Untitled Document
      প্রস্তুতি সংখ্যা/ফাল্গুন-চৈত্র ১৪১৬
Untitled Document
শহীদ মিনার, ১৯৯৮
Untitled Document
হ য ব র ল
আঁকিবুকি
চন্দ্রকন্যা সূর্যপুত্র
কোথায় কখন
ফাল্গুন-চৈত্র'১৪১৬

ফাল্গুন-চৈত্র'১৪১৬

কাজল মুখার্জী

ফাল্গুন-চৈত্র'১৪১৬
আসিতেছে
১লা বৈশাখ
সাপলুডু
বৈশাখ সংখ্যা

মোনালিসা স্টুডিও
ঘু ঘুড়ি ঘুড্ডি বাবা
সুমেরু মুখোপাধ্যায়
১.
প্রেম জেগেছে আমার মনে
বলছি আমি তাই।
তোমায় আমি ভালবাসি
তোমায় আমি চাই।।
ভালবাসা জীবনে বেশিবার আসে না, মিস করলে বাকি জীবনটা পস্তাতে হবে, এই রকম ধারণা অবশ্য সেই দেশে কারো মনেই ছিল না। তার বাপ ছিল দুঁদে রাজনৈতিক নেতা। তিনি বাঘ আর গরুকে চেন দিরেয় বেঁধে একই ঘাটে নিয়মিত পানি খাওয়াতেন। বাঘ গরুর দিকে মিটমিট করে চাইত বটে কিন্তু কিছু বলত না। তার দেশে সবাই ছিল তার বাধ্য। তাঁর ছিল যেমন বাজখাঁই গলা আর তেমনি তার দাপট। চন্দ্র-সূয্য পর্যন্ত তাঁর কাছে এসে মিনমিন করত। তাঁর দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়াটা ছিল শ্রেফ লৌকিকতা। তিনি চাইলে সমুদ্র থেকে পানি আর লবণ আলাদা করে ফেলতে পারতেন। তিনি লবণ আন্দোলনের কথা জানতেন তাই ছাড় দিলেন সমুদ্রকে। তিনি আন্দোলন ফন একদমই পছন্দ করতেন না। ক্ষেত্রে ফসল ফললেই সেনা বাহিনী পাঠিয়ে কেটে নিয়ে আমসতেন। তাঁর সমন্ত ইচ্ছাই সেনাবাহিনী অক্ষরে অক্ষরে পালন করত। দেশে সেনা নিয়োগের পদ্ধতিটি ছিল খুব অদ্ভুত। তাদের কেবলমাত্র তিনটি পরীক্ষা দিতে হত।
১. সে সর্বদা মিথ্যা কথা বলে কিনা?
২. সে মানুষ হত্যা করতে ভালবাসে কি না?
৩. প্রমাণ লোপাট করতে সে তৎপর কি না?
মেয়ের ছয় বছরের জন্মদিনে প্রাইমমিনিস্টার বাপ তাকে উপহার দিল একটা লাই ডিটেক্টার ও এক বোতল পটাশিয়াম সায়ানাইড। মেয়ে রোজ ঘর বন্ধ করে লাই ডিটেক্টারের সামনে বসে মিথ্যা কথা বলার অভ্যাস করতে লাগল। সেনা বাহিনীর উপর হুকুম ছিল তার কাছে রোজ একজন করে ভাল মানুষ হাজির করার। এটা ছিল তার প্রাকটিশ। সে মানুষ মেরে খুব মজা বেত। তার যখন ১৪ বছর বয়েস, মেজর সাথে করে নিয়ে এল এক নামজাদা বিজ্ঞানীকে। সেই হারামজাদা এতদিন বিদেশে গবেষণার নাম করে পালিয়েছিল, দেশে ফিরতেই তাকে হাজির করলেন প্রধানমন্ত্রীর মেয়ের কাছে। কাঁচাপাকা চুলের বিজ্ঞানী পটাশিয়াম সায়ানাইড দেখে খুব খুশি হয়ে গবেষণা করাতে বসে গেলেন। চোখের নিমেষে ঘর ভর্তি হয়ে গেল সবুজ, হলুদ আর বেগুনী ধোঁয়ায়, চারদিকে জলপ্রপাতের মত শব্দ হতে লাগল। বিজ্ঞানী প্রধানমন্ত্রীর বাসার সমস্ত জরুরী ফাইলপত্র, বিদেশী ঋণের দরখাস্ত সব ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ডুবিয়ে দিলেন কেমিক্যালের মধ্যে আর সারা ঘর জুড়ে রঙিন রঙিন ঘুড়ি উড়তে লাগল।
মেয়ে দেখল এই বিজ্ঞানী তার আব্বার থেকে বেশি শক্তিধর। তার কাছে গিয়ে সে নতজানু হয়ে বলল, আই লাভ ইউ, কিন' আমি তোমায় বিয়ে করতে চাই না, এসো আমার ভালবাসা গ্রহণ কর। বিজ্ঞানী সেই সরা ঘর উড়ে বেড়ানো রঙিন আর ধোঁয়ার ভেতরে সেই মেয়েকে জাপ্টে ধরলেন এবং তার বুকে মুখ ঘষতে থাকলেন। আর্মির মেজর এসে ঘরের বাতি নিভিয়ে দিল।

২.
ওরে, ও আমার টুকুন,
তোমার মাথায় বাছব বসে
ভালবাসার উকুন।।
নদী দিয়ে অনেক পানি বয়ে গেল। “ক” এর পর “খ” আর “খ” এর পর “গ” দেশের প্রধানমন্ত্রী হল। দেশের নীতি স্ট্রং থেকে স্ট্রংতর হল। আলট্রা-পালট্রাসোনোগ্রাফি দিয়ে ভ্রূণ চেক করে দেখা হত গর্ভস' বাচ্চা ধান্দাবাজ, মিথ্যাবাদী ও সন্ত্রাসী হবে কি না? তারপর সরকার থেকে দেওয়া হত প্রিবার্থ সার্টিফিকেট। বহু দেশ-বিদেশে বিটারমুন সেরে সেই মেয়ে দেশে ফিরেই সাবাইকে ঠান্ডা করে দিল জাদু দিয়ে, কেউ ট্যাঁ-ফো ও করল না। সেই মেয়ের নাম ছিল ঘ। সে হল দেশের চতুর্থ ও প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী। শপথবাক্য পড়ার পর থেকেই সে নিয়ে ব্যপক রদবদল। পরিস্কার বল্লেন, ক খ গ এতদিন যা মিসটেক করেছে তা আর তিনি করতে চান না। সকলে খুব হাত তালি দিল সেনাবাহিনীর কথামত। উকুন বাছার মত করে বুদ্ধিজীবি, বিজ্ঞানী ও ব্যবসায়ীদের মারার নির্দেশ দিলেন, এরা সব ক খ গ জমানার লোক এদের দিয়ে কিস্যু হবে না। কলে কারখানায় এখন একটাই শব্দ- ঘ্যাচাং। প্রধানমন্ত্রী রোজ একেকটা নতুন নতুন হুকুম করতেন, সেনাবাহিনী ঘেউ ঘেউ করতে করতে তা পালন করত।
ঘ দেশে ফিরলেও তার মন পড়েছিল বিদেশে, এ দেশের আবহাওয়া তার ছিল একেবারে অপছন্দের। দেশের বেসিক্যালি কিছুই তার পছন্দ ছিল না, সবেতেই তিনি ছিলেন বীতশ্রদ্ধ, তিতি-বিরক্ত। মাটি-কাদা-চাষ-বাষ ছিল তার দুই চক্ষের বিষ, তার স্বপ্ন ছিল ডিজিটার দেশ গড়বেন। তিনি বিজ্ঞানীদের নির্দেশ দিলেন ডিজিটাল খাবার-দাবার বানাতে। বিজ্ঞানী মহল তাকে খুব ভয় পেত। প্রধানমন্ত্রীর প্রাক্তণ স্বামী ছিলেন এক নামজাদা বিজ্ঞানী, এখন তিনি নাকি কেবল ঘুড়ি ওড়ান, সে ওড়াক। বিজ্ঞানীরা ঘ্যান ঘ্যান করতে সব ডিজিটালাইজ করতে লাগল।
বিপত্তি দেখা দিল, সমস্ত খাবার ডিজিটালাইজ করা সম্ভব হল না। সিস্টেম এরর দেকা দিতে লাগল। সেইসব সমস্যার সমাধানে বিদেশ থেকে প্রযুক্তিবিদ নিয়ে আসা হল। খুব ছোটবেলা থেকেই প্রধানমন্ত্রী শুধুমাত্র ঘি খেতেন। যখন তিনি বিদেশে থাকতেন ফ্লাইট ভর্তি করে ঘি যেত, সারা দেশবাসী তা জানে। বিদেশী প্রযুক্তিবিদেরা দেশী ঘি-এর কোড লিখতে পারল না। যা বানায় সব হয় বাটার নয় চীজ, আর সেগুলো দেখলেই ম্যাডামের বমি পায়। ঘ-এর নির্দেশে সেনা বাহিনীর লোকেরা সেইসব ঘিযুক্তিবিদদের ভাল করে লেসন ও লসন দিয়ে হেলিকপ্টারে ঝুলিয়ে ছেড়ে দিয়ে এল দূর দূর সব দ্বীপে। ইউ এক নেশন ঝামেলা করতে পারে বলে ডাইরেক্টরি প্রাণে মারা হল না। সংস্কৃতিমন্ত্রী এর নামকরণ করলেন “ঘেলায়েজনিং”
 
৩.
দয়ালবাবা কলা খাবা গাছ লাগায়ে খাও।
পরের গাচের পানে বাবা মিটমিটায়ে চাও?
আকাশ আস্তে আস্তে ভরে উঠল লাল নীল হলুদ কমলা বেগুণী গোলাপী সবুজ রঙে। রঙ বেরঙের ঘুড়িতে আকাশ যেন ছিট কাপড়ের জামা। আকাশের সেই অদভূত রূপ দেখে মন্ত্রীরা সব কবি হয়ে গেল, ঘুড়ির নাম দিতে লাগল; পেটকাটি, চাঁদিয়াল, বগ্গা। অ্যাসেম্বলিতে সভা বসলে হয় কবিগান আর তরজা, সে এক অপরূপ ব্যাপার। সেনারা দৌড়ে এল প্রধানমন্ত্রীর কাছে ম্যাডাম সারা আকাশ ঘুড়িতে ঢেকে গেছে, হেলিকপ্টার-প্লেন কিস্যু ওড়ানো যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর সেদিন এমনিতেই ঘুম ভাল হয়নি, বিশ্রী একটা স্বপ্ন দেখেছেন। গোটা আর্মির কাপড়-জামা দিয়ে এলিয়েনরা ঘুড়ি বানিয়ে ওড়াচ্ছে আর সেনা বাহিনীর দামড়াগুলো উদ্যোম হয়ে দৌড়াচ্ছে ঘুড়ির পেছন পেছন, ঘেউ ঘেউ করে। প্রধানমন্ত্রী চোখ বড়বড় করে তাদের ধমকে দিলেন, যাও তোরা নিজের চরকায় তেল দাও।
প্রধানমন্ত্রীর ইষদউষ্ণ ঘিতে চুমুক দিতে দিতে তিনদিন অনেক ভাবলেন কিন' কোন কূল কিনারা পেলেন না। এ কি হোলো রে! লোকে পড়াশোনার বই-খাতা, ধর্মগ্রন্থ, সরকারী দস্তাবেজ, প্রাচীন পুঁথি, বাড়ির দলিল, খবরের কাগজ সবকিছুই বানাচ্ছে রঙ-বেরঙের ঘুড়ি। আর ওড়াচ্ছে। বাজার রাস্তাঘাট সমস্ত ফাঁকা শুদু সেনা বাহিনী ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাও হেলিকপ্টার রাস্তায় হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে। কি দুর্ভোগ রে বাবা! তিনি ক্ষমতায় এসেই জটিল এক নদী চুক্তি করেছিলেন প্রতিবেশী দেশের সাথে। নদী শুকিয়ে কি সুন্দর সুন্দর সব চর গজিয়েছিল, আহা ভেবেছিলেন ডিজিটাল হাব করবেন। সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁস এদের সইবে কেন? চরে গেছে ঘুড়ি ওড়াতে, ফালতু ঝামেলা।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসে জানালেন সমস্ত দেশে ছেড়ে গেছে এই মরণব্যাধি আর এর কোন ওষুধ এখনও পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি। সমস্ত মুক্তিকামী মানুষ নাকি এই অসুখের ফলে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। তিনি এর নামকরণ করলেন “ঘ্রাইডস”। প্রধানমন্ত্রী বিপদের গন্ধ পেলেন, তিনি সকালে প্রাতঃভ্রমণে যান হেলিকপ্টারে চড়ে, সেটা বন্ধ। বিদেশে ছেলেমেয়েরা পড়াশুনো করছে, তিনি মাঝে সাঝে গিয়ে তাদের আপেলটা-বিস্কুট খাইয়ে আসেন এখন সব বন্ধ। তারপর তিনি প্ল্যান করেছিলেন ডিজিটাল দেশের ওপরে একটা লম্বা ছাউনি দেবেন, রোদ্দুর বৃষ্টি কিস্যুর ঝামেলা থাকবে না। জাপান-কোরিয়া দুইজনেই ইন্টারেস্টেড ছিল, এখন? সেনা প্রধানকে ডেকে নির্দেশ দিলেন, কিল দেম।
মেজর এসে জানালেন, ম্যাডাম ঘোর বিপদ। হয় গুলিতে ভেজাল অথবা তিরিশ বছর কথায় কথায় এদের গুলি খেতে খেতে হজম শক্তি বেড়ে গেছে, কারুর কিস্যু হচ্ছে না। আর ভাইরাস এমন ছেয়েছে, আমাদের যে ব্যাটেলিয়ানই চরে যাচ্ছে সেই বন্দুক ফেলে ঘুড়ি ওড়াতে শুরু করছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গিয়েছিলেন তদন্তে তিনিও এখন ঘুড়ি ওড়াচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর মাথা বোঁ বোঁ করে ঘুরে গেল। তিনি দেওয়াল ধরে বসে পড়লেন, মেজর দৌড়ে একগ্লাস গরম ঘি এনে তার মুখের সামনে ধরল, শক্ত হোন ম্যাডাম।
বিদেশীমন্ত্রী অ্যাসেম্বলিতে জানালেন জাপান- কোরিয়া দুজনেই দেশের সঙ্গে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রোগ্রামিং এর কোড লিখে মৈত্রী স্থাপন করতে চায়। তথ্য ও প্রযুক্তিমন্ত্রী এর নামকরণ করলেন ভিজুয়াল কাইটিং +++। অ্যাসেম্বলিতে জোর-কল্পনা চলতে লাগল দেশের ভবিষ্যত নিয়ে। সবাই গভীর আলোচনায় মগ্ন, তারমধ্যে খবর এল অ্যাসেম্বলির ছাদে ঘুড়ি ওড়াচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং, সহায়তায় সেনা প্রধান। সবাই হৈ হৈ করে উঠে পড়ল সিট ছেড়ে। স্পিকার বললেন, একমিনিট ; আজকের দিনটা খুবই ইস্পেশাল। এর একটা ইস্পেশাল নাম হওয়া উচিত। স্পিকার নামকরণে ছিলেন খুব উইক, তার রিকোয়েস্টে শেষশেষ শিক্ষামন্ত্রী মানকরণ করলেন, “ঘিন্ডিপেন্ডেন্স ডে”, বাংলায় “ঘাধীনতা দিবস”।

ঘুড়ি উৎসব, পদ্মার চর, ২০০৮
   
আলোকচিত্র : সুমেরু মুখোপাধ্যায়।    
Untitled Document
Total Visitor : 163970
সাপলুডু মূলপাতা Contact : shapludu@gmail.com
Copyright @ 2010-2013 Shapludu Developed and Maintained By : Life Yard