Untitled Document
মাঘ সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী

ধ্রুপদী থেকে
(মুহম্মদ খসরু সম্পাদিত পত্রিকা)
ক্ষুধার নন্দনতত্ত্ব
- গ্লাউবের রউসা
লাতিন আমেরিকা সম্পর্কে আলোচনার ক্ষেত্রে তথ্যবহুল জুড়ে দেয়া নিতান্ত প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপীয় পর্যবেক্ষেকরা যেভাবে বিশ্লেষণ করেন আমি বরং তার চাইতে কম সীমাবদ্ধকর পরিভাষায় আমাদের সংস্কৃতি ও ‘সভ্য’ সংস্কৃতির মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয় করতে পছন্দ করব। দেখা যায়, লাতিন আমেরিকা যখন এর সার্বিক দুর্দশায় শোকগ্রস্ত, বিদেশী দর্শকরা তখন সেই দুর্দশা উপভোগ করার রুচি গঠন করে, আর সেই দুর্দশাকে মর্মান্তিক উপসর্গ হিসেবে না নিয়ে তারা বরং একে কেবলই তাদের একটি আগ্রহজনক প্রাকরণিক উপাদান হিসেবে গ্রহণ করে। লাতিন আমেরিকা সভ্য মানুষের বোধের কাছে পৌঁছুতে পারে না; আর সভ্য মানুষও সত্যিকারভাবে উপলব্ধি করতে পারে না সেই দুর্দশা।
মূলত এটিই ব্রাজিলের শিল্পকলাসমূহের পরিস্থিতি। এখনো পর্যন্ত বিকৃত সত্য (সামাজিক সমস্যাবলিকে সমূল-করে-তোলা প্রাকরণিক বৈদেশিকবাদ) ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে, আর তার ফলে তৈরি হয়েছে রাশি রাশি ভ্রান্ত ধারণা যেগুলো কেবল শিল্পের এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও অনেক গভীরে প্রবেশ করেছে। ইউরোপীয় দর্শকদের ক্ষেত্রে অনুন্নত বিশ্বের শিল্পকলা সৃষ্টির পদ্ধতি ততোটুকুই আগ্রহজনক যতোটুকু আদিমতার প্রতি তাদের নষ্টালজিয়াকে তুষ্ট করে। সাধারণত এই আদিমতা (প্রিমিটিভিজম) শঙ্কররূপে উপস্থাপিত হয়-এর ছদ্মবেশ থাকে সভ্য বিশ্বের বিলম্বিত উত্তরাধিকারীর, আর একে যথাযথ বোঝা যায় না, কারণ এতে চাপানো থাকে উপনিবেশ সৃষ্ট শর্তাবলী। অস্বীকার করার উপায় নেই যে লাতিন আমেরিকা উপনিবেশ হিসেবে বিদ্যমান। গতকালের উপনিবেশবাদের সঙ্গে আজকের উপনিবেশবাদের পার্থক্য শুধু এখানে যে সমকালীন উপনিবেশকারী অধিকতর পরিশোধিত রূপ প্রয়োগ করে। আর যারা ভবিষ্যতে সাম্রাজ্য গড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা আরো বেশি চতুর রূপ দিয়ে একে প্রতিস্থাপন করতে চেষ্টা করছে।আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিতে লাতিন আমেরিকা এখনও যে-সমস্যায় ভুগছে তা হল কেবল উপনিবেশীয় পরিবর্তন। তাই আমাদের সম্ভাব্য স্বাধীনতা সব সময়ে একটি অধীনতা মাত্র।


এই আর্থনীতিক ও রাজনীতিক শর্তাবদ্ধতা কখনো সগোচরে কখনো-বা অগোচরে দার্শনিক পুষ্টিহীনতা ও অক্ষমতার দিকে আমাদের তাড়িত করেছে; প্রথমোক্তটি জন্ম দেয় নির্জীবতার আর দ্বিতীয়টি বিকারগ্রস্ততার। লাতিন আমেরিকায় ক্ষুধা যে একটি আতঙ্ককর উপসর্গ মাত্র নয়, বরং সমাজের মূল সারবস্তু, তার পেছনে রয়েছে এই কারণসমূহই। বিশ্ব চলচ্চিত্রের সঙ্গে তুলনায় ‘সিনেমা নোভো’ (Cinema Novo) –এর বেদনাদায়ক মৌলিকতার কারণ এখানেই নিহিত। ক্ষুধাই আমাদের মৌলিকতা আর আমাদের প্রধান দৈন্য হচ্ছে এই যে ক্ষুধা আমরা অনুভব করতে পারলেও বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে অনুধাবন করতে পারি না।
ক্ষুধাকে আমরা যেভাবে বুঝি ইউরোপীয়রা এবং ব্রাজিলীয়রা সেভাবে বুঝতে অক্ষম। ইউরোপীয়দের কাছে একটি অপরিচিত গ্রীষ্মমন্ডলীয় অধিবাস্তবতা বিশেষ, ব্রাজিলীয়দের কাছে যা একটি জাতীয় লজ্জা। তারা অনাহারে থাকে কিন্তু মুখ ফুটে তা বলে না। অথচ তারা জানে না, কেন এই ক্ষুধা। আমরা জানি, কেননা আমরা নির্মাণ করেছিলাম ঐ সকল কুৎসিত, বিষাদময়, বেপরোয়া, তীক্ষ্ণ আর্তনাদপূর্ণ চলচ্চিত্রসমূহ, যেগুলোতে এই সুযুক্তি প্রাধান্য পায়নি যে, সরকারের সীমিত সংস্কারমূলক ব্যবস্থা দিয়ে এ ক্ষুধার নিবৃত্তি হয় না, টেকনিকালারের আচ্ছাদনে একে লুকানো যায় না বরং এর স্ফীতি আরও বৃদ্ধি পায় আর অবস্থার ঘটে আরও অবনতি। সুতরাং কেবল ক্ষুধা-সংস্কৃতি’ই পারে দুর্বল করে কিংবা বিনষ্ট করে গুণগতভাবে নিজ কাঠামোকে লঙ্ঘন করতে। ক্ষুধার সবচেয়ে মহৎ প্রকাশ ঘটাতে পারে প্রচন্ড সহিংসতা।
-চলবে 


     
Untitled Document

ফুল
Total Visitor : 708937
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :