Untitled Document
মাঘ সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
তোজাম্মেল আলি জ্বিনসাধক
- মুরাদুল ইসলাম
 


জহির সাহেবকে আজ চিন্তিত দেখাচ্ছে।বিরক্তিতে তার মুখ কুচঁকে আছে।বিরক্তির কারন সামনে দাঁড়ানো একজন লোক।নাম তোজাম্মেল আলী,জ্বিন সাধক।জ্বিনের বাদশা কফিল নাকী তার খাস চাকর।

জহির সাহেব বিরক্ত মুখে বললেন, আপনি জ্বিন সাধক?

তোজাম্মেল আলি বিনয়ের সাথে বলল,জি জনাব।জ্বিনের বাদশা কফিলকে আমি সাধনা করে বশে আনছি।ওয়িন বশে আনা অনেক কঠিন কাজ।

জহির সাহেবের বিরক্তি আরো বাড়ল।সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে জ্বিনসাধকের দেখা পেয়ে তার মাথা চটে আছে।বললেন, এখানে কেন এসেছেন?

তোজাম্মেল আলি হেসে হেসে বলল, জনাবের মনে হয় রাগ হচ্ছে।রাগ করবেন না জনাব।রাগ হচ্ছে আগুনের মত।আগুন যেমন কয়লাকে নাশ করে তেমনি রাগ পূন্যকে।জনাব অনুমতি দিলে রাগ কমানোর উপায় বলে দিতে পারি।কফিল কোহকাফ নগরী থেকে এই তরিকা এনে আমাকে শিখিয়েছে।

জহির সাহেব, আপনার উদ্দেশ্য টা কি বলবেন?কোন উদ্দেশ্যে এখানে এসেছেন?আপনি ঢুকলেনই বা কেমন করে?

তোজাম্মেল আলি হাসিমুখে বলল, জনাব আমি কোহকাফ নগরী থেকে খবর পেয়েছি আপনাদের কারো বিপদ আসবে।জ্বিনের বাদশার ছোট ছেলে মফিল খবরটা দিয়েছে।ছেলেটা  মিথ্যা বলে না।তাই আপনাদের এখানে ছুটে আসলাম।

আপনি কোহকাফ নগরী থেকে খবর পেয়েছেন?বলতে পারবেন কোহকাফ কোথায়?

তোজাম্মেল আলি হা হা  শব্দ করে হাসল।তারপর বলল,কোহকাফ নগরী জ্বিনদের রাজধানী।আমাদের যেমন ঢাকা,তাদের কোহকাফ।আমি স্বপ্নযোগে কয়েকবার গিয়েছি।সবই অত্যন্ত সুন্দর।

জহির সাহেব পেপার হাতে নিতে নিতে বললেন, আপনি এখন যান।আমার আপনার সাহায্যের কোন দরকার নেই।

তোজাম্মেল আলি হাসি হাসি মুখে জবাব দিল, জনাব আমি এখন যাচ্ছি,প্রয়োজনে আবার আসতে পারি।

জহির সাহেব এবার রেগে গেলেন।কিছু মানুষ আছে চট করে রেগে যায়।এদের রাগ চট করে নেমেও যায়।আবার কারো কারো রাগ উঠতে দেরী হয়।এদের রাগ নামতেও সময় লাগে।জহির সাহেব এই দ্বিতীয় শ্রেনীর।তার রাগ হঠাত হঠাত  উঠে।তিনি আবার হাত পাতলা স্বভাবের মানুষ।জীবনের প্রথম চাকরি ছেড়েছিলেন জিএম সাহেবকে কষে দুইটা চড় দিয়ে।তাই পরিচিত জনরা তাকে খুব ভয় পান।

জহির সাহেব পেপার রেখে উঠলেন।তোজাম্মেল আলি বসে ছিল।সেও উঠে হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে রইল।প্রায় পঞ্চাশ ষাট বছরের বৃদ্ধলোক।জহির সাহেব তার দিকে চোখ লাল করে বললেন,ভালয় ভালয় দূর হয়ে যা।নইলে দাড়োয়ান ডেকে পিঠের ছাল তুলে রেখে দেব হারামজাদা।

তোজাম্মেল আলি হয়ত এরকম আচরন প্রত্যাশা করে নি।তাই সে চোখ বড় বড় করে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল।তারপর আস্তে আস্তে চলে গেল।

তোজাম্মেল আলি চলে যাবার পর জহির সাহেব পেপারটা হাতে নিয়েছেন এমন সময় তার স্ত্রী শায়লা এসে প্রবেশ করলেন বারান্দায়।বসতে বসতে বললেন, সাত সকালে এখানে বসে আছো কেন?

জহির সাহেবের মেজাজ এমনিতেই খারাপ ছিল।মেজাজ ভাল থাকলেও তিনি স্ত্রীকে এড়িয়ে চলেন।জহির সাহেব খিটখিটে আয় বললেন,সাত সকালে বসে থাকব না তো কি নাচব?

--এরকম কথা বলছ কেন?তোমার সাথে এখন দেখছি কথাও বলা যায় না।

--জহির সাহেবের মনে হল ভয়ঙ্কর কোন কথা বলবেন।কিন্তু নিজেকে সামলালেন।বললেন,এমনিতেই একজন এসে মেজাজ খারাপ করে গেছে,তার উপর এখন শুরু করেছ প্যাচাল।

--শায়লা বললেন, এত সকালে তোমার কাছে কে এল?ছেলে মেয়েরা তো কেউ ঘুম থেকে উঠে নি।

--জহির সাহেব শীতল চোখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে  রাগ যথাসম্ভব সামলে বললেন, তুমি জান আমি ছেলেমেয়েদের উপর রাগ করি না।এসেছিল এক জ্বিনসাধক,তোজাম্মেল আলি।

----কি সাধক বললে? জ্বিনসাধক?

--হ্যা, জ্বিনসাধক।

---তুমি প্রেসার চেক করিয়েছ?

--জহির সাহেব আশ্চর্য হয়ে বললেন, এর সাথে প্রেসারের কি সম্পর্ক?

।----শায়লা একটু হেসে বললেন,দাড়োয়ান এখনো গেট খুলে নি।তুমি হয়ত ভূল দেখেছ।প্রেশারে মানুষের হ্যালোসিনেশন হয়,এই পর্যন্ত বলে শায়লা দেখলেন জহির সাহেব তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।মনে হচ্ছে যেকোন মুহুর্তে ঝাপিয়ে পড়বেন।শায়লা আর কিছু না বলে চলে গেলেন।জহির সাহেব পেপার হাতে স্তব্দ হয়ে বসে রইলেন।

 
সকালে নাস্তার টেবিলে জহির সাহেবের বড় মেয়ে নীলা জিজ্ঞেস করল, বাবা তোমার কাছে নাকি মরক্কোর জাদুকর এসেছিল?

জহির সাহেব একবার মেয়ের দিকে আরেকবার স্ত্রীর দিকে তাকালেন।কিছু বললেন না।তার স্ত্রী কোন কথা শুনলে সেটা বাসার সবাইকে বলে বেড়ান।আর বড় মেয়েটা ঠিক তার মায়ের মত।ফাজিল!মনে মনে বললেন জহির সাহেব।এটা বলার পরপরই বুকে সামান্য ব্যথা অনুভব করলেন। আস্তে আস্তে চিনচিনে ব্যথা বাড়তে লাগল।জহির সাহেব চেয়ার থেকে উঠলেন।কিন্তু হঠাতই আবার মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন।যখন জ্ঞান হল দেখলেন তিনি এক হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন।

চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন কোন ডাক্তার বা নার্স কেউ নেই।জহির সাহেব আগ্রহ নিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন।এমন সময় দরজা দিয়ে ভেতরে  ঢুকল তোজাম্মেল আলি।

চমকে উঠে জহির সাহেব বললেন, আপনি এখানে?

--জ্বি জনাব।আপনার বিপদে সাহায্য করতে আসলাম।আমি নিজ ইচ্ছায় আসি নাই।মফিল ছেলেটার কথায় আসছি।ছেলেটার দিল বড় নরম।

জহির সাহেব কি বলবেন বুঝতে পারলেন না।তিনি হাসপাতালে কেন তাও ঠিক বুঝছেন না।তিনি বললেন, আমি এখানে কেন বলতে পারেন?

--জি জনাব।আমি কোহকাফ নগরী থেকে খবর পেয়েছি আপনার ব্যাধী হয়েছে।

--কি ব্যাধী?

---কি ব্যধী জানিনা জনাব।নিশ্চয়ই গুরুত্বপুর্ন কোন ব্যাধী।নাহলে মফিলের সাহায্য দরকার হত না।

হঠাত তোজাম্মেল আলি ব্যস্ত হয়ে বলল, এখন যাই জনাব।পরে আবার আসব।তোজাম্মেল আলি বের হয়ে গেল।আর তার একটু পরেই ডাক্তার আসল।ছেলেমেয়েসহ উপস্থিত হলেন তার স্ত্রী।

কয়দিন হাসপাতালে থাকার পর জহির সাহেব জানতে পারলেন তার মারাত্বক রোগ হয়েছে।ক্যান্সার।তাড়াতাড়ি বিদেশ নিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে।সরকারী চাকুরীজীবি হিসেবে অত্যন্ত সৎ ছিলেন জহির সাহেব।তাই তার টাকা পয়সার পরিমানও বেশি না।বিদেশ  গিয়ে চিকিৎসা করার মত টাকা তার নেই।হয়ত শায়লা তার বাবার দিক থেকে ম্যানেজ করবেন।এসব বসে বসে ভাবছিলেন জহির সাহেব।এমন সমুয় তোজাম্মেল আলি আবার আসল।রুমে প্রবেশ করেই বলল, জনাবের শরীর কেমন?

---ভাল।

--জনাব কোন চিন্তা করবেন না।মফিল আপনাকে  সাহায্য করতে চায়।সে যখন সাহায্য করবে তখন ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই।

জহির সাহেব লোকটার দিকে ভাল করে তাকালেন।এটা কি তার মনের কল্পনা?ওইদিন সকালে হয়ত অসুস্থ ছিলেন কিন্তু আজ ত স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন, কথা বলছেন।জহির সাহেব চোখ বন্ধ করে মনকে শান্ত করার জন্য বললেন, শান্তি শান্তি শান্তি।চোখ খুলে দেখলেন সামনে হাসি হাসি মুখে তোজাম্মেল আলি বসে আছে।

তোজাম্মেল আলি বলল, জনাব কি জানেন ব্যাধী কোথায় হয়?

জহির সাহেব জবাব দিলেন,শরীরের বিভিন্ন স্থানে।

তোজাম্মেল আলি হাসতে হাসতে বলল,ভূল বললেন জনাব।ছোটখাট ব্যাধী হয় শরীরে আরত বড় ব্যাধি হয় মনে।এজন্য একে বলে মনব্যাধী।

তোজাম্মেল আলিকে হঠাৎ ব্যস্ত দেখাল।বাইরে পদশব্দ শোনা যাচ্ছে।কেউ হয়ত আসছে এদিকে।জহির সাহেব একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছেন কারো সামনে তোজাম্মেল আলি আসে না।ব্যস্ত হয়ে তোজাম্মেল আলি বলল,জনাব এইমাত্র জ্বিন কফিলের ছোট ছেলে মফিল আপনার রোগমুক্তির তাবিজ আমাকে জানান দিল।জনাব আপনি আমার কথা শুনেন।

জহির সাহেব কাতর চোখে তার দিকে তাকালেন।বাইরে পদশব্দ আস্তে আস্তে কাছে আসছে।তিনি ভিতরে ভিতরে উত্তেজনা অনুভব করছেন।কেউ আসালে তোজাম্মেল আলি থাকবে তো!

তোজাম্মেল আলি বলতে লাগল, জনাব আপনার বাড়িতে যে তেতুল গাছ আছে তার চিড়ল-বিড়ল পাতার নিচে পূর্নচন্দ্রের রাতে যদি আপনে শুয়ে থাকেব তবেই হবে আপনার রোগমুক্তি।এখন যাই জনাব।

তাড়াতাড়ি তোজাম্মেল আলি পর্দার আড়ালে বাইরে চলে চলে গেল।প্রায় সাথে সাথেই ঘরে প্রবেশ করলেন ডাক্তার এবং শায়লা।
শায়লা এসে বললেন, তোমার বিদেশে চিকিতসার সব ব্যবস্থা করা হয়েছে।বিদেশে চিকিতসা ভাল হয়।

জহির সাহেব বিছানায় উঠে বসলেন।তারপর বললেন,আমি বিদেশ যাব না,বাড়ি যাব।তুমি সাথে গেলে আস।আস্তে আস্তে বিছানা থেকে নেমে তিনি স্বাভাবিক সুস্থ মানুষের মতই বের হয়ে গেলেন।
 

পূর্নচন্দ্রের রাত।আকাশে উজ্জ্বল রূপালী চাদঁ।সাদা জোছনা ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে।হালকা মেঘ মাঝে মাঝে চাদঁ ঢেকে দেয়।কয়েক মিনিটের জন্য।তারপর আবার সরে যায়।জহির সাহেব তেতুঁল গাছের নিচে পাটি বিছিয়ে শুয়ে আছেন।তেতুল গাছের ছোট ছোট পাতার ফাকেঁ দুধের মত গাঢ় জোছনার খেলা দেখছেন তিনি।এমন জোছনা তিনি এর আগে দেখেন নি।হালকা বাতাসে তেতুঁল পাতা আস্তে আস্তে নড়ে উঠে।জহির সাহেবের চোখে ঘোর লেগে যায়।তার কাছে মনে হচ্ছে সাদা জোছনা ঢেউ খেলে যাচ্ছে।জহির সাহেব এখন চলে গেছেন ঘোরের জগতে।যে জগতে জরা নেই,মৃত্যু নেই,রোগ শোক নেই।জহির সাহেবের একটা গানের কথা মনে হল,কোথায় যেন শুনেছিলেন,

চাদনী পসর চাদনী পসর আহারে আলো
কে ভেসেছে কে ভেসেছে তাহারে ভালো।

     
Untitled Document

ফুল
Total Visitor : 708727
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :