Untitled Document
মাঘ সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
দুই বছর
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী
সদুত্তর দেবেন কি ?
- শুভ কিবরিয়া
 


মাননীয় প্রধানমন্ত্রী
শুভেচ্ছা নেবেন।
গণতান্ত্রিক সরকারের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে আপনাকে অভিনন্দন।
এক ঘনকালো অনিশ্চয়তায় ভরা সেনানির্দেশিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর শেষে প্রত্যাশাময় গণতান্ত্রিক শাসনের দুই-বছরও অতিক্রান্ত হলো।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার দুই বছরের শাসনামলের দিকে পেছন ফিরে তাকালে কৃষি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাফল্যের জন্য প্রথমেই আপনাকে অভিবাদন জানাই।
শত বিঘ্ন বাধা অতিক্রম করে বছরের শুরুতে সকল স্কুল শিক্ষার্থীর হাতে পাঠ্যবই তুলে দিতে পারার কৃতিত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। এই কৃতিত্ব আপনারও। এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর হাতে সঠিক সময়ে বই তুলে দিয়েই শিক্ষা মন্ত্রণালয় থামেনি, একটি অসাম্প্রদায়িক যুগোপযুগী বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষানীতি প্রণয়নের কাজটিও তারা সেরেছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এ কারণে ধন্যবাদ পাবার যোগ্য। বছরের মাঝখানে স্কুল-কলেজ এমপিও ভুক্তি নিয়ে যে বিব্রতকর অবস্থায় তাকে ফেলা হয়েছিল, তার রেশ কাটিয়ে আপনার পরামর্শ মোতাবেক তিনি যে লক্ষ্যে অবিচল থেকেছেন সে কারণে জাতি আপনার প্রতিও কৃতজ্ঞ।
কৃষিমন্ত্রীও বাহবা পাবার যোগ্য। কৃষিপণ্য, বীজ, সার নিয়ে খুনোখুনি, রক্তারক্তির রাজনীতির সেই অচলায়তন তিনি ভেঙ্গেছেন দ্বিতীয় বছরেও। কৃষকবান্ধব হবার প্রাণপন চেষ্টা করেছেন। দলবাজির ঊর্ধ্বে উঠে হৃদয় দিয়ে কৃষকদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছেন। সফলও হয়েছেন। কৃষি উৎপাদন বেড়েছে। কৃষকরা কৃষিপণ্যের দামও পেয়েছেন।
এক সময় কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল মতিয়া চৌধুরীর হাতে। কৃষি ও খাদ্য দুটো একে অপরের পরিপূরক। কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে খাদ্য চাহিদার সমন্বয় খুব জরুরি। বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী প্রাণপণে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্দশা ঘোচেনি। যথাসময়ে খাদ্যপণ্য কেনা যায়নি। চালের চাহিদা পূরণ করা যায়নি। খাদ্যপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনার ত্রুটিগুলো সামলানো যায়নি। একসময় কঠোর হাতে যে সমস্যা মতিয়া চৌধুরী সামলেছেন একাই বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী তা সামলাতে পারেননি। ফলে এক দুর্বল ব্যবস্থাপনা ভর করেছে খাদ্যপণ্যের বাজারে। কথা হয়েছে অনেক। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। খাদ্যপণ্যের দাম দ্রুতই বাড়ছে। শুধু খাদ্যপণ্য কেন সকল নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামই হু হু করে বাড়ছে।

২.
দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে আপনি সবাইকে ধৈর্য ধরতে পরামর্শ দিয়েছেন। বলেছেন, ধৈর্য ধরলে আপনার এবং আপনাদের নেয়া কর্মকাণ্ডের সুফল জনগণ পাবে।
কিন্তু মান্যবর প্রধানমন্ত্রী ,সহসাই একটা প্রশ্ন জাগে, ধৈর্য কতদিন ধরতে হবে?
দ্রব্যমূল্য হু হু করে বাড়ছে। আপনি ভাষণে বলেছেন, এ বাড়ার বাস্তবসম্মত কারণ নেই। আশ্বস্ত করেছেন, এর তদন্ত হবে। কিন্তু কতদিনে?
আর তদন্ত হলেই বা জনগণের কি লাভ হবে ?
কত সময় পরে মানুষ এর সুফল পাবে?
আর কাকে নিয়েই বা তদন্ত করবেন?
গোয়েন্দা সংস্থা তো সচল প্রবল আছেই? তবুও প্রতিকার নেই কেন?
আর এই গোয়েন্দাসংস্কৃতির ফল তো দু’বছর ধরেই দেখছে মানুষ।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ,খুব জানতে ইচ্ছে করে, এ দুই বছরে আপনার নিয়ন্ত্রণাধীন গোয়েন্দা সংস্থা কি ছাত্রলীগ-যুবলীগের চিহ্নিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, দুষ্কৃতিকারীদের চিনতে পেরেছে ,?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পাবনায় স্থানীয় এমপি- ছাত্রলীগ- যুবলীগ বনাম প্রশাসনের অনায্য যুদ্ধে ডিসি, এসপি, ইউএনও প্রত্যাহার হয়েছে। সেই সময় ছাত্রলীগ-যুবলীগের যেসব পাণ্ডারা  প্রশাসনের ওপর তাণ্ডব চালিয়েছিল তারা আদালত থেকে বেকসুর খালাস পেয়েছে। আপনি কি তা জানেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!
আদালতের বিচারে আপনার সোনার ছেলেরা ‘নির্দোষ’ হয়েছে । কিন্তু কেনো তা কি আপনি জানেন?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ,তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষীরা সাক্ষ্য দেয়নি  !
২১ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ৮ জন সাক্ষী দিয়েছে। যারা সাক্ষ্য দেননি তাদের মধ্যে আছেন, প্রধান সাক্ষী রাজশাহী বিভাগীয় সহকারী কমিশনার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), সহকারী কমিশনার (ভূমি), পাবনা সদর থানার ওসি। প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, জেলার প্রশাসনের দাপুটে কর্মকর্তারা  আপনার ছাত্রলীগ- যুবলীগের কৃতবিদ্যা (!) সন্তানদের বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসেনি। পেছনের কারণ আপনি হয়ত জানেন। কিন্তু জনভাবনা বা পাবলিক পারসেপশন হচ্ছে, ডিসি-এসপি-ইউএনওর অমপানজনক পরিণতির পর আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে এই কর্মকর্তারা আর নিজেদের দুর্ভাগ্যের মুখোমুখি ফেলতে চাননি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পাবনার এই ঘটনা প্রমাণ করেছে, সুবিচার মেলেনি।
এরকম অজস্র ঘটনা ঘটিয়েছে ছাত্রলীগ।
কোথাও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির খবর পাওয়া যায়নি।
ছাত্রলীগ-যুবলীগের অপকর্ম কেন এতটা দায়মুক্তি পায় ,মাননীয় প্রধানমন্ত্রী?

৩.
বাংলাদেশ ব্যাংকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার জমা আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সোনা কিনছে। এসব খবর আশা জাগানিয়া। কিন্তু যে রেমিটেন্স বা প্রবাসী শ্রমিকদের আয় থেকে এই টাকা আসছে তার পরিস্থিতি কি? মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বাংলাদেশের শ্রমিকদের দুরবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। মালয়েশিয়া থেকে সাড়ে তিন লাখ শ্রমিক চুক্তির মেয়াদ শেষে ফেরত আসছে। তাদের চুক্তি নবায়ন করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। অথচ মালোয়েশিয়ার বাজারে শ্রমিক চাহিদা কমেনি, বেড়েছে। তারা লোক নেবার জন্য বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। একজন সাংবাদিক এই প্রশ্ন তুলেছিলেন প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীর কাছে। জানতে চেয়েছিলেন মালয়েশিয়া নতুন শ্রমিক নেবার জন্য বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, আর বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক শ্রমিক ফেরত আসছে, বাংলাদেশি শ্রমিকদের চুক্তি নবায়ন হচ্ছে না কেন?
প্রবাস কল্যাণ মন্ত্রী জবাব দিয়েছেন ‘এই প্রশ্নের উত্তরটা মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাইতে পারেন।’
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই হচ্ছে শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অবস্থা। আপনি কি জানেন সেখানে বেসরকারী জনশক্তি রপ্তানীকারক প্রতিষ্ঠান বায়রা এবং মন্ত্রণালয়ের বাহাস, বিরোধ, সংঘাত চলছে।একে অপরের বিচার চাইছে।এই প্রতিকারহীন লড়াইয়ে  ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের শ্রমবাজার!

৪.
বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার শেষে বেশ ক’জন আত্মস্বীকৃত খুনিদের শাস্তি হয়েছে। এই কৃতিত্ব আপনার। পলাতক খুনিদের ধরা এবং দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে আপনার মন্ত্রীরা অনেক কথা বলেছেন দু’বছর ধরে। ফলাফল আসে নাই। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ এগিয়েছে। কৃতিত্ব আপনার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। জেলহত্যার বিচার হবে কিনা জানি না। তবে সরকার ঢিমেতালে হলেও উদ্যোগী হয়েছে।
কিন্তু ভোলা-৩ আসনের সংসদ সদস্য নূরন্নবী চৌধুরী শাওনের কথা কি মনে আছে? আওয়ামী যুবলীগের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ইব্রাহিম হত্যার কথিত অভিযোগে এমপি শাওনের কি বিচার হবে? নাকি তার জন্য সাত খুন মাফ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী?
নাটোরের বড়াইগ্রামের উপজেলা চেয়ারম্যান সানাউল্লাহ বাবুর হত্যাকারী যুবলীগ-ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগ নেতাদের কি ধরা হবে প্রধানমন্ত্রী!
ইব্রাহিম, সানাউল্লাহ বাবুর প্রাণ সংহারকারীরা কি আইনের আওতায় আসবে আপনার শাসনামলে?
নাকি তারাও রেহাই পেয়ে যাবে দায়মুক্তির আওতায়?

৫.
বিদ্যুৎ জ্বালানি সঙ্কটের নিরসনে আপনার সরকার কি কি পদক্ষেপ নিয়েছে তা আপনি বিস্তর বলেছেন আপনার সর্বশেষ ভাষণে। বিদ্যুতের বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি একটি ব্যাখ্যায় বলেছে, ‘দেশের প্রকৃত বিদ্যুৎ উৎপাদন নিম্নমুখী। বর্তমান সরকারের সময় ২০টি প্রকল্পের মাধ্যমে এক হাজার ২১ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবার কথা বলা হচ্ছে। যার ১৬টি তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলের প্রকল্প। নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও পুরনো অনেক প্রকল্পের উৎপাদন বন্ধ।’
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আপনার প্রিয়ভাজন জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী অব্যাহতভাবে বিতর্কিত কর্মকাণ্ড চালিয়েই যাচ্ছে। এই দুই বছরের শাসনামলে বিদ্যুৎ খাতে দায়মুক্তির আইন তৈরি হয়েছে। জোট সরকারের আমলে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে বলেছেন এ সেদিনও বক্তৃতায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী  ওই দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিচার করার আইন ছিল, আছে। আপনার এবারের দুই বছরের  শাসনামলে জ্বালানী সেক্টরে দুর্নীতি হলে তার বিচার করার পথও আইন করে  রুদ্ধ করা হয়েছে। দুর্নীতি হলেও ওই আইনের আওতায় কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারী কাওকে আদালতে আনা যাবে না। তাই খুব অবাক হয়ে ভাবতে হয়, যে গণতন্ত্রের জন্য আপনার জীবনপাত, আপনার লড়াই সেই আপনিই ‘বিদ্যুতের দায়মুক্তির আইন’ এর মতো ইনডেমনিটি আইন তৈরি করেন কিভাবে?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার কি স্মরণে আছে ৫০ বছরের গ্যাস সংরক্ষণ করে তারপর রপ্তানি বিষয়ক আপনার অতীত ভাবনার কথা? দিনাজপুরের  ফুলবাড়ীতে দেশের জন্য আত্ম্হুতি দেয়া শহীদদের স্মরণসভায় জনগণকে দেয়া আপনার প্রতিশ্রুতির কথা।
দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে দেয়া ভাষণেও বিদ্যুৎ খাতে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলের দুর্নীতির কথা বলেছেন! কিন্তুশুধু কথা বলছেন কেন? এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিশন হচ্ছে না কেন? দায়ী ব্যক্তিরা বিচারের আওতায় আসছে না কেন? এছাড়াও মাগুরছড়া দুর্ঘটনা, নাইকো দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ আদায় হয়নি যেসব নেপথ্য দুষ্কৃতিকারীদের জন্য, তাদের বিচারটিও সামনে আনা যেত। জনগণ জানতে পারত কারা দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেয় ব্যক্তিস্বার্থে। জনগণের প্রিয় নেত্রী, এ কাজটি কি আপনি করতে পারেন না?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, উইকিলিসের তথ্য তো জেনেছেন সংবাদপত্র মারফত। কেন আপনার জ্বালানি উপদেষ্টা ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে কয়লা তুলে তা এশিয়া এনার্জির হাতে দিতে চায়, কেনো দেশের স্বার্থ  ক্ষুণ্য করে মার্কিন-ব্রিটিশ কোম্পানির হাতেদেশের গ্যাসক্ষেত্র দিতে এত তৎপর তিনি- তার খবর বেরুচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, একদিন হয়ত ভেতরের আরো খবর বেরুবে।
বিএনপি-জামায়াত জোট শাসনে তারেক-কোকোরা যেমন ভাবত সিঙ্গাপুর বা বিদেশে টাকা পাচার করলেই রক্ষা, কিন্তু জননেত্রী আপনার সরকার তো প্রমাণ করেছে, তাতে রক্ষা নেই। আজ পৃথিবীর কোথাও পাচার করে টাকা সরিয়ে লাভ নেই। সরকার তৎপর হলে তা বেরুবেই।
ভবিষ্যতের সরকারগুলো কি এসব ভেতরের খবর বের করতে তৎপর হবে না মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!

৬.
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জনমত জরিপগুলোর দিকে কি আপনার সদয় দৃষ্টি পড়েছে? যখন কেউ ক্ষমতায় থাকে, তখন তাকে ঘিরে থাকে আমলা এবং গোয়েন্দাদের এক বড় বলয়। তারা সত্য-চশমাকে খুলে ক্ষমতাসীনকে পরায় আত্মতুষ্টির রঙিন-চশমা।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতার ওই চেয়ারে বসেছেন। সংসদীয় গণতন্ত্রের আওতায় ওই চেয়ার ঘিরে থাকা প্রভাব বলয়, জনগণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা অগণতান্ত্রিক বলয় আপনার অচেনা নয়। ওই চেনা, জানা-শোনা- দেখা প্রভাব বলয়ের রঙিন চশমা খুলে সাদা চোখে কি দেখেছেন, দুই বছর শেষে সংবাদপত্রের জরিপগুলো ? চোখে কি পড়েছে টিআইবির জরিপ? যখন বিরোধী দলে থাকতেন, তখন টিআইবির দুর্নীতির জরিপ নিয়েই কিন্তু আপনি সরকারকে সতর্ক করতেন। সে সময়ের সরকারগুলো তা শোনেনি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ,এবারের এসব জরিপ বলছে গত দুইবছরে রাজনীতি সঠিক পথে  চলে নাই ।  ২০০৯ এবং ২০১০-এর দুই বছরের জনমত জরিপে ফলাফল এ বিষয়ে নিম্নমুখী। একটি বাংলা সংবাদপত্রের জরিপ মতে ২০০৯ সালে যে ৭০ শতাংশ মানুষ ভাবত দেশ সঠিক পথে চলছে, ২০১০-এ তাদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬১ শতাংশে। অন্যদিকে ওই একই সময় যারা ভাবত দেশ ভুল পথে চলছে বর্তমানে তার হারও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯ থেকে ৩৯ শতাংশে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী , ওই জরিপ অনুযায়ী দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, অর্থনীতির সার্বিক গতি, রাজনীতির পরিবর্তন ইত্যাদি বিবেচনায় প্রথম বছরের তুলনায় আপনার সরকারের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। অথচ ওই জনমত জরিপেই কিন্তু উঠে এসেছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, কৃষিক্ষেত্রে, শিক্ষাক্ষেত্রে নেয়া আপনার সরকারের পদক্ষেপসমূহের প্রতি জনগণের ইতিবাচক সমর্থনের কথা।

৭.
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দেশের সুবৃহৎ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রধান ব্যক্তি আপনি। সরকার প্রধানও আপনি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অনেক ঝড়, ঝঞ্ঝা, রক্তপ্লাবন, মৃত্যুঝুঁকি আপনি পেরিয়ে এসেছেন । অথচ এই দুই বছরে সরকার এবং দল আলাদা চেহারা পায়নি। দলের মধ্যে তো বটেই দলের অঙ্গ বা সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও গণতান্ত্রিক চর্চা সমুন্নত করা যায়নি। জেলা, উপজেলায় সরকারি দলের কমিটিগুলো গণতান্ত্রিক চেহারা পায়নি। দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি সুবৃহৎ প্রাতিষ্ঠানিকতার রূপ পায়নি। নিয়মতান্ত্রিক গণতন্ত্র চর্চার অনুপস্থিতিতে দলের মধ্যে হাইব্রিড আওয়ামী লীগারদের উপস্থিতি বেড়েছে বলে অভিযোগ এসেছে ত্যাগী নেতাকর্মিদের কাছ থেকেই। দল নয় ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুর সন্তুষ্টি অর্জনই সবার লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে।
মান্যবর প্রধানমন্ত্রী, বিনয়ের সাথে এই প্রশ্নটি তুলতে চাই আওয়ামী লীগের মতো দলে গণতন্ত্রের চর্চা অনুপস্থিত থাকলে, দেশে কি গণতন্ত্র চর্চার মান উন্নত হবে?
প্রিয় প্রধানমন্ত্রী , স্থানীয় সরকারকে ক্ষমতায়িত করার কথা যে আপনি অহরহ বলেছেন, সেই আপনার নিরঙ্কুশ শাসনামলেই ঠুটো জগন্নাথ করে দেয়া হলো উপজেলা পরিষদকে। একবার সংসদ সদস্যদের, অন্যবার আমলাদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপজেলার দফা রফা করা হলো।
শধু তাই নয়, মন্ত্রিপরিষদের মাথার ওপর ক্ষমতাবান আমলাদের মিনি ক্যাবিনেট তৈরি করে এক অদ্ভুত শাসনব্যবস্থা চালু করলেন আপনি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ,  বাংলা ও ইংরেজি দুটো দৈনিক সংবাদপত্রের হালের জরিপে উঠে এসেছে আপনার দুই বছরের শাসনমালে রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের চেহারা দেখে মানুষের হতাশার চিত্র। রাজনৈতিক সংস্কৃতি ভালোর দিকে গেছে এ মন্তব্য করার হার ২০০৯ থেকে ২০১০ এ এসে ৫৬ থেকে ৪২ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে ,রাজনৈতিক সংস্কৃতির মান নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে, এক বছর আগের এই মন্তব্যের হার ছিল ১৪ শতাংশ। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯ শতাংশে।
বোঝা যাচ্ছে রাজনীতি, গণতন্ত্র, দলের ভেতরে গণতন্ত্র চর্চা, সংসদে গণতন্ত্র চর্চার যে অবনমন তা মানুষকে দিনকে দিন আশাভঙ্গের দিকে নিয়ে চলেছে। এই রাজনৈতিক হতাশাই তো বিরাজনীতিকরণের উদ্যোগকে সমর্থন জানায়। গণতান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থাকে আক্রমণকারীদের উৎসাহিত করে। মাইনাস ফর্মুলাকে জায়গা দেয়।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দুই বছরে গণতন্ত্রের এই বেহাল দশার কথা কি আপনার আমলা উপদেষ্টারা আপনার বিবেচনায় এনেছেন?

৮.
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। ক্রসফায়ার মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়েছে। বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড জবাবদিহিতাবিহীন রাজনীতিকে উৎসাহিত করে। এ বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক মানুষ গুমের নতুন সংস্কৃতি সচল হয়েছে। এ প্রবণতা ভয়াবহ সামাজিক ও মানবিক অস্থিরতার জন্ম দেয়। দেশের বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে মানুষকে আস্থাহীন করে তোলে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি কি লক্ষ্য করেছেন এ আস্থাহীনতার চিত্র কিভাবে সমাজকে প্রভাবিত করছে ?
কদিন আগে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআই-এর সভাপতি প্রকাশ্য এক অনুষ্ঠানে বলেই ফেলেছেন, ‘কোনো এমপিকে কেউ জোর করে বলেনি যে আপনাকে এমপি হতেই হবে। আপনি না হলে দেশ চলবে না, এমন কথাও কেউ বলেনি। নির্বাচনে আপনারা কোটি কোটি টাকা খরচ করেছেন। বিভিন্ন জায়গায় লবিং করেছেন। সেই খরচের টাকা আমাদের কাছ থেকে নিচ্ছেন।’
প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার কি স্মরণে আছে, গার্মেন্টস শ্রমিকদের প্রতি সহৃদয় হবার জন্য গার্মেন্টস মালিকদের প্রতি আপনার মানবিক উদাত্ত  আহ্বানের কথা? আপনার ভাষ্য অনুযায়ী মানবেতর জীবনযাপনকারী গার্মেন্টস শ্রমিকদের ভাগ্য কতটুকু বদলানো গেল এই দুই বছরে?
পুলিশের গুলি, গার্মেন্টসের আগুন যেসব শ্রমিকের প্রাণ সংহার করল তার কি কোনো বিচার হয়েছে? বরং হাজার হাজার শ্রমিকদের নামে মামলা হয়েছে। শ্রমিক নেত্রী মোশরেফা মিশু এখনো রিমাণ্ড ও গারদবাসে।
অথচ রাষ্ট্র বা সরকার কি একই অপরাধে দোষী কোনো গার্মেন্টস মালিকের বিচার করেছে?
রূপগঞ্জে সেনা আবাসন প্রকল্পে দরিদ্য সাধারণ মানুষের নিহত নিখোঁজ হবার জন্য যারা দায়ী, তাদের কি কোনো বিচার করা গেছে?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সুশাসন কোনো বক্তৃতার বিষয় নয়। এটি দৃশ্যমান হতে হয়। ন্যায়বিচার সবার জন্য সমান অনুভূত হতে হয়। তা নইলে আইনের বাণী নিভূতেই কাঁদে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জনগণ আপনাকে ভরসার জায়গা বানিয়েছে।
তাদের সামনে দল নেই, প্রতিষ্ঠান নেই। গণতন্ত্র নেই ,আছেন শুধু আপনি, দেশনেত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা। তাই শেয়ারবাজারে ধস নামলে, দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়লে, লোডশেডিং না কমলে ,যানজট অসহনীয় হয়ে উঠলে, দুর্নীতির অবাধ বিচরণ অনুভব করলে, দলীয় হার্মাদদের তাণ্ডব দেখলে, অবিচার-অশাসন-দুর্বৃত্তপনা উথলে  উঠলে জনগণ ভাবে শেখ হাসিনাই তাদের ভরসা। তিনিই পরিত্রাণদাতা ।তিনিই কেবল  এই অশুভ -কুশাসন থেকে তাদের বাঁচাতে পারেন।
তারা বিশ্বাস করতে চায় বিশেষজ্ঞ আমলা-উপদেষ্টা-কনসালটেন্ট, সংসদ সদস্যরা বিক্রি হয়ে গেলেও জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণœ করে দেশনেত্রী শেখ হাসিনা দেশের কয়লা, দেশের গ্যাস  বিদেশীদের হাতে তুলে দেবেন না । গণতন্ত্রকে নস্যাৎ হতে দেবেন না।
জনগণ এখনো ভাবে  শেষপর্যন্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেখ হাসিনা পঙ্গু করবেন না। দ্বেষ, ঈর্ষা আর প্রতিহিংসা দিয়ে তিনি  বিরাজনীতিকে উৎসাহিত করবেন না। গোয়েন্দা সংস্কৃতির উত্থানকে তিনি বেসামরিক গণতান্ত্রিক রাজনীতির ওপরে জায়গা দেবেন না ।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জনগণের সেই ভরসা এখনো আপনার প্রতিই আছে। জনমত জরিপে ও দেখা গেছে তাদের ভরসার জায়গা আপনিই।
জনগণের যখনই সুযোগ এসেছে তখন তারা দুহাত উপুড় করে আপনাকে দিয়েছে। আজ তাদের পাবার পালা।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার সরকারের এই মেয়াদের পাঁচ বছরের দুই বছর শেষ। হানিমুন পিরিয়ড পার হয়েছে। বিএনপি জামাত জোট সরকারকে  দোষারোপে করে উৎরে যাবার দিন শেষ। জনগণের দিকে এগোনোর এখনই শ্রেষ্ঠ সময়।


     
Untitled Document

ফুল
Total Visitor : 708664
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :