Untitled Document
মাঘ সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
শিল্পীত ছদ্মবেশ এবং দায়হীন শিল্পচর্চা
সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক
- শিশির মল্লিক
 



শিল্প ও সাহিত্য সৃষ্টির পর্যালোচনায় শিল্প স্রষ্টার মানস প্রকৃতি সর্বাগ্রে আলোচ্য, বিবেচ্য ও বিশ্লেষিত হয়। সামাজিক মানুষ হিসেবে শিল্পী বা সাহিত্যিক নিজেও কোন না কোন সামাজিক স্তর বা শ্রেণী বিন্যাসে পরেন বা অবস্থান করেন। যার মধ্য দিয়ে তার জীবনবোধ রসপ্রাপ্ত হয়। প্রাগৈতিহাসিক যুগের গুহাচিত্র থেকে আধুনিক চিত্রকলা বা শিল্প বিষয়কে পর্যবেক্ষণ করলে এই বিষয়টি প্রতিভাত হয় যে শিল্পসৃষ্টির পেছনে শিল্পীর সামাজিক প্রেক্ষাপট নানাভাবে বাক্সময় হয়েছে।  প্রাগৈতিহাসিক চিত্রে খাদ্য সংগ্রহের বিষয়টি যেভাবে আরাধ্য হিসেবে উঠে এসেছে আজকের আধুনিক পৃথিবীতে তা আর মুখ্য নয়।  প্রতিকুলতার বিরুদ্ধে ধাপে ধাপে বিজয় অর্জন করেছে মানুষ। শুধু প্রকৃতি নয়, স্ব জাতির উপরও পারঙ্গম হয়েছে আধিপত্য প্রতিষ্ঠায়।  তাই মানুষের সৃষ্ট শিল্প-সাহিত্যে সেই আদি থেকে আজ অবধি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উপায়ে মুর্তায়িত হয়েছে সামাজিক কারণসমূহ।  যূথবদ্ধতা থেকে গোষ্ঠীতান্ত্রিকতা বা সম্পদের ওপর সবার অধিকারের পরিবর্তে ব্যক্তির আধিপত্য শিল্পসৃষ্টিতে নিয়ে এসেছে ব্যক্তিগত প্রত্যয় ও প্রেষণার সংমিশ্রণ বা অভিব্যক্তি।

সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশের বিভিন্ন ধাপে মানুষের নানা স্তর বিন্যাস, এক শ্রেণীর ওপর অন্য শ্রেণীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং এর বিরুদ্ধে লাঞ্ছিত মানুষের ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক সংগ্রাম - সমসাময়িক কালে তরঙ্গায়িত হয়েছে পুরো সমাজের ওপর দিয়ে। যা কোন না কোনভাবে সমাজের প্রতিটি মানুষকে স্পর্শ করে। সংগ্রামরত দুটো বিপরীতমুখী গোষ্ঠী বা শ্রেণী উভয়ই দাবী করে তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ছে। নিজের অবস্থানকে যৌক্তিক করার মানসে দুটো বিরুদ্ধ শ্রেণী বা গোষ্ঠী নিজ নিজ পক্ষে জনমত সৃষ্টির প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা  অব্যাহত রাখে। এ ক্ষেত্রে প্রধানভাবে তারা নির্ভর করে শিল্পী-সাহিত্যিক এবং বুদ্ধিজীবী অংশের ওপর। সমাজ এবং সামাজিক সম্পর্কগুলো সম্পর্কে যাদের জ্ঞানের অভাব রয়েছে, রয়েছে ইতিহাস সম্পর্কিত জ্ঞানের অভাব- সহজেই তারা কর্তৃত্বকরী শাসকদের দলে যোগ দিবেন এতে বিস্ময়ের কিছু নেই কিন্তু কেউ কেউ এসবে সচেতন থেকেও রাষ্ট্র বা শাসক শ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকের দায়িত্ব নিজ কাঁদে তুলে নেন। '৭১ পরবর্তী অনেক বামপন্থী বুদ্ধিজীবী বর্তমানে শুধুমাত্র দেশীয় শাসক-শোষক নয় সাম্রজ্যবাদী শাসক গোষ্ঠী তথা সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে প্রেসক্রাইব করছেন। এতে তাদের অবস্থা সঙ্গত কারণেই বেশ ভালো। তারা ’৭১ এর প্রসঙ্গ টেনে পক্ষে-বিপক্ষের শক্তির মাঝে রাজনৈতিক খেল খেলেন। কিন্তু বর্তমান সময়ের সমাজ ও সমাজের মধ্যেকার শ্রেণী সমূহের দ্বন্দ্ব বা সংগ্রামের বিষয়ে পুরোপুরি শাসক শোষকের পক্ষে অবস্থান নেন। লুঠেরা অর্থনীতি, শ্রম শোষণের শিল্পনীতি, আম জনতাকে দমনের রাষ্ট্রনীতি ও সাম্রজ্যবাদী পণ্য সংস্কৃতি তথা বিচ্ছিন্ন একক ভোগী মানুষ তৈরীর সংস্কৃতির পক্ষে পরামর্শকের দায়িত্ব পালন করেন। আরো একদল বুদ্ধিজীবী অংশ রয়েছে যারা জীবীকার প্রয়োজনে আপোষের সংস্কৃতি চর্চা করেন তাদের প্রতি করুণার উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক কিন্তু তাদের আর একটি অংশ যারা অব্যাহত রাষ্ট্রিয় সাহায্য সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা লাভের চেষ্টায় নিজেকে বেচাকেনায় হাজির করেন তাদের সংখ্যাও নেহায়তই কম নয়।

ফলে তাদের সৃজনশীলতায় জনগণের কিছু না আসলেও শাসক শ্রেণী সাময়িক সুবিধা লাভ করেন বৈকি! অতএব এসব রাষ্ট্রিয় আনুকুল্যপ্রাপ্ত শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীরা প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলেও তারা জনগণের কাছে চিহ্নিত ও ঘৃণার্হ হয়ে বাঁচেন। তাতে যদিও তাদের কিছু যায় আসেনা। অন্যদিকে শাসিত বা নিপীড়িত মানুষের মুক্তির আকাঙ্খা বা সুন্দর জীবনের বাসনার প্রতিনিধিত্বকারী শিল্পীসাহিত্যিকগণ নানা প্রতিকুলতার মধ্যে থেকেও সৃষ্টি করে চলেন ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক চেতনার বহুমাত্রিক রচনা যা মানুষের সভ্যতাকে দিয়েছে অফুরান শিল্পরসের আস্বাদ। যেখানে ব্যক্ত হয়েছে মানবীয় চেতনার বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনা। উঠে এসেছে মানুষের আশা-আকাঙ্খা সুখ-স্বপ্ন জীবনের প্রতি ভালবাসা, ঘৃণা, ব্যঙ্গতা, তিরষ্কার, উপেক্ষা প্রতিবাদ-সংগ্রাম, দুঃখবোধ, হতাশা, প্রকৃতির প্রতি প্রেম প্রভৃতি - যা আজো প্রবাহমান।

মানুষের ইতিহাসও পর্যালোচিত হয় এই শিল্প-সাহিত্য বা সৃজনশীল কর্মকান্ডকে বিশ্লেষিত করে। এ দিক থেকে শিল্পকলা মানব ইতিহাসের ডকুমেন্টস বা দর্পণও বলা চলে। অন্য দিকে শিল্পকলা মানব মনের আকাঙ্খা ও ভবিতব্য আগামীর স্বপ্নদ্রষ্টাও। এক প্রতিকূল পরিবেশে আনুকূল্য বাস্তবতার স্বপ্নদিশারীও বটে। ফরাসী বিপ্লব, রুশ বিপ্লব, চীন বিপ্লবসহ দু’ দুটো বিশ্বযুদ্ধের প্রাককালীন শিল্পচর্চাকে পর্যালোচনা করলে এটি পরিলক্ষিত হবে নিঃসন্দেহে।  ভারতীয় সমাজে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন সংগ্রামের উৎসমূলেও এটি প্রতিভাত। আমাদের দেশে ’৭১ পূর্ববর্তী শিল্প সৃষ্টির ভূমিকায়ও এই শিল্পস্রষ্টাদের স্বপ্নের অভিব্যক্তি সমুজ্জ্বল।

পরবর্তী সময়ে আমাদের জাতীয় জীবনে যে লুম্পেন সংস্কৃতি চর্চিত হয়েছে তার বাতাবরণে মধ্যবিত্ত শ্রেণী চরম অনিশ্চয়তা আর অস্থিরতার মধ্যে জীবনপাত করেছে। কেউ কেউ সমাজের গতির সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারলেও বেশিরভাগ পিছলে পড়েছেন সঙ্গীণ হয়েছে অবস্থার। এই সঙ্গীনতার বিরুদ্ধে কথা বলার বা নিজের অধিকারের প্রশ্নে রাজপথে সামিল হওয়ার বাসনাও গুড়িয়ে গেছে মধ্যবিত্তের । ক্ষমতাসীনরা তান্ডবতা ছড়িয়ে দিয়েছে সামাজিক-রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক সর্বক্ষেত্রে। যে যে জায়গায় আধিপত্যের সুযোগ পেয়েছে তাকে নিশ্চিত এবং নিষ্কণ্টক করতে প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে সশস্ত্র উপায়ে। তৈরী করেছে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা। জান-মান হারানোর ভয়ে ভীত মধ্যবিত্ত শ্রেণী নিজের অস্থিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে আত্মকেন্দ্রিক ভাবনায়। কোনকিছু তাদের যেন কিছু যায় আসে না। শুধুমাত্র নিজ ও সন্তান সন্ততির কথা ভাবা ছাড়া সমাজ বা রাষ্ট্রে কি ঘটছে তা নিয়ে ভাবনার কিছু দেখছে না। অভিভাবকরা সন্তান গড়ে তুলছে একান্ত আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপরতায় যেমন -‘দেশের কি হল না হল তাতে তোর কি? দেশে আর লোক নেই?’ ‘রাজনীতি করার দরকার নেয়’ ‘রাজনীতির ধারে কাছে যাবি না।’ নাটক বা সাংস্কৃতিক সংগঠন পেটের ভাত দেবে না।’ ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর দরকার নেয়।’ - এ রকম অজস্র মন্তব্য উল্লেখ করার আছে যা থেকে তাদের মনস্তাত্বিক অবস্থা বুঝা সম্ভব। সেই পারিবারিক পরিমন্ডলে বেড়ে ওঠা  সন্তানরা পারিবারিক-সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-সাংগঠনিক জীবনে কি ভূমিকা রাখতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। ফলে দেশপ্রেমিক মানুষ তৈরী হওয়ার যে শূণ্যতা সমাজে সৃষ্টি হয়েছে তা আরো দীর্ঘকাল আমাদের জাতীয় জীবনকে এক স্বপ্নহীন-অনিশ্চয়তায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে তা দ্যর্থহীনভাবে বলা যায়।

স্বাধীনতার আকাঙ্খা পুরো জাতীয় জীবনে যে প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছিলো এবং যাকে উজ্জিবিত করায় সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক সাংগঠনিক কর্মকান্ডে মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শিল্পস্রষ্টারা বড় ভূমিকা রেখেছিল সেই আকাঙ্খা বাংলাদেশ সৃষ্টির পরপরই ফিকে হয়ে গেছে যার বিকশিত রূপ আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি। কেন এমন হল? এই পরিস্থিতি কি আমাদের জন্য অনিবার্য ছিল? তথ্য-প্রযুক্তি ও উন্নত শিক্ষা সচেতনতার যুগেও, বৃহত্তর জনসমষ্টির উপযোগী একটি রাষ্ট্রিয় সংগঠন গড়ে তুলতে কি আমরা অসমর্থ? যে রাষ্ট্রিয় সংগঠন হবে প্রভু নয় স্বেচ্ছাসেবক (যদিও আধুনিক রাষ্ট্রের ব্যাখ্যা তাই)। নাকি আজীবন যাপিত দারিদ্র, অশিক্ষা, আর শ্রমদাসত্বের যুপকাষ্টে পিষ্ট নিষ্পেষিত মানুষের মতো আমরাও বিশ্বাস করবো ধন নির্ধনের এই বিভাজন ঈশ্বর প্রদত্ত? জানি প্রশ্নগুলোর ইতি নেতি দু’ ধরণের উত্তরই পাওয়া যাবে কিন্তু একটা বিষয়ে ঐক্যমতে আসবেন অনেকেই যে আমাদের অবস্থার পরিবর্তন দরকার এ ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই।

কিন্তু সে প্রেক্ষাপট তৈরির কারিগর কে? নিঃসন্দেহে শিল্পী বুদ্ধিজীবী সাহিত্যিক এবং মননশীল ব্যক্তিমাত্রই এই দায়বোধ অস্বীকার করতে পারেন না। আত্মকেন্দ্রিকতার বিপরীতে জাতীয় স্বার্থ যে নিজ স্বার্থেরই প্রতিস্বরণ ব্যক্তি যে সমষ্টির অংশ এটি বোঝাবে কে? আমি মনে করি যুগে যুগে এই জায়গাটিতে কাজ করেছে শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী সাংস্কৃতিক কর্মী সংগঠক ও সৃজনশীল মানুষেরাই। তারাই বৃহত্তর জনসমষ্টিকে প্রেরণা দিয়েছে-স্বপ্ন দেখিয়েছে যা পুরো সমাজকে এগিয়ে যেতে ভূমিকা রেখেছে।

আমরা অনেকেই আজকের বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য একবাক্যে রাজনীতিবিদদের দায়ী করি তা যেমন সত্য তেমনি শিল্পী-সাহিত্যিক সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের ভূমিকার বিষয়টিকেও উড়িয়ে দেয়া যায় না কেননা একজন আদর্শবান রাজনীতিবিদ গড়ে তোলায় শিল্পী-সাহিত্যিক-দার্শনিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একজন রাজনীতিবিদও ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প-সাহিত্য, দর্শন ও সামাজিক সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করেন। সেই সামাজিক সাংস্কৃতিক চর্চা যদি সমাজে চর্চিত না হয় তবে দেশপ্রেমিক মানবপ্রেমিক রাজনীতি ও নেতৃত্ব আশা করা যায় না।

আজকের বাংলাদেশে এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে আদর্শিক প্রশ্নটিই উপেক্ষিত এবং বিদ্রুপের বিষয়। তার ধার পাশ দিয়ে হাঁটা যেন বোকামী। এ মনোভাবের পরিবর্তন আনা কি জরুরি নয়? সেটা কারা আনবেন? দায়িত্বটি কার?

বিগত বছরগুলোতে এক শ্রেণীর স্বার্থান্বেষী মানুষ যেমন রাজনীতি, প্রশাসন এবং এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট বাণিজ্যের বদৌলতে ধনপতি হয়েছে। সেই ঘোড়দৌড়ে শিল্পী-বুদ্ধিজীবীরাও পিছিয়ে নেয়। ধনপতি হোন বা না হোন মনোভাবের দিক থেকে সবাই সেই সোনার হরিণ পাওয়ার বাসনায় পিছু ছুটছেন। ৩৬-৩৭ বছরে শিল্পী-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী অংশের দুর্নীতি দুর্বৃত্তায়ন ও সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে উল্লেখ করার মতো কোন আন্দোলন বা সংগ্রামের ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যাবে না। যা পাওয়া যাবে তাও প্রভাবশালী রাজনীতির প্রপাগান্ডার লেজুরবৃত্তি ছাড়া কিছু নয়। ফলে জাতীয় জীবনে সাধারণ মানুষের স্বপ্ন-আকাঙ্খা মুখ থুবড়ে পড়ায় স্বাভাবিক এবং তাই ঘটেছে। অদূর ভবিষ্যতেও শিল্পী-সাহিত্যিকরা ধনপতি হবার ঘৌড়দৌড়ে চুড় হয়ে থাকলে আমাদের অবস্থার পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনা তো নেই বরং আরো করুণ পরিণতি দেখার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে আমাদের। যা সাধারণ মানুষও আজ উপলব্দি করতে পারেন।

যে সমাজে সামান্য টাকা মজুরীতে কাজ করতে বাধ্য হন একজন শ্রমিক, ব্যয় বহুল বাজারী ব্যবস্থাপনায় কিভাবে তিনি বাঁচিয়ে রাখবেন নিজেকে? তার না পারার কথা ব্যক্ত করার যে রাজনৈতিক সাংগঠনিক অধিকারের স্বীকৃতি যা মানুষ অর্জন করেছে ঊনবিংশ শতকে রক্তক্ষয়ী আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাও তো এই কাঙ্গাল দেশে কার্যত নিষিদ্ধ। আবার অন্যদিকে ধনপতি ক্ষমতাশালীদের নিরাপত্তা ও সামাজিক অধিকারের বিষয়টি সবোর্চ্চ রাষ্ট্রিয় স্বীকৃতি ও সুযোগ চর্চিত হচ্ছে। এই স্ববিরোধ এই নিষ্ঠুরতার মাঝে একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে সমাজের অসংগতিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তুলে আনার দায়িত্ব কার? শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীর না রাজনীতিবিদের?

অনেক সতীর্থ শিল্পী কবি-সাহিত্যিক বন্ধুর সাথে কথা বলে দেখেছি তারা সামাজিক দায়-দায়িত্বের জায়গাটিতে স্রেফ অন্য একজন মধ্যবিত্তের মত করে ভাবেন। আঁকা-আঁকি, লেখা-লেখি যেন পেশাগত দায়। কেউ কেউ ব্যক্তি ইমেজের জন্য লেখেন বা আঁকেন। যাতে তার সামাজিক মর্যাদা বাড়ে। তারা কমিটমেন্টের কথা উঠলেই চিৎকার করে ওঠেন হতাশার কথা ব্যক্ত করেন সামাজিক অবস্থাকে দায়ী করেন।  অনেকে আবার শিল্প-সাহিত্যকে শুধুমাত্র রসবোধ, সোন্দর্য বা বিনোদনের চর্চা হিসেবে দেখেন। অনেকেই শিল্পে মানবিক বিষয়ের উপস্থাপনাকে পুরোনো ধ্যান ধারণা বা পশ্চাদপদ চর্চা মনে করেন।

যে সমাজে অমানবিকতা চরম এবং পরমাকার ধারণ করেছে সেখানে তো মানবিকতাই কাঙ্খিত বাস্তবতা। আসলে তারা শিল্পের আঙ্গিক বা গঠনের ভাঙ্গ-চোর করেন। একধরণের কসরতি শিল্প বা সাহিত্য চর্চা করছেন। তারা যা করেন তা আসলে ইউরো-আমেরিকান শিল্পের অনুকরণ মাত্র। তাদের দৃষ্টি সেদিকেই। তারা একবারও ভাবেন না ইউরোপ আমেরিকার আধুনিক শিল্প চর্চার ইতিহাস কয়েক শ’ বছরের। আমাদের মাত্র অর্ধশতকের। আর তাদের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা আর আমাদের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতাও এক নয়।

শিল্পের নতুন নতুন ধারা ও চর্চার বিরোধী আমিও নই কিন্তু এক একটি ধারা ও চর্চার সামাজিক বাস্তবতার প্রয়োজন সর্বাগ্রে বিবেচ্য যা সময়কে প্রতিনিধিত্ব করে; করে ইতিহাসকে মহিমান্বিত পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। অতএব আমাদের শিল্প সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সাংগঠনিক চর্চার এতো বছরের অর্জনকে পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরী। জরুরি এর মধ্যে আমাদের নিজস্বতা কতটুকু তা ভেবে দেখবার। আজকের বাস্তবতায় দেশপ্রেমিক রাজনীতি যেমন জরুরী তেমনি দেশপ্রেম, মানবপ্রেম ও সর্বোপরি সুন্দর জীবনবোধসম্পন্ন শিল্প তথা সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্বের প্রয়োজনীয়তাও অপরিহার্য...


     
Untitled Document

ফুল
Total Visitor : 708587
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :