Untitled Document
মাঘ সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
হেঁটে হেমায়েতপুর
 
কলাতিয়ায় এক চা দোকানে বসে বন্ধুকে ফোন করে যখন বললাম হেমায়েতপুর যাচ্ছি অবধারিত উত্তর এল, “অবশেষে!” তার স্বস্তিতে জল ঢেলে জানালাম এ হেমায়েতপুর সে হেমায়েতপুর নয়, এ হলো সাভারের হেমায়েতপুর। একসময়ের মোহনীয় গ্রামটার অনেকখানি এখন শিল্পচাঞ্চল্যে ভরে গেছে। তবে আরেকটু ভেতরে আগের প্রাকৃতিক আবহ মোটামুটি অটুটই আছে। তো ঢাকা থেকে কেরানিগঞ্জ হয়ে হেমায়েতপুর যাওয়ার
প্রস্তাব দিয়েছিলেন ঈমাম ভাই। রায়েরবাজারের সুপরিচিত সামাজিক সংগঠক ও সংস্কৃতিসেবী ঈমাম। রায়েরবাজার বধ্যভূমির স্মৃতিসৌধের আঙিনায় এলাকার বস্তির ছেলেমেয়েদের নিয়ে একটা স্কুল চালাতেন। সেটা দেখতে গিয়ে পরিচয়। তারপর আলাপ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে, এখন আমরা পরস্পরের সহযোগী বন্ধু। ঈমাম ঢাকা শহরে হেঁটে বেড়ান। গর্ব করে বলেন গড়ে তিনি দৈনিক কুড়ি কিলোমিটার হাঁটেন। সত্যি সত্যি, যখনই ফোনে জিজ্ঞেস করি, “আপনি কই?” উত্তর আসে, “আমি ওমুক জায়গায়।” দেখা গেল রায়েরবাজার থেকে হেঁটে তিনি হয়ত রামপুরা যাচ্ছেন কোনো একটা স্কুলে আঁকাআঁকির ক্লাস নিতে। হাঁটতে আমিও ভালবাসি, তবে তাঁর মতো এতটা “ফ্যানাটিক” না। ঢাকা শহরের আশেপাশে হাঁটার সুখ হবে এমন যাত্রাপথ খুঁজছি যখন, নদীর ওপারে গ্রামের ভেতর দিয়ে হেমায়েতপুর যাওয়ার পথটা বাতলালেন ঈমাম। পরিকল্পনাটা অনেকদিন ঝুলে থাকার পর এই সেদিন এক সূর্য না ওঠা কনকনে সকালে বের হলাম। দিনের শেষে হিসাব করে দেখেছিলাম প্রায় তিরিশ কিলোমিটার হাঁটা হলো। সে এক অপূর্ব ব্যাপার হয়েছিল। তবে এরই মধ্যে আমার সঙ্গে নোংরা আচরণ করার প্রতিবাদ করতে গিয়ে এক জায়গায় জনরোষের শিকার হয়েছিলাম আমরা। আর সেই রোষ প্রকাশকারীদের মধ্যে মহিলা ও পুরুষ উভয়েই ছিলেন। রাস্তাঘাটে মেয়েদের এই শারীরিক ও মানসিক লাঞ্ছনা আর অপমান যার ছাগুলে ইংরেজী নাম “ইভ টিজিং” আমাদের দেশের মানুষের, যার মধ্যে পুরুষ ও নারী উভয়ই আছেন, নারী সম্পর্কে মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গীর জটিল এবং প্রায় অভিন্ন এক মানসিক চিত্রকে প্রকাশ করে। নিজের অভিজ্ঞতাগুলোকে বিশ্লেষণ করে লিখতে চাচ্ছি বহুদিন। জানি না কবে তা করে উঠতে পারব। তবে ভাল কথা এই, পথের অন্য মানুষজন আর প্রকৃতি আমাদের সেদিনের মর্মবেদনা প্রায় পুরোটাই মুছিয়ে দিয়েছিল।

ফুলের কথাটা বলি। নদী পার হয়েছিলাম ঝাউতলা ঘাট দিয়ে। সিকদার মেডিকেল কলেজ থেকে এক-দেড় কিলোমিটারের মধ্যে নিরিবিলি ছোট্ট এক ঘাট সেটা। ওপারে বামনসুর গ্রাম। সেখান থেকে হেঁটে আটিগ্রাম। আটিগ্রামের ওপর দিয়ে পিচরাস্তা চলে গেছে কলাতিয়ার দিকে। সেই রাস্তা ধরে যাচ্ছি এমন সময় রাস্তার পাশে ধূলিধূসরিত ঝোপড়াটার দিকে চোখ গেল। প্রত্যেকটা পাতায় পুরু ধূলা জমেছে। কিন্তু সেই জেরবার দশা ঠেলে গাছটা একরাশ বেগনি ছিটে দেওয়া দু’পাপড়ির দুধসাদা ফুল ফুটিয়েছে। পাতাগুলোয় এত ধূলা অথচ ফুলগুলো কীভাবে রক্ষা পেল সেটাই রহস্য। “ব্রেভো গাছুয়া!” মনে মনে অভিনন্দন জানিয়ে বলি। সাদা ফুলের ছবি তোলা বড় কষ্ট। তার ওপর গরিব ক্যামেরা আর আনপঢ়্ ফোটোগ্রাফার - ফল যা হবার তাই হলো। তার থেকে বেছেকুছে দু’টো এখানে দিচ্ছি। ছবি তুলতে দেখে যথারীতি কৌতুহলী দর্শকের ভীড়। প্রশ্নের শেষ নেই তাদের। অধিকাংশই জানতে চান এ গাছের মাহাত্ম্য সম্পর্কে। উত্তর দিয়ে দিলেন ভীড়েরই একজন - “এই গাছের পাতা খাইলে বুইড়াও জোয়ান হয়া যায়।” আমি চোখ তুলে লোকটিকে দেখি, কালোকোলো, চোখ দু’টোতে ফিচলেমি চকচক করছে। বলি, “আপনি কী বললেন?” “আপা, কাইলকা আয়া এই গাছ আর পাইতেন না। দেখবেন পাতা-পুতা শিকড় সুদ্দা এক্কেরে খায়া লাইছে!” বিপুল হর্ষে খিকখিক করে সে হাসতে থাকে। এদিকে ভীড়ের মধ্যে ততক্ষণে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে। দ্রুত বেরিয়ে এলাম। কে জানে ছবি তোলাই গাছটার কাল হলো কিনা। পরের দিন এলে হয়ত সত্যিই দেখতাম গাছটা আর নেই। শিয়ালশাহ্র মাজারের ভিত্তি তো এভাবেই প্রস্তুত হয়। তবে সে গল্প আরেকদিন।       

 

ছবি ও লেখা: প্রিসিলা রাজ



        আলোকচিত্রী : প্রিসিলা রাজ

          আলোকচিত্রী : প্রিসিলা রাজ
     
Untitled Document

ফুল
Total Visitor : 708287
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :