Untitled Document
ফাল্গুন সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী

দেশের কি হবে?
এ আর্তির কি জবাব হতে পারে...

- শিশির মল্লিক




আশাবাদ মানুষের জীবনের চালিকা শক্তি বললে অত্যুক্তি হয় না। জৈবগাঠনিক বিষয়ে বলছি না, বলছি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে। ক্ষণজন্মা জেনেও মানুষ নানা সুখ-স্বপ্নে কাটায়, ব্যয় করে জীবন। মৃত্যুকে জয় করে চলে জীবনের স্বপ্ন। মানুষ ব্যপৃত হয় সৃজনে; সচল সজীব থাকে আমৃত্যু। সৃজনশীল আর বুদ্ধিবৃত্তিক বলেই স্বপ্নের বুনন চলে খেতে-খামারে কলে-কারখানা সর্বত্রই। স্বপ্ন পুরনের সফলতা তাকে করে আত্মবিশ্বাসী; আশাবাদে প্রাঞ্জল, করে কর্মোমুখী উৎপাদনশীলতায় মুখরিত। প্রাণী জগতে তার শ্রেষ্ঠত্ব তাই অতুলনীয়। প্রকৃতির ওপর ক্রমাগত প্রভাব বিস্তার মানুষের আশাবাদকে করে আরো বেশি সংহত এবং যৌক্তিক। একবিংশ শতকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যাপক অগ্রগতি মানুষের সৃজনশীলতায় এনেছে অমিত সম্ভাবনার সুযোগ। যাকে কাজে লাগিয়ে মানুষ ক্ষুধা-দারিদ্র ও বৈষম্যের নিগর থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিতে পারে অনায়াসেই। কিন্তু সে সম্ভাবনা ক্ষীণ এবং এটি এখনো আশাবাদ হিসেবে মানুষের কল্পনাশ্রীত। কারণটি বিমুর্ত বা জটিল কোন বিষয় নয় কেননা মানুষের কাছে এ সম্ভাবনার সফল প্রয়োগ পৌঁছে দেয়ার দায়টুকু যাদের ঘিরে তারাই সবচেয়ে সর্বনাশী এবং উৎপীড়ক হিসেবে মানুষের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করে চলেছে। মানুষের সবচেয়ে বড় সংগঠন রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্রিয় সংগঠনই মানুষের অগ্রগামীতায় বাধাদানে অগ্রনী ভূমিকা রেখে চলেছে দেশে দেশে। ফলে সকল মানুষের অধিকার স্বাধীনতা সমভাবে বিকশিত হয়নি; হবার সম্ভাবনা এখনো অস্পষ্ট। তাই মানুষের জীবনের গদ্য অফুরান।

যে সংগঠনকে ঘিরে মানুষের জীবনের আশা-আকাংখা সুখ দুঃখ আবর্তিত হয় সে সংগঠনের অবকাঠামো মানুষের প্রয়োজনানুগ না হলে আশাবাদ হতাশার অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিবা থাকে? আমরা কি সে পথে এগুচ্ছি? আমাদের ভবিষ্যত কি? আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের কি হবে? এ প্রশ্ন চাউর হচ্ছে দিন দিন।

আমরা কতটুকু সাচ্ছন্দ জীবন-যাপন করতে পারব, কতটুকু বিজ্ঞান-প্রযুক্তির প্রয়োগে জীবনকে সহজ ও উন্নততর করতে পারব, মানসিক বা সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে এগুবো, সমস্ত বৈষম্যমূলক বর্বর মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়ে সত্যিকার মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার দিকে এগুবো, এ সবই নির্ভর করে মানুষের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর। অতএব রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার সুযোগ নেই - কারোরই। অথচ হতাশজনক হলেও সত্যি এই যে, আজকে দেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ রাজনীতি বিমুখ। তারা গুটিয়ে নিয়েছেন নিজেদের। এই গুটিয়ে নেয়ার বাস্তব যুক্তি যতই থাক বিষয়টিকে নৈতিক সমর্থন দেয়া যায় না কোনমতেই। এর মাঝে দায়হীনতা, আত্ম-সার্থপরতার বীজ সুপ্ত রয়েছে। যা সমাজে সৃষ্টি করেছে নেতৃত্বের শূণ্যতা, সংগঠকের শূণ্যতা, দেশপ্রেম তথা মানবপ্রেমী আন্তরিক মানুষের শূণ্যতা। তৈরি করেছে রাজনীতি বিমুখ বিশাল জনতার দঙ্গল। ফলে সেই সুযোগ পুরোপুরি নেতিবাচক মানুষদের জায়গা করে দিয়েছে। অতএব আজকের বাস্তবতাকে কোনভাবেই অমূলক বলা যাবে না বরং গুটিয়ে যাওয়া মানুষেরাই আজকের বাস্তবতার অনুঘটক। তাই বলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দুর্বৃত্তায়ন ন্যায্য তা বলছি না; বলছি এটা ঘটা-ই স্বাভাবিক। আমরা বাধা হয়ে না দাঁড়ালে, বিরোধিতা না করলে, জবাবদিহিতা না চাইলে সুযোগ সেতো নেবেই। জনতার দায়-দায়িত্ব এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নয় কি?

শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চাকারী মধ্যবিত্ত জনতার ব্যাপক অংশই আজ আত্মকেন্দ্রিক, ব্যক্তিতাবাদী মূল্যবোধে গা ভাসিয়ে দিয়েছেন। সমস্ত অনিয়ম অরাজকতা দুর্বৃত্তায়নের জন্যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা রাষ্ট্রের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে নিজের দায় এড়ানোর মুর্খতা জোরে-সোরে তারা বাসে, অফিসে, রাস্তায়, হাটে-মাঠে, জমায়েতে প্রচার করে বেড়ান। যেন কোন কিছুর জন্যেই তারা দায়ী নন। সব দায় ঐ রাজনৈতিক নেতাদের। তারাই দেশটাকে শেষ করে দিয়েছে, সমস্ত দুর্ভোগের জন্যে তারাই দায়ী। কিন্তু যে মধ্যবিত্ত নিজেরটা ছাড়া অন্যেরটা ভাবেন না সে কি করে আশা করতে পারেন অন্য কেউ তার জন্যে ভাববেন? এটা মুর্খতা নয় কি? এরকম মানসিকতাসম্পন্ন পরিবারে যে শিশুর জন্ম হচ্ছে সেই তো হবে আগামী দিনের নাগরিক। তার কাছ থেকে আমরা কি আশা করতে পারি?
আশির দশকে বেড়ে ওঠা শিশু আজকে তরুণ তার কাছ থেকে আমরা কি পাচ্ছি। যারা পারিবারিক বাধার মধ্যে বেড়ে উঠেছেন। সামাজিক কর্মকাণ্ডের অপরাধে আমার বাবাও আমাকে ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখতে চেয়েছিলেন যদিও শেষ পর্যন্ত তা তিনি করেননি। তার বিশ্বাস ছিল এদেশে ভালো কোন কিছুই সম্ভব নয়। এ বিশ্বাসের ভীত আমাকেও নাড়া দেয়; হতাশায় নিমজ্জিত করে তবু আশায় জেগে থাকি - ভাবি হবে, আমরাও পারবো। পারবো জীবনের রূপকে সু-বিকশিত করতে। দুবৃত্তায়নের শিকড় উপড়ে একটি নতুন জোয়ার ছড়িয়ে দিতে। এটি শুধু আশাবাদ বা প্রবোধ নয়; সত্যি সত্যিই সম্ভব... ... ...
কিভাবে?

মাটির গুণাগুণ যেমন ফলনে বোঝা যায় তেমনি সমাজ মূল্যায়নের অন্যতম গুণাগুণ সুপ্ত থাকে পরিবার নামক উর্বরা মাটিতে। যেখান থেকে উৎপন্ন হয় মানুষ নামক বীজ। আমাদের সমস্ত আশা সম্ভাবনার মৌলিক ভীত হচ্ছে আমাদের পারিবারিক সংগঠন। যেখানে অভিভাবকরা নির্মাণ করেন একটি জাতির ভবিষ্যত।

‘দেশের কি হবে?’ এ প্রশ্নটির উত্তর নিহিত আছে সেখানটায়। রাজনীতি সমাজ পরিবর্তনের নির্ণায়ক-এতে সংশয় না রেখেই বলছি, রাজনীতি পরিবর্তনে নির্ণায়ক হচ্ছে মানুষ। ‘মানুষ’-কে সৃষ্টি করে? পরিবার তথা সামাজিক অন্যান্য প্রতিষ্ঠান। অতএব পরিবারিক মূল্যবোধের বিকাশ ও উন্নয়ন একটি মৌলিক প্রসঙ্গ নিঃসন্দেহে। এর পরিচর্চা একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সেখানটায় গুরুত্ব দিতে হবে প্রত্যেক নাগরিকের। এটা ব্যক্তির দায়, পারিবারিক দায়, সামাজিক এবং নৈতিক দায়ও বটে।

বিশ্বায়নের প্রভাবে ব্যাপক মধ্যবিত্ত-নিন্মবিত্ত মানুষ নগরমুখী হচ্ছে, একটা ভাসমান চ্যালেঞ্জিং জীবনকে বরণ করতে বাধ্য হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রথমেই সে সম্মুখীন হয় আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায়। যা থেকে তার আত্মকেন্দ্রিকতার বীজ প্রোথিত হয়। এটা পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থারই মৌলিক উপাঙ্গ। যা মানুষের ইচ্ছা নিরপেক্ষ বাস্তবতা। পুঁজিবাদ বিলোপের মাধ্যমে এর সমাপ্তি সম্ভব নতুবা নয়। অতএব বিচ্ছিন্ন একক মানুষের অসহায়ত্ব আমাদের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক জীবনে দীর্ঘকাল প্রভাব বিস্তার করে থাকবে তাতে সন্দেহ নেই। সচেতনভাবেই এই চেনা-জানা বিচ্ছিন্নতার বাধ ভাঙতে হলে সন্তানকে সেভাবেই গড়ে তুলতে হবে। আজকে যেভাবে মানুষ হবার আদর্শ অভিভাবকরা শিখাচ্ছেন তা অবশ্যই পরিত্যজ্য। একাডেমিক লেখাপড়া সম্পন্ন করে টাকা কামাই করা যদি মানুষ হবার মানদণ্ড হয় তবে এখন যে সামাজিক দুর্বৃত্তায়ন, অবক্ষয় আমাদের শৃংখলিত করেছে তাকে ঠিক আছে বলতে বাধা কই? আমাদের শিক্ষিত সোনার ছেলেরাই তো রাতারাতি গাড়িওয়ালা-বাড়িওয়ালা হচ্ছেন, ঘুষ-দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হচ্ছেন। এই দৌড়ে কেউ কেউ ছিটকে পড়লেও এই চলতি ঘৌড়দৌড়ে সেও সুযোগের অপেক্ষায় উন্মুখ থাকে সুযোগ পেলে সেও ছাড়বে কি?

আমি আপনি তো সন্তানকে এই শিক্ষা দিচ্ছি না, মানুষের কথা ভাবো। নিজের পাশাপাশি অন্যের সুবিধা-অসুবিধা চিন্তা করো। সামাজিক-সাংগঠনিক কাজে এগিয়ে যাও। রাজনীতি তোমার আমার প্রত্যেকের অধিকার অতএব রাজনৈতিক প্রশ্নে সোচ্চার হও। শুধু পরীক্ষা পাসের পড়াশোনায় চ্যাম্পিয়ন নয়, জ্ঞান-বিজ্ঞানের জন্যে বই পড়ো। যেখানে খেলা-ধুলার সুযোগ আছে খেলতে যাও। মৃত্যু নিয়ে ভাববার কিছু নেই, জন্মের মতো মৃতুও স্বাভাবিক কিন্তু মৃত্যুর তাৎপর্য ভিন্ন। সর্বত্রই জবাবদিহিতা বজায় রেখো। প্রশ্ন করো বিষয়টা এমন কেন? এমন নয় কেন? অন্যে যা পারে তুমি পারবে না ভেবে মুষড়ে পড়ো না-চেষ্টা করো। মানুষই মানুষের জন্যে এ বিশ্বে সমৃদ্ধি সৃষ্টি করেছে, তুমি তোমার অবদান রেখে যাও এটি তোমার মানবিক দায়িত্ব।

আমরা কি এভাবে এগিয়ে দিচ্ছি তাদের?
মনে হয় না।
অতএব ‘দেশের কি হবে?’

এ প্রশ্নটির যথাযথ উত্তরদাতা আপনি, আপনি এবং আপনিই। যদি পরিবর্তন আশা করেন তবে পরিবর্তনের সে পাঠ আপনাকেই শুরু করতে হবে আপনার সন্তানকে পরিবর্তনের উপযোগী করে তৈরি করে। যা আগামী ত্রিশ থেকে চল্লিশ বৎসরের মধ্যে সুফল আনতে পারে নতুবা... ... ...
     
Untitled Document

মডেল পুক
Total Visitor: 708384
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :