Untitled Document
ফাল্গুন সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
মোবারক গেছে, আমেরিকা যাবে কবে?
- শুভ কিবরিয়া


মিশরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক চিরকালীন ক্ষমতার গদি ছাড়ল অবশেষে। বলা ভালো, ছাড়তে বাধ্য হলো। মোবারককে পচিয়ে, সামরিক বাহিনীকে তেল-মসলা মাখিয়ে নিজেদের স্বার্থ ঠিকঠাক করতেই এ কদিন সময় নিল আমেরিকা। তাই-ই হয়ত সাবেক সেনাকর্মকর্তা মোবারক জনগণকে ক্ষেপিয়ে তুলল ঐ রকম একটা গাড়ল বিদায় ভাষণ দিয়ে। কি হতো, যদি সেই ভাষণেই মোবারক ক্ষমা চেয়ে, ভুল স্বীকার করেই প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়ত ?

প্রথমত, আমেরিকা-ইসরাইল তা চায়নি। তারা চেয়েছে আরও সময়ক্ষেপণ। বোঝাপড়া আরেকটু করতে। কাকে ক্ষমতায় আনা যাবে, কে আমেরিকা-ইসরাইলের স্বার্থ রক্ষা করবে সেটুকু নিশ্চিত করতে চেয়েছে আমেরিকা। মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ নিয়ে ক্ষণে ক্ষণে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্রমন্ত্রী যেসব প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন, তাতে মনে হয়েছে সমস্যাটা বোধহয় খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঙ্গরাজ্যেই ঘটছে। আদোতে ঘটনাও তাই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যই তো হয়ে আছে ‘মিসর’ বছরের পর বছর । এই প্রথম সেই পুরনো পাপের ঘরে ঢিল ছুড়ল মিসরের তরুন প্রজন্ম ।

এখন প্রশ্ন সেই মিসর কি আমেরিকার দীর্ঘদিনের এই গতরপ্রেম ছাড়তে পারবে?

যে নতুন জেনারেশন ‘ডে অব ডিপারেচার’ কিংবা ‘ডে অব ফেয়ারওয়েল’ অভিধা দিয়ে মোবারককে তাড়িয়েছে, তারা কি মিশরের আগাপাশতলা জড়িয়ে থাকা আমেরিকাকে তাড়াতে পারবে?

৩২ বছর ধরে সামরিক শাসন/জরুরি শাসন চলছে মিসরে। অথচ এ নিয়ে আমেরিকার টু শব্দটি নেই। সারা বিশ্বের গণতন্ত্রের ঠিকাদারি নেয়া ‘আমেরিকার’ এই আচরণ নিয়ে ভাবুন একবার !!! কেন তাদের এই নীরবতা?

তারা ভেবেছে, গণতন্ত্র থাকলে প্রশ্ন উঠবে। জনগণ জানতে চাইবে সামরিক খাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় কেন? শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, কর্মস্থান খাতে ব্যয় কমিয়ে সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানো কেন? তারা হয়ত জানতে চাইবেই ,কেন আমেরিকান কেপ্ট বা পতিতার চেহারা নেবে ‘মিসর’?

কেন স্বাধীন স্বত্তায় , নিজস্ব বিবেচনায় জেগে উঠবে না মিসর? গণতন্ত্র থাকলে এসব প্রশ্ন বিলক্ষণ উঠত? তাই হয়ত এত বছর মিশরে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তে দেয়নি আমেরিকা।বরং বাড়তে দিয়েছে সামরিক বাহিনীকে । আমেরিকার স্বার্থ রক্ষার ছদ্মাবরণেই তাই মিসরে শাসন চালিয়েছে মোবারক গং এবং সামরিক বাহিনী।

এবার ১৮দিনের টানা জনআন্দোলনের দিনে পশ্চিমের মিডিয়া প্রশ্ন তুলেছে সেখানে এখন ভোট হলে কি হবে ? আলোচনায় এসেছে, গণতন্ত্র এলে, ভোট হলে যদি ক্ষমতা পায় ইসলামপন্থি মুসলিম ব্রাদারহুড? তাহলে কি হবে? ইসরাইল সরাসরি বলেই ফেলেছে, গণতান্ত্রিক ভোটেও যদি মুসলিম ব্রাদারহুড জিতে যায় তবুও সেই সরকার দেখতে চায় না ইসরাইল। একজন পশ্চিমা সাংবাদিক আমেরিকা-ইসরাইলের এই অনধিকার চর্চা এবং রাজনৈতিক আকাক্সক্ষার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিউইয়র্ক টাইমস সংবাদপত্রে। তিনি লিখেছেন , ‘ডযু ফড়বং ড়ঁৎ হধঃরড়হধষ ঢ়ড়ষরপু ংববস ঃড় নব ঃযধঃ ফবসড়পৎধপু রং মড়ড়ফ ভড়ৎ অসবৎরপধহং ধহফ ওংৎধবষরং, ণবঃ ফধহমবৎড়ঁং ভড়ৎ ঊমুঢ়ঃরধহং?’

২.
মিসরের চারপাশ এবং মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এ জনআন্দোলন সাড়া ফেলেছে। মরক্কো, মৌরিতানিয়া, আলজিরিয়া, লিবিয়া, লেবানন, সিরিয়া ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, জর্ডান, কাতার, ওমান, ইয়েমেন কমোরস, সোমালিয়া, জিবুতি, সুদান প্রায় সবদেশেই এ জনআন্দোলন ধাক্কা দিতে পারে।

ধাক্কা দেবার সব লক্ষণই এখানে আছে। আমেরিকান কব্জায় নানাভাবে টিকে আছে এখানকার অধিকাংশ দেশের স্বৈরাশাসকেরা। গণতন্ত্র এখানে সোনার হরিণ। এখন এই দেশগুলোর অধিকাংশতেই ২৫ বছরের নিচে জনসংখ্যা ,মোট জনসংখ্যার একটা বড় অংশ। খোদ মিসরেই এ তরুণ প্রজন্মের হার মোট জনসংখ্যার ৫২.৩ শতাংশ। উল্লেখিত অন্য দেশে এ হার ৪০ থেকে ৬০ শতাংশের মতো। দেশগুলোতে দরিদ্রসীমার নিচে বাস করে প্রচুর লোক। সামরিক ব্যয় এ এলাকায় মূল উন্নয়নকে দাবিয়ে রেখেছে দীর্ঘদিন ধরে। এ দেশগুলোর সবগুলোতেই দুর্নীতি যথেষ্ট। সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা প্রায় নেই। অধিকাংশ দেশে শাসকেরা চালাচ্ছে পারিবারিক স্বৈরাশাসন। দীর্ঘদিন ধরে চলছে এই বাকরুদ্ব শাসন ।

মিসরের জনআন্দোলনের সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়বে এখন এসব দেশে । এ দেশগুলোকে নাড়িয়ে দেয়া ,শাসকদের কাঁপিয়ে দেয়ার সব সম্ভাবনার পথ দেখিয়ে দিল জনতার এই অহিংস প্রতিবাদ ।

৩.
একসময় ইরানের রাজ্যজুড়ে আমেরিকান মিত্র রেজা শাহ পাহলভী ছিলেন সেদেশের অধীশ্বর। রেজা শাহর পতনের পর ইসলামপন্থীদের উত্থান ঘটেছে ইরানে। লেবাননে আমেরিকানরা ঠেকাতে পারেনি হিজবুল্লাহর উত্থান। ধর্মভিত্তিক এই রাজনৈতিক দল এখন ইসরাইলের জন্য বিষফোঁড়া। খোদ প্যালেস্টাইনের একাংশ জনভোটে দখল করে আছে প্রচণ্ড আমেরিকা বিরোধী ‘হামাস’। ইরাকের নতুন সরকারের ওপরেও বড় প্রভাব আছে ইরানের । কাজেই মধ্যপ্রাচ্যেজুড়ে সর্বসাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া এ ‘রাজনৈতিক সুনামি’ কোনদিকে মোড় নেবে সেটাই এখন দেখার বিষয়। মিসরের রাস্তায় অনেক তরুণকে দেখা গেছে যারা পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত, যারা ভালো ইংরেজি বলতে পারে, যারা প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে শক্তিমান। এ পশ্চিমা শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর ভাবনাজুড়ে ‘ফ্রিডম’ কথাটা যদি গেঁথে যায়, চক্ষুস্মান হয়ে তারা যদি খুঁজে পায় আমেরিকান ‘আগ্রাসন’, তাহলে ‘মোবারক’ আর ‘আমেরিকা’ কি সমার্থক হয়ে উঠবে না খোদ মিসরেই ? পৃথিবীব্যাপী আমেরিকান যুদ্ধবাজনীতি, ৯/১১-এর পর ইসলামভীতি, ইসলাম-ফোবিয়া ছড়িয়ে আমেরিকা যে ভীতির শাসন, দমনের শাসন চালু করেছে তার মূল লক্ষ্য হচ্ছে ‘সামরিক ব্যবসা’কে সচল রাখা। আমেরিকান নুইয়ে পড়া অর্থনীতিকে ঠেকিয়ে রাখতে এই এখন মহাষৌধ।

কাছেই আমেরিকান অস্ত্রব্যবসা নির্ভর এই পররাষ্ট্রনীতির মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে এসব দেশের জনগণ যদি সচেতন না হয়, তবে এক মোবারক গেলেও তার বদলে হাজার মোবারক দাঁড়িয়ে যাবে।
     
Untitled Document

মডেল পুক
Total Visitor: 708376
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :