Untitled Document
ফাল্গুন সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
স্বপ্ন দুঃস্বপ্নের বন্ধন
- মুরাদুল ইসলাম




স্বপ্নে দেখলাম ব্যাঙ।দুইটা ব্যাঙ হাতের উপর লাফাচ্ছে।সাপ স্বপ্নে দেখলে শুনেছি শত্রু থাকে।কিন্তু ব্যাঙ স্বপ্ন দেখলে কি হয়? খোয়াবনামা জাতীয় কোন বই থাকলে উলটে দেখা যেত।স্বপ্ন দেখে মনে হয় চিৎকার দিয়েছিলাম।একজন ছুটে এসেছিল।পরে অবশ্য বুঝেছি সে নার্স।

সেই নার্স ই সকালে বলল, আপনি এই বেডে কেন ভর্তি হয়েছেন?আর কি কোন বেড খালি ছিল না?

আমি বললাম, জানিনা। তবে এখানে সমস্যা কি?

নার্স কিছুক্ষন আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনাকে বলা যায়।মরার আগে কেউ কিছু শুনতে চাইলে বলা উচিত।একটা লোক মরবে আর তাকে কিছু বলা হবে না এটা ঠিক কথা না।বেঠিক কথা। আমি ঠিক কথা বলি।

শুনে বুকটা একবার আতঁকে উঠল।জিজ্ঞেস করলাম, আমি যে মরে যাব কিভাবে জানলেন?

নার্স এবার অবজ্ঞার ভঙ্গিতে বললেন, আপনার নাক দেখে বুঝেছি।যারা কিছুদিনের মধ্যে মরবে তাদের নাক বাম দিকে বেকেঁ যায়।আপনার বেকেঁ আছে।অবশ্য এই বেডে আপনাকে দেখেই বোঝা উচিত ছিল।আমি তিন বছর ধরে এখানে আছি।এই বেড থেকে কেউ জীবিত ফিরে যায় নি।

আমি জানতাম আমার মারাত্বক কিছু হয়েছে।কিন্তু নার্সের কথা শুনে ভয় ভয় লাগা শুরু করল।বার বার নাকে হাত দিয়ে বাকা অংশ টা অনুভব করার চেষ্টা করলাম।পুরো রুমটাকেই ভয়ংকর ভয়ংকর মনে হতে লাগল।রুমএর চারদিকে ভাল করে তাকাতেই চোখে পড়ল দেয়ালে হিজিবিজি কি সব লেখা।অনেক কষ্ট করে ও পুরোটা বোঝা গেল না।যেটুকো বোঝা গেল তা এরকম,

“আমি........................মরব কেন?

বাবা মৃত্যু আমার পুতুল টা মরবে না

আমি মরে যাবে”

এই লেখাগুলো আরো ভয় জাগিয়ে তুলল।প্রতিদিন হাজারবার চোখ যেত ওদিকে।ভয়ে ঘুম আসত না রাতে।শেষরাতের দিকে ঘুম আসলে ভয়ংকর সব স্বপ্ন দেখতাম।প্রতিটা স্বপ্নই প্রায় এক রকম।সেখানে একটি মেয়ে আছে।ছোট মেয়ে।সুন্দর ফুটফূটে একটি বাচ্চা মেয়ে।সমস্ত ঘরময় পায়চারী করে বেড়াচ্ছে।যেন আমাকে দেখতেই পাচ্ছে না।কিন্তু স্বপ্নের এক পর্যায়ে হঠাৎ ব্যাঙ ব্যাঙ বলে চিৎকার করতে করতে মেয়েটা আমার দিকে ছুটে আসত।স্বপ্নের মধ্যেই মেয়েটাকে আমি ভীষন ভয় পেতাম।প্রানোচ্ছল ফুটফুটে মেয়েটাকে অস্বাভাবিক মনে হত তখন।আমার ঘুম ভেঙ্গে যেত।ঘুম ভাঙ্গলেই শোনতাম নার্স বলছে, প্রতিদিন ব্যাঙ দেখে কি আপনার ভয় যায় না? পুরো হাসপাতালের লোককে তো জাগিয়ে দিলেন।

অবস্থা এমন হল যে পুরোটা দিন ঐ মেয়েটার কথা ই মনে হত।প্রতিদিন স্বপ্নে সে আসে কেন।বেশী চিন্তা করার ফলে কি না জানিনা মাঝে মাঝে দিনের মধ্যেও আমি মেয়েটির কথা শুনতে পারতাম।ছোট মেয়েরা যেমন একা একা পুতুলের সাথে কথা বলে সেরকম কথা।

আস্তে আস্তে আমার অবস্থা খারাপ হতে লাগল।ডাক্তার বললন, দুটো কিডনী ই নষ্ট।কিডনী না পাওয়া গেলে কিছু করার নেই।

কিডনী কেনার মত সম্পদশালীদের কেউ আমি ছিলাম না।নিম্ন শ্রেনীর একটা চাকরী করতাম।তাই আমাকে অপেক্ষায় থাকতে হল কোন সহৃদয় ব্যাক্তির দান করার অপর।পত্রিকায় একটা বিজ্ঞাপন দেয়া হল।তারপর অপেক্ষায় ছিলাম।মৃত্যুর অথবা সহৃদয় কোন কিডনী দাতার।

অপেক্ষার সময় এক প্রকারের নিশ্চিত হয়ে গেলাম আমার মৃত্যু আসন্ন।কে আর আমার মত একজন কে কিডনী দিতে আসবে। নিজের সম্পর্কে আমার ধারনা ও খুব উন্নত ছিল না।আমার মত মানুষ দুনিয়ার কোন উপকারে লাগতে পারে তা আমার কল্পনার মধ্যেও ছিল না।অতএব মৃত্যু বা বেচেঁ থাকা দুটোই আমার কাছে একইরকম মনে হতে লাগল।তবুও একটা জিনিস অনুভব করতাম।আমার চারপাশে যেন বিশাল শুন্যতা।

মেয়েটা এখন আমার সাথে স্বপ্নে কথা বলে।প্রথমে ভয় পেত।আমিও ভয় পেতাম।কিন্তু আমার ভয় কেটে গেছে।নিজেকে আমি এখন দুই ভূবনের মাঝামাঝি অবস্থায় ভাবছি।অতএব উভয় ভূবনের বাসিন্দারা আমার কাছে একই।

মেয়েটার খুব কম কথা বলে।সবসময় পুতুল নিয়ে খেলা করে।মাঝে মাঝে মুখ তুলে গম্ভীরভাবে দু একটা প্রশ্ন করে।আমি তার খেলার পাশে বসে থেকে উত্তর দেই।

একদিন মেয়েটা আমাকে প্রশ্ন করল, আপনি আমার বাবা?

প্রশ্ন শোনে আমি তথমত খেয়ে গেলাম। আমার ছেলেমেয়ে নেই।কিন্তু এই মেয়েটি এমনভাবে প্রশ্ন করছে যেন সে একটা উত্তর ই চায়।সে উত্তরের প্রত্যাশা তার চোখে মুখে এমনভাবে ফুটে উঠেছিল যে তাকে অবজ্ঞা করার মত শক্তি আমার ছিল না।

যান্ত্রিক মানুষের মত মুখ দিয়ে উত্তর বেরোল, হ্যা।

এবার মেয়েটি পুতুল ছেড়ে সরাসরি আমার দিকে তাকাল।মানুষের চোখের দৃষ্টি তার অন্তরের শক্তি প্রকাশ করে।এই মেয়েটির চোখের দৃষ্টি দেখে আমি আশ্চর্য হলাম।এমন দৃঢ়ভাবে তাকিয়ে আছে যে ওই চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে মেরুদণ্ডে শক্তি থাকতে হয়।আমি চোখ নামিয়ে নিলাম।

মেয়েটা বলল, আপনার জন্য মা অপেক্ষা করছে।আমিও অপেক্ষা করেছিলাম।আপনি কেন আমাদের ছেড়ে ছিলেন?

মেয়েটার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল।আমার মনে হল আমি সত্যি ওর বাবা।ওদের অপেক্ষায় রেখে কোথাও চলে গিয়েছিলাম ভেবে নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছিল।দেখলাম হঠাৎ মেয়েটার চোখ মুখের পরিবর্তন হচ্ছে।একটা ভয়ংকর রুপ ফুটে উঠছে আস্তে আস্তে।অনেক দিন পর মেয়েটাকে আবার ভয় ভয় করতে লাগল একটু।

মেয়েটি হাতের পুতুলটা রাগে এক কোনে ফেলে দিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল, আপনি মার সাথে দেখা করবেন।

এই চিৎকারে ঘুম ভেঙ্গে গেল।আমিও হয়ত চিৎকার করেছিলাম।নার্সের কথা শোনলাম, আজ দেখি ব্যাঙ দেখেন নি?ব্যাঙ বলে চিৎকার দেন নি। আনন্দের কথা।

ওইদিন আমাকে রুমের বাইরে নেয়া হল।নার্স বলল পুরো রুমে নাকী কিসের পচা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে তাই পরিষ্কার করা হবে।

রাতে শুয়ে আছি।রুম পরিস্কার করার পর একটু ভাল ভাল লাগছে।দেয়ালের লেখাগুলো ও কে যেন মুছে দিয়েছে।

নার্স কে জিজ্ঞেস করলাম,গন্ধ কিসের ছিল? কিছু পেয়েছেন?

পেয়েছি।আপনার ওই ব্যাঙ মরে পচে ছিল এক কোনায়।আরেকটা জিনিস পাওয়া গেছে। জিনিসটা এক মেয়ের।তিনবছর আগে মারা যায় নিউমোনিয়ায়।কিন্তু জিনিসটা এতদিন এখানে ছিল আর আমার চোখে পড়ে নাই।এটাই আশ্চর্যের কথা।

জিনিসটা কি একটি পুতুল?

নার্স উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনি জানলেন কেমন করে?দেখেছিলেন নাকি?

ঠিক সেই সময় ডাক্তার এসে প্রবেশ করলেন।সাথে আমার এক কলিগ।বন্ধু ও বলা যায়।ডাক্তার সাহেবের মুখে শোনলাম কিডনী পাওয়া গেছে।দু একদিনের মধ্যেই অপারেশন করে প্রতিস্থাপন করা হবে।সব ব্যবস্থা করেছন আমার কলিগ বন্ধু।

কিন্তু অদ্ভুদ কারনে আমার চোখ ওই কোনের দিকে চলে গেল।যে কোনে মেয়েটা পুতুলটাকে ছুড়ে ফেলেছিল।মেয়েটার কথা মনে হতে ই কষ্ট লাগল।

ডাক্তার বললেন, আরে আপনি কাদঁছেন কেন? বেচেঁ থাকবেন এটা তো খুশির কথা।

ডাক্তারকে বলতে পারতাম আমি কাদঁছি একটি অন্য ভূবনের মেয়ের জন্য।যে মেয়েটি আমার সন্তানতুল্য।কিন্তু বলতে পারলাম না।শুধু একটু হাসলাম।
     
Untitled Document

মডেল পুক
Total Visitor: 708381
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :