Untitled Document
ফাল্গুন সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
   বিদেশী রূপকথা : হাতি
  কমিকস্ : টিনটিন

ছড়াঃ চারু প্রজাপতি
শীত বসন্ত


এ ক রাজার সাত রাণী। দেমাকে বড়রাণীদের মাটিতে পা পড়ে না। ছোটরাণী খুব শান্ত। এজন্য রাজা ছোটরাণীকে সকলের চাইতে বেশি ভালবাসিতেন।

কিন্তু অনেকদিন পর্যন্ত রাজার ছেলেমেয়ে হয় না। এত বড় রাজ্য কে ভোগ করিবে? রাজা মনের দুঃখে থাকেন।

এইরূপ দিন যায়। কতদিন পরে,- ছোটরাণীর ছেলে হইবে। রাজার মনে, আনন্দ ধরে না; পাইক পিয়াদা ডাকিয়া, রাজা রাজ্যে ঘোষণা করিয়া দিলেন, - রাজা রাজভাণ্ডার খুলিয়া দিয়াছেন, মিঠাইমণ্ডা মণি মাণিক যে যত পার, আসিয়া নিয়া যাও।

বড়রাণীরা হিংসায় জ্বলিয়া মরিতে লাগিল।

রাজা আপনার কোমরে, ছোটরাণীর কোমরে, এক সোনার শিকল বাঁধিয়া দিয়া বলিলেন -‌‌যখন ছেলে হইবে, এই শিকলে নাড়া দিও, আমি আসিয়া ছেলে দেখিব!’ বলিয়া রাজা রাজদরবারে গেলেন।

ছোটরাণীর ছেলে হইবে, আঁতুড়ঘরে কে যাইবে? বড়রাণীরা বলিলেন,-‘আহা, ছোটরাণীর ছেলে হইবে অন্য লোক দিব কেন? আমরাই যাইবো।’

বড়রাণীরা আঁতুড়ঘরে গিয়াই শিকলে নাড়া দিলেন। অমনি রাজসভা ভাঙ্গিয়া, ঢাক-ঢোলের বাদ্য দিয়া, মণি মাণিক হাতে ঠাকুর পুরুত সাথে, রাজা আসিয়া দেখেন,- কিছুই না!

রাজা ফিরিয়া গেলেন।

রাজা সভায় বসিতে না বসিতেই আবার শিকলে নাড়া পড়িল।

রাজা আবার ছুটিয়া গেলেন। গিয়া দেখেন, এবারেও কিছুই না। মনের কষ্টে রাজা রাগ করিয়া বলিলেন,- ছেলে না হইতে এবার শিকলে নাড়া দিলে, আমি সব রাণীকে কাটিয়া ফেলিব।” বলিয়া রাজা চলিয়া গেলেন।

একে একে ছোটরাণীর সাতটি ছেলে ও একটি মেয়ে হইল। আহা ছেলেমেয়েগুলো যে,-- চাঁদের পুতুল-- ফুলের কলি। আঁকুপাঁকু করিয়া হাত নাড়ে, পা নাড়ে,- আঁতুড়ঘর আলো হইয়া গেল।

ছোটরাণী আস্তে আস্তে বলিলেন,- ‘দিদি কি ছেলে হইলো একবার দেখাইলি না।’

বড়রাণীরা ছোটরাণীর মুখের কাছে রঙ্গ-ভঙ্গি করিয়া হাত নাড়িয়া, নথ নাড়িয়া,বলিয়া উঠিল -‘ছেলে না হাতি হইয়াছে,- ওঁর আবার ছেলে হইবে!- ক’টা ইঁদুর আর ক’টা কাঁকড়া হইয়াছে।’

শুনিয়া ছোটরাণী অজ্ঞান হইয়া পড়িয়া রহিলেন।

নিষ্ঠুর রড়রাণীরা আর শিকলে নাড়া দিল না। চুপি-চুপি হাড়ি-সরা আনিয়া, ছেলেমেয়েগুলোকে তাহাতে পুরিয়া, পাঁশগাদায় পুঁতিয়া ফেলিয়া আসিল। আসিয়া, তাহার পর শিকলে নাড়া দিল।

রাজা আবার ঢাকঢোলের বাদ্য দিয়া, মণি মাণিক হাতে ঠাকুর পুরুত সাথে আসিলেন;-বড়রাণীরা হাত মুছিয়া তাড়াতাড়ি করিয়া কতগুলি ব্যাঙের ছানা ইঁদুরের ছানা বেড়ালের ছানা আনিয়া দেখাইলো।

 দেখিয়া, রাজা আগুন হইয়া, ছোটরাণীকে রাজপুরীর বাহির করিয়া দিলেন।

বড়রাণীদের মুখে হাসি আর ধরে ন;- পায়ের মলের বাজন আর থামে না। সুখের কাঁটা দূর হইল; রাজপুরীতে আগুন দিয়া ঝগড়া কোন্দল সৃষ্টি করিয়া ছয় রাণীতে মনের সুখে ঘর সংসার করিতে লাগিলেন।

 পোড়াকপালী ছোটরাণীর দুঃখে গাছ-পাথর ফাটে, নদীনালা শুকায়- ছোটরাণী ঘুঁটেকুড়ানী দাসী হইয়া, পথে পথে ঘুরিতে লাগিলেন।

 



এমনি করিয়া দিন যায়। রাজার মনে সুখ নাই, রাজার রাজ্যে সুখ নাই,- রাজপুরী খাঁ খাঁ করে, রাজার বাগানে ফুল ফোঁটে না,- রাজার পূজা হয় না।

একদিন, মালি আসিয়া বলিল -‘মহারাজ, নিত্যপূজার ফুল পাই না, আজ যে পাঁশগাদার উপরে, সাত চাঁপা এক পারুল গাছে, টুলটুলে সাত চাঁপা আর এক পারুল ফুটিয়া রহিয়াছে।’

রাজা বলিলেন,- ‘তবে সেই ফুল আন, পূজা করিব।’

মালী ফুল আনিতে গেল।

মালীকে দেখিয়া পারুলগাছে পারুলফুল চাঁপাফুলদিগে ডকিয়া বলিল,-‘সাত ভাই চম্পা জাগ রে!’

অমনি সাত চাঁপা নড়িয়া উঠিয়া সাড়া দিল,- ‘কেন বোন পারুল ডাক রে?’

পারুল বলিল,-
‘রাজার মালি এসেছে,
পূজার ফুল দিবে কি না দিবে?’

সাত চাঁপা তুরতুর করিয়া উপরে উঠিয়া গিয়া ঘাড় নাড়িয়া বলিতে লাগিল,-
‘না দিব, না দিব ফুল উঠিব শতেক দূর,
আগে আসুক রাজা, তবে দিব ফুল!’

 দেখিয়া শুনিয়া মালী অবাক হইয়া গেল। ফুলের সাজি ফেলিয়া, দৌঁড়িয়া গিয়া, রজার কাছে খবর দিল।
আশ্চর্য হইয়া, রাজা, রাজসভার সকলে সেইখানে আসিলেন।


রাজা আসিয়া ফুল তুলিতে গেলেন, অমনি পারুল ফুল চাঁপা ফুলদিগকে ডাকিয়া বলিল,-
‘সাত ভাই চম্পা জাগ রে!’

চাঁপারা উত্তর দিল, ‘কেন বোন পারুল ডাকরে?’

পারুল বলিল,-‘না দিব, না দিব ফুল, উঠিব শতেক দূর,
আগে আসুক রাজারবড়রাণী তবে দিব ফুল।’

বলিয়া চাঁপাফুলেরা আরো উঁচুতে উঠিল।
রাজা বড়রাণীকে ডাকাইলেন। বড়রাণী, মল বাজাইতে বাজাইতে আসিয়া ফুল তুলিতে গেল। চাঁপাফুলেরা বলিল,
‘‌ না দিব, না দিব ফুল, উঠিব শতেক দূর,
আগে আসুক রাজার মেজরাণী, তবে দিব ফুল।’

তহার পর মেজরাণী আসিলেন, সেজরাণী আসিলেন, ন-রাণী আসিলেন, কনে রাণী আসিলেন, কেহই ফুল পাইলেন না। ফুলেরা গিয়া আকাশে তারার মতো ফুটিয়া রহিল।

রাজা গালে হাত দিয়া মাটিতে বসিয়া পড়িলেন।

শেষে দয়োরাণী আসিলেন; তখন ফুলেরা বলিল,-
‘না দিব, না দিব ফুল, উঠিব শতেক দূর,
আগে আসুক রাজার ঘুঁটেকুড়ানী দাসী,
তবে দিব ফুল।’

তখন খোঁজ খোঁজ পড়িয়া গেল। রাজা চৌদোলা পাঠাইয়া দিলেন, পাইক বেহারারা চৌদোলা লইয়া মাঠে গিয়া ঘুঁটে-কুড়ানী দাসী ছোটরাণীকে লইয়া আসিল।

ছোটরাণীর হাতে পায়ে গোবর, পরণে ছেঁড়া কাপড়, তাই লইয়া তিনি ফুল তুলিতে গেলেন। অমনি সুরসুর করিয়া চাঁপারা আকাশ হইতে নামিয়া আসিল, পারুল ফুলটি গিয়া তাদের সঙ্গে মিশিল; ফুলের মধ্য হইতে সুন্দর সুন্দর চাঁদের মতো সাত রাজপুত্র এক রাজকন্যা “মা মা” বলিয়া ডাকিয়া, ঝুপ করিয়া ঘুঁটে কুড়ানী দাসী ছোটরাণীর কোলে-কাঁখে ঝাঁপাইয়া পড়িল।

সকলে অবাক! রাজার চোখ দিয়া ঝরঝর করিয়া জল গড়াইয়া গেল। বড়রাণীরা ভয়ে কাঁপিতে লাগিল।

রাজা তখনি বড়রাণীদিগে হেঁটে কাঁটা উপরে কাঁটা দিয়া পুঁতিয়া ফেলিতে আজ্ঞা দিয়া, সত রাজপুত্র, পারুল- মেয়ে আর ছোটরাণীকে লইয়া রাজপুরীতে গেলেন।

রাজপুরীতে জয়ডঙ্কা বজিয়া উঠিল।

প্রাপ্তিসূত্র : দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার সংকলিত ঠাকুরমার ঝুলি থেকে সংগৃহীত।
Untitled Document

মডেল পুক
Total Visitor: 680638
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :