Untitled Document
চৈত্র সংখ্যা ১৪১৭
আমাদের ১লা বৈশাখ (১৪১৮) বাংলার আপামর কৃষি সমাজের সাথে ১৫ এপ্রিল
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
ড. ইউনুস এবং ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ে কয়েকটি ভুলতে বসা প্রশ্ন
- প্রিসিলা রাজ



গ্রামীণ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালকের পদ থেকে অধ্যাপক মুহম্মদ ইউনুসকে অপসারণ করতে গিয়ে শেখ হাসিনার সরকার যে ইতরজনসুলভ আচরণ করল তাতে ক্ষুদ্রঋণ সম্পর্কে ইতিমধ্যে হারিয়ে যেতে বসা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো যেন আরো তলিয়ে গেল। বহুদিন ধরে শহরে-গ্রামে ঘুরে গরিব মানুষের মধ্যে ক্ষুদ্রঋণের প্রসার ও ফলাফল দেখে আমার মনে যে কয়েকটি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে তা নিয়ে লিখতে চেয়েছি অনেকবার। মুহাম্মদ ইউনুসকে নিয়ে তোলপাড়ের সময় আরো প্রাসঙ্গিক বলে মনে হলো তা।

এ লেখার মাঝপথে হাতে এল অর্থনীতিবিদ কাজী খলিকুজ্জামানের একটি সাক্ষাৎকার (সাপ্তাহিক বুধবার মার্চ ১, ২০১১ সংখ্যায় প্রকাশিত)। তিনি পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের বর্তমান চেয়ারম্যান। সংস্থাটি বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণদাতাদের শীর্ষ সংস্থা যেটির নির্বাহী পরিষদ সরকার ও বেসরকারী ক্ষুদ্রঋণদাতাদের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত। সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থাপনা বিশেষ করে সুদ সম্পর্কে যা বলেছেন তারপর এ নিয়ে আমাদের তেমন কিছু বলার থাকে না তাই তাঁকে উদ্ধৃত করেই এ লেখা শুরু করছি।

"...ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার চড়া, আদায় হচ্ছে খুব কড়াকড়িভাবে। শুরুতেই ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে মোট ঋণের ৫ শতাংশ সঞ্চয় হিসাবে কেটে নেওয়া হয়। এই সঞ্চয়ের ওপর ২ থেকে ৫ শতাংশ সুদ দেওয়া হয়, যা অতি নগণ্য। কিন্তু এই টাকা অন্যত্র ব্যবহার করে ৩০-৪০ শতাংশ অর্থ আদায় করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। দরখাস্ত ও ঋণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নামে ৭০-৮০ টাকা নেওয়া হয় যেটা ৫-১০ টাকার বেশী হয় না। আরেকটি পীড়াদায়ক বিষয় হলো ঋণ নেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে প্রথম কিস্তির টাকা ফেরত দেওয়া। দেখা গেছে, এ সময়ে টাকা ব্যবহার থাক গুণেও দেখা হয় না। টাকাটা ভেঙে ভেঙে দেওয়া হয়। ফলে অনেক সময় অর্থ দিয়ে আশানুরূপ কাজ হয় না। ঋণগ্রহীতা জানে না সে কত সুদ দিচ্ছে। তাদের বলা হয় সুদের হার ১২-১৩ শতাংশ। এটা হলো ফ্ল্যাট রেট। সুদের হার হিসাব করার সময় ধরে নেওয়া হয় ঋণগ্রহীতার কাছে পুরো টাকাটা পুরো সময় থাকে। কিন্তু প্রথম কিস্তি দেওয়ার পর তো সেটা থাকছে না কারণ প্রতি কিস্তির সঙ্গে সঙ্গে আসল টাকার পরিমাণ কমে যাচ্ছে। যদি আমরা ক্রমহ্‌্রাসমান পদ্ধতি বিবেচনা করি তাহলে সুদের হার গিয়ে দাঁড়ায় ৪০-৫০ শতাংশ। ২০০৬ সালে আমি যে জরিপ করেছি সেখানে দেখা গেছে, এক-তৃতীয়াংশ ঋণগ্রহীতা আরো দরিদ্র হয়েছে। ফলে যে উদ্দেশ্যে ক্ষুদ্রঋণ প্রদান করা হচ্ছে যে কোনো কারণেই হোক তা সফল হচ্ছে না। এছাড়া জোর করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ তো রয়েছেই।"
ঋণ নিঃস্ব মানুষের অধিকার?

ঋণ মানুষের অধিকার - ইউনুসের চমকপ্রদ স্লোগান শুরুতেই আমাদের ঐতিহ্যগত সামাজিক চেতনার সঙ্গে বিরোধ তৈরী করে। ঋণ করে ঘি খাওয়া - ঋণ থেকে দূরে থাকার এই সামাজিক শিক্ষা কি তবে ভুল? ঋণ ব্যক্তি হিসাবে মানুষের দৈহিক ও মানসিক
অস্তিত্বকে পরাধীন করে, এ থেকে দূরে থাকার পরামর্শ এ কারণেই প্রাচীনরা দিয়ে গেছেন আমাদের।

তবে ক্ষুদ্রঋণদাতারা বলতেই পারেন এ স্লোগানের তাৎপর্য পরিস্থিতিনির্ভর। এবং তাঁরা তা বলেও থাকেন। তাঁদের বক্তব্য: গরিব মানুষকে তাঁরা ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। প্রথাগত ব্যাংকগুলো ঋণ দেয় না এই যুক্তিতে যে ঋণ তাঁরা শোধ করতে পারবেন না। ফলে গরিবের যখন বিভিন্ন কারণে নগদ টাকার প্রয়োজন হয় তখন তাঁরা সেটা পান না। ক্ষুদ্রঋণ চালু হওয়ার পর নিম্নবিত্তের সে অভাব অনেকটাই ঘুচেছে।

সাদা চোখে, আমাদের দেশের দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাসকারী কোটি কোটি লোকের সংখ্যা বিবেচনা করলে, ক্ষুদ্রঋণদাতাদের এই অবদানকে বিরাট মনে হবে সন্দেহ নেই। কিন্তু একটু তলিয়ে ভাবলে এমন কিছু প্রসঙ্গ উঠে আসে যার পরিপ্রেক্ষিতে এ সাফল্য আদৌ সাফল্য, নাকি মানুষের সঙ্গীন অবস্থা কাজে লাগানোর সুযোগ, সে প্রশ্ন অবধারিত হয়ে যায়।

এই দেশে কারা, কীসের জন্য ক্ষুদ্রঋণ নেন? সবচেয়ে আগের উত্তর - যাঁদের পুঁজি নেই, ভূমি খুব কম - ভিটা-কৃষিজমি মিলিয়ে দু'তিন বিঘা বা তারও কম, একেবারে ভূমিহীন, নারীপ্রধান গরিব পরিবার, এঁরাই। কয়েকটি হাঁস-মুরগি বা বাছুর কি ছাগল কেনা, ঢেঁকিতে ছেঁটে বাজারে বিক্রির জন্য ধান কেনা, হলুদ-মরিচ জাতীয় মশলা কিনে গুঁড়া করে বাজারে বিক্রি, পরিবারের কারো এমন কোনো অসুখ যার চিকিৎসা না করলেই নয়, মেয়ের বিয়ের যৌতুক, জীবন কোনোরকমে টেনে নিয়ে যাওয়ার এমন হাজারো প্রয়োজনে গরিব মানুষ ক্ষুদ্রঋণদাতার কাছে হাত পাতেন।

প্রশ্নটা হচ্ছে, এমন ছোট, এমন নগণ্য প্রয়োজনেও মানুষকে অন্যের কাছে, সে ব্যক্তিই হোক বা সংস্থা, হাত পাততে হয় কেন? জানি, ক্ষুদ্রঋণদাতার কাছে এ প্রশ্ন করার আগে করতে হবে রাষ্ট্রের কাছে কেননা রাষ্ট্রকে মানুষ এসব বিষয় সমাধান করার দায়িত্ব দিয়েছে। রাষ্ট্র দেশের অধিকাংশ মানুষের পরিস্থিতি উন্নয়নে ব্যর্থ হয়েছে অথবা ক্ষেত্রবিশেষে আরো খারাপের দিকে ঠেলে দিয়েছে যেখানে ক্ষুদ্রঋণওয়ালারা নগদ টাকা নিয়ে হাজির হয়েছেন। এ অবস্থায় মানুষের তাঁদের কাছে যাওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু এরপরও ক্ষুদ্রঋণদাতারা এ প্রশ্ন এড়াতে পারেন না কেননা প্রায় সময়ই বাণিজ্যিক লাভের দিকটি আড়ালে রেখে বিশাল সামাজিক কর্তব্য পালন করছেন বলে তাঁরা দাবি করেন।

এ এক মজার ব্যাপার যে ক্ষুদ্রঋণের এই স্লোগানটির পেছনে লুকিয়ে আছে নিম্নবিত্ত মানুষের সঙ্গে মধ্যবিত্ত বা তার ওপরের সারির জনগোষ্ঠীর অধিকারের তুলনা। বিত্তবান ঋণ পায়, বিত্তহীন পায় না - অথচ ঋণের প্রয়োজন ও ব্যবহার বিবেচনায় বিত্তবানের সঙ্গে বিত্তহীনের আকাশ-পাতাল ফারাক। মধ্যবিত্ত বা আরো সচ্ছলদের নিছক বেঁচে থাকার প্রয়োজনে ধার করতে হয় না কিন্তু বিত্তহীন মানুষকে তাদের খাওয়া-পরা-লেখাপড়া-চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো মেটানোর জন্যই অন্যের পকেটে লাভ রেখে টাকা ধার করতে হয়। মৌলিক চাহিদা তো মৌলিক অধিকারই, তা মেটাতে যদি ঋণই করতে হয় তবে সেখানে কারই বা সাফল্য, আর সাফল্যই বা কী?

নারীর ক্ষমতায়ন

শার্শার সেই নারীর কথা এখনও মনে পড়ে। ভারত সীমান্তের কাছে সেই গ্রামে গেছিলাম এক সমীক্ষার কাজে। এক উঠানে মহিলাদের সঙ্গে সভা করছিলাম। মলিন বেশের ম্লান সেই নারীও সেখানে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে কথা শেষ হওয়ার পরও দেখলাম মহিলা অনেকক্ষণ ধরে ঘুর ঘুর করছেন। একসময় একটু অবসর হলে তিনি কাছে এসে সমস্যার কথা জানালেন। তাঁর রিকশাচালক স্বামীর চাপে তাঁকে কয়েকবার ক্ষুদ্রঋণ নিতে হয়েছে। স্বামী ঋণের টাকা উড়িয়েছেন আর তাঁকে বাড়ী বাড়ী কাজ করে বহু কষ্টে তা শোধ করতে হয়েছে। এবারও স্বামী ঋণ নিতে চাপ দিয়েছেন কিন্তু তিনি বেঁকে বসেছেন যে কিছুতেই তা করবেন না। ফলে মারধোর করে স্বামী তাঁকে বাড়ী থেকে বের করে দিয়েছেন। এদিকে বাড়ীতে তিনটা ছোট ছোট বাচ্চা।

বাংলাদেশের প্রবল পরাক্রান্ত পিতৃতান্ত্রিক সমাজে ওপরের গল্পটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মেয়েদের মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ হওয়ার এটি এক অবশ্যম্ভাবী পরিণতি যা নিয়ে ক্ষুদ্রঋণদাতাদের গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করতে দেখি না।

নারীর জায়গা থেকে ক্ষুদ্রঋণদাতারা অত্যন্ত জোরালোভাবে তাঁদের যুক্তি তুলে ধরেন এভাবে যে, তাঁরা নারীকেন্দ্রিক গ্রাহক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন কেননা নারীরা নির্ভরযোগ্য, তাঁরা টাকা ওড়ান না, ঋণের টাকা শোধ দিতে অপারগ হলে তাঁরা উধাও হয়ে যান না, তাঁদের বিনিয়োগ থেকে পুরো পরিবার লাভবান হয় ইত্যাদি।

কিন্তু এসব যুক্তির মধ্যে কয়েকটি গুরুতর ফাঁক রয়ে গেছে। ক্ষুদ্রঋণদাতাদের বক্তব্য থেকে মোটামুটি পরিষ্কার যে তাঁরাও জানেন তাঁদের দেওয়া ঋণের অধিকাংশের চূড়ান্ত ব্যবহারকারী আসলে পরিবারের পুরুষ। এক্ষেত্রে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাঁরা হন ঋণগ্রহীতার স্বামী। ক্ষুদ্রঋণদাতাদের বক্তব্য, টাকাটা যেহেতু স্বামীরা স্ত্রীর মাধ্যমে নেন সেহেতু তাঁদের স্ত্রীর মতামতকে দাম দিতে হয় যা পরিবারে স্ত্রীর ক্ষমতায়ন ঘটায়। কিন্তু আমাদের সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে এ পরিস্থিতিতে উল্টো ঘটনাটিই ঘটার কথা - হয় ঋণ এনে দাও নয়ত অত্যাচার সহ্য কর। সব ক্ষেত্রে তা যে ঠিক এরকম সাদা-কালো পরিস্থিতি তৈরী করে তা না, তবে স্বামী বা তার পরিবারের নরম-গরম ব্যবহার মিলিয়ে মেয়েদেরকে এমন অবস্থার মুখেই পড়তে হয়।

ওদিকে স্বামী বা স্বামীর পরিবার ঋণ কাজে লাগায় কিন্তু সাপ্তাহিক কিস্তি দেওয়ার চাপ তো স্ত্রীর মাথার ওপরই। স্বামী যদি জুয়া খেলে ঋণের টাকা উড়িয়ে বা ব্যবসায়ে মার খেয়ে এলাকাছাড়া হয় তারপরও স্ত্রীকেই কষ্ট করে ঋণ শোধ করতে হয় কারণ তার তো পালানোর জায়গা নেই। স্বামী পথেঘাটে থাকলে তার ধর্ষিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই, ছেলে হিসাবে তার সামাজিক যোগাযোগের পরিসরও অনেক বড়, হয়ত সে পুরোপুরি নিরুদ্দেশেও যায় না, নির্দিষ্ট কোনো সামাজিক আশ্রয়েই থাকে আর সে জানে সন্তান তো তাদের মায়ের কাছেই আছে, শত কষ্টেও যে তাদের কাছ ছাড়া করবে না। এ অবস্থায় মেয়েটি যে নিরুদ্দেশে না গিয়ে মুখ বুজে খেয়ে না খেয়ে ঋণ শোধ করে সে তো তার দায়িত্ববোধের পরিচয় না, এটা তার অসহায় অবস্থারই প্রকাশ। কিন্তু ক্ষুদ্রঋণদাতারা এটাকে নারীর দায়িত্ববোধের পরিচয় হিসাবে তুলে ধরেন যা নারীর সত্যিকারের সামাজিক অবস্থানকে ঢেকে দেয়। এর মধ্যে দিয়ে নারীর আপাতদৃষ্টিতে একটি ইতিবাচক কিন্তু প্রকৃত অর্থে অসত্য ভাবমূর্তি তৈরী হয় যাকে কাজে লাগিয়ে ক্ষুদ্রঋণদাতারা নিজেদের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেন।

সুদমুক্ত ঋণ কি অসম্ভব?

দরিদ্র মানুষের ঋণ যদি দিতেই হয় তবে তা হওয়া দরকার সুদবিহীন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পেশার গরিব নারী-পুরুষ যাঁদের সঙ্গেই কথা হয়েছে তাঁরা মূলতঃ দু'টি জিনিসের কথা বলেছেন - পেশার প্রশিক্ষণ এবং পুঁজিগঠন বা বাড়ানোর জন্য সুদমুক্ত ঋণ।

মুশকিলটা হচ্ছে যখনই বিভিন্ন আলোচনায় সুদমুক্ত ঋণের কথা তুলেছি, ক্ষুদ্রঋণের ঘোরতর সমালোচকও বলেছেন, সুদমুক্ত ঋণ কী করে সম্ভব? কেউ কেউ এমনভাবে তাকিয়েছেন যেন সোনার পাথরবাটির কথা বলছি।

তাঁরা এমন করে ভাবছেন সম্ভবতঃ এ কারণে যে, ঋণ ব্যাপারটা যেহেতু চরিত্রগতভাবে লাভমুখী সেহেতু সুদ ছাড়া ঋণ এক অসম্ভব ভাবনা, এ ধরনের কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত লোকসান হয়ে ভেস্তে যেতে বাধ্য। কিন্তু মানুষের যখন দরকার সুদমুক্ত ঋণ তখন তাদের উপকারের কথা বলে আপনি তো নিজের পকেট ভারী করতে পারেন না!

সুদমুক্ত ঋণ বা নিদেনপক্ষে স্বল্পসুদে ঋণ কি একান্তই অসম্ভব? বিদ্যমান তথ্য বলছে সম্ভব। কিছু কিছু সরকারী বিভাগ যেমন, মহিলা অধিদপ্তর, যুব সংক্রান্ত দপ্তর, মৎস্য ও পশু অধিদপ্তর ইত্যাদি দপ্তরগুলো বিভিন্ন জীবিকা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের পর প্রশিক্ষণার্থীদের বিনা বা স্বল্প সুদে ঋণ দেয় বলে আমরা জানি। এছাড়া সরকারের পল্লী উন্নয়ন দপ্তর বা বিআরডিবি-এর রয়েছে স্বল্প সুদ ও সুবিধাজনক শর্তে ঋণ দেওয়ার দেশব্যাপী বিরাট কর্মসূচি। অন্ততঃ কয়েক বছর আগেও ছিল, এখন কী পরিস্থিতি জানি না। এছাড়া কিছু ভিনদেশী এনজিওরও এ ধরনের কর্মসূচি আছে বলে জানি।

কিন্তু সুদমুক্ত বা স্বল্প সুদ এবং সুবিধাজনক শর্তে ঋণ দেওয়ার এসব কর্মকাণ্ডের ব্যবস্থাপনা দুর্বল এবং দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ায় নিম্নবিত্ত মানুষ এর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন অধিকাংশ সময়। প্রায় সময়ই অত্যন্ত দরিদ্র, যাদের এ ধরনের সহায়তা দরকার তাদের কাছে এ ঋণ পৌঁছাতে পারে না। এলাকার অবস্থাপন্নরা ক্ষমতা ও যোগাযোগের জোরে এসব সুযোগসুবিধা নিয়ে নেয়। বিশেষ করে বিআরডিবি সম্পর্কে এ অভিযোগ বেশী শুনেছি।

ওপরে যেসব সুদমুক্ত বা স্বল্পসুদ ঋণের কথা বলা হলো তার দু'একটি বাদে সবগুলোই স্বল্পমেয়াদী। বিশাল পরিসরে, কোটি কোটি মানুষের কাছে, দীর্ঘমেয়াদে বা বছরে পর বছর ধরে এ ধরনের ঋণের ব্যবস্থা করা কঠিন কাজ কেননা ঋণের টাকাটা যারা দেয় তারা সুদ পাবে বলেই দেয়। আমি দেশের বাইরের মহাপ্রভুদের কথা বলছি। তাঁরা কেন বিনাসুদে বাংলাদেশকে বা এদেশের মানুষকে টাকা ধার দেবেন? একথা সকলেই জানে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইউনুসের এই যে বিশাল মর্যাদা এবং গুরুত্ব তার কারণটাই হলো, তিনি বড়লোক দেশগুলোর টাকা গরিব দেশের গরিবদের কাছে ধার দিয়ে সুদে-আসলে তা ফেরত দেওয়ার রাস্তা দেখিয়েছেন। মহাজনী ঋণ গ্রাম বা শহর যে কোনো পর্যায়ে যার খাতকদের একটা বিশাল অংশ অত্যন্ত দরিদ্র মানুষ, সেটিকেই ইউনুস আন্তর্জাতিক মাত্রা দিয়েছেন। মহাজনী প্রথার বিশ্বায়ন ঘটিয়েছেন - এখন গাগলার সখিনা বেগম আমেরিকা বা ইংল্যান্ডের জনসন-রনসন বা রবিনসন-আহমেদ কোম্পানির প্রায় সরাসরি খাতক, ঋণটি পৌঁছে দিচ্ছে কেবল স্থানীয় বা জাতীয় কোনো এনজিও।

বৃহত্তর পরিসরে বিনাসুদে ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া সম্ভব কি সম্ভব না অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরাই তা ভাল বলতে পারবেন। তবে বুঝি যে নিম্নবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে সফল উদ্যোক্তা তৈরীর জন্য এর কোনো বিকল্প নেই এবং এ বিষয়ে জোরালো, আরো জোরালো দাবী তোলা জারি রাখাই উচিত।

সমবায় আন্দোলন বনাম ক্ষুদ্রঋণ

ঊনিশশ' পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে আখতার হামিদ খানের নেতৃত্বে এই বঙ্গে সমবায় আন্দোলন শুরু হয়েছিল। দরিদ্র মানুষ যাতে সমবেত হয়ে নিজেদের যৌথ পুঁজি গঠন করে তা বিনিয়োগ করতে পারে সেটাই ছিল এ আন্দোলনের লক্ষ্য। প্রথমদিকে ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়লেও সমবায় আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছিল। মূলতঃ যৌথ পুঁজি গঠন ও বিনিয়োগে সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব, তা থেকে দুর্নীতি আর তার থেকে সদস্যদের ভেতরে জন্ম নেওয়া পারস্পরিক সন্দেহ-অবিশ্বাসের কারণে সমিতিগুলো ভেঙে গিয়েছিল। এখন সরকারের সমবায় অধিদপ্তরের প্রতি জেলা-উপজেলায় কার্যালয় থাকলেও সত্যিকার অর্থে দরিদ্র মানুষের ক্ষমতায়ন করতে সক্ষম এমন সমবায় সমিতির সংখ্যা সারা দেশে হাতে গোণা।

সমবায় আন্দোলন যদি সফল হতো তবে কয়েকটি লাভ একসাথে হতো, একদিকে নিম্নবিত্ত মানুষ নিজেরা নিজেদের পুঁজি গড়ে তা বিনিয়োগ করতে পারতেন, যার অর্থ তাঁরা নিজেরা ব্যবস্থাপনার প্রকৃত অর্থে মালিক হতেন। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের এ মালিকানা কোনো প্রতীকী অর্থে হতো না যেমনটা গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষেত্রে হয়েছে - প্রতিষ্ঠানটির সব ঋণগ্রহীতা এর অংশীদার বলা হলেও সেটা কী অর্থে ও কতটা তা স্পষ্ট নয়। সমবায়ের আরো এক ইতিবাচক দিক নিম্নবিত্ত মানুষরা এর মধ্যে দিয়ে সামাজিক ক্ষমতা অর্জন করেন। নারী এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সমিতি সেদিক থেকে আরো গুরুত্বপূর্ণ।

এদেশে সমবায় আন্দোলনকে সফল করে তোলার গুরুত্বপূর্ণ জোরালো প্রচেষ্টা আখতার হামিদ খানের পর আর কেউ সেভাবে হয়ত নেননি। রাষ্ট্র থেকেও নেওয়া হয়নি। শুনেছি মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের কোনো কোনো জায়গায় মুক্তিযোদ্ধা কেউ কেউ সমবায়ভিত্তিক কর্মকাণ্ড শুরু করেছিলেন যা বাহাত্তর পরবর্তী রাজনৈতিক ডামাডোল, বঙ্গবন্ধুর একনায়কতান্ত্রিক এবং জেনারেল জিয়ার সামরিক শাসনের যাঁতাকলে নির্মমভাবে পিষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

ক্ষুদ্রঋণ এদেশের নিম্নবিত্ত বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আন্তর্জাতিক পুঁজির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে যা নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায় তাদের কোনো ভূমিকা নেই বা থাকলেও অতি নগণ্য। এরই বিপরীতে সমবায় আন্দোলন সফল হলে নিম্নবিত্ত মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জোর বাড়ত। কিন্তু সেটা হয়নি, তার কারণ হয়ত এই যে, নিম্নবিত্ত মানুষের স্বর জোরালো হতে পারে এমন কিছু করার তাগিদ এ রাষ্ট্র বোধ করে না। এমন কিছু ঘটলে তাকে সমূলে বিনাশ করার দিকেই বরং এ রাষ্ট্র মনোযোগ দিত।

আরো মজার ব্যাপার, সমবায় সমিতির আদি ধারণাকে কাজে লাগিয়েই ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলো এতটা সফল হতে পেরেছে। টাকা ধার দেওয়ার আগে যে কোনো ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা আগে সম্ভাব্য ঋণগ্রহীতাদের নিয়ে সমিতি গঠন করে। এ সমিতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য কোনো সদস্য ঋণ ফেরত দিতে অপারগ হলে অন্যরা তাকে বাধ্য করবে কেননা সমিতির নিয়ম এই যে একজন ঋণ শোধ দিতে না পারলে অন্যদের তা শোধ করতে হবে।

এদেশে সমবায় আন্দোলনকে সফল করতে বাইরের দেশগুলোর বিত্তবান গোষ্ঠীর, যারা গ্রামীণসহ অন্যান্য ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাকে ঋণ দেয়, কোনো আগ্রহ নেই কেননা এতে তাদের কোনো মুনাফা হবে না। অধ্যাপক ইউনুস নিজেকে যা দাবী করে থাকেন, গরিবের বন্ধু, নারীর বন্ধু, তা যদি সত্যিই হতেন তবে এদেশের বৃহত্তর মানুষ প্রকৃতঅর্থে ক্ষমতার অধিকারী হতে পারে এমন কোনো উদ্যোগই নিতেন, সেটা সমবায় হোক বা হোক আরো জোরালো কোনো কিছু।

১২.০৩.২০১১
     
Untitled Document

চাম্পারাইয়ে থার্টি
Total Visitor: 709312
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :