Untitled Document
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
 
হারিয়ে যাচ্ছে লোকজ নৃত্য কুড়ার নাইছ
-জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল
আব্বা, হেরা বঙিল বাঁশ লইয়া নাচতাছে কেরে? শিশু জিহাদের প্রশ্নে পিতার সোজা উত্তর- ‘কুড়ার নাইছ নাছে।’ আব্বা, কুড়ার নাইছ কি? বাড়ীর আঙ্গিনায় জীবনের প্রথম অভিনব অঙ্গভঙ্গিতে একদল পুরুষের বিশেষ নাচ দেখে শিশু জিহাদের মনে এ ধরনের অনেক প্রশ্ন জাগে। ছেলের প্রশ্নবানে বিদ্ধ পিতা রীতিমত বিভ্রত। সন-সন্তানের প্রশ্নের জবাব দিতে না পারা পিতা ভাবে, শিশুদের সব প্রশ্নের জবাব নেই, আবার সব প্রশ্নেরও জবাব দিতে হয় না। তবে, প্রশ্নের জবাব না দিলেই বা আমাদের নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতিক সম্পর্কে কি করে জানবে আজকের জিহাদেরা? কিন' আউল বাউল লালনের দেশের হারিয়ে যাওয়া অনেক কৃষ্টি আর সংস্কৃতির কথা আজকের অনেক পিতাদেরও যে জানা নেই। গাজীকালুর পট, যাত্রাপালা, লোকজ নৃত্য, জারিগান, কুড়ার নাচ, পালাগান এগুলোই ছিলো বাঙ্গালীর সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ এজাতীয় হাজারো সংস্কৃতি বিলুপ্তির পথে! এসব বিলুপ্তজ প্রায় লোক সংস্কৃতিরই একটি কুড়ার নাচ, যা কুড়ার নাইছ নামেই লোক মুখে প্রচলিত। কুড়ার নাইছ এক ধরনের লোকজ নৃত্য। কিছু সংখ্যক লোক দলবদ্ধ হয়ে প্রত্যেকে একটি করে সুসজ্জিত বাঁশ কাঁধে নিয়ে বাড়ী বাড়ী ঘুরে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে অভিনব অঙ্গভঙ্গিতে এক ধরনের বিশেষ নাচের মাধ্যমে লোকজনের মনোরঞ্জন করে থাকে। বিনিময়ে কিছু উপঢৌকন আদায় করে, মূলত তাকেই বলে কুড়ার নাইছ। কুড়ার নাইছের দলে নিুে তিন জন এবং সর্বোচ্চ ১১ জন সদস্য থাকে। তারা প্রত্যেকেই একটি করে শুকনো বাঁশ নিয়ে তাতে রং বেরংয়ের কাপড় পেচিয়ে (বিশেষ করে রঙিন শাড়ি) এর মাথায় আয়না, জরির ফিতা প্রভৃতি লাগিয়ে একটি আকর্ষনীয় বস'তে পরিণত করে বাঁশটিকে। এর পর দর্শনীয় বস'টি কাঁধে নিয়ে ঢোল, করতাল, শানাই প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ধানের চারা বোনা, ধান কাটা, বাড়া বানা এ জাতীয় নানা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে নৃত্য শৈলীক প্রদর্শন করে।

কবে, কখন, কোথায় কুড়ার নাইছের প্রচলন শুরু হয়েছিল এর সঠিক তথ্য আজ অজানা হলেও এটা জানা যায় যে, প্রাচীন কালে কলেরা, গুটিবসন- প্রভৃতি মহামারি রোগে আক্রান- হয়ে যখন কোনো শিশু মৃত্যুর দ্বার প্রানে- উপনীত হতো তখন শিশুটির উদ্ভিগ্ন অভিভাবকেরা সৃষ্টি কর্তার কাছে এই মান্যত করে (নিয়ত করে) নিজেদের সন-ানের জীবন ভিক্ষা চাইতেন যে, “আল্লাহ যদি আমার সোনার চাঁনরে বাছাইয়া রাখে তাইলে তার মুসলমানীর সময় (সুন্নতে খৎনা) কুড়ার নাইছ দিয়া মানুষরে খাওয়ামু (ভুরি ভোজ)। অবশেষে অগত্যা বেঁচে যাওয়া শিশুটির উৎফুল্ল অভিভাবকরা সৃষ্টি কর্তার ঋন সুধে তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতির বাস-বায়ন স্বরূপ কুড়ার নাইছের আয়োজন করে থাকেন। নিয়ম অনুযায়ী কুড়ার নাইছ দল ৭টি গ্রাম ঘুরে বাড়ী বাড়ী গিয়ে বাদ্যযন্ত্রের সাথে নৃত্য প্রদর্শন করে মানুষের মনোরঞ্জন করে চাল, টাকা তুলেন। তবে, তা জোড় করে নয়, গৃহকর্তারা স্বেচ্ছায় যা দেন। কুড়ার নাইছে অংশগ্রহণকারীরা কোনো আর্থিক সুবিধার (মজুরি) বিনিময়ে নাচেন না। এমনকি বাড়ী বাড়ী গিয়ে উঠানো টাকা-পয়সা বা চাল-ডাল থেকেও ভাগ নেন না। এক ধরনের শখের বসেই তারা নেচে থাকেন। তাছাড়া তারা শুধু যে শিশুটির সুন্নতে খৎনা হচ্ছে তার বাড়ীতে আয়োজিত উন্নত ভুরি ভোজ অনুষ্ঠানের সম্মানীত মেহমান হিসাবে ভুরি ভোজে অংশ নেন। বৃহত্তর কুমিল্লার মধ্যবর্তী এলাকার বিভিন্ন স'ানে বিশেষত সুরাদানগর ও নবীনগর এলাকায় এখনো মাঝে মধ্যে কুড়ার নাইছ দেখা যায়। অনেকের দৃষ্টিতে কুড়ার নাইছ হলো একটি কুসংস্কার। আবার কেউ কেউ কুড়ার নাইছকে কুসংস্কার না বলে একে প্রাচ্য সংস্কৃতি হিসাবে আখ্যা দেন। তবে কুসংস্কার আর সংস্কৃতি যাই বলা হোক না কেন, আবহমান কাল ধরে প্রাচ্যের সরলপ্রাণ মানুষের হৃদয়ে লালিত কুড়ার নাইছের মতো এসমস- লোকজ রীতিনীতিগুলো সভ্যতার বিকাশ তথা আধুনিকতার অজুহাতে আমদানী করা পাশ্চাত্য সভ্যতার আগ্রাসনে ধ্বংস হতে বসেছে। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষাকরা জরুরী, নইলে আউল বাউল লালনের দেশটিও অচিরেই বিলিন হয়ে যাবে অসভ্য সংস্কৃতির কৃষ্ণ গহ্বরে।
 
 
Untitled Document
Total Visitor : 698474
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By : Life Yard