Untitled Document
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী

 

ছবি - কাজী মনির
শিল্পীর অনুপস্থিতি ও দর্শকের জন্ম
-মোস্তফা জামান
শিল্পবস্তুর সাথে শিল্পীর সম্পর্কসূত্র আবিষ্কারকে জরুরী মনে করা হয় কেন? শিল্পবস্তুটি যতোটুকু তাৎপর্য বহন করে তার চেয়ে বেশী তাৎপর্য দাবি করার জন্য। শিল্পকে যতো বেশী শিল্পীর ব্যক্তিগত প্রকাশভঙ্গি ও ব্যক্তিগত বিষয়ের সাথে জড়িত অবস্থায় দেখা যায় ততোই এতে আধিবিদ্যক কুয়াশা যুক্ত হয়, ততোই তাকে সমালোচনার উর্ধ্বের বস্তু হিসেবে দাবি করা সম্ভব হয়। শিল্পবস্তু মূলত অপর সমাজ, সংস্কৃতি ঐতিহ্য, কিংবা বলা যায় পূর্ববর্তী শিল্প-সমূহের পাশাপাশি বিজ্ঞান প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে বেশি সম্পর্কিত, ব্যক্তি এই সম্পর্কের সূত্রে শিল্পী হয়ে শিল্প সৃষ্টি করে।

শিল্পের এইসব পরিপ্রেক্ষিত দেখায় সমালোচকদের প্রধান দায়িত্ব। এই সূত্রেই শিল্পের সমালোচনা হয়, হওয়া উচিৎ। শিল্পকে সমালোচনার উর্ধ্বে রাখতে চাইবার মানে হচ্ছে, একে একটি ধর্মীয় বা বিশ্বাসের মাত্রা দেয়া। বিষয় শিল্প সৃষ্টির পেছনে একটা বড় শক্তি, কিন্তু বিষয়ের মধ্যে থেকে শুধু এর যায়মানতার ভিত্তি দেয়া যায় না। ব্যক্তিকে বিষয় পরিচালনা করে, ব্যক্তি- যিনি নির্দিষ্ট কোন সময়ে, কোন সিস্টেমের তলায় অবস্থিত একজন সাবজেক্ট মাত্র- তার সাবজেক্টটিভিটি- বা ব্যক্তিগতর প্রকাশটাই প্রেডিকেটস নির্দেশ করে। প্রেডিকেটস হলো তার বিষয় যা সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে, সামাজিক বাস্তবতা, অবাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে তার ভিতর জন্ম নেয়। ফলে শিল্প বিষয় তাড়িত হয়ে নিজ শিল্পকে ধর্মীয় মাত্রা দিতে চাইতে পারে, কিন্তু সমালোচক তা হতে দিতে পারে না। কেন পারে না উদাহরণ দিয়ে সেই বিষয়টা পরিষ্কার করা যাক।

কাবা শরীফ একটি স্থাপত্য, এর তাৎপর্য বিচার করতে স্থাপত্য হিসেবে এটিকে কেউ দেখবেন না। এমনকি অমুসলিমও না। কাবার তাৎপর্য এই স্থাপনাকেন্দ্রিক বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত। কাবা যে মূল্যবান তার সাথে একটি ধর্ম বিশ্বাস, সেই বিশ্বাসকেন্দ্রিক ইতিহাস, এবং এই ইতিহাসের পেছনের মহামানবদের জীবন ও তাদের ওহিপ্রাপ্তির বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কাবা শরিফকে কিছুতেই এই মহামানবদের প্রচারিত ধর্ম ও বিশ্বাস থেকে আলাদা করে দেখার উপায় নেই।

এখন কথা হচ্ছে আমরা কি ‘সেক্যুলার’ শিল্প হিসাবে পরিবর্তিত শিল্পকেও একই দৃষ্টিতে দেখবো কিনা ! যদি সেক্যুলার শব্দ ব্যবহারে কারো আপত্তি থাকে, কেউ যদি নিজ শিল্পের বাইরে ভাব প্রকাশ করে বলে দাবি করে তার শিল্পের ব্যাখ্যা বিশে¬ষণ অন্যভাবে হবে কী? এই প্রস্তাবের সুরাহা সহজ, কারণ সব শিল্প বিচারের মধ্যে দিয়ে দুনিয়ার চেহারা দেখা, তাকে দুনিয়ার তাবৎ জ্ঞান- সেক্যুলার, নন সেক্যুলার জ্ঞান দিয়ে বিচার করতে হবে। কোন জ্ঞান দিয়ে তার বিচার হচ্ছে তা মূল প্রশ্ন না, মূল প্রশ্ন হরো লাগসই বিশে¬ষণ ও বিচার হলো কি না।

শিল্পের স্রষ্টা আছেন, এই স্রষ্টার মনন থেকেই শিল্পবস্তু বা আর্ট অবজেক্টটির জন্ম। এই মনন অধিকাংশ সময়ে সুনির্দিষ্ট সমাজের চর্চিত মনন, যে সমাজে শিল্পের বাস। আমাজনের গভীর জঙ্গলের মানবগোষ্ঠী যে মনন থেকে শিল্প গড়েন আধুনিক শহরকেন্দ্রিক সমাজের মানুষ সেই মনন থেকে ও একই উদ্দেশ্য তা গড়েন না।

শিল্পীর বা ব্যক্তির মনন ভাবনায় তার স্থান-কাল একটি মুখ্য বিষয়। ব্যক্তির মনন গোষ্ঠীর মনন থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয়-ই নয়। যা ব্যক্তির তার সাথে স্পষ্টতই গোষ্ঠীর যোগ আছে। ভাষা এই যোগাযোগের সবচেয়ে বড় বাহন। একই অর্থনীতি, রাজনীতি বা সমাজ ব্যবস্থা এই যোগাযোগের ভিত্তি। তাই ব্যক্তি মানেই সমাজের প্রতিনিধি। পাগলও তার সমাজের অন্য পাগলদের প্রতিনিধিত্ব করে, অথাৎ গোষ্ঠী ভিন্নতা দিয়ে ব্যক্তির ভিন্নতা যাচাই সম্ভব।

সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় যে সত্র তা হলো সামাজিকতা, যার সূত্রে সেতো তার সুনির্দিষ্ট সমাজের গণ্ডির বাইরে বেরোতে চাইলেও পারে না। তাই ব্যক্তি মানেই সমাজের ভগ্নাংশ বা কম্পোনেন্ট। ব্যক্তি সুনির্দিষ্ট সমাজের কোনো না কোনো একটি স্রোতের মুুখপাত্র মাত্র। পাশ্চাত্য দর্শনের ভাষা ধার করে বলা যায় যে, সে সাবজেক্ট বা এজন্ট যার এজেন্সি হলো তার সত্য, বিষয এমনকি শিল্পী হয়ে ওঠার তাবৎ প্রচেষ্টা।

(চলবে)


Untitled Document
Total Visitor : 708549
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By : Life Yard