Untitled Document
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী

   
মঙ্গলবারের গল্প
-তপন বাগচী

এক দেশে ছিল এক বানিয়া। তাকে সকলে বেনে বলে ডাকে। তার ছিল এক সুন্দরী বউ। তাদের কোনো সন্তান নেই। এই নিয়ে তাদের মনে কিছুটা দুঃখ রয়েছে। কিন্তু তা কারো কাছে প্রকাশ করে না। মনের দুঃখ মনেই চেপে রাখে।
একদিন তাদের বাড়িতে এক সন্ন্যাসী এসে বলে, ‘আমাকে কিছু ভিক্ষা দাও গো? কে আছ? ঈশ্বরের দোহাই, আমাকে কিছু খাবার দাও।’ এই কথা বলে সন্ন্যাসী সুর করে উচ্চারণ করে-
‘কে আছ গো, মা-জননী
একটা কথা শোনো
দু’দিন ধরে উপোস আমি
খাইনি খাবার কোনো।
আমার ঝুলি ভরবে মাগো
এক মুঠো চাল পেলে
কোথায় গেলে মা-জননী
আমি তোমার ছেলে!’
বেনে তখন বাড়িতে ছিল না। বেনের বউ ঘর থেকে বাইরে আসে। সন্ন্যাসীকে দেখে আবার ঘরের ভেতরে যায়। ঘর থেকে নিয়ে আসে কিছু খাবার। সন্ন্যাসীর সামনে গিয়ে বলে, ‘এই নাও’।
সন্ন্যাসী বলে, ‘মা, ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। কিন্তু মা তোমার ছেলেমেয়েরা কই? তাদের তো দেখছি না!’
‘আমাদের কোনো সন্তান নেই।’
‘সে কী? তাহলে, আমি তো তোমার দেয়া কিছু নিতে পারব না।’
‘কেন ঠাকুর? তুমি খাবার চেয়েছিলে বলেই তো আমি তোমার জন্য এই খাবার এনেছি। আমার ঘরে আর তো কিছু নেই।’
‘সে ঠিক আছে, মা। যার কোলে সন্তান নেই, তার হাত থেকে আমি তো কিছু খাই না।’
সন্ন্যাসী চলে যায়। বেনে-বউ খুব কষ্ট পায়। সন্তান নেই বলে সন্ন্যাসী তার কাছ থেকে ভিক্ষা নেয় না, এটা যে কতটা অপমানের, তা সে কাকে বোঝাবে? কিন্তু প্রতিদিনই আসে এবং খাবার চায়। কিন্তু খাবার দিতে গেলে একই কথা বলে চলে যায়।
একরাতে, বেনে ঘরে ফিরে এলে, বউ তাকে এই ঘটনা জানায়। সন্ন্যাসীকে জব্দ করার জন্য বেনে তার বউকে একটা কৌশল শিখিয়ে দেয়। পরদিন আবার সন্ন্যাসী আসে, এবং আগের মতো একই সুরে বলে-
‘কে আছ গো, মা-জননী
একটা কথা শোনো...’
এবার আর বেনের বউ সামনে আসে না। স্বামীর শেখানো কৌশল মতো, দরজার আড়ালে লুকিয়ে থাকে। একফাঁকে সে সন্ন্যাসীর ঝোলার মধ্যে একটা সোনার মুদ্রা ফেলে দেয়। ভেবেছিল কেউ দেখব না। কিন্তু সন্ন্যাসী তা দেখে ফেলে। সন্ন্যাসীর ভীষণ রাগ হয়! সে সঙ্গে-সঙ্গে তাকে অভিশাপ দেয়-
‘মুদ্রা দিয়ে ইচ্ছেমতো
যায় না কিছু কেনা
তোমার ঘরে সন্তানাদি
কখনো আসবে না।’
সন্ন্যাসীর অভিশাপে বেনে-বউ খুব বিচলিত হয়। কান্নায় বুক ভরে ওঠে। এই অভিশাপ থেকে সে মুক্তি চায়। সে সন্ন্যাসীর পা জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চায়।
‘একটা না হয় ভুল করেছি
হয়তো কিছু পাপ!
তাতেই তুমি উঠলে ক্ষেপে
করলে অভিশাপ?
আমায় তুমি ক্ষমা করো
ভুল হবে না আর
তোমার কাছে এই মিনতি
করছি বারংবার।’
এরকম কান্নাকাটিতে সন্ন্যাসীর কিছুটা দয়া হয়। নারীর কান্নায় কার না হৃদয় গলে! সন্ন্যাসী তার অভিশাপ ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু তার সঙ্গে কিছু শর্ত জুড়ে দেয়। তাদের ছেলে হবে বলে আশীর্বাদ করে। তারপর বেনে-বউকে সে কিছু উপদেশ দেয়। বলে-
তোমার স্বামীর পরতে হবে নীলরঙা এক জামা
কিনতে হবে একটি ঘোড়া, রঙ হবে তার নীল
ঘোড়ায় চড়ে ছুটতে হবে, নয় যে সহজ থামা-
সামনে যখন আরেক ঘোড়া- রঙে রঙে মিল-
থামবে তখন ঘোড়ার চলা, নামবে গভীর বনে
খুঁড়তে হবে গর্ত সেথায়, খুবই সংগোপনে।’
এটুকু বলে সন্ন্যাসী একটু থামে। মন দিয়ে শোনে বেনে-বউ। সন্ন্যাসী থামলে সে বলে, ‘তারপর কী হবে, সন্ন্যাসী ঠাকুর? গভীর বনে একা-একা সে কী করবে?’
সন্ন্যাসী বলে,
‘অত উতলা হচ্ছ কেন? সকল কথাই বলছি। গর্ত খুঁড়তে-খুঁড়তে সে একটা মন্দির দেখতে পাবে।’
‘কীসের মন্দির, কার মন্দির, সন্ন্যাসী ঠাকুর?’
‘সে কথাই তো বলছি। ওখানে আছে পার্বতী দেবীর মন্দির। মন্দিরে আছে পার্বতী দেবীর মূর্তি। তোমার স্বামী সেখানে গিয়ে পার্বতী দেবীকে প্রণাম করবে। তারপর তাঁর কাছে সন্তান চাইবে।’
‘ঠিক আছে, সন্ন্যাসী ঠাকুর। আমি আমার স্বামীকে আজকেই দেবীর কাছে পাঠাচ্ছি। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।’
বেনে-বউ বাড়ি গিয়ে স্বামীর কাছে সকল ঘটনা খুলে বলে। বেনে তখনই নীল জামা পরে, নীল ঘোড়ায় চড়ে জঙ্গলের দিকে রওয়ানা হয়। সঙ্গে কোদাল নিতে সে ভুল করে না।
যেতে-যেতে, যেতে-যেতে এক নীল ঘোড়ার সঙ্গে দেখা হয়। এই তো সেই নীল ঘোড়া! এখনই তো তার থামার সময়। এখানেই তো তার নামার জায়গা! সাত-পাঁচ ভেবে সময় নষ্ট না করে বেনে তখনই ঘোড়া থামিয়ে নেমে পড়ে। তারপর সেই গভীর জঙ্গলে বাড়ি থেকে আনা কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়তে থাকে। মাটি খুঁড়তে-খুঁড়তে একসময় এক মন্দির দেখা যায়। এই সেই পার্বতী মন্দির। পুরো মন্দিরই সোনা, হীরা ও মাণিক্য দিয়ে বানানো। বেনে তখন মন্দিরের ভেতর ঢুকে পড়ে। সেখানে সে পার্বতী মূর্তির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে গড় হয়ে প্রণাম করে। তারপর প্রার্থনার ভঙ্গিতে বলে-
‘আমার আছে ঘর-বাড়ি আর
গোরু-ঘোড়া-টাকা
কিন্তু আমার সোনার সংসার
লাগছে ফাঁকা-ফাঁকা!
মনে আমার দুঃখ অনেক
নাই কোনো সন্তান
আমি এখন তোমার কাছে
চাইছি কৃপা-দান।’
বেনের প্রার্থনায় দেবী সন্তুষ্ট হন। তিনি মূর্তির আবরণ থেকে বেরিয়ে আসেন। তারপর বলেন-
‘তোমার প্রার্থনায় আমি সন্তুষ্ট। তুমি কোন্ ছেলে নেবে? একটি ছেলে দিতে পারি, যে হবে সুস্থ ও সুন্দর কিন্তু বেশি দিন বাঁচবে না। অথবা আরেকটি ছেলে দিতে পারি, যে দীর্ঘদিন বাঁচবে, কিন্তু সে হবে অন্ধ।’
(চলবে)

Untitled Document
Total Visitor : 709022
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By : Life Yard