Untitled Document
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী

   
হজপিসের একটি রাত
-আবদুল্লাহ আল হারুন

সিসটার ইনগ্রিদ রাতের শিফটে কাজে এলেন। তার হাতে যথারীতি একটা বিরাট ঝুড়ি। তাতে মোটা মোজা, খবরের কাগজ, একটি গরম পুলোভার এবং উল দিয়ে বোনার সরঞ্জাম। আজ রাতে কি তার কিছু বোনার সময় হবে ? কেউ তা বলতে পারে না। গতবারের রাতের শিফটে, তার মনে হল, এত কিছু ঘটেছে যে তার এক মুহুর্ত বসারও অবকাশ মেলেনি।
হলঘরে বড় বড় গ্লাসে লম্বা সাদা মোমবাতি জ্বলছে। সিসটার ইনগ্রিদ জানেন আজ কেউ মারা গেছেন। এ সব মোমবাতি এজন্যই জ্বালানো হয়েছে। কে মারা গেছেন, মি: স্যামুয়েল না মিসেস ব্রয়ার ? গত কদিন ধরে দুজনেরি অবস্থার দারুন অবনতি হয়েছিল। দুজনের অমানুষিক কষ্ট দেখে সবাই মনে মনে প্রার্থনা করতো ঈশ্বর যেন এদের তাড়াতাড়িই তার কাছে ডেকে নেন।
না, মি: স্যামুয়েল নন। সিসটার ইনগ্রিদ কাজ বুঝে নেবার সময় বিকেলের নার্সের কাছে জানতে পারলেন। কিন্ত মিসেস ব্রয়ার আজ সকালে পরলোক গমন করেছেন। ”ঈশ্বরকে ধন্যবাদ”, বলল সিসটার এরিকা। ”শেষের কদিন বেচারী অনেক কষ্ট পেয়েছে। শ্বাসকষ্টে তার গলার অবিরাম উচ্চস্বরের মর্মান্তিক ঘড় ঘড়ানি শুনলে আমারই বুকটা কেঁপে উঠত। দেহে এ বীভৎস অত্যাচার তার অসহ্য হয়ে গিয়েছিল। হাঁ, তার মেয়ে শেষ সময়ে তার পাশে ছিল। গতকাল সন্ধ্যায় তাকে টেলিফোন করে ডেকে নিয়ে আসা হয়েছিল। বোঝা গিয়েছিল মিসেস ব্রয়ারের শেষ সময় এসে গিয়েছে। হয়ত রাতেই মারা যাবেন। কিন্ত আজ প্রত্যুষ পর্যন্ত বেচারী তার চরম কষ্টের শ্বাসটি নিয়েছে। তবে কি বলব, তার যাবার সময়টি ছিল খুবই মর্মস্পর্শী। একদম শেষ মুহুর্তে সে একদম শান্ত হয়ে যায়। গলায় আর কোন শব্দ ছিল না। চোখে মুখে স্বস্তির ছাপ। মনে হয় গত কদিনের ভয়াবহ ক্লেশের পর শেষ পর্যন্ত উত্তরনটি খুবই সহজ হয়েছিল তার জন্য। ঠোঁটের স্মিত হাসিটি সবাই দেখেছে।”
দুজনে মিলে অন্যান্য দরকারি তথ্যগুলি বিনিময় করলেন। রোগীদের কার্ডে রাতে কার জন্য বিশেষ কি করতে হবে সব নোট করে নেয়া হল। মিসেস হাইনরিসকে এখনই একটি কড়াডোজের মরফিন ইঞ্জেকশান দিতে হবে।
মি: স্যামুয়েল আজ বেশ ভালই আছেন। প্রাক্তন স্ত্রী ও তার দ্বিতীয় বিয়ের ছেলেটি তাকে আজ বিকেলে দেখতে এসেছিল। এমনকি উনি তাদের সাথে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলার মতও শক্তি ও ইচ্ছা আজ তার আবার হয়েছিল। যদিও গত কয়েকদিন তিনি কোন কথাই বলেননি। সর্বক্ষণ চুপচাপ থেকেছেন। তিনতালায় মিসেস স্মিথের অবস্থা মোটেও ভালো না। উনি আজ খুবই বিষণœœ এবং অস্থির। রাতে মাঝে মাঝে তাকে দেখে আসাটা ওর জন্য ভালো হবে। উনি ঘুমান খুবই কম। বেশীর ভাগ সময়েই তন্ময় হয়ে সরবে ভাবেন এবং নিজের সাথেই কথা বলেন। এমনও হতে পারে উনি তার দুশ্চিন্তা নিয়ে হয়ত কোন কথা নার্স ইনগ্রিদের সাথে বলতে চাইবেন।
”রান্নাঘরে এখনও আজকের মজাদার আপেল কেকের কিছু অংশ রয়ে গেছে। তোমার জন্য আমি তাজা কফিও মেশিনে তৈরী করে রেখেছি। যেটা তোমার পছন্দ !” একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে এটা বলে বিকেলের শিফটের নার্স এরিকা বিদায় নিল।
রাত দশটায় স্বেচ্ছাসেবিকা মার্লিস এল। সে আগেই বলে রেখেছিল আজরাতে সে ডিউটিরত নার্সকে সাহায্য করবে। সিসটার ইনগ্রিদ ও মার্লিস দুজনে একসাথে সবগুলি কক্ষে একটা চক্কর লাগালেন। প্রথম ঘরে মিসেস মায়ার গভীর ঘুমে মগ্ন। মিসেস ক্রাউস এখনও জেগে এবং আরেকবার বাথরুমে যেতে চাইলেন। ”ভাগ্য ভালো আজ আমরা দুজন”, ইনগ্রিদ বলল। মিসেস ক্রাউস নিজে থেকে হাঁটাচলা করতে পারেন না। দ্বিতীয়ঘরে মিসেস ফোগেল তার মাথার দিকে হেলানো বিছানায় খুবই আরামে বসে আছেন। উনি আরও কিছুক্ষণ টিভি দেখতে চাইলেন। কেমোথেরাপির জন্য তার সব চুলই পড়ে দেছে। কেশহীন মাথাটি তার চেহারায় একটা অন্যধরনের
সৌন্দর্য এনে দিয়েছে। দুকানে তার বড় একটি হেডফোন (টিভির কথা শোনার জন্য) এবং কানদুটি তার ন্যাড়া মাথায় মনে হয় কেউ আলাদাভাবে বসিয়ে দিয়েছে। বেশ কিছুদিন হল মার্লিস তাকে চেনে। সে জিজ্ঞেস করল, তার শ্বাসকষ্টের খবর কি ? ”হাঁ, একটু ভালো এখন।” মিসেস ফোগেল বললেন। তার ছোট্ট উত্তরে বোঝা গেল উনি এখন কথাবার্তা বলার মুডে নেই। টিভির ছবিটিতেই তার আকর্ষণ এখন বেশী। কাজেই দুজনে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে পেছনে দরজাটি আস্তে ভেজিয়ে দিল। তিন নম্বর কক্ষটি খালি। এখানে ছিলেন মিসেস ব্রয়ার যার আজ তিরোধান হয়েছে। উনি এখন নীচের তলায় হজপিস ভবনের মৃতদেহ রাখার হল ঘরে শুয়ে আছেন। মার্লিস বলল পরে সে একবার নীচে গিয়ে ওর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসবে।
যে ছোট কামরাটিতে অন্যদিকের দরজা দিয়ে সরাসরি বাগানে যাওয়া যায় সেই ঘরে মি: লুডভিগ শুয়ে আছেন।
সন্ধ্যার পরই বাইরে বাগানের সবুজ ঘাসে সম্পুর্ন নীরবতা নেমে আসে। হলঘরের দিকে তার কামরার দরজাটি প্রায় সময়ই পুরো খোলা থাকে। যাতে বাইরে থেকে সব সময় ভেতরে মি: লুডভিগের অবস্থা কেমন তা দেখা যায়। উনি কিছু চান কিনা। এ সব কারণে সব সময় দরজা খোলা ও বন্ধ করে তাকে রিবক্ত না করার জন্যই এই ব্যবস্থা।
মি: লুডভিগ বেশ কিছুদিন হল সারা দিনরাত কোন নড়া চড়াই করেন না। বিছানায় প্রায় নিস্পন্দ হয়ে পড়ে থাকেন। অনেকদিন হল উনি কোন কিছু খেতে আপত্তি করে আসছেন। কয়েকদিন হল পানিও আর পান করছেন না। উনি তার মৃত্যুর প্রতীক্ষায় আছেন। মৃত্যুপথটি বেশ দীর্ঘ, গতিও তার খুবই ধীর। কেউ জানে না কেন এত দেরী হচ্ছে ? তিনদিন আগে হঠাৎ তিনি চিৎ হয়ে দুটি হাত প্রার্থনার ইংগিতে আড়াআড়ি করে বুকে রেখে ঐ এক ভাবেই শুয়ে আছেন। তার এই বিষ্ময়কর ভঙ্গিটি সবাইকে একটু হতভম্ব করে দিয়েছে। কারন তিনি যে ঈশ্বর, ধর্ম, বা ’এই সব জিনিসে’ তেমন বিশ্বাস করেন না তা তার আসার পরে তার কথাবার্তা থেকে পরিষ্কার বোঝা যেত। তবে এখন প্রার্থনা করার ভঙ্গিতে কেন শেষ শয্যায় শুয়ে আছেন?
মাঝে মাঝে তাকে কেউ কেউ দেখতে আসত। তার বিছানার পাশে চুপচাপ বসে থাকত। সবাই কিছুক্ষণ থেকেই চাপা স্বরে একটা বিদায় সালাম দিয়ে বা হাতে সামান্য একটা চাপ দিয়ে চলে যেত। যেভাবে অনেক মৃত্যুপথযাত্রীর সঙ্গ দিয়ে আমাদের অনেক কিছু শেখা হয়, মি: লুডভিগের বেলায়ও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্ত তার কাছ থেকে আমরা বিশেষ একটা শিক্ষা পেলাম। মরন পথটি, মরতে পারা এবং শেষ বিদায়ের চরম ও পরম মুহুর্তটি যেমন রহস্যময় তেমনি দেহটির সাথে সাথে সব কিছু ত্যাগ করাটিও অপরিহার্য। কিন্ত সব কিছুই চির গোপনীয়তার আবরনে ঢাকা। একটি প্রহেলিকা যা এ পৃথিবী ছাড়িয়ে মহাশুন্যের অসীম পথে ধাবমান।

দু চক্ষু পুরো মেলে দিয়ে মি: স্যামুয়েল তার বিছানায় শুয়ে আছেন। দুজনে এসে তার ঘরে ঢুকার পর, ওকে এভাবে শুয়ে থাকতে দেখে একটু চমকেই গেল। তবে কি--? কিন্ত আজ উনি তো বেশ ভাল ছিলেন, এরিকা বলছিল। কিন্ত তাকে এখন দেখে তো মনে হচ্ছে না উনি কিছুটা ভালো আছেন ! তার নিশ্চল দেহটি আর বিস্ফোরিত দুটি চোখ দেখে মনে হচ্ছে তিনি আর এ ধরাধামে নেই।
পরে আমি ওর পাশে একটু বসব কি, জিজ্ঞেস করল মার্লিস। হাঁ, আমার মনে হয় এটাই এখন দরকার, কেউ ওর কাছে থাকুক, তার বরাবর ইচ্ছা একবারে একা না থেকে---, ইনগ্রিদ ইচ্ছা করেই তার বাক্যটি শেষ করল না। দুজনেই খুবই সাবধানে শব্দ না করে থেকে বিছানার পাশ থেকে বড় আরাম কেদারাটি উঠিয়ে ঘরের কোনায় নিয়ে রাখল। কিন্ত মি: স্যামুয়েল মোটেই নড়াচড়া করছেন না। তার দৃষ্টি এখনও অনেক অনেক দুরে !
দৃজনে মিলে আবার মিসেস রুষ্টারের বিছানা পারিপাটি করে দিলেন। উনাকে নতুন পাজামা পরিয়ে দিতে হল। যেটা পরা ছিল সেটা উনি ভিজিয়ে ফেলেছেন। নতুন আরেকটি পানির বোতলও তার বিছানার পাশের টেবিলে রাখা হল। “এখন আর রাতে আপনাদের বেল বাজিয়ে ডাকার দরকার নেই।” মিসেস রুষ্টার উভয়কে ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন। ”যখনি প্রয়োজন হবে, আপনি স্বাচ্ছন্দে বেল বাজাবেন। আমরা একজন আসব। সে জন্যই তো আমরা এখানে আছি।” এটা এবং শুভরাত্রি বলে দুজনে মিসেস রুষ্টারের কাছ থেকে বিদায় নিল। উনি এ পর্যন্ত রাতে বেশ ভালোই ঘুমাতে পারেন। আশা করা যায় আজ রাতটিও তার জন্য শান্তিপুর্ন হবে। সব ঘর দেখা হয়ে গেলে মার্লিস মি: স্যামুয়েলের ঘরে গেল তার কাছে থাকার জন্য।
রাত একটায় ইনগ্রিদ মি: স্যামুয়েলের ঘরে আবার গেল। খুবই সাবধানে এবং নি:শব্দে ঘরে ঢুকল। মার্লিস বিছানার পাশে বসে আছে। মার্লিস এবং ইনগ্রিদ দুজনেই খুবই মনোযোগ দিয়ে মি: স্যামুয়েলের নিশ্বাস প্রশ্বাস শুনলেন। এত ধীরে চলছে যে অভিজ্ঞ ইনগ্রিদের আর বুঝতে বাকি রইল না উনি মারা যাচ্ছেন। এরকম মৃত্যুকালীন ধীরলয়ের শ্বাস প্রশ্বাস সে তার কুড়ি বছর ধরে হজপিসে মৃত্যু-সঙ্গ দেবার সময় বহুবার শুনেছে। এ ছাড়া তার একটা সহজাত বোধও হয়ে গেছে, মৃত্যুমুহুর্তটি কখন আসছে ! মি: স্যামুয়েলের সারা শরীরেও পরিবর্তন এসে গেছে। এবং খুবই বিষ্ময়ের ব্যাপার (অস্বাভাবিকও), মধ্যরাতের দিকে তিনি তার দুটি হাতই আড়াআড়ি করে বুকের উপর রেখেছেন। মরার পরই এভাবে দু হাত বুকে ক্রস করে রাখা হয়। মার্লিস বলল, দুটি হাত বুকে রাখাটাই তার এ পর্যন্ত দেহের একমাত্র নড়াচড়া !
চল, এখন সামান্য একটা কিছু খাওয়া যাক। চায়ের তেষ্টাও পেয়েছে। বলল ইনগ্রিদ। মার্লিস বেশ খুশী হয়ে ইনগ্রিদের সাথে রান্নাঘরে এল। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে পিঠ ব্যথা হয়ে যায়। ”এটা একটা সহজ কাজ নয়, চুপচাপ শুধু বসে থাকা। তোমার কি মনে হয়, এটা কি ঠিক হবে, আমি যদি কিছুক্ষন মি: স্যামুয়েলকে অল্পক্ষনের জন্য একা রেখে যাই ? কিছুক্ষণ অন্য একটা কিছু করতে পারলে আমারও ভালো লাগবে।” বলল মার্লিস। ’হাঁ, কোন অসুবিধা নেই।’ ইনগ্রিদ বলল। ’আমরা দরজাটি পুরো খুলে রাখি। তাহলে আমরা শুনতে পাব এর মধ্যে যদি একটা কিছু হয়।’
রান্নাঘরে দুজনে একটু আরাম করে বসে কেক আর চা খেলেন। কিছু কথাবার্তাও বললেন নিজেদের মধ্যে। মিনিটি বিশেক পরে মার্লিস আবার যখন মি: স্যামুয়েলের ঘরে গেল, তার দেহে একটা স্পষ্ট পরিবর্তন সে লক্ষ্য
করল। উনি আর কোন নি:শ্বাস নিচ্ছেন না। মি: স্যামুয়েল পরলোক গমন করেছেন। ’হা, ঈশ্বর, আমার ওকে একলা রেখে চলে যাওয়াটা মোটেই উচিৎ হয়নি।’ মার্লিসের কন্ঠে আত্বসমালোচনার স্বর।
ইনগ্রিদ তাকে সান্তনা দিল। ’জানো তুমি, এরকম অভিজ্ঞতা আমার বহুবার হয়েছে। অনেক সময এটা মনে হয় কোন কোন মৃত্যুপথযাত্রী তার শেষ সময়ে একাকি হবার জন্য অপেক্ষা করে। এবং সত্যি সত্যি তারা তখনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন যখন তার শয্যাপার্শ্বের একমাত্র সঙ্গীটি কিছুক্ষণের জন্য কোন কারণে বাইরে যায়।’
আজ রাতে ইনগ্রিদের আরও অনেক কিছু করার আছে। মি: স্যামুয়েলের মেয়েকে এত রাতে টেলিফোন করে তাকে দু:সংবাদটি দেবার কষ্টকর ব্যাপারটি তাকেই এখন সারতে হবে ! অনেক সময় আত্বীয়স্বজনরা আলাদা করে আগে থেকে বলেন, ’গভীর রাতে খবর দেবার দরকার নেই।’ তাহলে পরদিন সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করাটাই নিয়ম। তবে এদের সংখ্যা খুবই কম এবং প্রায়ই এরা দূর সম্পর্কের আত্বীয়। কিন্ত স্যামুয়েলের কন্যার অনুরোধ ছিল যত রাতই হোক তাকে মৃত্যুসংবাদটি দিতে। সকাল ছটায় মার্লিস গাড়ীতে চেপে বাড়ী যাবার আগে বলল, ’আ: আমার মনে হচ্ছে এ রাতটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ছিল। তবুও স্বল্প সময়ে কত কিছু ঘটে গেল !’

নভেম্বর ২০০৯-১২-০৯

Untitled Document
Total Visitor : 709208
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By : Life Yard