Untitled Document
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী

Download These Files
একজন রঘুদার কথা
-পংকজ শুভ্র


১৯৯৫ সালের কথা। জেলা শহর নওগাঁর নির্জন সন্ধ্যায় চারণ শিল্পী গোষ্ঠীর আধাপাকা ঘরে কজনে মিলে গানের আড্ডায় মত্ত। রঘুদা তখনো আসেনি। কিছুক্ষণ পরে বাইরে অন্ধকারে কিসের যেন আলো চোখে পড়লো। রঘুদা সিগারেটে শেষ টান দিযে নিচ্ছেন। আসরে আসার পর একবেলোর ভাঙা হারমনিটা টেনে নিয়ে শুরু করলেন তার লেখা ও সুর করা নতুন গান। গানটির স্থায়ী শেষ করার পর হঠাৎ উচ্চস্বরে ও সুরে বলে উঠলেন রঘুদা,
“আমি মুক্ত বাজার,আমি বিশ্বায়ন, আমি ই মেইল, আমি ক্রেডিট কার্ড; তোরা শুধু কিনবি, আমি নেব তেল গ্যাস, আকাশ মাটিতে আমার থাবা, আমি পুঁজি আমি মুনাফা।”
এই আমাদের রঘুদা। রাজধানীর আধুনিক জীবনের তথাকাথত শিক্ষিত, সচেতন মানুষগুলো যখন জানে না ইন্টারনেট কি, ক্রেডিট কার্ড কি তখন চিরআধুনিক রঘুদার গানে ঝরে পড়েছে এর প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ। তার এই ঘৃণা বিদ্বেষ ছিল সকল অনিয়মের কেন্দ্রবিন্দুতে। তিনি যখন পশ্চিমা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বলেছেন, তেমনি রাষ্ট্রীয় সুশাসনের জন্য বলেছেন, আবার তিনিই চেয়েছেন প্রতিটি শষ্য দানার সমবন্টন। আজ অপরিকল্পিত নগরায়নের কুফল মানুষ পেতে শুরু করেছে। দূরদর্শী মানুষটি সেদিন এর বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেনÑ
“পড়বে ধ্বসে দাম্ভিক প্রাসাদ, হবে সবুজের আবাদ।”
গ্রামীণ সহজ সরল মানুষদের সতর্ক করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের ছাত্রটি গেয়েছিলেন,“জাগরে জাগ অতীত এ মাটির ভিত/ গ্রাম থেকে ফেলো না পা বাইরে।”
ব্যবসা সূত্রে অত্যন্ত কাছ থেকে দেখা ধানের দেশের মানুষের ক্ষুধার্ত মুখগুলো তার ভিতরে আগুন জ্বালিয়েছিল। যে সবার মুখে অন্ন তুলে দেয় সে কেন অভুক্ত? কারণ,
“কালো অজগরের পিঠে বোঝায় করে/ নিয়ে যাচ্ছে শষ্য স্বপ্ন গ্রাম ভেঙে চুরে।”
এখানে কালো অজগর পিচঢালা নগরমুখী রাস্তার প্রতীক। এমন অৎস্র প্রতিবাদ শক্তিশালী শব্দ ও সুরের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে রতন সাহা রঘুর গানে। তার রচিত পাঁচ শতাধিক গান শুধু দেশের কথা বলে, মানুষের কথা বলে, সংগ্রামের কথা বলে, শান্তির কথা বলে। তার প্রেমের গানগুলিতে এর প্রতিফলন স্পষ্ট। সেখানে উপমা, উৎপ্রেক্ষা আসে বাংলার ফসলী জমি থেকে; প্রেমিকার হাসি মিশে যায় ফসল ঘরে তোলা নির্মল হাসির সাথে।
আসলে রঘুদা এমনই। যাভাবেন তাই করেন। মেকী কোন কিছুই জানেন না। বানিয়ে বানিয়ে সুন্দর কথা দিযে পংক্তি সাজাতে পারেন না। রাষ্ট্রযন্ত্রকে খুশি রাখার মতো চিত্রকল্প সাজাতে পারেন না। তাই তিনি রবীন্দ্র স্মৃতিধন্য নওগাঁর একজন অখ্যাত গীতিকার সুরকার। তবে এতে তার কোন আক্ষেপ নাই। থাকবার কথাও নয়। কারণ তিনি লেখেন মাটির ঋণ শোধ করবার জন্য। যে মাটির পরে কবিগুরু মাথা ঠেকাতে চেয়েছেন। রতন সাহা সে মাটিরই সন্তান। মাটির বুকে লাঙলের ফলা দিয়ে তিনি লিখে যেতে চান জীবনের জয়গান। এই মাটি থেকেই জন্ম নেয় তার কথা ও সুর। সবুজের উত্তাল ঢেউ দেখে তিনি খুশিতে আত্মহারা। গেয়ে ওঠেন,
“মা তোর চাষী ছেলের কাণ্ড দেখে মুন্ডু ঘুরে যায়।”
শিল্পীর গণসংগীতের প্রতি বিশেষ দুর্বলতা ছিল। তিনি ছিলেন গণমানুষের শিল্পী। সমমনাদের সঙ্গে নিয়ে ১৯৮৬ সালে একক উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করলেন,“চারণ শিল্পী গোষ্ঠী”। তার রচিত লড়ায়ের গান, সাম্য শান্তির গান সে সংগঠনের শিল্পীরা আজও গেয়ে বেড়ায়। দুঃখজনক হলেও সত্য এ পর্যন্ত তার মাত্র তিনটি গানের এ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। জি সিরিজ (অগ্নিবীণা) থেকে প্রকাশিত তার এ্যালবামে কন্ঠ দিয়েছেন যথাক্রমে সুবীর নন্দী (এমন কিছু দুঃখ আছে), সমবেত (দেশজনতা) এবং স্বর্ণময়ী (নীল নীল নীলিমায়)। অসংখ্য ভাল গান এখন শুধু পান্ডুলিপির শুষ্ক পাতায় লিপিবদ্ধ আছে। আর কিছু জমা আছে কষ্ট ভরা রঘুদার বুকের ভিতরে। যে বুকে এখনো বিশ্বাস আছে। একদিন ক্ষমতার সংবিধান মুছে সমতার সংবিধান রচিত হবে এদেশে। উঠোন জুড়ে বসবে গানের মেলা, খুলবে আদমজীর তালা। বিশ্বায়নের ফেরে বেকার হবে না যুবকের হাত। ঋণে জর্জরিত হবে না গ্রামের সরল মানুষ। সে পর্যন্ত তার শব্দ সুরের সংগ্রাম চলতেই থাকবেÑ
যতদিন না উঠবে ধান কৃষকের উঠোনে
যতদিন না জাগবে প্রাণ মরুময় জীবনে
যতদিন না ডাকবে বান শোষণের হবে অবসান
আমি গাইবো লড়ায়ের গান।”

রতন সাহা রঘুর দুটি গান
এক
ইতিহাস কথা কয়, কথা কয় ইতিহাস, ইতিহাস কথা কয়।
যুগে যুগে মোরা মুক্তি শান্তিতে বিশ্বের বিষ্ময়।
অৎস্র আলো জ্বেলেছি আমরা হিংস্র রাতের বুকে
স্বাধীনতা সাম্য চেয়েছি আমরা ইতিহাসের বাধার মুখে
তবু মোরা হারিনি এসেছে ফিরিঙ্গি ইংরেজ পর্তুগীজ
বাঁশের কেল্লা থেকে শহীদ মিনার ছড়াও বিশ্বময়।

দুই
সাগরের বুকে ঢেউ থেমে যায় নি এখনো পাখিরা গান গায়,
এখনো সবার বুকে ওঠে স্পন্দন,
গানে গানে তাই মোরা আশার দীপালি জ্বেলে যায়
মানুষের দিবানিশি ক্রন্দন মুছাতে বুকে ওঠে স্পন্দন।
এখনো মাটির বুকে লাঙলের ফলা লেখে আগামী ফসলের কাব্য প্রবল
বন্যা ঝড়ে রিক্ত কৃষাণ তবু মানতে চাই না কোন ভবিতব্য,
সেই আশা নদীর মোরা দুক’ল হয়ে সুরে সুরে ভরবো এ মহাজীবন।
ছিড়েছে বীনার তার ভয় কি বন্ধু তুমি বাঁধ না নতুন করে আবার।
জীবনের সংগ্রাম যাবে না বৃথা, ঘাম সংগীত সাথী তাই এগিয়ে চলার
সেই চলার ছন্দে বাধো সময়ের সুর , গানে গানে জাগাবো মোদের ভুবন।



Untitled Document
Total Visitor : 709969
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By : Life Yard