Untitled Document
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী

 
বর্ণ বিচিত্রা - তৃতীয় পর্ব
কাঁটাল
-শ্রীপ্রভাত রঞ্জন সরকার
কাঁটাল ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি নাম করা ফল। শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত ‘কণ্টকীফলম্’ থেকে অর্থাৎ যে ফলের গায়ে কাঁটা আছে। ‘ফল’ শব্দের ‘ল’ অন্তস্থ ‘ল’। তাই স্বাভাবিক নিয়মে কাঁটাল-এর অন্তস্থ ‘ল’ হওয়া উচিত কিন্তু আসলে তা নয়। উত্তর ভারতের সব কয়টি ভাষাতেই একে আদি ‘ল’-এর মত উচ্চারণ করা হয়। তাই লেখবার সময় আদি ‘ল’ দিয়ে লেখাই সঙ্গত। যা সংস্কৃত তৎসম নয় ও যার উচ্চারণও আদি ‘ল’-এর মত তাকে জোর করে অন্তস্থ ‘ল’ ব্যবহার করতে যাব কেন? তবে অনেকে ভুল করে কাঁটালকে ‘কাঁঠাল’ লেখেন। বাংলা ভাষায় এই ভুল বাবান ‘কাঁঠাল’ লেখবার প্রথা অনেক দিনের। পুরোনো বাঙলা হিয়ালীতে আছে-
কাঁসারির সারি’ ছাড়া পাঁঠার ছাড়া ‘পা’।
লবঙ্গের ‘বঙ্গ’ ছাড়া কিনে আন্গে তা।।
এখানে উত্তরটা হয়ে দাঁড়ায় কাঁঠাল। একটু আগে বললুম এই বানানটা ভুল। ‘কণ্টক’ শব্দ থেকে ‘কাঁটা’ শব্দ এসেছে। তাই ‘কাঁঠালে’ ‘ঠ’ আসবে কোন সপ্তলোকের সুদূর মহাকাশ থেকে? ‘কাঁটাল’-কে অসমীয়া ভাষায় বলা হয় কটাল/কঠাল। হিন্দীতে ‘কটহল্’। কাঁটাল বলতে কাঁচা ও পাকা (এঁচোড় ও পাকা কাঁটাল) দুইকেই বোঝায়। কিন্তু সংস্কৃত ‘পনস্’ মানে পাকা কাঁটাল। ওড়িয়া, মারাঠী ও মধ্যপ্রদেশের কোন কোন অংশে কাঁটালকে ‘পনস্’ বলা হয়ে থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রায় ৪৭ প্রজাতির* কাঁটাল পাওয়া যায়।
কাঁটাল ঠাণ্ডা সহ্য করতে পারে না। কিন্তু গ্রীষ্মপ্রধান দেশে উর্বর জমিতে তো বটেই, কিছুটা অনুর্বর জমিতেও কাঁটাল ভালই জন্মায়। ত্রিপুরায় ও পশ্চিম রাঢ়ের অর্দ্ধ পার্বত্য ভূমিতে যেমন কাঁটাল প্রচুর জন্মায় ঠিক তেমনি আসাম, উত্তর বাঙলা, নদীয়া, বর্দ্ধমানের উর্বর সমতল ভূমিতেও কাঁটালের প্রাচুর্য। কাঁটাল মাটির বিচার বড় একটা করে না। কাঁটাল একটি পুষ্ঠিকর খাদ্য। তবে কিছুটা দুষ্পাচ্য। কাঁটালের আরো একটি বৈশিষ্ট্য হল এই যে ‘নাগলিঙ্গম’ গাছের মত কাঁটাল গাছেও শিকড়ে, কাণ্ডে, শাখায়, উপশাখায় ফল ধরে। প্রাচীন অষ্ট্রিক বাংলায় বড় ফুলকে বলা হত ‘ মোচা’ (কলার ফুল বড়, তাই তাকে মোচা বলা হয়) আর ছোট ফুলকে বলা হত ‘মুচি’। নারকোলের ফুলের মত কাঁটাল ফুলকেও বাংলায় মুচি বলা হয়। কাঁচা কাঁটাল (যাকে বাংলায় এঁচোড় বলা হয়) গুণগত বিচারে মাংসের সমান; অথচ মাংসের তামসিক দোষ এতে নেই। বাঙলার অনেক মানুষ তাই কাঁচা কাঁটালকে ‘গাছপাঁঠা’ বলে থাকেন।
কাঁটাল গাছ আমগাছের তুলনায় কিছুটা ছোট হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সকল দেশেই প্রচুর পরিমাণে কাঁটাল জন্মায় ও তা জন্মায় বিভিন্ন প্রজাতির। মালয় বর্গীয় ভাষাগুলিতে ও ফিলিপিন্স্-এ কাঁটালকে ‘লঙ্কা’ বলা হয়। লঙ্কার অজস্র গুণের কথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অধিকাংশ লোকই জানেন। একটু চেষ্টা করলে কাঁটাল থেকে উন্নত মানের অ্যালকোহল্ পাওয়া যেতে পারে যা ঔষধ শিল্পে কাজে লাগবে। কাঁটালের বীজ আলুর চেয়েও অনেক বেশী পুষ্টিকর ও সুস্বাদু। ভারতে আলু আসবার আগে পর্যন্ত ভারতের মানুষ কাঁটাল বীজই মুখ্য তরকারী রূপে ব্যবহার করত। এখনও খাদ্য হিসেবে কাঁটাল বীজের ব্যবহার আছে। সাধারণত ইংরেজীতে কাঁটালকে বলা হয় ‘জ্যাক্ফ্রুট’।
কাঁটালের সঙ্গে নিকট সম্পর্কযুক্ত কিন্তু ভিন্ন গোত্রীয় গাছ হচ্ছে ‘রুটিফল’ যার সংস্কৃতি নাম ‘পনসিকা’। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফল। তবে শ্রীলঙ্কা ও কেরলেও যথেষ্ট পরিমাণে জন্মায়। এই ‘রুটিফল’ বা পনসিকাও কাঁচায় এঁচোড়ের মত তরকারী রেঁধে ও পাকায় ফল হিসেবে খাওয়া হয়। ‘রুটিফল’ কাঁটালের চেয়ে বেশী পুষ্টিকর ও সুস্বাদু হলেও পাকা অবস্থায় ফলটি অত্যন্ত দুর্গন্ধযুক্ত। তাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লোকেরা মজা করে বলে থাকেন যে নাক বন্ধ করে যদি ‘রুটিফল’ খাই মনে হবে স্বর্গে আছি আর নাক খুলে যদি রুটিফল খাই মনে হবে নরকের মাঝখানটিতে বসে আছি। রুটিফলকে ইংরেজীতে ‘ব্রেড ফ্রুট’ বলা হয়।
ভারতে মোটামুটি বিচারে খাজা (যার কোয়াগুলি কিছুটা র্ঝঝরে), নেয়ো বা গলা (যার কোয়াগুলি নরম ও অত্যন্ত রসযুক্ত), মিশেল (যা আংশিক খাজা, আংশিক নেয়ো), পদ্মরাজ, লাল কাঁটাল, বারমেসে কাঁটাল, শীতের কাঁটাল, ধুমো কাঁটাল, প্রভৃতি অনেকগুলি শ্রেণী দেখতে পাওয়া যায়। গুণগত বিচারে মোটামুটিভাবে সব কাঁটালই প্রায় এক। রুটিফলের পাতার সঙ্গে কাঁটালের পাতার লেশমাত্র মিল নেই। রুটিফলের পাতা অতিবৃহৎ ও দেখতে কতকটা রেড়ী পাতার মত। ক্ষণার বচনে বলা হয়েছে-
“আঘনে যদি না হয় বৃষ্টি।
তবে না হয় কাঁটালের সৃষ্টি।।”
কথাটা হয়তো ক্ষণার সময় ঠিকই ছিল। কিন্তু আজকাল অঘ্রাণে বৃষ্টি হোক বা না হোক, কাঁটাল ঠিকই ফলে। একটু আগেই বলছিলুম যে কাঁটাল গাছ আম গাছের চেয়ে কিছুটা ছোট হয়। বাংলা মাপের এক বিঘা (বাঙলায় তিন বিঘা সাড়ে পাঁচ কাঠায় এক একর) জমিতে যেখানে ১৬টি বড় জাতের আমগাছ লাগানো যায় সেখানে কাঁটাল লাগানো যায় ১৮টির মত। তবে হ্যাঁ, মেঘলণ্ঠন প্রজাতির আমগাছ ২০ টির মতও লাগানো যেতে পারে।

* লেখকের বাগানে এই গাছগুলো আছে।

(চলবে)

Untitled Document
Total Visitor : 708594
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By : Life Yard