Untitled Document
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী


লক্ষ্মীসরা বা আচার্যসরা বা গনকাসরা
বাংলাদেশের লোক শিল্পকলা
-নিসার হোসেন
এ অঞ্চলের প্রাচীনতম বসবাসকারী মানুষের আঁকা চিত্রকলার যেসব নিদর্শন পাওয়া গেছে তা পণ্ডিতদের মতে ৩ হাজার বছরের বেশী পুরোনো নয়। এর আগের কোন নিদর্শন পাওয়া না গেলেও আমাদের বর্তমান সময়ের লোকশিল্পের মধ্যেই এখনও পর্যন্ত এমন কিছু উপাদান টিকে আছে ( বিশেষ করে ব্রতের আলপনায়), যার মধ্যে প্রাগৈহাসিক যুগের শিল্পকলার ধারাবাহিকতার প্রমাণ মেলে। বংশপরম্পরায় পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে চর্চিত হওয়ার কারণেই এই টিকে থাকা। (এর উপাদান খুবই ক্ষণস্থায়ী এবং অধিকাংশ লোকশিল্প “কোন গার্হস্থ্য উৎসবের পরই চিরকালের জন্য পরিত্যাগ করা হয়।”)

লোকশিল্পগুলো সম্পূর্ণভাবেই লোকজীবন ও আচার-বিশ্বাসের সাথে গভীরভাবে যুক্ত বিধায় ঔপনিবেশিক যুগের নতুন প্রেক্ষাপটে এই শিল্পের বিনাশ অবশ্যম্ভাবী ধরে নিয়ে ১৯ শতক থেকেই শিক্ষিত বাঙালীদের কেউ কেউ এ শিল্পকে সংরক্ষণের জন্য কী করা যায়, তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। এরপর উপনিবেশ বিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠবার সাথে সাথে তাঁদের তৎপরতাও বৃদ্ধি পায় এবং সমাজের উচ্চতম স্তরের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও কেউ কেউ দিনের পর দিন পাড়া গাঁয়ের নীচু স্তরের, নীচু বর্ণের মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে লোকশিল্পের নমুনা সংগ্রহ করেন। এ ধরণের উদ্যোগ থেকেই ১৯৩১-৩২ সালের মধ্যে বাংলার লোকশিল্পের সংগ্রহ নিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন ও যাদুঘর গড়ে উঠতে দেখি। তবে অত্যন্ত মহৎ এইসব আয়োজনের মূল লক্ষ্যই যে লোকজীবন বিচ্ছিন্ন নাগরিক সমাজের মধ্যে ঐতিহ্য বোধ জাগিয়ে তোলা তা ঐ সময়ের বিভিন্ন লেখালেখি থেকে জানা যায়। এভাবেই পাশ্চাত্যের শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রভাবে সাহেব হয়ে যেতে থাকা বাঙালীদের জন্য সাহেবী পন্থাতেই লোক ঐতিহ্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল।

    

শখের হাঁড়ি
বাংলার প্রাচীনতম চিত্র নিদর্শন:
অজয় নদী তীরবর্তী সর্পাহারী বক (কালোর ওপর সাদা)
তুলনা হচেছ রাজশাহীর শখের হাঁড়ি -তে পাখির মুখে সাপ

সর্পাহারী বক



দেশ ভাগের পর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ঢাকায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত আর্টস্কুলে ১৯৫৫ ও ১৯৫৮ সালে দু’বার লোকশিল্পের প্রদর্শনী আয়োজন করেছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি আর্টস্কুলের অভ্যন্তরেই একটি লোকশিল্পের সংগ্রহশালা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি যাদেরকে ইউরোপ আমেরিকায় পাঠিয়ে পাশ্চাত্যের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে এনে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন তাদেরই অসহযোগিতার কারণে সেই উদ্যোগটি থেমে যায়। একদিকে আধুনিকতাকে বরণ করে নেওয়া অন্যদিকে ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা, এই দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ জয়নুলের আঁকা এ সময়ের চিত্রকর্মেও লক্ষ্য করা যায়।

তবে ৭০ এর দশকে জয়নুলকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম এক উদ্যোগ নিতে দেখা যায়। এ সময় তিনি সোনার গাঁ-এ একই সঙ্গে লোকশিল্পের সংগ্রহশালা এবং লোকশিল্পীদের পল্ল¬ী গড়ে তুলতে শুরু করেন। অর্থাৎ তিনি উপলদ্ধি করেছিলেন যে শুধুমাত্র যাদুঘরে সংরক্ষণ করে লোকশিল্পকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। তবে লোকশিল্পী যে শুধুমাত্র আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায়, জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, উচ্চ মার্গের শিল্পীদের মতো টিকে থাকতে পারে না, এই সত্যটি তখনো পর্যন্ত জয়নুলের পক্ষে উপলদ্ধি করা সম্ভব হয়নি।

জয়নুলের সহকর্মী এবং গুরুসদয় দত্তের বহুল আলোচিত ব্রতচারী আন্দোলনের কর্মী শিল্পী কামরুল হাসানও ১৯৬০ সালে আর্টস্কুলের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ডিজাইন সেন্টার নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যেখানে লোক শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা করার জন্যও কিছু পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। ১৯৭০-৮০’র দশকে এই প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় আয়োজিত লোকশিল্পের মেলাগুলো শহুরে শিক্ষিত মানুষদেরকে এই শিল্পের প্রতি বিশেষ আগ্রহী করে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। তাদের পাশাপাশি বাংলা একাডেমিও মাঝে মাঝে লোক-উৎসব-অনুষ্ঠান আয়োজনের সাথে সাথে লোকশিল্পের মেলা আয়োজন করে একইভাবে ঢাকা শহরবাসীদেরকে মাঝে মাঝে তাদের ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। গত শতাব্দির ৭০ দশক থেকে এ পর্যন্ত যে অসংখ্য লোকশিল্প মেলা আয়োজিত হলো তা আমাদের লোকশিল্পকে কিভাবে উপকৃত করেছে জানি না, তবে এইসব মেলার মধ্য দিয়েই আমরা এই সংবাদটি নিয়মিতভাবে পেয়েছি যে, আমাদের লোকশিল্পের অনেক কিছুই ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে লুপ্ত হয়ে যাওয়া এই প্রক্রিয়াটি মন্থর এবং বলা যায় স্বাভাবিক। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষের বা সমাজের হস্তক্ষেপও দায়ী। যেমন কাঁথার ঐতিহ্যটিকে পুনর্জাগরিত করার নামে তথাকথিত সমাজ সেবক সাজা এলিটরা যেভাবে পয়সা উপার্র্জনের লক্ষ্যে এই শিল্পকে সম্পূর্ণ বিকৃত ও ধ্বংস করে দিল তা নজিরবিহীন এক দৃষ্টান্ত। আর এ কথা সত্যও যে, ধর্ম ও সমাজই ধ্বংস করেছিল আমাদের পটচিত্রকলার সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে। বাংলার সবচেয়ে দক্ষ এই চিত্রকর সম্প্রদায় হিন্দু-মুসলিম উভয় সমাজেই নিন্দিত-নিগৃহিত হতে হতে শেষ পর্যন্ত পেটের দায়ে এবং মান সম্মান ফিরে পেতে ধীরে ধীরে অন্য পেশায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। পটুয়াদের প্রতি সমাজের এই আচরণের কারণ অনুসন্ধান করে পণ্ডিতরা নানা ধরণের মতামত দিয়েছেন। এই অঞ্চলে বর্ণ হিন্দুদের মধ্যে যে কয়টি শিল্প সম্পৃক্ত পেশাজীবী সম্প্রদায় রয়েছে তার মধ্যে চিত্রকর হিসেবে স্বতন্ত্র কোনো সম্প্রদায় না থাকলেও পণ্ডিতদের ধারণা যে, এক সময় তারা বেশ সম্মানের সাথে বর্ণ হিন্দু সমাজে অন্তর্ভুক্ত ছিল। বহ্মবৈবর্ত পুরাণে বলা হয়েছে যে, ‘‘ঐতিহ্য বিরোধী চিত্রাঙ্কনের কারণে কুপিত ব্রাহ্মণদের অভিশাপে চিত্রকরগণ সদ্য সমাজচ্যুত।” কি সেই ঐতিহ্য বিরোধী কাজ যে সম্বন্ধে তেমন কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাইনি। তবে বাংলাদেশে একমাত্র পটচিত্রকর সম্প্রদায় হিসেবে যারা বহুকাল আগে থেকে পরিচিত সেই আচার্য সম্প্রদায় যে একসময় নিয়মিত মুসলিমদের জন্যে গাজীর পটও আঁকতো সে সম্বন্ধে নিশ্চিত তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। কেউ কেউ মনে করেন যে পটচিত্রকে বৌদ্ধরা যেভাবে ধর্মকাহিনী প্রচারে কাজে লাগিয়েছিল বাংলায় ইসলাম ধর্ম সম্প্রসারিত হওয়ার শুরুর দিকে মুসলমানরাও সেভাবেই মুসলমান পয়গম্বর ও বীরদের নানা কাহিনী প্রচার করতে শুরু করে। এই তৎপরতা হয়তোবা বহ্মবৈবর্ত পুরাণ রচতি হওয়ার কালেই দেখা দিয়েছিল (ত্রয়োদশ শতাব্দির শুরুর দিকে)। গুরুসদয় দত্তও পটুয়াদের কাছ থেকে তাদের সমাজচ্যুত হওয়ার একটি কাহিনী সংগ্রহ করেছিলেন। কাহিনীটি হচ্ছে, পটুয়াদের কেউ একজন অতীত কালে কোনো একদিন মহাদেবের অনুমতি না নিয়েই চিত্রাংকন শুরু করেন। এমন সময় মহাদেব চলে এলে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ঐ পটুয়া তার তুলিটি মুখের ভেতর লুকিয়ে ফেলে। মুখে পুরে তুলিকে এঁটো এবং অপবিত্র করে ফেলার জন্য মহাদেব তাকে অভিশাপ দিলে, সে সমাজের নিচু জাতের নিন্দনীয় মানুষ হয়ে যায়। এই কাহিনীটি বাহ্যত কল্পকাহিনী মনে হলেও সম্ভবত এই বয়ানের মধ্যে মূল সত্যটিও সংরক্ষিত হয়ে আছে। তুলি মুখে লুকানো, এঁটো করে ফেলা ইত্যাদি থেকে অনুমান করা কঠিন নয় যে চিত্রকরেরা গোপনে শাস্ত্র বিরোধী ছবি আঁকতে বাধ্য হয়েছিল স্রেফ পেটের দায়ে; এই স্বীকারোক্তিটিই রূপক ভাবে এই গল্পের মধ্যে বর্ণিত হয়েছে।

   মেলা

এক সময় ময়মনসিংহ এবং ফরিদপুর অঞ্চলের আচার্যরা পট আঁকার পাশাপাশি প্রায় সব ধরণের চিত্রাংকনের কাজই করতো। মন্ডপে দেবদেবীর মূর্তি তৈরি করার পর আচার্যদের দিয়েই রং এর কাজটি করিয়ে নেয়া হতো। কোনো কোনো পন্ডিত মনে করেন চিত্রকররা সমাজচ্যুত হলে এই শূন্যতা পূরণ করতে গিয়েই কুম্ভকার সম্প্রদায় নিজেরাই চিত্রাংকনের কাজ হাতে তুলে নেয়। এই ধারণা অমূলক নয় এই কারণে যে আচার্য বা পটুয়াদের মতো কুম্ভকারদের গোটা সম্প্রদায়ের মধ্যে চিত্রাঙ্কনের দক্ষতা দেখা যায় না। কুম্ভকারদের তৈরি করা এমন ধরণের লক্ষ্মীসরা এখনও দেখতে পাওয়া যায় যেগুলো আচার্যসরা নামে পরিচিত এবং সবচেয়ে দামী। সম্ভবত এই আচার্যসরা-ই আচার্যদের শাস্ত্রসম্মত কাজের একমাত্র প্রাচীন নমুনা, যা কুম্ভকারদের মাধ্যমে টিকে আছে স্রেফ ধর্ম সম্পৃক্ততার কারণেই। এ কথাও অনস্বীকার্য যে শুধুমাত্র ধর্ম সম্পৃক্ততার কারণেই আমাদের লোক চিত্রের অনেক প্রাচীন নিদর্শন এখনও অবিকৃতভাবে টিকে আছে যার মধ্যে অন্যতম হল কুম্ভকারদের লক্ষ্মীসরা এবং মনসাঘট আর মালাকারদের করন্তি চিত্র। এর বাইরে একমাত্র রাজশাহী অঞ্চলের শখের হাঁড়ি ছাড়া ধর্ম সম্পৃক্ততাহীন অন্যান্য লোকচিত্রের অস্তিত্ব বাংলাদেশে নেই বললেই চলে। তবু যেটুকু যেভাবে টিকে আছে তা নিয়ে নানা দৃষ্টিকোন থেকে দেখার এবং নতুনভাবে বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ণ করার যথেষ্ট সুযোগ এখনও রয়েছে বিধায় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বৃত্তির বন্দোবস্ত করে তরুণদেরকে মাঠ পর্যায়ে কাজ করার জন্য উৎসাহিত করলে দেশ-জাতি এবং পৃথিবীর তাবৎ মানুষ উপকৃত হবে।

আলোকচিত্র:
নিসার হোসেন


সোলার ঊপর আঁকা মনসা

লক্ষ্মীসরা বা আচার্যসরা বা গনকাসরা

Untitled Document
Total Visitor : 709025
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By : Life Yard