Untitled Document
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
নেড়ুদা ও হিড়িম্বা
-রজত শুভ্র বন্দোপাধ্যায়
নেড়ুদাকে সহপাঠী হিসেবে পেয়ে আমরা বেজায় খুশী হলুম, আবার একটু কিরকম যেন লাগতো, এমন মানুষ তো দেখিনি আগে! যেমন ধর মধু আন্টির ঘটনা। মধু আন্টি ছিলেন বেজায় মেজাজী, যখন তখন রেগে যেতেন, আর রেগে গেলেই বলে উঠতেন, “আআআহ! কান ধরে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে যাব হেড্‌ স্যারের কাছে! জানো না তো, হেড স্যার মারলে কিরো-ও-ও-ম লাগে!” হিড় হিড় করে টানার জন্যেই হয়তো ছেলেরা তাঁর নাম দিয়েছিল হিড়িম্বা – বেশ কয়েক বছর আগেই! হিড়িম্বা আমাদের ইতিহাস পড়াতেন, আর নেড়ুদা তো নিজেই সাখ্যাত এক ইতিহাস, কাজেই অনিবার্য ভাবেই খুব তাড়াতাড়ি দুজনের মধ্যে ঝামেলা লেগে গেল। 

একদিন ক্লাসে এসেই মধু আন্টি শাড়ির আঁচল দিয়ে নিজেকে হাওয়া করতে করতে বলে উঠলেন, “উফ্‌! কি গরম রে বাবা! ভীষণ টাফি লাগছে, ভীষণ টাফি, জানলাগুলো খুলে দাওনা!” ওমনি নেড়ুদা বলে উঠলো, হেঁড়ে গলায়, “ওকি রে! টাফি আবার কি রে বাবা!” বলেই বিশ্রী ভাবে খ্যা খ্যা করে হেসে উঠলো! আন্টি তো অবাক! তিনি কিনা স্বয়ং হেড স্যারের মামাতো বোন, তাঁর সঙ্গে চ্যাংড়ামো! ভয়ানক রেগে গিয়ে বললেন, “আরে! নেড়ু! ইয়ার্কি মারছো আমার সঙ্গে? কি মনে করো তুমি আমাকে?” নেড়ুদা অম্লান বদনে বলে দিল, “আন্টি, সিংহ শিশু!”
ব্যাস! আমরা তো পাথর! আন্টিও বেশ কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন, তারপর চেয়ার থেকে উঠে এসে নেড়ুদার কান ধরে দাঁড় করিয়ে দিলেন। নেড়ুদা নির্বিকার ভাবে কানে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “ইশ, এই কানটা একটু যেন লম্বা হয়ে গেল, প্লিস অন্য কানটাও একটু টেনে দিন না!” শুনে আন্টি তো প্রায় মুচ্ছো যান! এরকম অভিজ্ঞতা বোধহয় তাঁর আগে কখনও হয় নি! চোখ গোল করে কিছুক্ষণ নেড়ুদার দিকে তাকিয়ে থেকে তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, “কি? কি বললে তুমি? কি সাহস! ই-ই-ই-ই-শ্‌! এক্ষুণি চল হেড স্যারের কাছে, তিনি উপযুক্ত ব্যবস্থ্যা নেবেন।” বলে হিড় হিড় করে নেড়ুদাকে টানতে টানতে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমরা বুঝলুম, এবার নেড়ুদার হবে! একেই তো হেড স্যার ভয়ানক রাগী, তার ওপর তাঁর বোনকে অপমান, নির্ঘাত উনি এবার নেড়ুদাকে ভীষণ পেটাবেন।

এদিকে হয়েছে কি, আমাদের ক্লাসেই নীলু বলে একটি ছেলে ছিল, যার ছিল কিনা মৃগীর ব্যামো! মাঝে মাঝেই সে “ই-ই-ই-ই-ই, ই-ই-ই-ই-ই” বলে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ত। আমরাও তখন জুতো-টুতো শুঁকিয়ে তাকে সুস্থ করবার চেষ্টা করতুম, তাতে সে আরো “ই-ই-ই-ই-ই, ই-ই-ই-ই-ই” করে মুখ দিয়ে ফ্যানা বের করতে আরম্ভ করে দিত, আমরা তখন মেট্রনকে ডেকে আনতুম। নেড়ুদা আমাদের ক্লাসে আসবার পর থেকেই নীলুর জন্য নানা ধরণের চিকিৎসার চেষ্টা করে চলেছে, যদিও এখনও সেরকম ফল পায় নি। সেদিনও আন্টি যখন নেড়ুদার ওপর চ্যাঁচাতে শুরু করলেন তখন নীলুর দাঁত বেরিয়ে এসেছিল, পাশ থেকে লাট্টু তার জুতো দেখিয়ে কোনও রকমে অবস্থা সামলেছিল।

 যাই হোক, হিড়িম্বা আন্টি তো নেড়ুদাকে নিয়ে চলে গেলেন। আমরা, বাকিরা, ক্লাসে বসে নেড়ুদাকে নিয়ে কি কি হচ্ছে হেড স্যারের ঘরে, তাই নিয়ে জোর আলোচনা করে চলেছি, ওদিকে দেখি কেউ আর ফেরে না! তারপর ক্লাস শেষ হওয়ার ঘন্টা পড়ল, এবার টিফিন, আর নেড়ুদাও দেখি হাসি হাসি মুখে ক্লাসে ঢুকল। ওমনি বাপ্পা লাফিয়ে উঠে জিজ্ঞেস করল, “কি গো নেড়ুদা, হেড স্যার কি বললেন?” নেড়ুদা হেসে বলল, “হেড স্যার আর কিই বা বলবেন? যা বলার হিড়িম্বাই বলল, তারপর সার ফটাশ করে আমার বাঁ গালে একটা থাপ্পড় মারলেন! উফ্‌! বেশ জোর আছে স্যারের হাতে, নির্ঘাত বজরংএ গিয়ে ব্যায়াম করেন রোজ!”

 কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। আমরা সবাই তখন টিফিন খাওয়া ভুলে গেছি, ক্লাসের সকলের চোখ নেড়ুদার দিকে। সে কিন্তু নির্বিকার ভাবে গার্গীর ব্যাগ খুলে তার টিফিন-বক্স খুঁজছে! পাশ থেকে মহুয়া হঠাৎ বলল, “তারপর? তারপর?” নেড়ুদার ধীরে সুস্থে গার্গীর মার করা লুচি তরকারি চিবোতে চিবোতে বলল, “তারপর আর কি! তারপর স্যার আমাকে হাওয়া করলেন আর কোকা কোলা খাওয়ালেন, তারপর খুব মিষ্টি করে বললেন যেন আর কক্ষণও এরকম দুষ্টুমি না করি, তারপর আমি চলে এলাম।”

 আমরা তো অবাক! গার্গী মাঝে “এই, এই” করে এগিয়ে আসছিল, সেও এই পর্যন্ত শুনে কিরকম যেন থতমত খেয়ে গেল! বলে কি নেড়ুদা! স্যারের যে এই ধরণের মোলায়েম স্বভাব, তা তো আগে কখনও শুনিনি! কিছুক্ষণ পর গদাই বলল, “দূর দূর, এ আবার হয় নাকি? এবার তুমি বাজে বকছ। আসলে কি হল, বলই না!”

নেড়ুদার ততক্ষণে লুচি খাওয়া শেষ, দীপুর জলের বোতলের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, “কি আর হবে! স্যার থাপ্পড় মারলেন আর আমিও দু চোখ আধবোজা করে নীলুর মত ‘ই-ই-ই-ই-ই, ই-ই-ই-ই-ই’ বলতে বলতে কার্পেটের ওপর লুটিয়ে পড়ে থুতু ছেটাতে শুরু করে দিলাম। হিড়িম্বা বলে উঠল, ‘ওর কিচ্ছু হয় নি, ও ভীষণ দুষ্টু ছেলে!’ শুনে আমি আরো জোরে ‘ই-ই-ই-ই-ই, ই-ই-ই-ই-ই, ই-ই-ই-ই-ই, ই-ই-ই-ই-ই’ করতে করতে স্যারের টেবিলে এক লাথি মারলাম। গেলাস, বোতল, সব ঝন্‌ ঝন্‌ করে উঠল, স্যার প্রচণ্ড ঘাবড়ে গিয়ে বেয়ারাকে ডেকে বললেন, ‘ওরে অজয়, দেখ, দেখ, এ কি বিপদ রে বাবা, তোল, তোল!’ অজয় ব্যাটা যেই এসে আমাকে ধরতে গেল, আমি ‘ই-ই-ই-ই-ই, ই-ই-ই-ই-ই’ করে ওর পাজামায় থুতু ছিটিয়ে দিলাম, ও ‘ছি, ছি,’ বলে লাফিয়ে সরে গেল, আমিও চোখ টিপে পড়ে রইলাম।” তারপর নেড়ুদা জল খেয়ে বলল, “চ’ রে চ’, মাঠে যাই।”

 আমি বললুম, “মাঠে যাবে কি? দাঁড়াও, দাঁড়াও, আগে বল, তারপর কি হল?” নেড়ুদা বলল, “তারপর? তারপর হঠাৎ গায়ে জল পড়ল, চোখ খুলে দেখি স্যার নিজেই উবু হয়ে বসে আমাকে হাতপাখা দিয়ে হাওয়া করছেন, আর অজয় আমার সারা গায়ে জলের ছিটে দিচ্ছে। ভাবলাম খামোখা এভাবে জামা কাপড় ভেজানোর কোনও মানে হয় না, তাই মাথাটা আস্তে আস্তে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে উঠে বসলাম। হিড়িম্বা বলে উঠল, ‘দেখেছো! কিচ্ছু হয় নি ওর, ও ভীষণ অসভ্য!’ স্যার তখন হিড়িম্বাকে এক ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়ে অজয়কে দিয়ে আমার জন্যে কোকাকোলা আনালেন। হিড়িম্বা ওদিকে গজ গজ করছে, কিন্তু কি করবে? আমি কোকাকোলা খেতে থাকলাম, আর স্যার হাওয়া করতে করতে বললন, ‘যাও, ক্লাসে যাও। আর কক্ষণও এরকম দুষ্টুমি করবে না।’ ব্যাস! তারপর আমি চলে এলাম!”
 সেদিন থেকেই আমরা ওর নাম দিলুম ‘পাগলা নেড়ুদা!’

Untitled Document
Total Visitor : 708947
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By : Life Yard