Untitled Document
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী

 
নজরুলের ইরানী ফুল দৌলতপুরের নার্গিস
-জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল

ক্যাপশন ও ছবি:   (কুমিল্লা দৌলতপুর)


তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের বরদাখাত পরগনার বিখ্যাত জমিদার আগাসাদেক এর মেয়ের জামাতা মীর আশ্রাফ আলীর জমিদারী স্টেটের প্রজাহিতৈষী জমিদার রায় বাহাদুর রুপেন্দ্র লোচন মজুমদারের জমিদারী এলাকার অন্তর্ভুক্ত এক গ্রাম “দৌলতপুর”। এই গ্রামের  দুটি  সম্ভ্রান্ত বাড়ি মুন্সী বাড়ি ও খাঁন বাড়ি। আÍীয়তার সুবাদে মুন্সী বাড়ি ও খাঁন বাড়ির মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক। আফগানিস্তান বংশোদ্ভুত খাঁন পরিবার। বংশীয় ও সামাজিক মর্যাদার উচ্চতায় দুটি বাড়ির অবস্থান কাঁধে কাঁধে মিললেও, আর্থিক বিবেচনায় মুন্সীবাড়ির অবস্থান ছিল উপরে।
খ্রিস্টীয় ১৮৮৯ সালে খাঁন পরিবারে জন্ম নেন একসময়ের বহুল আলোচিত ব্যক্তি আলী আকবর খাঁন। আলতাফ আলী খাঁন, ওয়ারেশ আলী খাঁন, নেজবত আলী খাঁন তাদেরাই কনিষ্ঠ ভাই আলী আকবর খাঁন। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া আলী আকবর খাঁন ছিলেন মেধাবী। দারিদ্র্যকে উপেক্ষা করেই শেষ পর্যন্ত তিনি কৃতিত্বের সাথে বি.এ. পাশ করেন। শিক্ষা জীবন শেষে প্রথমে চাঁদা সাহেবের গৃহ শিক্ষক, পরে সৈনিকের চাকুরীতে যোগ দেন। সৈনিক জীবনে এক পর্যায়ে তিনি ক্যাপ্টেন পদমর্যাদায় উন্নীত হন। একজন নাট্যকার (লেখক) হিসেবেও তাঁর পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর লেখা হিন্দুস্থানের ইতিহাস, মোসলেম চরিত, আদর্শ মহিলা প্রভৃতি গ্রন্থ এবং ভিশতি বাদশাহ ও বাবর প্রভৃতি নাটক উল্লেখযোগ্য। সৈনিক জীবন শেষে রূপসা স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে থেকে এক পর্যায়ে পুস্তক ব্যবসার সাথে জড়িত হন। বাংলাবাজার ও কোলকাতায় ভারতীয়া লাইব্রেরী নামে একটি বইয়ের দোকান প্রতিষ্ঠা করেন। প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ কমরেড মোজাফফর ও শিক্ষানুরাগী ক্যাপ্টেন ডা. নরেন্দ্রনাথ দত্ত এ দু’জন ব্যক্তি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। এক সময় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাথেও তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পর, অর্থাৎ ১৯১৭ সালে ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে যোগ দিয়ে নৌশেরার ট্রেনিং শেষে ১৯১৯ সালের দিকে নজরুল করাচিতে অবস্থান করছিলেন। সম্ভবত তখনই আলী আকবর খানের সাথে নজরুলের পরিচয় ঘটে। নজরুলের সৈনিক পদমর্যাদা তখন ব্যাটালিয়ন কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার, আলী আকবর ক্যাপ্টেন। ১৯২০ সালের জানুয়ারি মাসে নজরুল দেশে ফেরেন। এক পর্যায়ে মার্চ মাসে বাঙ্গালী পল্টন ভেঙ্গে দেওয়ার খবর পান। পরে ১৯২১ সালে (বাংলা ২৩ চৈত্র ১৩২৭) আলী আকবরের সাথে নজরুল কুমিল্লা হয়ে মুরাদনগরের দৌলতপুরে আসেন। তবে আলী আকবর খাঁনের সাথে নজরুলের দৌলতপুরে আসার বিষয়টি নিয়ে খানঁ পরিবার ও মুন্সী পরিবারে মধ্যে মত পার্থক্য রয়েছে। সাম্প্রতিকালে এ দুই পরিবারের কাছ থেকে পরস্পর বিরোধী বক্তব্যও পাওয়া যায়। মুন্সী বাড়ির বীর মুক্তিযোদ্ধা লুৎফর রহমান মুন্সী ওরফে রওশন মুন্সীর (নার্গিসের ভ্রাতষ্পুত্র) দাবি, তার চাচা অর্থাৎ নার্গিসের বড় ভাই আব্দুস সোবহান প্রথম মহাযুদ্ধের সৈনিক ছিলেন। নজরুল তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সূত্র ধরেই দৌলতপুরে আসা।
তবে নজরুল কার হাত ধরে দৌলতপুর এসেছিলেন এসব বিতর্কের উর্ধ্বে হচ্ছে, নজরুল এসেছিলেন এবং আসার কারণেই নজরুলের জীবনে এক নতুন মাত্রা ও নতুন অধ্যায় সূচিত হয়। দৌলতপুরে অবস্থান কালেই একজন বিদ্রোহী নজরুলের মাঝে আবিভূর্ত হয় প্রেমিক নজরুলের। খাঁন বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার উত্তরে মুন্সী বাড়িতে বিয়ে দেন আলী আকবর খাঁনের বোন আসমতের নেসাকে। বাবার বাড়ি একই গ্রামে হওয়ায় আসমতের নেসা প্রায়সই বাবার বাড়ি থাকতেন, সেই সাথে তাঁর মেয়ে সৈয়দা খাতুনও।
এক পর্যায়ে সৈয়দা খাতুনের বড় ভাই জব্বার মুন্সীর সাথে মামা নেজাবত আলী খানের মেয়ে আম্বিয়া খাঁনমের বিয়ের দিন স্থির হয় ১৯২১ সালের ৫ মে (বাংলা ২২বৈশাখ)। সেই বিয়েতে যোগ দেন নজরুল। জনশ্র“তি আছে এবং ঐতিহাসিকদের মতেও ওই দিনই যুবক নজরুলের প্রথম দেখা হয় ভাইয়ের বিয়েতে আসা ষোড়শী সৈয়দা খাতুনের সাথে। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে সখ্যতা। নজরুল ইরানী ফুলের নামে তাঁর নাম রাখেন নার্গিস আসার খানম। নার্গিসের রূপ মাধুরী ও প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ে দৌলতপুরে দীর্ঘ ৭১ দিন অবস্থান করেন নজরুল। এসময় এলাকার অনেক স্থানই নজরুলের পাদচারনায় ধন্য হয়েছে। পার্শ্ববর্তী প্রাচীন বিদ্যালয় বাঙ্গরা উমালোচন উচ্চ বিদ্যালয়েও গিয়েছেন এবং সেখানে নজরুলকে সংবর্ধনা দেয়ার কথাও শোনা যায়। বাঙ্গরা স্কুলের শিক্ষক আব্দুর রহমান ভুইয়া জানান, স্কুলের সামনে একটি বকুল গাছের নিচে নজরুল বাঁশি বাজাতেন। সেই স্মৃতিবিজড়িত গাছটিও কেটে ফেলা হয়েছে বছর কয়েক আগে।
দৌলতপুর অবস্থান কালে সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ দৌলতপুরে এলে নজরুল তাকে কদমবুচি (সালাম) করে সম্মান জানান। দৌলতপুরে একটানা থাকাকালে সৃষ্টি হয় নজরুল-নার্গিসের প্রেমের সম্পর্ক। নার্গিস নজরুলকে কতখানি আলোড়িত করেছিলেন এর সাক্ষর রয়েছে “হিংসাতুর” কবিতা এবং ১৯৩৭ সালের ১ ফেব্র“য়ারী নার্গিসকে লেখা নজরুলের একটি চিঠিতে- “...আমার অন্তর্যামী জানেন, তোমার জন্য আমার হৃদয়ে কি গভীর ক্ষত, কী অসীম বেদনা !”
এক পর্যায়ে আলী আকবর ভাগ্নি নার্গিসকে নজরুলের সাথে ঢাকঢোল বাজিয়ে বিয়ে দেন। বিয়েতে জমিদার রায় বাহাদুর উপেন্দ্র লোচন মজুমদারসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন বলেও জানা যায়  (আলী আকবর খাঁনের ভাই ওয়ারেশ আলী খাঁনের নাতি আব্দুল করিম ও তার ছেলে জুয়েলর দেয়া তথ্যানুযায়ী)।
যতদূর জানা যায় বাংলা ১৩২৮ সালের ৪ আষাঢ় নজরুল অজ্ঞাত কারণে বিয়ের রাতেই দৌলতপুর ছেড়ে গোপনে চলে যান। এ আকষ্কিক চলে যাবার পর নজরুল কুমিল্লায় এলেও আর দৌলতপুর আসেননি। চলে যাবার কারণটি এখনো রহস্যাবৃত। বলা যায় নার্গিসই একমাত্র নারী, যার কল্যাণে পৃথিবীতে নজরুলের মতো একজন বিখ্যাত কবির সৃষ্টি হয়েছিলো। একথা নজরুলও স্বীকার করে গেছেন- “...তুমি এই আগুনের পরশ মানিক না দিলে আমি ‘অগ্নিবীণা’ বাজাতে পারতাম না- আমি ‘ধূমকেতুর’ বিষ্ময় নিয়ে উদিত হতে পারতাম না...”( নার্গিসকে লেখা নজরুলের চিঠির অংশ)।
এই ব্যর্থ বিয়ের বছর দুয়েক পর কুমিল্লায় ইন্দ্র কুমার সেন গুপ্তের বিধবা বোন গিরিবালা দেবীর একমাত্র কন্যা আশালতা সেনকে (প্রমীলা) বিয়ে করেন নজরুল। এ যাবৎ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী নজরুল দৌলতপুরে বসেই ১৬০টি গান এবং ১২০টি কবিতা রচনা করেছিলেন। উল্লেখযোগ্য কবিতা গুলোর মধ্যে- ‘বেদনা-অভিমান’, ‘অ-বেলা’, ‘অনাদৃতা’, ‘পথিক প্রিয়া’, ‘বিদায় বেলা’ প্রভৃতি।
নজরুল চলে যাবার পরও নার্গিস তাঁর জন্য ১৬ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলেন। এক পর্যায়ে মামাতো ভাই নোয়াজ্জস আলী টুক্কু খাঁন (তৎকালীন  ইউপি ভাইস প্রেসিডেন্ট) কোলকাতায় গিয়ে নজরুলের কাছ থেকে এক প্রকার জোর পূর্বকই বিয়ের তালাক নামায় স্বাক্ষর আনেন (১৯৩৭ সালে)। অতঃপর জোর করেই নার্গিসকে বিয়ে দেন ঢাকার হাসানবাদের ছেলে, কবি আজিজুল হাকিমের সাথে। তাদের ঘর আলোকিত করে জন্ম নেয় এক মেয়ে ও এক ছেলে। ছেলে ডা. আজাদ ফিরোজ ইউরোপের মেঞ্চেস্টারে চিকিৎসক এবং মেয়ে শাহানারা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। নার্গিস মারা যান ১৯৮৫ সালে, তাকে সমাহিত করাহয় মেঞ্চেস্টারে। আলী আকবর খাঁনও ১৯৭৭ সালে পরলোকগমন করেন।
যতদূর জানা যায়, যে আলী আকবরের হাত ধরেই নজরুলের দৌলতপুর আসা, আবার এক সময় সেই আলী আকবরই নজরুলের নামটি পর্যন্ত শুনতে পারতেন না এবং তারই হাতে নজরুলের লেখা সংবলিত অনেক কাগজ পত্রাদি ধ্বংস হয়েছে। খাঁন পরিবার আজীবন “নজরুল-নার্গিস” অধ্যায়টিকে একটি কলঙ্কিত  ইতিহাস বলে মনে করতেন ( খাঁন বাড়ির বর্তমান প্রজন্ম তেমনটি মনে করেন না)।
আজ নজরুল, নার্গিস, আলী আকবর এদের কেউ নেই। আছে শুধু একটি অমর প্রেম কাহিনী আর কিছু স্মৃতি চিহ্ন।





Untitled Document
Total Visitor : 708302
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By : Life Yard