Untitled Document
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী

 
বরেন্দ্র বিজয়
-মাসুদ চৌধুরী
প্রান্তিকের প্রাকৃতজন (উত্তর) শীর্ষক বৃত্ত আর্ট ট্রাস্ট আয়োজিত শিল্প বিষয়ক কর্মশালা রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের বেলডাঙ্গা ও সাহানা পাড়া নামক আদিবাসীদের গ্রামকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরী ভবন থেকে যাত্রা শুরু ২০ এপ্রিল ২০১০ এর সকালে। উদ্দেশ্য পালপুর গ্রাম। সেখানকার পালপুর মহাবিদ্যালয়ে শিল্পীদের থাকবার ব্যবস্থা করেছেন আয়োজকবৃন্দ। বৃত্ত আর্ট ট্রাস্টকে সহায়তা প্রদান করেছেন মহাবিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি প্রফেসর নিমাই সরকার ও সদস্য সচিব (কলেজের অধ্যক্ষ)। পালপুর মহাবিদ্যালয় রাত্রিযাপন ও বিশ্রাম স্থল। সেখান থেকে বেলডাঙ্গা ও সাহানা পাড়া হলো শিল্পীদের কর্মক্ষেত্র। মোট ২০ জন শিল্পীর কাজ নিয়ে ২০ এপ্রিল থেকে ২৩ এপ্রিল ২০১০ চার দিনের এই কর্মশালা। থাকার জায়গা থেকে কাঁচা-পাকা পথ পেরিয়ে প্রথমেই বেলডাঙ্গা বাম দিকের পথ ধরে তারপরে একটু সোজা যেয়ে ডান দিকে সাহানা পাড়া। শিল্পীদের দুটি দল দুপাড়ায় যায়। তারপর স্থান বদল করে দুপাড়া ঘুরে মিলিত হয় দুপাড়ার মধ্যবর্তী বটতলা নামক সমাধি স্থলে। সেখানেই দুপুরের আহার। সেই সাথে সুনির্দিষ্ট স্থান উল্লেখ করে প্রত্যেকের কর্ম পরিকল্পনার উপস্থাপন এবং মত বিনিময়। আলোচনা আর আহার শেষ করে থাকবার জায়গায় বিশ্রাম। সন্ধ্যায় গান, বাজনা, হৈ হুল্লোড় আর আড্ডা। পর দিন সকালে নাস্তা সেরে যথারীতি কাজে নেমে পরা। কেউ কেউ স্থাপনা স্থানে কেউ স্থাপনার উপকরণ সংগ্রহে শহর অভিমুখে। উল্লেখ্য যে, আয়োজকবৃন্দ আসার সময় বাসেই উপকরণ ক্রয়ের জন্য সাধ্যমত অর্থ সহায়তা প্রদান করেছেন, যা আর্ট ক্যাম্পের অন্যতম সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। অংশগ্রহণকারী শিল্পীবৃন্দ মনের আনন্দে তাদের স্থাপনাকে সুন্দর করে সাজিয়ে উপস্থাপন করার সুযোগ পেয়েছেন।

          অল্প গরমেই কাহিল হয়ে পরেন অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতম মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাদশা। বাইরে বৈশাখের তীব্র গরম দেখে তিনি আর বেরুনোর ঝুঁকি নিলেন না। ঘরে বসেই জল রংয়ে আঁকলেন বরেন্দ্র ভূমির নিসর্গ দৃশ্য। সেখানেও বিপত্তি প্রচন্ড গরমে রং শুকিয়ে কাঠ। জলরংয়ের যে ভেজা ভেজা ভাব তা অপসৃত। তবু মোস্তাফিজুর রহমানের কুশলী হাতে তা এক ভিন্ন মাত্রা ধারণ করেছে।

          সম্ভবত শিল্পীদের মধ্যে কনিষ্ঠ দুজন হলেন আরিফুল ইসলাম এবং বিদ্যুৎ। বিদ্যুৎ বিষয় করেছেন আদিবাসী রক্ষা ঘরকে। রক্ষা ঘর মূলত শস্য সংরক্ষনাগার। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় জিগুরাট নামে শস্য সংরক্ষনাগারের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। রক্ষা ঘর গোলা ঘর নামেই সমধিক পরিচিত। রক্ষা ঘরের দেয়ালে বিদ্যুৎ সাজিয়েছেন ঐ পরিবারের প্রায় সব সদস্যের আলোকচিত্র। সেখানে নিজের আলোক চিত্রও তুলে ধরে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সম্প্রীতির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন।

          আরিফুল ইসলাম মুখোশ, খড় আর রশি ব্যবহার করে মানব দেহ তৈরী করেছেন। শহুরে পার্কের স্লিপার নয় পুকুর পাড় থেকে পুকুরের জলে নামার অভিপ্রায়ে পিচ্ছিল মাটির স্লিপার বানিয়েছেন তিনি। আদিবাসী শিশু কিশোরদের সাথে নিজেও লাফিয়েছেন পুকুরের জলে। বন্দী সাধের বেদনা, সাধ্যের অকুলান মন কেমন করা অনুভবে বেশ ভাবায়।

          সুভাষ সূতার তার স্থাপনা সাজিয়েছেন কাক তাড়ুয়া দিয়ে। বিস্তীর্ণ ধান ক্ষেতে লাঠির ডগায় বিভিন্ন ধরনের রঙ্গিন পাতিল বসিয়ে তিনি তৈরী করেছেন কাক তাড়–য়া এমনিতেই দৃষ্টি মনোহর কাক তাড়ুয়া গুলোকে পোষাক পরাতে পারলে মনে হয় আরো দৃষ্টি নন্দন হতো।

শাহরিয়ার হোসেন সাবিন কাজ করেছেন একটি আদিবাসী উৎসব নিয়ে। গৃহসজ্জা থেকে শুরু করে তৈরী খাবারের সাথে উৎসবে পান করা তাড়িরও উপস্থিতি তার আয়োজনকে পূর্ণতা দিয়েছে। উৎসবটি আর শুধু আদিবাসীদের থাকেনা সাবিনও হয়ে যান সে উৎসবের একটি প্রধান চরিত্র।

শাহরিয়ার এর স্থান না থেকে বেরিয়ে ডান পাশে হাসান আশিকের কাজ। মাটির গর্তে করা স্বল্প গভীরতার একটা কূপ সেখানে মাটির তৈরী তিনটি মানব দেহ। জলহীন কাটা মাটির কূপে অবস্থিত মানব দেহ গুলোও ফেটে যাওয়া শরীরে উপস্থাপিত যা প্রতীক বাহী।

তাহমিদুর রহমান উজ্জ্বল শুষ্ক পুকুরের ফেটে যাওয়া মাটিতে ফুটিয়েছেন রঙ্গিন শাপলা। পলিথিন ব্যাগে রঙ্গিন পানি ভরিয়ে ভাবনার অভিনবত্বে সম্পাদিত কাজটি দৃষ্টি সুখকর।

এখানকার মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবারের গৃহের স্থাপত্য শৈলী প্রায় একই রকম। গৃহের প্রবেশ পথের পাশ প্রাচীর ঘেরা। প্রবেশ পথ থেকে প্রাচীর শুরু হয়ে বর্গাকারে অথবা আয়তাকারে তা গৃহটিকে বেধে রেখেছে। প্রবেশ পথের অভ্যন্তরে ছাদসহ টানা বারান্দা। বৈশাখের তপ্ত দুপুরে ভিতরে প্রবেশ করেই শীতল আবেশে দেহ মন জুড়িয়ে যায়। সেই সাথে যোগ হয় ফজলুল করিম কাঞ্চনের দেয়াল চিত্র। বিভিন্ন প্রাণীর দেহাবয়বের সরলও নয়ন সুখকর উপস্থাপন। প্রাগৈতিহাসিক যুগের গুহাচিত্রের স্মৃতি হালকা ওয়াশে চিকন তুলির কাজের মত ভাসতে থাকে।

ফজলুল করিম যে বাড়ীতে কাজ করেছেন তার উল্টো দিকের বাড়ীতে প্রায় একই রকম জায়গায় আব্দুস সোবাহান হীরার কাজ। কাঞ্চন যদি ঐতিহ্য আশ্রয়ী হন তবে হীরা অনেকাংশে আধুনিকতা উপস্থাপনে তৎপর। হীরা দেয়ালে ছবি এঁকেছেন, কাগজে প্রিন্ট নিয়ে দেয়ালে সেটেছেন। নিজে এঁকেছেন, আদিবাসী বালককে দিয়ে আঁকিয়েছেন।

মো. হাবিবুল্লাহ ত্রিভূজাকৃতির রঙ্গিন কাগজে স্কুল ঘরের বাইরেটা সাজিয়েছেন। ভিতরে বাংলা হরফে আদিভাষার বাক্যবিন্যাসে বিভিন্ন বিষয়ের উল্লেখ। সদা হাস্যময় মিষ্টভাষী হাবিবুল্লাহর মিষ্টি কাজ। এখনো কুমার এই শিল্পীর কাজের কাছে এসে ভ্রম হয় তার পরিণয় সংক্রান্ত উৎসব নয়তো!

জিল্লুর রহমান টিটন মিশ্র মাধ্যমে এঁকেছেন বরেন্দ্র ভূমির নিসর্গ আর গ্রীষ্মের কাঠ ফাটা গরমে ফেটে যাওয়া মাটির চরিত্র বুকে ধারন করে পানির জন্য আকুলতা ও না পাওয়ার হাহাকারে ছেটে ছুটে পূর্বই হতে রাখা এসে এসে যীশুর মত ঝুলে পড়েছেন এবং ভূমিতে পতিত হয়েছেন খুবই নাটকীয় ও মানবিক টিটনের উপস্থাপন।

হুমায়ুন কবির আকাশে উড়িয়েছেন নানা রংয়ের ঘুড়ি সঙ্গে নিয়েছেন স্থানীয় শিশু আর কিশোরদের। সূতার যোগ সূত্রে ঘুড়ি ক্ষার নাটাই যেমন বাধা পড়ে। হুমায়ুনও প্রীতি ডোরে বাধা পড়েছেন আদিবাসী শিশু কিশোরদের সাথে। তাদের আনন্দহীন জীবনে হুমায়ুনের সাথে অন্তত কিছুটা সময় আনন্দের অকালে বিভিন্ন রংয়ের ঘুড়ি উড়িয়েছে তারা।

সব কাজেই মোস্তফা শরীফ আনোয়ার তুহীন বেশ আইডিয়া ধর্মী। তা যে সব সময়ের জন্য কার্যকর তা বলা যাবে না। তবে তুহীনের আইডিয়াগুলো উপভোগ্য। তিনটি প্রধান চরিত্র লাল, সবুজ আর হলুদ পোষাকে তুলে ধরেছেন সম্ভবত বাংলাদেশের প্রথম পতাকা

রংয়ের কথা অন্য চরিত্রগুলোর কেউ মশালবাহী যেন আলোর বার্তা বহনকারী আর আছে সারিবদ্ধ শিশু কিশোর। পরিবেশনার এক পর্যায়ে অনেকাংশে শুষ্ক পুকুরের কাদা গায়ে মেখে পাশের পুকুরে যেয়ে মশাল থেকে স্নান সারার ভাবনা চিত্তাকর্ষক।

সুদর্শন হাস্যোজ্জ্বল নূরুল আমীন ঘুটে আর খড়ের গাদাকে হাঁসের আদল দিয়েছেন। স্থানীয় বহুল ব্যবহৃত উপকরণগুলো কাজে লাগিয়ে কৃষিজীবী মানুষের গৃহপালিত প্রাণীকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে নূরুল আমীনের ভাবনা প্রশংসনীয়।

আজাদী পারভীন টুয়েজলী আদিবাসী বিয়ের আয়োজন করে পুরো গ্রামে শোরগোল ফেলে দিয়েছেন। উৎসবের আবহে তিনি এঁকেছেন দেয়াল চিত্র বিভিন্ন দেহাবয়ব ব্যবহার করে।

আব্দুস ছালাম আর ময়নুল ইসলাম পল তাদের স্থাপনা আর পরিবেশনার স্থান হিসেবে বেছেনিয়েছেন পূর্বেই উল্লেখ করা দুগায়ের মধ্যবর্তী সমাধি স্থলকে। সমাধি স্থলটি এমনিতেই দুগায়ের মধ্যে একটা যোগসূত্র স্থাপন করেছে। পল আর ছালামের কাজের মধ্যেও যেন একটা যোগসূত্র আছে। সন্ধ্যায় ছালাম যেমন প্রেতাত্মা নামিয়েছেন আলোয় শ্বেতশুভ্র বস্ত্রে আরও আধারের রহস্যময় চমৎকার আবহে। দিবালোকে পল সেখানকার বটগাছে ঝুলিয়েছেন জীবনের দোলনা। দোলনায় বসিয়েছেন সজীব সবুজ প্রাণের প্রতীক কিশোর-কিশোরীদের। সবশেষে পল উপস্থিত প্রায় সবার মুখে গরুর গোমাই (টোপা) পরিয়ে নসিমন গাড়ীতে তুলেছেন। উপস্থাপনায় অভিনবত্ব ছিলো।

কৌশিক সরকার প্রামান্য চিত্র নির্মাণ করেছেন একটি অন্ধ আদিবাসী বালিকাকে বিষয় করে। চিত্রের শুরুতেই বালিকাটির প্রাণ খোলা নির্মল হাসি মন কেমন করা বেদনায় বিষয়ের সাথে একাত্ম করে। দৃষ্টিহীন বালিকাটির দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো মানবিক বোধের দৃষ্টি খুলে দেয়।

আলোকচিত্রী তানভীর উল ইসলাম যাত্রার শুরু থেকে ক্যাম্পের প্রায় শেষ পর্যন্ত তার ক্যামেরা নিয়ে তৎপর। অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের কাজ আর কাজের বাইরে অন্যান্য মজার ঘটনাবলী তার ক্যামেরায় ধরে রেখেছেন। ২৩ এপ্রিল পূর্বাহ্নে কৌশিকের প্রামান্য চিত্রের পর তার আলোক চিত্রের প্রদর্শনী চলাকালীন বিদ্যুৎ বিভ্রাট। অগত্যা প্রদর্শনীর অপমৃত্যু। পরে অবশ্য সে সব আলোক চিত্রের রস থেকে বঞ্চিত হইনি। তানভীরের কাজ যেন সমস্ত কর্মশালার এক প্রামাণ্য দলিল।

ডাব্লিউ : ১. শিক্ষামূলক শিশু চিত্র স্কুল
২. স্কুল ঘর বন্দীশালা মানুষের
৩. অর্জন আদি থেকে উৎসারিত

রাজিউদ্দিন চৌধুরী ডাব্লিউ তার কাজকে দুটি গ্রামেই বিস্তৃত বিবৃত করেছেন। সাহানা পাড়ায় তার প্রথম কাজটি হাবিবুল্লাহর কাজের পাশেই। শিশু চিত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের করা তার কাজটি ইঙ্গিতবাহী। বেলডাঙ্গার স্কুলকে কেন্দ্র করে করা স্থাপনায় স্কুলের বাধা ধরা বন্দীত্বের প্রতি প্রচ্ছন্ন বিদ্রুপ আছে। বেলডাঙ্গায় করা অপর কাজটি ইতিহাস আশ্রিত। আদিবাসীসহ নিজে মাটিতে শয়ন করে তিনি সম্ভবত বুঝাতে চেয়েছেন আদি যে মানুষ কালক্রমে আধুনিক হয়েছে তার পরম্পরা ধরে উৎসে গেলে তা যে এক এবং অভিন্ন।

মাসুদ চৌধুরী তার স্থাপনার নামকরণ করেছেন ভূমিপুত্র। কাক তাড়ুয়া এবং ক্রসের আদলে করা কাঠামোয় তিনি ছড়িয়েছেন বঙ্গবন্ধুর চিত্র পরিচিত সফেদ পাঞ্চাবী এবং কালো কোট। কোটের বুকের কাছ থেকে বের হয়ে আসা সবুজ কাপড়ের জমিনে রক্তের ধারা বইয়ে লাল বৃত্ত তৈরী করেছেন। কাঠামোর পিছনে দাড়িয়ে তিনি উচ্চারণ করেছেন বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ কিছু অংশ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।



Untitled Document
Total Visitor : 709310
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By : Life Yard