Untitled Document
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী

 
বিলুপ্তপ্রায় সংস্কৃতি অষ্টক ও হালুই
-শরিফুল ইসলাম সেলিম
কাঁধে লাঙল, গলায় গান-এই হলো চিরায়ত বাঙালির আপন পরিচয়। বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গীত ও পার্বণ যেন অবিচ্ছেদ্য। যেমন : প্রথম ধান কাটার সময় নবান্ন, ঘরে ফসল উঠলে পৌষ সংক্রান্তি ইত্যাদি। চৈত্রসংক্রান্তিতে নীলের গাজন উপলক্ষে দক্ষিণাঞ্চলে জমে উঠে এরকম এক উৎসবের মেলা। চৈত্রের শেষ-তিন দিন বিভিন্ন ধরনের গান ও অনুষ্ঠানাদি পালন করে এ অঞ্চলের কৃষিজীবী মানুষ। এসব গানের মধ্যে অষ্টক অন্যতম। চৈত্রসংক্রান্তি ঘনিয়ে এলে গ্রামের সকলের বাড়ির সামনে একদল শিল্পীকে এ গান গাইতে দেখা যায়। মূলত চৈত্রসংক্রান্তির উৎসবের জন্য এ গানের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। অষ্টক গানের বিষয় মূলত শিব। এ গানে রাধা-কৃষ্ণের লীলা ও নিমাই সন্ন্যাস প্রসঙ্গও এসে থাকে। এছাড়া গৌরী, বহ্মা, বিষ্ণু, চন্ডিদাস-রজকিনী, বেহুলা-লখিন্দর প্রসঙ্গও থাকে। অষ্টক গানের নামকরণ, উৎপত্তি ও বিকাশ সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। এ সম্পর্কে কথা হয় অষ্টক গানের একজন রচয়িতা নড়াইলের বাহিরডাঙা গ্রামের স্বভাবকবি বিপিন সরকারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের গানে অষ্ট চরিত্রের সমন্বয় ঘটে বলে এ গানের নাম অষ্টক হতে পারে। অষ্ট বা আটটি চরিত্র হলো রাধা, কৃষ্ণ, সুবল, বিশাখা, ললিতা, বৃন্দা, বড়িমাই ও বলরাম।’ আবার এ অঞ্চলে অষ্টকের অন্যতম প্রধান শিল্পী নড়াইল জেলার ভাদুলিডাঙা গ্রামের সুবোধ বিশ্বাস বলেন, ‘কৃষ্ণ অষ্ট বা আট সখী নিয়ে লীলা করতেন বলে এ গানের নাম অষ্টক হতে পারে।’ যেভাবেই নামকরণ হোক, বর্তমানে অষ্টক গানের চরিত্রসংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে তার কথার ব্যাপ্তিও। অষ্টক গানের ভাষা আটপৌরে, কিন্তু এর আবেগ ও প্রেরণা অত্যন্ত ব্যক্সময়। খেয়ালের ঢঙে গাওয়া এ গানের স্থায়ী ও অন্তরা দুটি অংশ বা স্তবক থাকে। ভগ্ন ত্রিপদীর আঙ্গিকে অন্তরা রচিত হয়। শিব সম্পর্কে গাওয়া গানগুলোতে হালকা রসের প্রাধান্য দর্শকদের বিনোদনে একটি একটি নতুন মাত্রা যোগ করে। গানের মধ্যে শিব-পার্বতীর দাম্পত্য জীবনের দ্বন্দ্ব ও ভালাবাসা দিয়ে লৌকিক জীবনের ওপর ছায়াপাত করা হয়। অষ্টক গানের দল গঠিত হয় ১০ থেকে ১২ জন শিল্পী নিয়ে। শিল্পীরা দুটি দলে ভাগ হয়ে গান পরিবেশন করেন। একজন সূত্রধর গানের শুরু এবং গানের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করেন। সূত্রধরের (স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘সরকার’) নির্দেশ অনুযায়ী শিল্পীরা রীতিনীতি ও ভাব-গাম্ভীর্য রক্ষা করে গান পরিবেশন করেন। কখনো চটুল, কখনো ধীর লয়ে চলতে থাকা গানের মধ্যে থাকে তরুণ-তরুণীদের মনোমুগ্ধকর নৃত্য। অষ্টক পরিবেশনে বাঁশি, ঢোল, হারমনিয়াম, মন্দিরা ও খোল এবং এক ধরনের স্থানীয় বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হয়।

পৌষের শেষ সপ্তাহে কৃষকদের ফসল তোলা উপলক্ষে জমে ওঠে হালুই গানের আসর। এ গানও নীলের গাজনের একটি শাখা। ১২ থেকে ১৫ জন শিল্পীর একটি দল পৌষের শেষ সপ্তাহে বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই গান পরিবেশন করে থাকে। এ গানের বিশেষত্ব হলো এর কথায় দেশ, দেশের মানুষ, সমাজের ভালো-মন্দ, মহৎ ব্যক্তি ইত্যাদি উঠে আসে। নড়াইল জেলায় যে হালুই গান দেখা যায় তা লিখেছেন কবি বিজয় সরকারের ভাবশিষ্য স্বভাবকবি বিপিন সরকার। হালুই গান পয়ার ছন্দে রচিত হয়। কারো কারো মতে, হালুই গান পরিবেশনের সময় শিল্পীদের হাতে একটা করে বাঁশের লাঠি থাকতো। লাঠি দিয়ে আঘাত করে একটি তাল সৃষ্টি হতো। সবাই মিলে সেই তালের সঙ্গে একসঙ্গে গান গাইতো। বর্তমানে অবশ্য বাঁশের লাঠির বদলে দেশী বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের গানে অষ্টক গানের মতো তালে তালে নৃত্যও পরিবেশন করা হয়।

অষ্টক ও হালুই গান সাধারণত নিম্নবর্ণের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী যেমন : দাস, নমশুদ্র, ঘরামি, জেলে ও রাজবংশীরা পালন ও উপভোগ করে থাকে। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ ও মালদাহ্ জেলায় অষ্টক গান এখনো জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হয়ে থাকে। খুলনা ও বৃহত্তর যশোর জেলার গ্রামে-গঞ্জে এ গান ব্যাপক জনপ্রিয়। তবে আগের মতো পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এখন ধীরে ধীরে বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শিল্পী সুবোধ বিশ্বাস বলেন, ‘এ গানের শিল্পীরা কোনো পৃষ্ঠপোষকতা না পেয়ে অভাবের কারণে বিভিন্ন রকম পেশায় জড়িত হয়ে গান ছেড়ে দিয়েছেন। কেবল উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতাই এই সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।


   
Untitled Document
Total Visitor : 709945
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By : Life Yard