Untitled Document
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী

 

বর্ণ পরিচয়: তেঁতুল
- শ্রী প্রভাত রঞ্জন সরকার

 
বাংলা তেঁতুল শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘তিন্তিড়ি’, ‘তিন্তিড়ী’, ‘তিন্তিলি’, ‘তিন্তিলী’ শব্দ থেকে। এখানে ‘ল’ হচ্ছে অন্তস্থ ‘ল’ (***)। তবে বাংলা তেঁতুলের উচ্চারণে রয়েছে আদি ‘ল’ (**)। তাই বাংলা অক্ষরে তেঁতুল লিখতে গেলে প্রচলিত বাংলা ‘ল’তেই কাজ চলবে। কিন্তু সংস্কৃত ‘তিন্তিড়ি’ লিখতে গেলে অন্তস্থ ‘ল’ (***) লিখতেই হবে। অবশ্য পাঠকের যদি উচ্চারণ জানা থাকে তাহলে তিনি যে কোন ‘ল’ লিখেও অন্তস্থ ‘ল’ - এর উচ্চারণ করে নিতে পারেন। ওড়িয়াতে এক্ষেত্রে অন্তস্থ ‘ল (***)- এর উচ্চারণ করা হয়ে থাকে। মৈথিলীতে বলা হয় ‘তেঁতর’, প্রাচীন বাংলায় বলা হত ‘তেন্তুড়ী’। তিন্তিড়ি > তেন্তুড়ি > তেন্তুলি >তেঁতুল। ১২০০ বছরের পুরোনো বাংলায়-
“দুলী দুহি পিঠা ধরণ ণ জাই
রুখের তেন্তুলি কুমভীরে খাএ।”
ইংরেজী শব্দ Tamarin এসেছে ফারসী তমর-ই-হিন্দ থেকে। ‘তমর-ই-হিন্দ্’ শব্দের মানে হচ্ছে ভারতের আম। হয়তো বা সেকালকার পারস্যের মানুষ তেঁতুল দেখে সেটাকে ভারতের আম বলে মনে করেছিলেন। সংস্কৃত শব্দ আম্লিক-যার মানে অম্লরসযুক্ত বস্তু- এটা কিন্তু আদি ‘ল’ (**) থেকে প্রাকৃতে এসেছে ‘আম্লিঅ’, তার থেকে আমলী। মধ্য প্রদেশে, রাজস্থানের মাড়োয়ারী ভাষায় তেঁতুলকে ‘আমলী’ বলা হয়। এই আমলী বিকৃত হয়ে  হিন্দুস্তানীতে ‘ইমলী’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাচীন বাংলাতেও তেঁতুল অর্থে ‘আমলা’ শব্দের বিস্তর ব্যবহার ছিল- এখন বোধ হয় নেই।
একটু আগেই বললুম, আমলীক-এর ‘ল’টা হচ্ছে আদি ‘ল’ (**)। এই একই অর্থে ‘আমরীক্’ শব্দও চলতে পারে। তারও মানে টক ভাবযুক্ত বস্তু। টককে সংস্কৃতে অম্ল বা অম্র বলা হয় আর তার থেকে এনেছে ‘আম্র’ শব্দটি যার মানে আম। আম যতই মিষ্টি হোক তাতে অল্প টক ভাব থাকবেই। আম্র > আম্ব > অম্বা > আঁব-অ > আঁব্ । বাংলায় আঁব, ওড়িয়ায় আঁব অ’। মধ্য প্রদেশে আঁবা, আমা; রাজস্থানে আঁবা; গুজরাতে অম্বো; মারাঠীতে আম্বা, পাঞ্জাবীতে আম্ব। বিবর্ত্তনের ধারায় হিন্দীতে ও বাংলায় আংশিকভাবে ‘আম’ শব্দটি এসেছে। তবে উৎসগত বিচারে ‘আম’ শব্দের চেয়ে ‘আঁব’ অনেক বেশী শুদ্ধ। তবে বাংলায় ‘আম’ শব্দের ব্যাপক ব্যবহার থাকায় তাকেও ভুল বলে উড়িয়ে দিতে পারি না।
‘অম্লভাবযুক্ত’ এই অর্থে ‘আম্রাতক’ শব্দটিও সংস্কৃতে প্রচলিত যাকে ‘আম্লাতক’ লেখা যায়। এই ‘আম্রাতক’ বা ‘আম্লাতক’ থেকেই বর্ত্তমান বাংলায় ‘আমড়া’ শব্দটি এসেছে। আসলে এটি ‘ড়’ নয়, অন্তস্থ ‘ল’ (***)। কিন্তু বাংলা ভাষায় অন্তস্থ ‘ল’- এর কোন পৃথক রূপ না থাকায় বাধ্য হয়ে ‘ড়’ দিয়ে লিখতে হয়। আমরা যাকে বিলিতি আমড়া বলি সেটা কিন্তু ‘আমড়া’ই নয়। ভিন্ন প্রজাতির একটা ফল।
তেঁতুল প্রায় সমস্ত গ্রীষ্মপ্রধান দেশে জন্মে থাকে। প্রজাতিও অনেক। অতি বৃহৎ থেকে অতি ক্ষুদ্র নানান ধরণের- লাল-ফিকে-হলদে- বেগুনী প্রভৃতি নানান রঙের। কোন তেঁতুল অত্যন্ত টক, আবার কোন তেঁতুল মধুর চেয়েও বেশী মিষ্টি। এই মধু তেতুল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দ্বীপে জন্মে থাকে। নতুন তেঁতুলের চেয়ে পুরনো তেঁতুলের গুণ অনেক বেশী। যে সকল গ্রীষ্মপ্রধান দেশে গ্রীষ্মকালে শরীর শুকিয়ে যায় যে সকল দেশে তেঁতুলের ব্যবহার বিশেষ মূল্যবহ। তেঁতুল একটি সাত্ত্বিক ফল। মস্তিষ্ক রচনায় এর যথেষ্ট ভূমিকা আছে। হাঁপানী রোগে পুরনো তেঁতুল ঔষধের কাজ করে। তবে ‘অতি সর্বত্র বর্জয়েৎ’ নীতি অনুযায়ী তেঁতুল বেশী খাওয়া ভাল নয়। অতিরিক্ত তেঁতুল ভক্ষণে রক্তদুষ্টি হতে পারে। তেঁতুলের হাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল নয়.... তাতে চর্মরোগ হতে পারে। ভারতে ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্বত্র তেঁতুলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। উত্তর ভারতে তেঁতুল তেঁতুড়, তেতর, আমলী, ইমলি প্রভৃতি শব্দ প্রচলিত। দক্ষিণ ভারতে তামিলে ও মালয়ালামে ‘পুলি’ ও তেলেগুতে ‘চিন্তাপাণ্ডু’ বলে। তেঁতুল একটি গুচ্ছমূল গাছ। তাই ঘূর্ণী ঝড়ে যখন বড় বড় গাছ পড়ে খোঁজ নিলে দেখা যাবে তাদের মধ্যে তেঁতুল গাছের সংখ্যা যথেষ্ট।


Untitled Document
Total Visitor : 709333
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By : Life Yard