Untitled Document
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী

 
সুরের জন্ম-মৃত্য : তৃতীয় পর্ব
-কফিল আহমেদ

(পূর্ব প্রকাশের পর)

যাত্রাপথে আমরা তো বনে-পাহাড়ে, বিলে-গাঙ্গে আর মাঠে মাঠে, আজে পথে পথেই ওখানের ছোটোবড়ো সব শিশুদের সঙ্গে বললাম- .... হরিণেরে ছেড়ে দাও/ চোখ দুটা খুলে দাও। আসলে নিজেকেই, নিজেরাই নিজেদেরকে বলা। তা অবশ্যই আরো প্রাণের হয়ে আরো জীবন্তের হয়ে উঠতে পারে; যদি আমরা নিজেরা কথাটাকে আরো হরিণের করে, হনুমানের করে, ভাবনাটাকে আরো মনোপ্রাণের করে নেচেগেয়ে আরো সত্যি সত্যি, না হয় ওর জন্য, ওকে বোধগম্য করে তোলবার জন্য জীবনভর অপেক্ষার অধৈর্য্যটুকু সইতে পারতাম।

কিন্তু মানুষ হয়ে আমরা তা হই কেমনে? আমাদের তো নামঠিকানা আছে। এর থেকে মুক্ত হওয়া তো অনেক অনেক দুরূহ কাজ বৈকি! তবে কি সুরের আলিঙ্গনে সব কথা লয়ে, সব কিছু ছেড়েছুঁড়ে এসবের একদম বাইরে চলে যাবো? শুনেছি হাজার বছরেরও আগে আমাদের গানের বাঙলা ধারার বৌদ্ধ সহজিয়া বন্ধুরাও নাকি যারপরনাই প্রতিকূলে পড়ে পড়শীদের থেকে দূরে দূরে থাকতেন। ধ্যানে জ্ঞান, ধ্যানে মুক্তি, ধ্যানেই প্রাপ্তি..... এভাবে লুকিয়ে বা পালিয়ে বাঁচার ঘটনা পৃথিবীতে কম নয়। আর জানি, মনকে পবন করে, ধ্যানে নিজেকে গগনে স্থাপন করবার একটা বিস্ময়বোধ মানুষের জীবনে, বাণীতে আছেই।

ভবে হলো যাতনা, লালন বলেছেন। আর পথ? স্বরূপে যার আছে নয়ন/তার ভবপারের ভয় কি রে মন? একথা সত্য যে, আমাদের বাংলা গানে, জীবনে ব্যক্তির এই মানসিক দিব্যতা, স্বরূপসন্ধানের এই দিকটা কতোটা শক্তির, উদ্দীপনার আর সৌন্দর্যের হয়ে উঠতে পারতো যদি ব্রতটুকু জীবনের আরো একান্নদিকে, সবাই আরো একসাথে মিলতে পারতাম। জীবনের একান্নদিকের এই সমাবেশ কেবলই মানুষেরই সমাজে সীমিত থাকবে কেনো?

‘ভক্ত’ গাইছেন-শূকর গরু দুইটি পশু/ খাইতে বলেছেন যিশু। এতে করে শূকর-গরুর ব্যবধানটুকু একটু নড়লেও কথা হচ্ছে, তাই বলে এ কথায় শূকর-গরুর মুক্তি ঘটলো কি? না। জীব মরে যায় জীবান্তরে- একথায় আমাদের মন ‘পৃথিবী-প্রকৃতির ধারায়’ কিছুটা স্বস্থি পেলেও আজ আর তেমন সান্ত্বনা পাই কেমন করে? এখন তো যে কারো জীবন, যেকোনো জীব, জড়-অজড়, প্রতিবিন্দু দানা সবই আরো বাণিজ্যের ফার্মিংয়ের প্ল্যানিংয়ে আটক। সে কাজে দোকানদাররা চিন্তার নানান বিলাপ আর আলাপের আয়োজন করে নানান ‘ভাবের নোটিশ’ নিয়ে টাকা সাথে নামযশ কামাতে আরো পাগলা-মত্ত। মর্মের সাথে কর্মের গণ্ডগোলটা আসলে চিন্তারই। বিভক্তি। বিচ্ছেদি। ধড় হতে মাথার বিভক্তি। বিচ্ছেদি। যদিও ‘জগতের কাছে রে দেনা’ গানে শুনেছি, খণ্ড আজি হোক অখণ্ড/অনু পরমাণু মিলিত হউক। ‘জনমে জনমে প্রাণবলি দিয়ে’- শ্যামা গাইতে গাইতে বলিদানের সেই রাতে মানুষকে বিবিধ অতিথির আসনে বসিয়ে, জনতাকে শ্রেণীভেদে নানা বাসনে নানান প্রসাদ খাইতে শুনছি-দেখছি। সমাজ বিন্যাসের স্তরে স্তরে সমস্যাটা বহুকাল থেকেই ব্যক্তিমানসিকতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘাপটি মেরে আছে। গানের সামনে সমাজ ও বাংলা মনোলোকের নানান অসঙ্গতি আর বৈপরিত্যগুলি বাংলা জীবনেরই সংকট। কোনো কোনা ক্ষেত্রে এই সংকট ব্যক্তির একদম অবচেতনে। আর কেউ কেউ কেবল নিছক সুবিধা পাবার জন্য এদেশীয় বুদ্ধিবৃত্তির পেশাদারা ‘ভূবনফকির’। তা নিয়ে নানান পীরালি, ফকিরি, গোঁসাইগিরি। আর ‘ভাব’ কেবলই বাংলার কিংবা কেবল কোনো নির্দিষ্ট ‘বস্তুলোকের’ সীমারেখায় চিহ্নিত বা আন্দোলিত হবে কেনো? আর যদি তাকে ‘বাংলার’ করে দেখতেই হয় তবে তো প্রথমে অ-ভাব শব্দটিই বারবার সরাসরি যুক্ত হয়ে আসে। ‘ভাব ন হোই অভাব ণ জাই/ অইস সংবোহে কো পতিআই’র প্রকাশকে যতোই আলো-আঁধারির বলা হোক না কেনো, আসলে এ গীতের মনোভূমি বাংলার হয়েই জীবন্ত। আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। ভাব হয় না বলেই তো অভাব যায় না। অভাব বলেই তো ভাব হয় না। এ দশার মুখে কি জ্ঞান? কি প্রাপ্তি? সম্বন্ধ ওতপ্রোত। অভাবের বাস্তবতার নিরিখেই ভাবের জন্ম। আর ভাবের শক্তিতেই অভাব দূর হতে পারে। দূরিতে দারিদ্র জ্বালা দেবীর আদেশ / ভাসা গাইতে স্বপ্নে দিলা উপদেশ - আমাদের চন্দ্রাবতীতে এই সহজ স্বীকারোক্তি বাংলার ভাবধারারই অকপট প্রামাণ্য। বাংলার ভাবকে দেখতে হলে তো তাকাতে হবে এদেশের অভাবজড়িত মানুষের পোড়ামুখের চোখের সব শেষ জ্যোতির আলোকের দিকে, দুচোখের কালো- ঘোলা মণির টানপোড়নের ঠিক মধ্যিখানে। কিংবা গুটি বসন্ত যাদের চোখ খেয়েছে তাদের অন্তরলোকের দিকে। আর সাথে অবশ্যই চিনতে হবে কোনো গীতারানী কিংবা নূরজাহানের চোখেমুখের শূন্যতাকে। যাদের বিয়ে হয়-বিয়ে হয়েছিলো এসব অন্ধের সাথে। যে কোনো দিনই তাকে দেখে নাই, দেখবে না, সেই অন্ধকে টেনে নিতে বাধ্য যে সাধারণ নারী- তাদের জীবন আর চোখমুখের ভাবটুকু বাংলার শূন্য, নগ্ন বা বোবা ভাবধারা।

তা’বলে ব্যাপারটা এমন নয় যে, কোনো বিশেষ ‘উচ্চপদ’ জীবনদর্শন বা কোনো বিশেষ আধ্যাত্মচেতনার জায়গাটিকে এড়িয়ে কথা বলছি। কোনো শ্রী চৈতন্য, লালন, বিবেকানন্দ কিংবা রবীন্দ্রনাথের জীবনভাবনাটাকে বাংলার ভাবধারার বাইরে রেখে কথা বলছি না। দেখতে হবে ভাব কিংবা ভাবনার প্রকৃত সমাজ ও মনোবাস্তবতা কোথায় কেমনভাবে জীবন-জীবনে বয়ে গেছে। জীবনের চাইতে বড়ো ভাব আর কি হতে পারে? কোনো দ্বৈত বা অদ্বৈত, কোনো ঐশী বা আসমানী ভাবালোক যা বাংলার ভাবাচারে বর্তমান-তাকেও কিন্তু সেই সাধারণের জীবনবাস্তবতার জায়গাটিকে ধরেই বুঝতে হবে। ভাবতে হয়, ব্রহ্মাণ্ড যতো বিশাল আর অসীম হোক না কেনো, কোনো একটি ছোট গ্রামের সেই সাধারণজন, তার প্রাণশক্তি কিংবার বাঁচার প্রেরণার জায়গাটি আসলে কোথায়, কেনো, কেমন তা মনে আনা চাই। তা মনে না এনে কোনো দেশ বা জাতিগোষ্ঠীর মৌলিক ভাবধারাকে কখনো চেনা যাবে না। চান-সুরুজ-গ্রহ-তারায় ভরা আসমান / বন্ধু গো, আমিও তো গাইলাম কতো গান- তা আসলে বাংলালোকের ভাব। সাধারণের মনে মুখের চোখের ভাব। গান। বাংলার ভাব তো চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারাকে সঙ্গে নিয়ে, প্রকৃতিকে চিনেজেনেই দিনমাসলগ্ন চিহ্নিত করেছে। কেনো পরমহংস সৌন্দর্যের ভাবাদর্শ-যার জন্মভূমি বাংলা হলেই, আর তা যদি অন্য দেশের আন্তরিক সংবর্ধনায় পৌঁছে গিয়ে কোনো বিদ্যালয়ে পাঠ্য হয় কেবল তখনই তাকে বাংলার ভাব বলে গর্ব করবো- তা তো নয়। তাকে বুঝতে এর আসল সৌন্দর্যের জায়গাটা দেখতে-ভাবতে কেমন তা মনে রেখেই। তিতুমীর তো বাংলার বীর। তার ভাবটুকু তো একসময় একনিষ্ঠ ইসলামিক। আর জীবনবোধ তো সর্বসাধারণের পক্ষে দেশাত্মবোধে। এখন বুঝতে হবে বাংলার ভাব ভেবে আমরা তার কোনটিকে বেশি করে নেবো। কোনো জীবনকেই এককথায়, এর বিশেষণে চিহ্নিত করা ঠিক নয়। নানান বিষয় আর ঘটনারাশির মাঝ দিয়েই জীবন এগুতে থাকে। তবে তিতুমীর শেষ পর্যন্ত সর্বসাধারণের পক্ষে তার লড়বার দেশাত্মবোধের জায়গাটিতেই বিশেষিত। আর কিশোর ক্ষুদিরামকে নিয়ে.... দশ মাস দশ দিন পরে / জন্ম নেবো মাসীর ঘরে .... গানের এই ভাবটুকু অবশ্যই বাংলার ভাব। কথাটা আবেগঘন হলেও তাই কিন্তু বাংলার অন্তরলোকের একটা খাঁটি জায়গা। কোনো সম্প্রদায় আর ধর্মাধর্মের আবরণ দিয়ে বাংলার প্রকৃত ডাকনামকে আড়াল করা যাবে না। কোনো বিষয় আর ঘটনা, কোনো জীবন কখনো সময়ের হয়েই, সাথে সকলের জন্যেই চিরকালের হয়ে উঠতে পারে। খুব সাধারণের মনে জীবনে, জীবনযাপনের  ধরনে, ভাবনার গড়নে এমন অনেক চিন্তা বিশ্বাসবোধ কাজ করতে দেখি যাতে বাংলার ভাবের খোলামেলা রকমটিকে খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন সুসংদুর্গাপুরের সেই ‘মুসলিম’ যুবক সুমেশ্বরী নদীর মাঝ থেকে বহুদুরের এক মেঘঢাকা পাহাড়কে দেখিয়ে মন থেকে আমাকে বলেছিলো -ঐ যে দেখা যায়, অইটাই কৈলাস। এরপর সে তার স্বাভাবিক বর্ণনায় যা বলেছিলো তাকে কেউ কাব্য জ্ঞান করতে পারেন। কিন্তু তার ভাবের প্রকাশ আমার এখনো মনে আছে। সে বলছিলো-কৈলাসের মধ্যখানে-সুন্দর একটা ঝর্ণা আছে। পানি কিন্ত নীলবর্ণ। বিরাট গভীর। সে কবি নয়, কিন্তু এটাই তার ভাবের প্রকাশ। আপনভাষা। আমি মনে করি বাংলার ভাব এরকম মুখের কথাতেই। কথার ধরনে। গানের আলোচনায় এসব বলবার কারণ কিন্তু ভাবটুকু আসলে কোথায়, সুরের ভাষাটাকু আসলে কোথায়, তা কখন কিভাবে কেনো আমাদের ভাবতে শেখায় তা জানাবার জন্যই বলা।

ব্যাপারটা স্বতঃসিদ্ধ। বোধের খোলামেলা স্বাধীন জাগরণের। কিন্তু সেই নির্দিষ্টকরণ, সেই **** বা কোনো সুশৃঙ্খল সংজ্ঞাবাদে এসে বাংলার ভাব আটকে যাবে কেনো? সাদা বসন, সাদা ঘোড়া, সাতপাক-তা ব্রাত্যজনের পছন্দ রূচি ভঙ্গিমার একান্ত ঘটনা। সেক্ষেত্রে লালন নিজস্ব পরিসরে যা পেরেছেন তা যদি সকলের জন্য কিংবা সর্বকালের জন্য নির্দিষ্ট করতে চাইতেন, তবে সে নিজেও কিন্তু তাতে আক্রান্ত হয়ে সেই সীমানাতেই আটকে যেতেন। তবে লালন জীবনকালে এসবের অনেকটা আঁচ করেছিলেন বলেই একটু ইঙ্গিত করেছেন - কুতর্কের দোকান সে করে না আর।

একটা সংকটে পড়েই, না হয় কোনো রূপের বা অরূপের সামনে নানান প্রশ্ন আর প্রশ্নলোকের উত্তর খুঁজে পেতে জীবন-জগতের সাথে বিজড়িত মানুষজন গেয়েছিলো- এ সমস্যার অনুসারে ভিন্নবিধান হইতে পারে। যুগসঞ্চিত বহু সমস্যার আর বিরোধের পথ পাড়ি দিয়ে ভিন্ন বিধান রচনার আগে গানের সাধককে ভাবতে হয় অনেক। বুঝতে হয় সত্য-মিথ্যার নানান কারণ-অকারণ। চেতন-অবচেতন। যাচাই-বাছাই। চিন্তাকে জীবনে জড়িত না করে তো অন্তরে দিব্যজ্ঞানের আলোকবিন্দুবীজ বপন হয় না। আর বিধান কিংবা কানুন সে তো প্রথমে নিজের জন্যে। অন্যের উপর তাকে চাপিয়ে দেয়ার পথটা বোধয় সাধকের নয়। সমস্যা তখনই যখন আত্মতত্ত্বের নামভেদে নিজেকে আলগা খোঁপার মতোই মস্তকে পরিয়ে এমন সাজে সাজানো হয় যে, যে কোনো ক্লিপ খুলে সহজ মানুষকে খুব সহজেই একটানে ছিন্ন করার সুবিধাটা রাখা হয়। অনেককাল আগেই চৈতন্য বোধয় সেজন্যই ইঙ্গিতটা করেছিলেন- বাউল কহিও না হইও আউল / বাউলকে কহিও বিক্রি না করিও চাউল / বাউলকে কহিও ইহা কহিয়াছে বাউল।

(চলবে)

 
Untitled Document
Total Visitor : 708315
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By : Life Yard