Untitled Document
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী

 
দুর্বল ভিত, সবল রাষ্ট্র : বেগুনবাড়ি ট্র্যাজেডি এবং নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের-র অভিজ্ঞান
-শুভ কিবরিয়া
১.
ওকিনাওয়া দ্বীপ থেকে মার্কিন ঘাঁটি সরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমরা তা করতে পারিনি।
সরকারের কাজে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটছে না। তাই আমি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
-ইউকিয়ো হাতোইয়ামা
পদত্যাগকারী জাপানি প্রধানমন্ত্রী
(সূত্র : প্রথম আলো ॥ ৩ জুন ২০১০)

সম্প্রতি জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপ থেকে মার্কিন ঘাঁটি যেখানে ৪৭ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে, সেই সেনা ঘাঁটি না সরানোর সিদ্ধান্ত নেয়ায় দেশে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েন জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইউকিয়ো হাতোইয়ামা । এর জেরেই ২ জুন ২০১০ প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে তিনি পদত্যাগ করেন। গত সেপ্টেম্বরে নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অব জাপান তাদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অব জাপানের অর্ধশতাব্দীর শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসীন হন। ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অব জাপানের নেতা পদত্যাগী প্রধানমন্ত্রী ইউকিয়ো হাতোইয়ামা নির্বাচনে প্রচারাভিযান চালানোর সময় প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় গেলে তিনি এ বছরের মে মাসের মধ্যে ওকিনাওয়া দ্বীপ থেকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে নেবেন। কিন্তু সম্প্রতি এই প্রতিশ্র“তি থেকে সরে আসেন হাতোইয়ামা। এর জেরে হাতোইয়ামার ক্ষমতাসীন জোটে ভাঙন ধরে। ফলে পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী হাতোইয়ামা।
জনগণের ইচ্ছা, তাদের কাছে দেয়া প্রতিশ্র“তি থেকে সরে আসা এবং পদত্যাগের নমুনা, প্রমাণ করেও জাপান-রাষ্ট্রর ব্যবস্থার শক্তিমত্তা।



২.
নানা কারণ দেখিয়ে বিশেষত রাষ্ট্রের সংহতি, নিরাপত্তা এবং সুশাসনের অজুহাতে ফেসবুক বন্ধ করেছে বাংলাদেশ সরকার বেশ কদিন হলো। গণমাধ্যমসহ নানা জায়গায় এ নিয়ে প্রতিবাদ হতে থাকে। সরকার এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে বলে আশাও বাড়তে থাকে। এ ব্যাপারে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব সুনিল কান্তি বোস দৈনিক সংবাদপত্র ‘কালের কণ্ঠতে এক মন্তব্য দিয়েছেন। পাঠকরা মন্তব্যটি পড়তে পারেন-

ফেসবুক বন্ধ থাকার কারণে সে ধরনের কোনো ন্যাশনাল ক্রাইসিস (জাতীয় সঙ্কট) হচ্ছে বলে আমি মনে করি না। এর (ফেসবুকের) অনেক উপকারী দিক আছে, সেটা স্বীকার করি; কিন্তু অপকারী দিকও তো রয়েছে। অপকারী দিকগুলোর মাত্রা বেড়ে গেলে একটা ব্যবস্থা তো আমাদের নিতেই হবে। অনেকে বলেছেন, মাথাব্যাথার কারণে মাথা কেটে ফেলা হয়েছে। আসলে বিষয়টি তেমন নয়। মাথাব্যাথা সারাতে ডাক্তাররা এ পরামর্শও দেন যে, কয়েকদিন বিশ্রামে থাকেন এবং ইনটেলেকচ্যুয়াল কোনো কাজ করবেন না। আমাদের ব্যবস্থা গ্রহণও অনেকটা সেই ধরনের।
[সূত্র : কালের কণ্ঠ ॥ ৩ জুন ২০১০]

৩.
সরকারের উজির-নাজির, কেরানীদের এসব বক্তব্য গায়ে মাখলেও চলে, একে অবজ্ঞা করাও যায়। কেননা কথিত শিল্পায়ন, ডিজিটাল গ্রাম, ডিজিটাল বাংলাদেশ বলে বলে যে আওয়ামী লীগ মুখে এতকাল ফেনা তুলেছে, তার সঙ্গে এই সচিবের ডাক্তারী পরামর্শ একেবারেই বেমানান। বরং আমরা সরকারের রাজনৈতিক অংশের দৃষ্টিভঙ্গির দিকে তাকাতে পারি।
সরকার চাইছে বিরুদ্ধতা বন্ধ করতে।
পৃথিবীব্যাপী এই রোগের নানান দাওয়াই আছে।
আমেরিকার বিখ্যাত প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের দাওয়াই তার অন্যতম।
ইরাক, আফগানিস্তানে তিনি সেই দাওয়াই দিয়েছেন।
হয় আমার পক্ষে এসো নয় তুমি শত্র“ হিসেবে চিহ্নিত- বুশ জমানার এই দাওয়াই, পৃথিবীব্যাপী এখনো চলছে। বুশ সাহেবদের বড় মিত্র ইসরাইল তার বড় প্র্যাকটিশনার।
বুশ গং-এর এই দাওয়াই নিয়ে পরীক্ষা চালাতে গিয়ে বিপদে পড়েছে পাকিস্তান। এখন বরং মিত্ররাই তাদের শত্র“তে পরিণত হচ্ছে।
‘আফগানিস্তানে’- এই দাওয়াই কাজে লাগছে না।
সুতরাং, দুনিয়াব্যাপী খেয়াল করলে দেখা যাবে, রাজনৈতিক সরকার যখন অরাজনৈতিক পথে শক্তি দেখানোর চেষ্টা করে তখন তার ফল কোথাও ভালো হয়নি, হয় না।
১৯৭১ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতি তার বড় প্রমাণ। একই ভুলের কারণে খুন, রক্ত, অনাচারীয় শাসন এখানে বারবার ফিরেছে।
১৯৯০-২০০৬ জমানার শেষটার্মে ২০০১-২০০৬, তারেক জিয়া বা বিএনপির গায়ের জোর কি বিপদ, বিপত্তি আনে তার স্মৃতিও সুখকর নয়।

৪.
এসব অতীত অসুখ আমাদের হুঁশ দেয় নাই।
আইনজীবি ব্যারিস্টার রফিকুল হকের কথা ধার করে বলতে হয় সরকারের মাথা থেকে এখনো ১/১১-এর ভূত নামেনি।
ভূত নামেনি কেন?
বাংলাদেশ এখনো ‘রাষ্ট্র’ হয়ে উঠেনি বলে।
রাষ্ট্র হয়নি কেননা এখানকার প্রতিষ্ঠানগুলো দাঁড়ায়নি।
সংবাদপত্র, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন- এসব প্রতিষ্ঠান বা খুঁটি যার ওপর ভিত্তি করে নাবালক রাষ্ট্র সবল হয়, তার পথে বাংলাদেশ হাঁটেনি। তাই সামরিক শাসকেরা এখানে দীর্ঘতম সময় ধরে রাষ্ট্রশাসন করেছে।
সুতরাং, রাজনৈতিক সরকারের বড় দায়িত্ব ছিল, রাষ্ট্রের খুঁটিগুলোকে সবল করা।
সবচেয়ে বড় কাজ ছিল রাজনৈতিক সরকারের স্বাধীন মিডিয়া, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা।
এবার অনেক দুর্যোগ, দুর্বিপাকের পরে আওয়ামী লীগ সেই সুযোগ হাতে পেয়েছিল।
কিন্তু, তারাও পথ ভুলতে বসেছে।
উল্টো পথে হাঁটছে তারাও।

৫.
ভিত দুর্বল হলে কি হয়?
অট্টালিকা বড় হলেও সে পড়ে যায়।
মানুষ মেরে নিজের মৃত্যু ঘটায়।
রাজধানী ঢাকার বেগুনবাড়ির সাম্প্রতিক ঘটনা তার বড় প্রমাণ।

সেই রেশ কাটতে না কাটতেই পুরনো ঢাকার নিমতলীর ভয়াবহ প্রবল-সবল আগুনের মুখোমুখী হতে হলো আমাদের। একশ’র উপরে মানুষের অগ্নিদগ্ধ মৃত্যুর খবরে এখন সারা জাতির জীবনে শোক-দুঃখ চলছে।
কিন্তু, এটাও তো ভাবার দরকার, এগুলো কেন ঘটছে?
আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক কাজ-কম্মো চলছে।
কোনো নিয়ম নেই। কেউ দেখবারও নেই।
ভিত ছাড়াই বেগুনবাড়িতে বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে। কেউ দেখার নেই। চলছে অরাজকতা। অনিয়ম। গায়ের জোরে।
আর তাই বিপদ এড়ানো যাচ্ছে না।
‘রাষ্ট্র’ ঠিক একই রকম। এখানে নিয়মটা চালু রাখতে হয়। অনিয়ম বন্ধের স্বাভাবিক পথগুলো খোলা রাখতে হয়। নইলে রাষ্ট্রের ভিত উপড়ে পড়ে। আগুন ধ্বসিয়ে দেয় সব। ‘রাষ্ট্র’ আর তখন ‘রাষ্ট্র’ থাকে না। আধুনিক জগতে তাকে বলে ‘অকার্যকর রাষ্ট্র’।
ভয়টা সেখানেই।
রাজনীতি এবং রাষ্ট্র যদি নিয়ম না মানে। গায়ের জোরে সব কিছুকে চালাতে চায় তবে বিপত্তি ঘটবার সম্ভাবনা খুবই বেশি। সেই বিপত্তিটা এড়াতে হলে সাবধান হতে হবে।  





Untitled Document
Total Visitor : 709181
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By : Life Yard