Untitled Document
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী

 
শিল্পীর অনুপস্থিতি ও দর্শকের জন্ম
-মোস্তফা জামান

(পূর্ব প্রকাশের পর)

অপর অর্থে প্রশ্ন হচ্ছে, এই মনন বা বিশ্বাসের চিহ্ন শিল্পবস্তুতে যদি খুঁজে না পাওয়া যায় তাহলেও কি আমাদের অর্থাৎ দর্শকদের সেটির অনুসন্ধানে নামতে শিল্পীর দ্বারস্থ হতে হবে? এই প্রশ্নটি উত্থাপন করতে হচ্ছে এই জন্যে যে, বাংলাদেশের শিল্পী শিল্পটি কোন বিশ্বাস বা সাধনা থেকে জন্ম নিলো (যদি শিল্পে তার হদিস নাও দিতে সক্ষম হন) এবং কোন ব্যক্তিগত মানসিক প্রক্রিয়া ও প্রকল্পের মাধ্যমে জন্ম নিলো এই বিষয়টিকে শিল্পের বিচারে সবার আগে  প্রণিধানযোগ্য বা পাঠযোগ্য বিষয় বলে মনে করেন।অথচ শিল্পের প্রজেক্ট শিল্পে স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়, যদি ফাঁক থাকে তার মধ্যে তা বিষয়বস্তুর উপস্থাপনা ও অঙ্গীকার ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে দেখা দেয়।  
শিল্প বিচার মানে হচ্ছে শিল্পের পরিপ্রেক্ষিত আবিষ্কার : কোন বিষয় এতে বর্তমান, কোন সামাজিক সূত্র হতে এর আগমন। অথবা পূর্ববর্তী কোন কোন শিল্পের পরিপ্রেক্ষিতে এটি তাৎপর্যপূর্ণ, এমনকি কোন সামাজিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে এটি আমাদের চোখে এর রাজনীতি ও নন্দন খুলে ধরে। যদি শিল্পেই এমন সব বিষয়ের প্রকাশ সম্ভব হয় তবে, এর পেছনের জটিল সৃষ্টি প্রক্রিয়া ধর্তব্যে এনে আরো গভীর বিশ্লে¬ষণ সম্ভব হতে পারে। এর পেছনের জটিল মানুষটির মানসিক আবহ এবং যে সমস্ত বিশ্বাস কেন্দ্র করে এই মানসিক আবহ তৈরি তার বিশ্লেষণও এই চেষ্টার সহায় হতে পারে। কিন্তু এও মনে রাখা দরকার যে, শিল্পবিচার করতে গিয়ে যদি শিল্পীর মনোজগত নিয়ে গবেষণা করতে হয় তবে, শিল্পকে মুখ্য বিষয় ধরে নেয়া হচ্ছে না। মুখ্য হয়ে যাচ্ছে শিল্পের উৎস। শিল্প সিমিওটিক পদ্ধতির মতো- এর তাৎপর্য অন্য শিল্প, অন্য ভাষা, অন্য বাস্তবতা ও সৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের সামনে হাজির হয়।
শিল্পের উৎস মনোজগত, মনোজগতের বিশ্লেষণ করতে গেলে শিল্পীর দ্বারস্থ হতে হবে। শিল্পী তখন তার বিশ্বাস, ভ্রান্ত বিশ্বাস, অবসেশন, পক্ষপাতিত্ব (নানান বিষয়ের প্রতি), আবেগ, বুদ্ধি, ব্যক্তিত্ব, রুচি ইত্যাদি তার নিজের মতো করে পেশ করবেন। যদি
শিল্পে মনোজগতের, রুচির (যদি কেউ রুচির ছাপ শিল্পে রাখতে চান) চিহ্ন না ফোটে তবে সেটি শিল্পীর ব্যর্থতা। শিল্পী ও শিল্পের এই ব্যর্থতা ঢাকতেই শিল্প থেকে শিল্পীতে মনোযোগ দেয়ার দাবি উত্থাপিত কী?
শিল্প বিশ্লেষণে শিল্পীর দ্বারস্থ হলে যা ঘটে, তা হলো :
শিল্পী তার শিল্পে যে মননের ছাপ দিতে চেয়েছেন সেটি তার কাজে অনুপস্থিত থাকলেও তা নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। দূর করতে পারেন প্রকাশিত (শিল্প) ও অপ্রকাশিতের (মনোজগত) এই দু’য়ের দূরত্ব, ভাষা বা ভাষ্য দিয়ে সাধন করতে পারেন এই কর্ম।

শিল্পকে গৌণ করে তুলে, শিল্পের রস আস্বাদনে রসদাতার নির্দেশ অনুযায়ী একমুখী দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা। অর্থাৎ রস আহরণের বিভিন্ন উপায় নাকচ করে দেয়া, এর পাঠ নির্দিষ্ট করে দেয়া।
শিল্প যে একটি আলাদা বস্তু, অর্থাৎ শিল্পীর সৃষ্টি হলেও এটি শিল্পের জগতের একটি উদাহরণ এবং বিশ্বাস-জাগানিয়া বস্তু হয়েও স্রষ্টার বিশ্বাসের সাথে এর ছেদ হয়ে গেছে তা অস্বীকার করা। এক্ষেত্রে স্রষ্টা সৃষ্টি করেও এর নাড়ী কাটতে চাইছেন না- এই জন্যে যে, তার সত্ত্বা ও মতামত যেন তার শিল্পকে মূল্যবান করে তুলতে পারে। তার সত্ত্বা থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় এই শিল্পবস্তুর স্বাধীন সত্ত্বা হিসেবে স্বীকৃতি না দেয়ার মানে হচ্ছে একে তার মূল্যের অধিক মূল্য দেয়ার চেষ্টা।
সর্বোপরি বিশে¬ষণ ও বিচার রোহিত করা। অর্থাৎ শিল্পের বিচারের বিষয়টির ওপর স্রষ্টার কর্তৃত্ব বজায় রাখা।
শেষের এই বিষয়টিই সবচাইতে ক্ষতিকর, যেটি সাধন করতে এর আগের কর্মগুলোও জরুরী। বিচার ও বিশ্লেষণ রোহিত করা, পাঠ নির্দিষ্ট করে দেয়া এবং স্রষ্টার কর্তৃত্ব প্রয়োগ করা, এই সব মিলিয়েই শিল্পকে ধর্মের পর্যায়ে উন্নীত করা।
শিল্প দর্শকের সম্মুখে বিদ্যমান, তিনি (দর্শক) এটি গ্যালারির দেয়ালে ঝোলানো অবস্থায়, অথবা কোনো বিশেষ স্থানে স্থাপিত অবস্থায় দেখছেন, কিন্তু দর্শক এটিকে শিল্পের নানা অভিধা দিয়ে বিচার করতে পারবেন না। এই অবস্থাটি শিল্প সৃষ্টির জন্য কতো সহায়ক তা আমাদের এখন ভাবতে হবে। তার আগে শিল্পের অভিধাগুলো কী, তা জেনে নেয়া জরুরী।
বাস্তববাদ, পরাবাস্তববাদ, ঘনবাদ, পপশিল্প, অভিব্যক্তিবাদ, বিমূর্ততা, আধুনিকতা, উত্তরাধুনিকতা, পিউর বা শুদ্ধ শিল্প, অপশিল্প বা রুচিসম্মত শিল্প এইসব নানান অভিধার মধ্যে দর্শক হাবুডুবু খাচ্ছেন। তিনি এ কারণেই শিল্পীর দ্বারস্থ হচ্ছেন সংজ্ঞা, চরিত্র ও বর্গ নির্ধারণ করার জন্য। শিল্পের চরিত্র নির্ধারণ করার জন্য শিল্পীর ভাষ্যকে সবচাইতে মূল্যবান মনে করছেন। যদি শিল্প ও শিল্পের ভাষ্যের দূরত্ব যোজনও হয়, তবুও তা বুঝতে পারছেন না। কারণ এই দর্শকও শিল্পকে শিল্পীর অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে মনে করছেন।
শিল্প প্রথমত একটি বুদ্ধিবৃত্তিক মননের সৃষ্টি। দ্বিতীয়ত এটি সৃষ্টির পরপরই একটি সম্পূর্ণ সত্ত্বা হিসেবে বহির্জগতের অংশে পরিণত। একটি শিল্পবস্তু সৃষ্টির সময় কেবল শিল্পীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি, প্রদর্শিত হবার সাথে সাথেই এটি সামাজিক বস্তু। এভাবে শিল্পী তার নিজ সৃষ্ট বস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারান। একটি সামাজিক ঐতিহাসিক শক্তি এর স্থান দখল করে নেয়।
এই শক্তিটি মূলত একটি জাতির সম্মিলিত ইতিহাস-চেতনা, সমাজ-চেতনা ও নন্দন- চেতনার ফলাফল। এই শক্তিটি আমাদের সমাজে দুর্বল। কারণ আমাদের ইতিহাস ঐতিহাসিকভাবেই একটি স্বল্পকর্ষিত ক্ষেত্র, এমনকি কর্ষণ প্রক্রিয়া অনেক দোষে দুষ্ট। প্রাক্তন কলোনী হয়ে, ও কলোনাইজারদের জ্ঞানকে দিব্য-জ্ঞান মেনে, আমাদের আপন যা কিছু তাকে পর হিসাবে দেখবার বৃত্ত তৈরি হচ্ছে।  এর ফলধার করা অথবা আকার-আকৃতিতে আপনার জ্ঞান বা ঐতিহ্য এমন বিষয়বস্তু নির্ভর সংস্কৃতিতে আমরা বিলীন হয়ে আছি।  
জাতি পরিচয় বিষয়ে যেমন আমাদের কুয়াশা কাটেনি, তেমন শিল্প বিষয়েও আমাদের অপক্কতা বর্তমান। নিজস্ব সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ও নন্দনতাত্ত্বিক ভাষ্য আমরা নতুন শতকে প্রবেশ করেও তেমনভাবে পাচ্ছি না। জাতি হিসেবে আমাদের সংস্কৃতি, সমাজ, ইতিহাস ও নন্দন নিয়ে ভাবনার ঘাটতি আছে। সবক্ষেত্রে এই ঘাটতি পূরণের পন্থা আবিষ্কার এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। তবে নন্দনতত্ত্ব ও শিল্পের ইতিহাস নিয়ে কিছু বলার থাকে।
একেক ভাষ্যকার একেক নন্দন ও শিল্প-ইতিহাস তুলে ধরতে পারেন, তখন শিল্পের দর্শকতো আরো বিপাকে পরবেন, এমন প্রশ্ন উঠতে পারে। এমন হলে দর্শক বিপাকে পরবেন না। কারণ যতো মত ততোই পথ পরিষ্কার সম্ভব হয়ে ওঠে। মতের বিভিন্নতা দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়, আর দ্বন্দ্ব ছাড়া সত্যে উপনীত হওয়ার অন্য কোন বিকল্প মানব সভ্যতার ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায় না।

(চলবে)


Untitled Document
Total Visitor : 708710
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By : Life Yard