Untitled Document
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী

 
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল
- মার্জিয়া লিপি

 জীববৈচিত্র্য :
কোন নির্দিষ্ট এলাকার জীববৈচিত্র্য বলতে উক্ত ভূ-খন্ডে বা জলসীমায় বিরাজমান যাবতীয় প্রজাতির প্রাণী  ও উদ্ভিদকে বুঝায়। অর্থাৎ জলে, স্থলে অন্তরীক্ষে অর্থাৎ স্বাদু ও সামুদ্রিক জলাশয় সমূহে, মাটি, বাতাস, পৃথিবীর সর্বত্র বসবাসকারী সকল প্রকার জীবের মধ্যে বিরাজমান প্রজাতিগত, জিনগত ও পরিবেশগত বিভিন্নতাই হলো জীববৈচিত্র্য। অর্থাৎ পৃথিবীতে বিরাজমান জীবসমূহের সামগ্রিক সংখ্যা, প্রাচুর্য ও বিভিন্নতাকে জীববৈচিত্র্য বলে।
পৃথিবীতে বিরাজমান জীবসমূহের সামগ্রিক সংখ্যা, প্রাচুর্য ও তাদের মধ্যে বিভিন্নতাকে জীববৈচিত্র্য বলে। পৃথিবীতে যত জীব বিরাজমান তাদের মধ্যে গঠনগত, উপাদানগত ও কার্যাদির পার্থক্য রয়েছে। এই পাথর্ক্যের জন্যই জীবের মধ্যে নানা বৈচিত্র্যের দেখা দেয়। জীববৈচিত্র্য পরিবেশীয় ভারসাম্য রক্ষা তথা পুষ্টিসহ অন্যান্য বিষয়ে পরস্পরের মধ্যে সহযোগিতা দ্বারা জীবের প্রাচুর্য ঘটে এবং জীবের ধ্বংসের কারণেই পরিবেশের বিপর্যয় ঘটে।
জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব :
জীববৈচিত্র্যের ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ তার প্রথম এবং প্রধান কারণ প্রকৃতির সংস্পর্শ ব্যতীত মানব জীবন ধারণ অসম্ভব। পৃথিবী নামক গৃহে জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা প্রত্যেক সচেতন মানুষের কাছে স্পষ্ট। জীববৈচিত্র্যের কারণে পৃথিবী এত সুন্দর। নিম্নে জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করা হল :
অর্থনৈতিক গুরুত্ব :
পৃথিবীর পৃষ্ঠে ছড়িয়ে থাকা লক্ষ লক্ষ বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী থেকে প্রাপ্ত দ্রব্যাদি অর্থনীতিতে নানাভাবে ভূমিকা রাখছে। মৌলিক চাহিদার মধ্যে মানুষ বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ্ব ও প্রাণীজ উৎস থেকে খাদ্য, বস্ত্র, ঔষধ, শিল্পজাত পণ্য, জ্বালানি, বাসস্থান তৈরীর সরঞ্জাম পেয়ে থাকে। প্রায় সাত হাজার উদ্ভিদ প্রজাতিকে আমরা খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করি। উদ্ভিদ প্রজননের বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে উদ্ভাবিত হচ্ছে উচ্চ ফলনশীল শস্য। জৈব প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে ভবিষ্যতে অনেক প্রজাতির জীবকে নানা কাজে ব্যবহার করা যাবে। জীব বৈচিত্র্যের অবসান ঘটলে ভবিষ্যতে সম্ভাবনা বাধাগ্রস্থ হবে।
উল্লেখ্য, আমাদের অর্থনীতির সাথে সম্পর্কযুক্ত বিভিন্ন প্রকল্প, প্রতিষ্ঠান এবং শিল্প কারখানা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নানাবিধ উদ্ভিদ ও প্রাণীজ উৎসের উপর নির্ভরশীল ।
                                     কৃষিকাজ ও চাষাবাদ
                                     মৎস্যচাষ ও মৎস্য
                                     কাঠ সম্পদ ও শিল্প
                                     রেশম চাষ ও রেশম শিল্প
                                     কুটির শিল্প
                                     মৌমাছি ও লাক্ষা চাষ
                                     ঔষধপত্র

তৃতীয় অধ্যায়
উপকূলীয় পরিবেশে জীববৈচিত্র্য

উপকূলীয় পরিবেশ :
বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। ইহার দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে সাতক্ষীরার জেলার হরিণভাঙ্গা নদী থেকে আরম্ভ করে পূর্বাংশে কক্সবাজার পর্যন্ত ৬৫০ কিলোমিটার বিস্তৃত যে তটরেখা- উহাই বাংলাদেশের উপকূল। সাগরের তীরে অবস্থিত জোয়ার-ভাঁটায় প্লাবিত ভূমিকে উপকূল ধরা হয়। এই বিস্তৃত উপকূল ভাগের সব জায়গায় একই পরিবেশ না। উপকূলের পূর্বদিকে পাহাড়ীয়া এলাকা। এখানে আছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, আছে প্রবাল প্রাচীর। অন্য দিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে লবণ-পানির জোয়ার-ভাঁটায় সৃষ্ট ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন।

পদ্মা বাংলাদেশের একটি প্রধান নদী। ইহা হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে উৎপত্তি হয়ে গঙ্গা নামে ভারতের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার উত্তর প্রান্ত দিয়ে পদ্মা নামে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। দক্ষিণ-পূর্বাদিকে প্রবাহিত হয়ে গোয়ালন্দের নিকট যমুনা ও চাঁদপুরের নিকট মেঘনা নদীর সাথে মিলিত হয়ে তিন নদীর মিলিত স্রোতধারা মেঘনা নাম ধারণ করে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়। তিন নদীর মিলিত এই স্থান মেঘনা মোহনা নামে পরিচিত। পদ্মা বাংলাদেশের পশ্চিম প্রান্ত হতে প্রায় পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। চলার পথে হিমালয় পর্বতের নুড়ি, শিলাচূর্ণ, পাথরকুচি প্রভৃতি নিয়ে মেঘনা মোহনায় গড়ে উঠেছে অসংখ্যা ব-দ্বীপ। নদীর মোহনায় ত্রিকোণাকৃতি নতুন জেগে ওঠা ভূমিকে ব-দ্বীপ বলে। যেমন : ভোলা, নোয়াখালী, কুতুবদিয়া, সন্দীপ  ইত্যাদি। পদ্মা যখন বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে তখন ইছামতি, কুমার, মাথাভাঙ্গা ও গড়াই নামে চারটি শাখা নদী সোজা দক্ষিণমুখী হয়ে কুষ্টিয়া ও যশোর জেলার  দক্ষিণে সামান্য পথ অতিক্রম করেই পদ্মার প্রচুর পলি ও মিষ্টি পানি বঙ্গোপসাগরে পৌঁছে দেয়। তখন আজকের  খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা জেলার উৎপত্তি হয়নি। নদীর মোহনায় দিনে দুইবার জোয়ারের প্রভাবে পলি জমা পড়ে অতি দ্রুত গড়ে তোলে অসংখ্য ব-দ্বীপ।  ব-দ্বীপে সৃষ্টি হয় নূতন পলি আধিক্য কাদা মাটির নিম্নভূমি। প্রতিদিন জোয়ারে ডুবে যায় আবার ভাঁটার জেগে ওঠে। সামান্য লবন পানি ও মিষ্টি পানির মিলিত স্রোতধারায় বিধৌত হয় এই ব-দ্বীপ অঞ্চল। এই নিম্ন সমতলভূমিতে জন্ম নেয় গরান জাতীয় শক্ত কাঠের ম্যানগ্রোভ বন। এভাবে সৃষ্টি হয়েছে আজকের এই সুন্দরবন।  দ্রুত সাগরের মধ্যে বনভূমি এগিয়ে যেতে থাকে, দূরত্ব বাড়তে থাকে মিষ্টি পানির উৎস পদ্মা থেকে। জনসংখ্যার বৃদ্ধিজনিত কারণে এলাকায় বসবাসকারী জনসাধারণ সুন্দরবনের উত্তরাংশের বন কেটে গড়ে তুললো মানুষের আবাসস্থল ও কৃষিকাজের আবদী জমি। এভাবে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে সুন্দরবন ধ্বংস করে  গড়ে ওঠে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলা। কুমার, মাথাভাঙ্গা, ভৈরব ও গড়াই নদীগুলি এইসব নতুন জনপদের উপর দিয়ে চলতে চলতে নাম পরিবর্তন করে হরিণভাঙ্গা, রায়মঙ্গল, মালঞ্চ, কপোতাক্ষ, শিবসা, পশুর, বলেশ্বর  ও হরিণঘাটা নামে বঙ্গোপসাগর মিলিত হয়। মোহনায় আজও ব-দ্বীপের সৃষ্টি অব্যাহত আছে। তবে পদ্মা হতে বঙ্গোপসাগরের দূরত্বে বেড়ে যাওয়া ও বিভিন্ন কারণে স্রোতের গতি কমে যাওয়ায় ব-দ্বীপ ভূমিতে মিষ্টি পানির প্রবাহ আর আগের মত নেই। মাটিতে পলির অংশ কমে গেছে। উপকূলের আনুমানিক ৫লক্ষ ৭৭ হাজার হেক্টর জায়গা নিয়ে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলায় গড়ে উঠেছে সুন্দরবন যার তটরেখা হরিণভাঙ্গা হতে হরিণঘাটা পর্যন্ত ১২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ।

জলবায়ুর উপর নির্ভর  করে গড়ে ওঠে পরিবেশ। আমাদের  উপকূলভাগ পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের অন্তর্গত উষ্ণমন্ডলে বা গ্রীষ্মমন্ডলে অবস্থিত। ২১ মার্চ তারিখে সূর্য বিষুবরেখার উপর দিয়ে লম্বভাবে কিরণ দেয়। যেহেতু বাংলাদেশ গ্রীষ্মমন্ডলে তথা উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত সেহেতু দিনরাত্রি সমান হয়। এভাবে পৃথিবী ঘুরতে ঘুরতে ২১ জুন তারিখে এমন অবস্থায় আসে যখন সূর্য কর্কটক্রান্তির উপর দিয়ে লম্বভাবে কিরণ দেয়। তখন আমাদের বাংলাদেশে তথা উত্তর গোলার্ধে দিন সবচেয়ে বড় ও রাত্রি সবচেয়ে ছোট হয়। এ সময় বাংলাদেশে বেশ গরম পড়ে। পৃথিবী ঘুরতে ঘুরতে ২৩ সেপ্টেম্বর তারিখে এমন অবস্থায় পৌঁছে গিয়ে সূর্য পুনরায় বিষুররেখার উপর লম্বভাবে কিরণ দেয় তখন আবার বাংলাদেশে দিন রাত্রি সমান হয়। এরপর ২২ ডিসেম্বর তারিখে সূর্য দক্ষিণ  গোলার্ধে মকরক্রান্তির উপর লম্বভাবে কিরণ দেয়। তখন বাংলাদেশে দিন সবচেয়ে ছোট ও রাত্রি সবচেয়ে বড় হয়। এ সময় আমাদের এখানে শীতকাল। বাংলাদেশের যশোর ও  ঝিনাইদহ জেলার উপর দিয়ে কর্কটক্রান্তির অবস্থান তাহলে দেখা যায় সূর্যের তাপ বিষুবরেখা হতে কর্কটক্রান্তি আবার কর্কটক্রান্তি হতে বিষুব রেখা  অর্থাৎ ২১ মার্চ হতে ২৩ সেপ্টেম্বর  পর্যন্ত গ্রীস্মকাল  ধরা যায়। এই সময় সূর্য এই এলাকায় লম্বভাবে কিরণ দেয়। সূর্যের তাপ প্রচুর পরিমান পড়ে। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর থাকায় প্রচুর জলীয় বাষ্পের সৃষ্টি হয়। জলীয় বাষ্প ভরা দক্ষিণ পূর্ব  মৌসুমী  বায়ু বছরের প্রায় ৯ মাস অর্থাৎ মার্চ হতে নভেম্বর মাস পর্যন্ত এই এলাকার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। সূর্যের প্রখর তাপে সাগরের পানি উত্তপ্ত হয়, বাতাস উত্তপ্ত হয়। উত্তপ্ত বায়ু ও ঘুর্ণি বায়ু থেকে সামুদ্রিক ঝড়ের সৃষ্টি হয়। আমাদের উপকূলে সাধারণত ঃ মে-জুন এবং অক্টোবর-নভেম্বর মাসে  ঘূর্ণিঝড় দেখা যায়, জলোচ্ছ্বাস ঘটে। জলোচ্ছ্বাসের ফলে আমাদের  উপকূলভাগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উত্তরবঙ্গে হিমালয়ের বরফ গলা পানিতে সৃষ্ট বন্যার ন্যায় উপকূলীয় জনপদ সাগরের লবণ পানির জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়। ঘর-বাড়ি ও ফসল ধ্বংস হয়। দক্ষিণে সুন্দরবন থাকায় জলীয় বাষ্পপূর্ণ বাতাস বনভূমির শীতল স্পর্শে ঘনীভূত হয়ে মেঘ হয়, বর্ষা ঝরায়। সাগরে  উত্থিত ঘুর্ণিঝড়ের দাপট বনভূমি কর্তৃক অনেকটা বাধাপ্রাপ্ত হয়। সূর্যের প্রচন্ড তাপ পড়ে একদিকে যেমন গরম পড়ে অন্য দিকে সুন্দরবন থাকায় মেঘ হয়, বর্ষা ঝরায় ফলে এখানকার জলবায়ু উষ্ণ এবং আর্দ্র। উষ্ণ এবং আর্দ্র জলবায়ুতে প্রচুর ফসল জন্মে। কিন্তু মানুষের বর্তমান কর্মকান্ডে পৃথিবীর পানি-বাতাস অত্যধিক উত্তপ্ত হয়ে জলবায়ুর পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটলে উপকূলের অমূল্যসম্পদ সুন্দরবনকে টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি ঘটবে।
(চলবে)



Untitled Document
Total Visitor : 709220
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By : Life Yard