Untitled Document
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
বাদল ভাইয়ের পুণ্যস্মৃতির উদ্দেশ্যে, জয়তু বাদল রহমান
-বেলায়াত হোসেন মামুন

কোনো কোনো সময় আসে যখন একজন মানুষই পুরো সময়কে নিয়ন্ত্রণ করে। একজন মানুষই অনেক কিছুর দায়িত্ব অন্ধের মত, মন্ত্রমুগ্ধের মত পালন করে যায়। এখনকার সময়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য বাদল রহমান একাই পালন করছিলেন অনেক মানুষের দায়িত্ব। তিনি তাঁর কাজ শেষ করে যেতে পারেন নি। কিছু কাজ মাঝপথে আর কিছু কাজ পরিকল্পনার স্তরে রেখেই তিনি ১১ জুন ভোরে চলে গেছেন জীবিত মানুষের জন্য অচেনা-অজানা জগতে। আমরা জীবিতরা ঐ দিকে তাকালে ঘুটঘুটে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাই না।

বাদল রহমান ছিলেন আমার কাছে একজন কল্পনার ক্ষমতাধর স্রষ্টা। ছেলেবেলায় বহুবার টেলিভিশনে ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’ দেখেছি, সে তখন অদ্ভুত এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। একজন কিশোরের একা খুলনা থেকে ট্রেনে ঢাকায় আসার মধ্যকার কাহিনীর চমৎকার নির্মাণ, কাহিনীর ভেতর থেকে ছেলেবেলাকার স্বপ্নের নায়ক হওয়ার পথ পেয়েছিলাম। একজন এমিলের সাহস, বুদ্ধিমত্তা, নেতৃত্বের ক্ষমতা দেখে আমরা অনেকেই এমনি হওয়ার স্বপ্ন দেখেছি। আমি জানি আমাদের দেশের বহু কিশোর একজন এমিল হওয়ার স্বপ্নের পথে হেঁটেছে অনেকটা পথ। আমার এই ছেলেবেলার নায়কের স্রষ্টাকে মনে হত এক অকল্পনীয় ক্ষমতার অধিকারী মানুষ। যিনি এমিলকে তৈরী করতে পারেন তিনি যে খুব সহজ মানুষ নন, তা সেই সময় এক প্রকার বিশ্বাসের মত হয়ে গিয়েছিলো। অন্যদিকে তিনি একজন চলচ্চিত্র পরিচালক। স্বপ্নের নায়ক, নায়িকা, খারাপ মানুষ, ভালো মানুষের এক ভিন্ন জগৎ এবং এই জগতের স্রষ্টা হলেন চলচ্চিত্র পরিচালক। ফলে এমন ক্ষমতাধর মানুষের সম্পর্কে যে ভীতিকর ধারণা, তাদের ক্ষমতার প্রতি সেই ছেলেবেলাকার যে অকুণ্ঠ আনুগত্য তা কি আমার একারই ছিলো নাকি সকল মানব শিশুরই এমন হয়? বর্তমান সময়ে আমার চলচ্চিত্রের তত্ত্ব, পরীক্ষা-নিরিক্ষা, মতবাদ ইত্যাদি বিষয়ের দিকে যে মনোযোগ তা আমি আমার ছেলেবেলায় কোথায় পাবো? এখনতো আমি বড় হচ্ছি, অনেক তত্ত্ব, মতবাদের মধ্যে বসবাস করি, ছেলেবেলার কল্পনার নায়কতো আর এখনকার নায়ক নন। এখনকার নায়কের হতে হয় মতবাদে, তত্ত্বে অথবা আদর্শের কান্ডারি, ঝান্ডাধারী।

ছেলেবেলার নায়ক এমিলের স্রষ্টা বাদল রহমানের সাথে পরিচয় বহুদিন আগে থেকেই কিন্তু ঘনিষ্টতা, একত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা অল্প দিনের। গতবছর (২০০৯) ফেডারেশনের সভাপতি হিসেবে তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর আমি বাদল ভাইকে পেয়েছি খুব কাছ থেকে। বাদল ভাই সভাপতি আর আমি যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। অনেকরকম কারণে গত একবছর বাদল ভাইয়ের সাথে আমার প্রায় প্রতিদিন এক ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা কোনো-কোনোদিন পুরোটা দিনই একত্রে কেটেছে। একজন নেতা হিসেবে, কর্মী হিসেবে, নির্মাতা হিসেবে, শিক্ষক হিসেবে এবং অভিভাবক হিসেবে আমার দেখা বাদল ভাইকে একজন পরিপূর্ণ সংস্কৃতিসম্পন্ন মানুষ মনে হয়। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন, বাংলাদেশের সামগ্রিক চলচ্চিত্র সংস্কৃতির বিকাশে তিনি যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন, চলচ্চিত্রের জন্য জীবন ক্ষয়কারী চিন্তায় তিনি যেভাবে আক্রান্ত থাকতেন সবসময় তার আঁচ কাছ থেকে পেয়েছি প্রতিদিনের প্রতিটি দেখায়। সবসময় নানা রকম পরিকল্পনায় ব্যস্ত থাকতে দেখেছি, সহজাত নেতৃত্ব গুনের অধিকারী হিসেবে পরিকল্পিত কাজগুলো করে ফেলতে পারার সক্ষমতায় বিস্মিত হয়েছি বহুবার। যে কাজের জন্য আমার আহার-নিদ্রা বিলুপ্ত হয়ে যেতো তাই বাদল ভাইকে করতে দেখেছি অনায়াসে। চেতনায় তিনি ছিলেন সর্বতোভাবেই গণমুখী। তা সে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনই হোক, নাট্য আন্দোলনই হোক কিংবা যে কোন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বলয়ে হোক। এলিটিষ্ট ড্রইংরুমের যে সংস্কৃতি যা বর্তমানে আমাদের সকল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেই ব্যাপকভাবে বিরাজমান, তা নিয়ে দুর্ভাবনায় বাদল ভাইকে আচ্ছন্ন থাকতে দেখেছি, তাতে পরিস্থিতির কোন উন্নতি ঘটুক আর নাই ঘটুক একজন তরুণ হিসেবে সাংস্কৃতিক চেতনা পতনের দ্রুত গতির এ সময়ে বিশ্বাস ধরে রাখার শক্তিতো বাদল ভাইয়ের কাছেই পেয়েছি। বাদল ভাই শিখিয়েছেন এ সবই একটি পচনমুখী সময়েরই প্রতিচ্ছবি। তিনি সংস্কৃতিকে ব্যাপক মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন। চলচ্চিত্র সংসদতো বর্তমানে প্রায় পুরোটাই বনেদি অভিজাতদের বৈঠকখানার মুচমুচে খাবারে পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতি একদিনেই তৈরি হয়নি। ধীরে ধীরে এই বনেদিয়ানার রোগে আক্রান্ত হয়েছে চলচ্চিত্রসংস্কৃতি।

বনেদিয়ানার বৃত্তের বাইরে আর একটি বৃত্ত থাকে তা অর্থনৈতিক শ্রেণীতেই হোক অথবা সাংস্কৃতিক বলয়ে। একটা ভদ্রলোকের সংস্কৃতি আর অন্যটি ছোটোলোকের সংস্কৃতি। আমাদের নাট্য আন্দোলন ও চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন এখন প্রায় পুরোটাই ভদ্রলোকের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। প্রায় বলছি একারণে যে, কিছু মানুষতো থেকেই যায় সব সময়েই। যেকোনো দলের ভেতরে ন্যূনতম একজন থাকে ভিন্নমত পোষণকারী। এই একজনই জ্বালিয়ে রাখে ভিন্নমতের অগ্নিস্রোতকে। তা ক্ষীণ এবং প্রায় নি¯প্রভ হলেও তাতো অগ্নিই। বিশাল ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের জন্য ঐ একটু নিভু-নিভু অগ্নিও ভয়ংকর। মুহম্মদ খসরু, বাদল রহমানদের আমার সেই বিশাল দলের মাঝে ভিন্নমত পোষণকারীই মনে হয়। আমি দেখেছি বাদল ভাইয়ের পরিকল্পনায় কিভাবে জায়গা দখল করে গণমুখী চেতনা। একটি জাতির চলচ্চিত্রিক চেতনাকে বিকশিত করার জন্য, সমৃদ্ধ এবং শাণিত করার জন্য মুহম্মদ খসরু এবং বাদল রহমানরা প্রায় অর্ধ শতাব্দী সময় ধরে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র শিক্ষার্থীতো বাদল রহমানই যিনি বর্হিবিশ্বে গেছেন চলচ্চিত্রে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের জন্য। সেই সময়টাতো এমন সময় যখন চলচ্চিত্রকে পেশা হিসেবে নেয়া ছিল দুঃসাহসিক। বাদল ভাই একদিন ঠাট্টাচ্ছলেই বলছিলেন, তখন বিয়ে করার ক্ষেত্রে পাত্রের প্রধান এবং একমাত্র যোগ্যতা ছিল সরকারী চাকুরী করা, আর বাদল ভাই সরকারী চাকুরী ছেড়ে দিয়ে চলচ্চিত্রে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন। বাংলাদেশের প্রথম ‘ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স’-এর মূল পরিকল্পনাকারী এবং সমন্বয়কারী হিসেবে, ফিল্ম আর্কাইভের ধারণা এই দেশে আমদানীকারক হিসেবে বাদল ভাইকে দেখা যায়। তিনি অধ্যাপক সতীশ বাহাদুরের সাথে আর্কাইভের রূপরেখা প্রণয়নের তৎপরতায় সামগ্রিক চলচ্চিত্রসংস্কৃতির মাত্রাকে উচ্চতর করার স্বপ্নেই বিভোর ছিলেন। বিগত শতাব্দীর আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে সাংবাদিক এবং উপমহাদেশের প্রথম বাঙালি মুসলিম চলচ্চিত্রকার ওবায়েদ-উল-হকের নেতৃত্বে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র নীতিমালা’ প্রণয়নে বাদল ভাই মূল কর্মশক্তি হিসেবে কাজ করেছেন। চলচ্চিত্র সংস্কৃতির কর্মকাণ্ডের পেছনে এত বেশি শ্রম এবং সময় তিনি ব্যয় করেছেন যে এমিলের পর আর কোন বড় ছবির পেছনে সময় তিনি দিতে পারেননি। পরিকল্পনা নিয়েছেন বারবার কিন্তু কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর অন্য অনেক কাজ এসে বাদল ভাইয়ের সময় কেড়ে নিয়েছে। তিনি ‘ছানা ও মুক্তিযুদ্ধ’ নির্মাণ করলেন ১৯৯৮ সালে। এমিল থেকে ছানায় আসতে তিনি ব্যয় করে ফেলেছেন একটি দীর্ঘ সময়। সেই ছানাও নানারকম জটিলতায় মুক্তি পেলো নির্মাণের প্রায় দশ বছর পর।

বাদল রহমানকে একজন চলচ্চিত্রকার হিসেবে যতটা সময় পাওয়া গেছে তার চেয়ে বহুবেশি সময় তিনি দিয়েছেন সাংস্কৃতিক আন্দোলন-সংগ্রামে। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে ‘জনতার মঞ্চ’ অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো। বাদল রহমান হলেন এই ‘জনতার মঞ্চের’ অন্যতম প্রধান সংগঠক এবং রূপকার। রাজনৈতিক বিশ্বাসে তিনি কখনো পতাকাবদলের রাজনীতিতে প্রবেশ করেননি। তিনি বরাবরই নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক বিশ্বাসের মধ্যে তাঁর কর্মকাণ্ডকে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। বিনিময়ে সেই রাজনৈতিক দল থেকে তিনি যথাযথ মূল্যায়িত হননি বরং নিগৃহীত হয়েছেন। আমি বাদল ভাইকে বর্তমানে একটি বিশাল পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হতে দেখেছি। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ফেডারেশন কেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে যে নানা গোত্র-বিভক্তি তা থেকে বের হয়ে আসার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব তিনি দিয়েছিলেন। সত্যিকার ভাবেই সংসদ আন্দোলনকে বাংলাদেশে কার্যকর ভূমিকায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাদল ভাইয়ের পরিকল্পনায় আমরা সবেমাত্র কাজ করতে শুরু করেছিলাম। এমন সময়ে বাদল ভাইয়ের চলে যাওয়া খুবই অনাকাঙ্খিত। মাত্র গত সপ্তাহের ৪ জুন, শুক্রবার, সারাদেশের সকল চলচ্চিত্র সংসদগুলো সম্মিলিতভাবে জাতীয় উদযাপন পরিষদের মাধ্যমে বাদল ভাইয়ের ৬২তম জন্মদিন উদযাপন করেছি। ঠিক এর এক সপ্তাহের পর ১১ জুন বাদল ভাই আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন তা আমাদের কল্পনাতেও ছিল না। আকস্মিকতার এই শোক বহন করার সামর্থ্য আমাদের নেই। জন্মদিনের ছবিগুলো এখন কেবলই স্মৃতি।

ফেডারেশনের নাম ১৯৭৩ সালের নামে ফিরে যাওয়া, ১৯৭৩ সালের ফেডারেশনের মূল লোগোকে রেখেই বর্তমান সময়োপযোগী লোগো তৈরি করা এবং ফেডারেশনের গঠনতন্ত্রকে সংস্কার করে তিনি সবেমাত্র তাঁর পরিকল্পিত কাজ করতে শুরু করেছিলেন। আমরা বাদল ভাইয়ের কর্মের চিন্তার গতির সাথে তাল মেলাতে হিমশিম খেলেও কাজ করে যাচ্ছিলাম। তিনি বঙ্গবন্ধুর শৈশব নিয়ে শিশু একাডেমীর অর্থায়নে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের মধ্যে ছিলেন। আরও একটি বড় নির্মাণ কর্মকাণ্ডে তিনি নিজেকে ব্যস্ত রাখছিলেন। শহীদুল্লাহ কায়সারের ‘সংশপ্তক’ উপন্যাস অবলম্বনে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রায় সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন।

বাদল ভাই বর্তমান সরকার ঘোষিত ‘ন্যাশনাল ফিল্ম ইনস্টিটিউট’ স্থাপন, ‘জাতীয় চলচ্চিত্র ও সম্প্রচার নীতিমালা’ প্রণয়নের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করছিলেন, এখন তাঁর অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের অন্যান্য সব সময়ের সবকিছুর মতই এই অতি প্রয়োজনীয় কাজগুলোর কি হবে তা অনিশ্চয়তার অন্ধকারেই থাকলো। বর্তমানে বাদল ভাই ফিল্ম সেন্সর বোর্ডের সদস্য হিসেবে তরুণ এবং নতুন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য যে কার্যকর এবং প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করছিলেন তা থেকেও বঞ্চিত হবে নতুনতর, তরুণতর প্রজন্ম। মাত্র গত সপ্তাহে নুরুল আলম আতিক পরিচালিত ‘ডুবসাঁতার’ চলচ্চিত্রের কোন কর্তন ছাড়া সেন্সর সনদ পাওয়ার ক্ষেত্রে বাদল রহমানের বলিষ্ঠ ভূমিকা চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেলো। ডিজিটাল চলচ্চিত্রের সেন্সর ফি বর্তমানের ফি থেকে পঞ্চাশ ভাগ কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাদল ভাই কাজ করছিলেন। বাদল ভাইয়ের এইসব কর্মকাণ্ডের একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বলতে পারি চলচ্চিত্রে নতুন প্রজন্ম এবং চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি তাদের সবচেয়ে বড় অভিভাবককে হারিয়েছে। বাদল রহমানই সম্ভবত একমাত্র চলচ্চিত্র নির্মাতা যিনি ইন্ডাস্ট্রির ফর্মুলা চলচ্চিত্রের প্রতি কোনরকম বিশ্বাস না থাকার পরেও সবসময় এই কারখানার লোকজনের প্রতি ছিলেন সহানুভূতিশীল, যে কারণে ইন্ডাস্ট্রির লোকদের অপরিমেয় ভালবাসা এবং শ্রদ্ধাও তিনি পেয়েছিলেন।

বাদল ভাইয়ের সবচেয়ে বড় যে গুণ আমাকে সবসময় মুগ্ধ করতো তা হলো তিনি কখনো অপরের কোন সমস্যাকে অপরের সমস্যা মনে করতেন না। যে কেউ তার নিজের সমস্যা নিয়ে বাদল ভাইয়ের কাছে উপস্থিত হলে বাদল ভাই অন্যের সমস্যাকে মুহূর্তের মধ্যেই নিজের সমস্যায় পরিণত করে তারপর এর সমাধানে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। এ ধরনের অভিভাবকত্ব সহজ বিষয় নয়, চলমান স্বার্থপর সময়ে এ মনোভাব পাওয়া নিতান্তই সৌভাগ্যের বিষয়। নতুন এবং তরুণদের জন্য বাদল রহমান ছিলেন সৌভাগ্যের মতই কিছু।

বাদল ভাই অনেক কাজ অসমাপ্ত রেখে গেছেন। তা তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে, পরিবারের ক্ষেত্রে, রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এবং সবচেয়ে বেশি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে। বাদল ভাইয়ের দেওয়ার ছিল অনেক, বলার ছিল অনেক কথা, আমরা খুব বেশি নিতেও পারিনি, শুনতেও পারিনি। তবুও চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে, চলচ্চিত্র সংসদ এবং চলচ্চিত্রসংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে গণমুখী চেতনার কথা তিনি ধারণ এবং লালন করতেন, তাকে ধারণ এবং লালন করাই হবে আমাদের আগামীর লক্ষ্য। চলচ্চিত্র সংসদ এবং সংস্কৃতি নিয়ে গত একবছর বাদল ভাইয়ের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার কারণে বাদল ভাইয়ের ভাবনার, পরিকল্পনার সঙ্গী হওয়ার ভাগ্য আমার হয়েছে। বাদল ভাইয়ের স্বপ্নের কাজের সমাপ্তিতে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রাকে বিরতিহীনভাবে চালিত করতে হবে। ১৯৪৮ সালের এক বর্ষণস্নাত দিনে বাদল রহমানের জন্ম হয়েছিল, ৬২তম জন্মদিনের দিনটি ছিল একটি প্রবল বর্ষণস্নাত দিন, আজ বাদল ভাইকে যখন বনানীতে সমাহিত করে এলাম আকাশে তখন প্রবল বর্ষণের প্রস্তুতি। বাদল ভাইয়ের পুণ্যস্মৃতির উদ্দেশ্যে, জয়তু বাদল রহমান।

(লেখায় ব্যবহৃত বাদল রহমানের এবং লেখকের আলোকচিত্রগুলো তুলেছেন যথাক্রমে মতি রহমান ও জেসমিন আরা মলি।)

১২ জুন, ২০১০, শনিবার, বিকাল ৪টা



বেলায়াত হোসেন মামুন
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব বাংলাদেশ
সভাপতি, ম্যুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটি
সম্পাদক, চলচ্চিত্রের কাগজ ‘ম্যুভিয়ানা’ এবং চলচ্চিত্র সাময়িকী ‘চিত্ররূপ’



চলচ্চিত্র জগতে নজরুল
-অনুপম হায়াৎ

ভূমিকা
কালজয়ী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬)। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, সাংবাদিকতা, রাজনীতি, নাটক, বেতার গ্রামোফোন ও চলচ্চিত্র তাঁর প্রতিভার স্পর্শে হয়েছে উজ্জ্বল। ১৯৪২ সালের জুলাই মাসে অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি মেতেছিলেন ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’। তাঁর সৃষ্টির ক্ষেত্র ছিল আধুনিক বিশ্বেও অন্যতম শক্তিশালী জনপ্রিয় শিল্প গণমাধ্যম চলচ্চিত্রও। চলচ্চিত্রে তিনি অবদান রেখেছেন সুরভান্ডারী, পরিচালক, সংগীতকার সুরকার, গীতিকার, অভিনেতা, গায়ক, চিত্রনাট্যকার, সংলাপকার ও সংগঠক হিসেবে। ১৯৩১ থেকে ১৯৪২ খৃষ্টাব্দের জুলাই মাসে অসুস্থ হওয়ার আগে পর্যন্ত চিত্রলোকে নজরুল ছিলেন এক সক্রিয় ব্যক্তি। শুধু বাংলা চলচ্চিত্র নয়, নজরুলের দানে সমৃদ্ধ হয়েছে হিন্দী, উর্দু ও পাঞ্জাবী ভাষার চলচ্চিত্রও।
নজরুলের জন্ম বায়োস্কোপ চালুর যুগে। তার জন্মেও দু’তিন বছরের মধ্যেই মানিকগঞ্জের হীরালাল সেন কলকাতায় প্রথম বায়োস্কোপ বা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। হীরালালই প্রথম বাঙালী চলচ্চিত্রকার। আর ১৯৩১ খৃষ্টাব্দে বিদ্রোহী প্রেমিক কবি কাজী নজরুল ইসলাম চলচ্চিত্রে জড়িত হয়ে বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে পথিকৃৎ এর মর্যাদা পান।
নজরুল মোট কতটি চলচ্চিত্রের সাথে জড়িত ছিলেনÑ তা এখনো পুরোপুরি বলা সম্ভব নয়। কেননা নজরুলের জীবন ও কর্ম মহাখনি তুল্য। গত ৪০-৫০ বছর ধওে গবেষণা করেও অনেকে নজরুল সম্পর্কে খুব সামান্যই জানতে পেরেছেন। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, নজরুল ২০-২১ টি ছবির সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। এসব ছবির মধ্যে রয়েছে ঃ নারী, ধূপছায়া, প্রহ্লাদ, বিষ্ণুমায়া, ধ্র“ব, পাতালপুরী, গ্রহের ফের, বিদ্যাপতি, গোরা, সাপুড়ে (বাংলা), সাপেরা (হিন্দী), নন্দিনী, চৌরঙ্গী (বাংলা), চৌরঙ্গী (হিন্দী), দিকশূল, অভিনয় নয়, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম (প্রামাণ্য চিত্র), বিদ্রোহী কবি (প্রামাণ্য চিত্র), কবি নজরুল (প্রামাণ্য চিত্র), কাজী নজরুল ইসলাম (প্রামাণ্য চিত্র)।


১.
অবিভক্ত বাংলায় ব্যবসায়িক ভিত্তিতে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু পার্সী চিত্র প্রতিষ্ঠান ম্যাডান থিয়েটারস। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে কলকাতায় প্রথম নির্বাক বাংলা ছবি ‘বিল্বমঙ্গল নির্মিত হয় ১৯১৯ খৃষ্টাব্দে। ম্যাডান থিয়েটারস-ই ১৯৩০-৩১ খৃষ্টাব্দে প্রথম সবাক বাংলা নির্মাণেরও উদ্যোগ নেয় বাণিজ্যিক কারণে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে নজরুলকে ম্যাডান থিয়েটারস ‘সুর ভান্ডারী’ নিযুক্ত করে। নজরুলের ‘সুর ভান্ডারী নিযুক্ত হওয়ার সংবাদটি কলকাতার দৈনিক ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায় ১৯৩১ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি সংখ্যায় ছাপা হয়।
‘সুর ভান্ডারী’ হিসেবে নজরুলের দায়িত্ব ছিল সবাক চিত্রে অংশগ্রহণকারী নট-নটীদের কণ্ঠস্বর পরীক্ষা করা। উল্লেখ্য ‘সুর ভান্ডারী’ পদটি সংগীত পরিচালকেরও ওপরে।
ম্যাডান থিয়েটারসে ‘সুর ভান্ডারী’ হিসেবে নজরুলের যোগদানের পরই পরীক্ষামূলকভাবে ৩০-৪০ টি সবাক খন্ডচিত্র নির্মিত হয়। এগুলো মুক্তি পায় ১৯৩১ সালের ১৩ মার্চ। সম্ভবতঃ এই খন্ডচিত্রের একটিতেই নজরুল তাঁর ‘নারী’ কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলেন।
কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, বাংলা সবাক চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় সেই ঘটনার প্রামাণ্য নিদর্শনটি এখন দু®প্রাপ্য।
নজরুলের ম্যাডান থিয়েটারসে যোগদানের পর এই প্রতিষ্ঠানের প্রযোজনায় কয়েকটি সবাক ছবি মুক্তি পায় ১৯৩১ খৃষ্টাব্দে। এগুলোর মধ্যে ছিল প্রথম বাংলা সবাক ছবি জামাই যষ্টী, জোর বরাত, ঋষির প্রেম, তৃতীয় পক্ষ, প্রহলাদ ও লায়লা। এসব ছবির সংগীত পরিচালক ভিন্ন হলেও ‘সুর ভান্ডারী হিসেবে নজরুলের অবশ্যই অবদান থাকার কথা। এর মধ্যে ‘প্রহলাদ’ ছবিতে ধীরেন দাসের কণ্ঠে কয়েকখানি সুশ্রাব্য নজরুল গীতি (সুরসহ) ব্যবহৃত হয়েছে বলে অশোক কুমার মিত্রের সূত্রে জানা যায়। তিনি ম্যাডান থিয়েটারসের ‘বিষ্ণুমায়া’র (১৯৩২) ছবিতেও ধীরেন দাসের কণ্ঠে নজরুল গীতি (সুরসহ) ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য ‘প্রহলাদ’ এবং ‘বিষ্ণুমায়া’র প্রিন্ট এবং বুকলেটও দু®প্রাপ্য। ফলে এসব ছবিতে নজরুল সংশ্লিষ্টতার বিস্তারিত ও প্রাম্যাণ্য তথ্য পাওয়া যায় না।
১৯৩১ খৃষ্টাব্দে নজরুল ‘ধূপছায়া’ নামে একটি ছবি পরিচালনা ও সে ছবির সংগীত পরিচালনা এবং তিনি বিষ্ণুর ভূমিকায় অভিনয় করেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। চলচ্চিত্রের ইতিহাস খুঁজে অবশ্য এ নামে কোন ছবি পাওয়া যায় না। তবে হতে ‘ধূপছায়া’ একটি অসমাপ্ত বা অমুক্তিপ্রাপ্ত ছবি।
১৯৩২-৩৩ খৃষ্টাব্দে ম্যাডানের প্রযোজনায় আরো কয়েকটি সবাক ছবি মুক্তি পায়। এসবের মধ্যে ছিল কৃষ্ণকান্তের উইল, চিরকুমারী, কলংক ভঞ্জন, রাধাকৃষ্ণ। এসব ছবিতে ‘সুর ভান্ডারী’ নজরুলের কণ্ঠস্বর ব্রাশআপ করা অনেক নট-নটী, গায়ক-গায়িকা, নায়ক-নায়িকা, অভিনেতা-অভিনেত্রী ছিলেন। শুধু ম্যাডান থিয়েটারস নয় - ঐ সময়ের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান নিউ থিয়েটারস, ইষ্ট ইন্ডিয়া ফিল্ম ইন্ডাষ্ট্রিজ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের ছবিতেও নজরুলের কাছে ট্রেনিংপ্রাপ্ত শিল্পীরা অংশ নিয়ে সবাক পর্বের চিত্র জগতকে মাতিয়ে তোলেন।

           
২.
ম্যাডান থিয়েটারসের অন্যতম পার্টনার মিসেস পিরোজ ম্যাডান ১৯৩৩ খৃষ্টাব্দে পায়োনীয়ার ফিল্মস কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠান থেকে গিরিশ চন্দ্রের ‘ধ্র“ব চরিত’ নিয়ে ছবি নির্মাণের ঘোষণা দেয়া হয়। ‘ধ্র“ব’র পরিচালক নিযুক্ত হন কাজী নজরুল ইসলাম ও সত্যেন্দ্রনাথ দে। নজরুল এ ছবির সংগীত পরিচালনা ও গান রচনা করেন। তিনি ছবির নারদ চরিত্রে রূপদান করেন এবং গানেও কণ্ঠ দেন। নজরুল ছবির ১৮ টি গানের মধ্যে ১৭টি গান রচনা করেন এবং ৪ টি গানে অংশ নেন। ‘ধ্র“ব’র মাধ্যমে নজরুল বাঙালী মুসলমানদের প্রথম চলচ্চিত্রকার হিসেবে আবির্ভূত হন।
ইতিহাসবিদ কালীশ মুখপাধ্যায় ‘ধ্র“ব’ কে চিহ্নিত করেছেন অত্যন্ত নিকৃষ্ট ধরনের চিত্র হিসেবে। আর অধ্যাপক অরুণ দত্ত গুপ্ত ‘ধ্র“ব’ কে ভালো সংগীত বহুল ছবি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সমালোচক খগেন্দ্রনাথ রায় লেখেন ঃ ধ্র“ব হয়েছে একখানি যাত্রান্তরিত নাটক। ‘ধ্র“ব’ ছবির অভিনয়ে নজরুল নতুনত্ব এনেছিলেন ‘নারদ’ চরিত্রের মেকআপে। তিনি অশীতিপর নারদকে আটাশে নামিয়ে আনেন, পোশাকও বদলে ফেলেন। নজরুলের এই ‘বিদ্রোহ’ ও নবনারদী রূপ নিয়ে পত্র-পত্রিকা ও বিভিন্ন মহলে তুমুল সমালোচনা হয়। কিন্তু নজরুল তাঁর যুক্তি দিয়ে বলেছেন, ‘আমি চিরতরুন ও চিরসুন্দর প্রিয় নারদের রূপই দেবার চেষ্টা করেছি।’
‘ধ্র“ব’ মুক্তি পেয়েছিল ১৯৩৪ সালের ১ জানুয়ারী। কিন্তু এই ছবি মুক্তির সংগে সংগেই ম্যাডান থিয়েটারসের সঙ্গেও নজরুলের সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়। কারণ ম্যাডান থিয়েটারস কবির সংগে প্রতারণা করেছিল।

৩.
১৯৩৫ সালের ২৩ মার্চ কলকাতার রূপবাণী প্রেক্ষাগৃহে যখন কালী ফিল্মস প্রযোজিত প্রিয়নাথ গাঙ্গুলী পরিচালিত ‘পাতালপুরী’ মুক্তি পায়, তখন দর্শকরা দুই সাহিত্যিক বন্ধুর সম্মিলিত মেধার সংগে পরিচিত হয়। এঁদের একজন কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার শৈজানন্দ মুখোপাধ্যায়, আরেকজন এ ছবির সংগীত পরিচালক, গীতিকার, অভিনেতা কাজী নজরুল ইসলাম।
এ ছবির কাহিনী গড়ে উঠেছে কয়লা খনির শ্রমিক নারী-পুরুষদের নিয়ে। নজরুল ছবির কাহিনীর মূল ‘থিম’ অনুযায়ী সংগীত সৃষ্টির জন্য বর্ধমানের কয়লা খনি অঞ্চলেও গিয়েছিলেন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য। এ ছবিতে তিনি ‘ঝুমুর’ নামে নতুন সুর সৃষ্টি করেছিলেন। সমালোচকরা ছবির নিন্দা করলেও সংগীতের প্রশংসা করেছিলেন।

৪.
পৌরাণিক ‘ধ্র“ব’ এবং কয়লা খনির শ্রমিক জীবন নির্ভর ‘পাতালপুরী’র পর নজরুল হত্যা-রহস্য-রোমাঞ্চ-প্রেম নির্ভর ‘গ্রহের ফের’ ছবির সংগীত পরিচালনা করে বিচিত্র ও সৃজনশীল প্রতিভার পরিচয় দেন। দেবদত্ত ফিল্মস প্রযোজিত চারু রায় পরিচালিত ‘গ্রহের ফের’ মুক্তি পায় ১৯৩৭ সালের ৪ ডিসেম্বর। ছবিতে অজয় ভট্টাচার্যের লেখা গানের সুর দিয়েছিলেন নজরুল।

৫.
ম্যাডান থিয়েটারসের পর সেকালের বিখ্যাত চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান নিউ থিয়েটারসে নজরুলের যোগদান বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। এই প্রতিষ্ঠানের বাংলা ও হিন্দী ভাষায় নির্মিত ‘বিদ্যাপতি’ ও ‘সাপুড়ে’র কাহিনীকার, গীতিকার ও সুরকার হিসেবে নজরুল উপমহাদেশের চলচ্চিত্র দর্শকদের কাছে পৌঁছেছিলেন। সেই সংগে পেয়েছিলেন জনপ্রিয়তা। ‘বিদ্যাপতি’ ও ‘সাপুড়ে’ পরিচালনা করেছিলেন দেবকী কুমার বসু আর সংগীত পরিচালনা করেছিলেন রাইচাঁদ বড়াল।
বাংলা ‘বিদ্যাপতি’ মুক্তি পেয়েছিল ১৯৩৮ সালের ২ এপ্রিল। এ ছবিতে নজরুলের লেখা গান ও সুর ব্যবহৃত হয়েছে। ‘বিদ্যাপতি’র হিন্দী ভার্সন মুক্তি পেয়েছিল ওই বছরের ডিসম্বরে। নিউ থিয়েটারসের ‘সাপুড়ে’ (বাংলা) মুক্তি পেয়েছিল ১৯৩৯ সালের ২৭ মে আর হিন্দী ‘সাপেরা’ মুক্তি পেয়েছিল ২৪ জুন। ‘সাপুড়ে’ ছবির ৭টি গানের মধ্যে ৬ টি গানের (সুরসহ) গীতিকার ছিলেন নজরুল। এ ছবিতে নায়িকা কানন দেবীর গাওয়া ‘আকাশে হেলা দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই’ এখনো দর্শক স্মৃতিতে অম্লান। নিউ থিয়েটারসের আরো একটি ছবি ‘দিকশূল’- এ নজরুল দুটো গান লিখেছেন। প্রেমাংকুর আতর্থী পরিচালিত এ ছবিটি মুক্তি পায় নজরুলের অসুস্থতার পর ১৯৪৩ সালের ১৪ আগষ্ট। ছবির সুরকার ছিলেন পংকজ মল্লিক।
(চলবে)
http://www.youtube.com/watch?v=FYFhYtfTM5w
Kazi Nazrul Islam -in his Film''Dhrubo''released 1st January,1934





ক্যাসেলস্ অন দি স্যান্ড
-মাহবুব আলম

শহরের শব্দময় কর্মব্যস্ত জীবন থেকে সমুদ্র সৈকতের তরঙ্গময় জীবনময়তা। উৎসবের মেঘ-বৃষ্টি।
সপ্তাহ ছুটি উদযাপনে এসেছে অসংখ্য মানুষ। বিভিন্ন বয়সের। বিভিন্ন পেশার। সমুদ্রের পাড়ে পাড়ে পথ হাঁটা মানুষের পায়ের ছাপ। নকশী রেখা। আলতো আঁচড়ে বালুকাটা লেখা। সব কিছুকে ছুঁয়ে ক্যামেরা এসে স্থির হয় জল এলিয়ে পড়া তীরের প্রান্তরেখায়। একটি কিশোর। উঁচু হয়ে বাঁ হাতে ভর রেখে নিবিষ্ট মনে দুর্গ-ঘেরা রাজপ্রাসাদ গড়ছে। ছুটি কাটাতে আসা মানুষের উদ্দাম কোলাহল ওর একাগ্রতায় এতটুকু ব্যাঘাত ঘটাতে পারে না। আপন সৃষ্টিতে বিভোর ও। সৌন্দর্যের শিল্পদেশে নিমজ্জিত।
ডান হাতের কারুকার্যে গড়ে উঠেছে একের পর এক বালুর চূড়া। মাঝে মাঝে উপুড় হয়ে শুয়ে চোখ দুটো কুঁচকিয়ে কেমন একটা ভঙ্গী করে দেখে নিচ্ছে প্রাসাদের শিল্প সৌন্দর্য। উঁচু উঁচু চূড়ার সমতা। হঠাৎ সমুদ্রের বাঁধনহারা ঢেউগুলো দাপাদাপি শব্দে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর সৌন্দর্যময় প্রাসাদের ওপর। নিমিষে ভাসিয়ে নেয় সব। কেবল প্রাসাদ গড়ার জায়গার বালুটা একটু উঁচু হয়ে থাকে। ছেলেটা একটুও রাগ করে না। দমে যায় না। বালুমাখা হাত দুটো বুকের কাছে জড়ো করে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ধুয়ে যাওয়া প্রাসাদ দেখে। সমুদ্রের উন্মত্ততা ওকে অবাক করে। ও কিছুক্ষণ একভাবে দাঁড়িয়ে থেকে শুধু তেড়ে আসা খামখেয়ালী ঢেউগুলোর মজা দেখে। সমুদ্রের ঢেউগুলোও যেন ইচ্ছে করে ছুটে এসে ওর প্যান্টের হাঁটু অব্দি ভিজিয়ে দিয়ে যায়। ও আবার একটু সরে গিয়ে ভেজা জল বালু নিয়ে প্রাসাদ গড়ার খেলায় মেতে ওঠে। সৃষ্টির আনন্দে তলিয়ে যায়।
একজন চলচ্চিত্রকারের জীবনের প্রতি নিরুদ্দম বিশ্বস্ততা এবং শিল্প সৌন্দর্যের প্রতি সযত্ন মমত্ববোধ থাকলেই কেবল এমন অদ্ভূত একটি ছবি তৈরি করতে পারেন। যিনি আধুনিক চলচ্চিত্র ভাষা সম্পর্কে অবশ্যই সম্যক অভিজ্ঞ, পরিচিত। বিষয়বস্তু, ডিটেল সমৃদ্ধ দৃশ্য গ্রন্থনা এবং ফটোগ্রাফির কারণে ছবিটি তাই একাধিক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরষ্কৃত, সম্মানিত হয়েছে।
বিশ মিনিটের এই স্বল্প দৈর্ঘের ছবিটি পরিচালনা করেছেন সোভিয়েট চলচ্চিত্রকার ভিদুগিরিস। যিনি এ যাবৎ অসংখ্য ডকুমেন্টারি ছবিতে শ্রমিক, কৃষক এবং শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে আলোকিত করেছেন। জীবন অবলোকনে তিনি বাস্তবের বড় বেশী কাছাকাছি চলে যান। তাঁর ক্যামেরার দৃষ্টি তীক্ষèভাবে সূক্ষè শিল্প সৌন্দর্যে এদের বিশ্লেষণ করে। গ্রহণ বর্জনের ক্ষেত্রে তিনি বড় নির্মম নির্দয়। কোথাও মিথ্যাচার নেই। শিল্পে পাপ নেই। পরিচালক ভিদুগিরিসের আর একটি সুযোগ্য বৈশিষ্ট্য তিনি শিশু কিশোরদের নিয়ে এমন অদ্ভুত সব ছবি করেছেন যা এর আগে আর কেউ কখনো ভাবেনি।
যেমন ‘ক্যাসলস অন দি স্যান্ড’- এর নায়কও একটি কিশোর। তাকে কেন্দ্র করেই ছবিটির দৃশ্যের পর দৃশ্য চিত্রায়িত। প্রথম থেকে শেষ অব্ধি (ছবির সুর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত) পরিচালক ঐ কিশোরটির সৌন্দর্য মগ্নতাকে ধরে রেখেছেন। পাশাপাশি একের পর এক ঘটনা বিন্যাসিত হয়। মা-বাবার সঙ্গে ছুটি কাটাতে আসা ‘দেখিই না কি হয়’- ভাব গোছের দুষ্ট ছেলেমেয়েগুলো ওর বালুর প্রাসাদ হাতে-পায়ে ভেঙ্গে উচ্ছল সমস্বরে হাসিতে ফেটে পড়ে। ওর বুকটা গুড়িয়ে যায়। এমনকি পালিয়ে যাওয়া ছেলেমেয়েগুলোর দিকে একবার ফিরেও তাকায় না। বালু-জড়ো ভাঙ্গা প্রাসাদের দিকে তাকিয়ে ময়লা হাত প্যান্টের কাপড়ে মোছে। চোখে জল এসে ফিরে যায়। মানুষের আনন্দ ভীড়ে ও ঘুরে বেড়ায়। সহৃদয় এক ভদ্রলোক  ডেকে নেন ওকে। কিছু খেতে বলাতে ওর অবারিত সংকোচ ঝরে পড়ে। লজ্জায় জড়ো হয়ে যেতে চায় ও। কিন্তু ভদ্রলোকের স্বচ্ছল স্নেহের কাছে পরাজিত হতে হয়। স্নেহ ক্ষুধার কাছে নিজেকে সমর্পিত করে ও।
আবার ফিরে যায় সমুদ্র পাড়ে। যৎনিবিষ্টতায় বালুর প্রাসাদ তৈরি করে। সৌখীন ট্যুরিষ্টদের ক্যামেরা বিকেলের রোদমাখা ওর সৌন্দর্যময় বালুর প্রাসাদ ধরে রাখে। যা সমুদ্রের অবাধ্য ঢেউ কিংবা দৌঁড়ছুটো ছেলেমেয়ের দল কৌতুকের বশে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিতে পারবে না।
ছবিটির বৈশিষ্ট্য এর দৃশ্য গ্রন্থনায় পরিমিতিবোধ। কাট-টু-কাট দৃশ্যপরম্পরায় বক্তব্যের সহজ গভীরতা। জটিলতার অন্তিম নির্বাসন। ‘ক্যাসলস অন দি স্যান্ড যেমন একটি কিশোরের সৌন্দর্য মগ্নতার ছবি, তেমনি একদল মানুষের উৎসব উদযাপনের ছবি। সৃষ্টির আনন্দ এবং উৎসবের আনন্দকে পাশাপাশি রেখে পরিচালক ছবির পরিণতিতে পৌঁছে গেছেন। যেখানে জীবন সত্যময়।
পূর্বদেশ
অক্টোবর ১৯৭৪
Untitled Document
Total Visitor : 709033
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By : Life Yard