Untitled Document
শ্রাবণ সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
বাংলাদেশের লোক শিল্পকলা
-নিসার হোসেন


আমরা জানি যে, গত শতকের ২০ দশক থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এ দেশের বেশ কয়েকজন লোকশিল্প সংগ্রাহক তথা বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ বাংলাদেশের নানা প্রান্তর ঘুরে ঘুরে লোকশিল্পের বিভিন্ন নিদর্শন এবং এ সংক্রান্ত অনেক তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেছেন। কিন্তু তারা কেউই বাংলার এই অংশে (বর্তমানে যা বাংলাদেশ) ‘পটুয়া’ নামক চিত্রকর সম্প্রদায়ের কোনো অস্তিত্ব ছিল কি না, সে সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য দিতে পারেননি। কোনো কোনো গবেষক ঢাকার ‘পটুয়াটুলী’ নামক এলাকাটিকে ঢাকায় পটুয়াদের বসবাসের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ১৯ শতকের ৬০ দশকে ঢাকায় অবস্থানকালে ‘নোটস অন দি রেসেস, কাস্ট অ্যান্ড ট্রেডস অফ ইস্টার্ন বেঙ্গল’ নামক গ্রন্থে (১৮৮৩তে প্রকাশিত) জেমস ওয়াইজ জানিয়েছেন, ঢাকায় ২৫ ঘর পটোয়া পরিবার বসবাস করছেন এবং এদের পেশা কাপড় রঙ করা ও চুলের ফিতা তৈরি করা। ১৯ শতকের ৯০ দশকের কথা বলতে গিয়ে পুরোনো ঢাকার অধিবাসী হাকিম হাবিবুর রহমানও সম্ভবত এই পটোয়াদের কথাই বলেছেন। তবে তিনি এদেরকে শুধু সোনা-রূপার গহনায় মণিমুক্ত-পাথর বসানোর কাজ করতে দেখেছেন।

ঢাকায় চিত্রকর হিসেবে খ্যাতিলাভ করেছিল এরকম দুটো সম্প্রদায়ের কথা জেমস ওয়াইজের লেখা থেকে জানা যায়। এদের মধ্যে ‘মুকাব্বির’ উপাধিধারী একটি পরিবারের কথা তিনি জানিয়েছেন, যারা বংশপরম্পরায় মুঘল মিনিএচার ধাঁচের প্রতিকৃতি অংকনে প্রসিদ্ধ ছিল। এই তথ্যটি থেকে আমরা অন্য একটি অমীমাংসিত বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি তা হচ্ছে,- কোম্পানি আমলের ঢাকার চিত্রকলা হিসেবে পরিচিত যে ঈদ, মহরমের মিছিল ইত্যাদি বিষয়ক মিনিএচার ধাঁচের ছবিগুলো ঢাকা জাদুঘরে রক্ষিত আছে তা সম্ভবত এই ‘মুকাব্বির’ পরিবারেরই কারো আঁকা। কেননা এই ছবিগুলোর শিল্পী হিসেবে যে নামটি পাওয়া গেছে (আলম মুসাব্বির) তার উপাধি ‘মুসাব্বির’। জেমস ওয়াইজ কর্তৃক উল্লিখিত ‘মুকাব্বির’ নিশ্চয়ই ‘মুসাব্বির’ শব্দটির ভিন্ন উচ্চারণ।

তাঁর লেখায় অপর যে গোষ্ঠীটিকে চিত্রাঙ্কনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহকারী গোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে তারা আচার্য সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ। এদের মূল পেশা ঠিকুজি* ও পঞ্জিকা প্রণয়ন করা। জেমস ওয়াইজ জানিয়েছেন যে, ১৬ ঘর আচার্য ঢাকায় বসবাস করছেন যাঁরা মূল পেশার বাইরে স্বর্ণকারের কাজ, দেবদেবীর প্রতিমা ডেকোরেট করার কাজ, প্রতিমার চালচিত্র আঁকা এবং বিভিন্ন ইমারতের কার্নিশে ও দেয়ালে ফুল, লতাপাতা ও জীবজন্তুর ছবি আঁকা ইত্যাদির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ
করতেন। এমনকি এরা অয়েল-পেইন্টার হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে গুরুসদয় দত্তের লেখাতেও এই আচার্য সম্প্রদায়কেই বাংলাদেশের প্রধান চিত্রকর সম্প্রদায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, এরা চালচিত্র আঁকায় বিশেষ পারদর্শী ছিলেন এবং পটচিত্রও আঁকতেন। (*ঠিকুজি- ঐড়ৎড়ংপড়ঢ়ব)

১৯৩২ সালে প্রকাশিত ‘বিচিত্রা’ পত্রিকার একটি সংখ্যায় গুরুসদয় দত্ত লিখেছিলেন, “পূর্বে এরা (আচার্যরা) পূর্ব বাংলার অশিক্ষিত মুসলমানদের জন্য ‘গাজির পট’ নামক এক রকম জড়ানো পটও আঁকতেন।... আজকাল পূর্ব বাংলায় মেলা ইত্যাদিতে সাধারণত যে সকল গাজির পট পাওয়া যায় সেগুলিতে আচার্যদের আঁকা পুরানো পটের মত চিত্রকলা-কৌশল নেই।” এই লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার ৪ মাস আগে প্রবাসী পত্রিকায় কবি জসিম উদ্দীনের ‘পল্লি শিল্প’ নামক যে লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল তাতেও এই আচার্যদেরকেই বাংলার প্রধান চিত্রকর সম্প্রদায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁরা পটচিত্র আঁকতেন কি না, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানাতে পারেননি। এর বহু আগে থেকেই যে বাংলাদেশের পটচিত্র প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল তার প্রমাণ এই লেখাটিতে পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, “চারি (৪) বৎসর আগে কবি পরিমল কুমার ঘোষ মহাশয় বলিয়াছিলেন যে, বিক্রমপুর জেলায় গ্রাম্য মুসলমানেরা একপ্রকার গাজির পট দেখাইয়া বাড়ি বাড়ি ঘুরিত। আমরা বহু অনুসন্ধান করিয়া এই পটের খোঁজ পাইয়াছি। পট এখনও আমাদের হস্তগত হয় নাই।” তবে কারা সেই পট আঁকতেন সে বিষয়ে পরবর্তীকালেও কোনো তথ্য তিনি জানাননি।

আসলে পূর্ববাংলায় মুসলিম আধিক্যের কারণে গাজির পটের প্রচলনই সম্ভবত বেশি ছিল এবং পূর্ববাংলার (এর নির্মাতা) আচার্যরা যেহেতু পটপ্রদর্শনের কাজটি কখনোই করতেন না, তাদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে বেদে-নাগারচি-গায়েন হিসেবে পরিচিত নীচু জাতের মুসলমানেরাই এই পটপ্রদর্শন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তাই অনেক গবেষক পট-প্রদর্শকদেরকেই পটের নির্মাতা ভেবে নিশ্চিত ছিলেন যে, এ ধরনের পট মুসলমানদেরই আঁকা। যেমন, ১৯৫০ সালে প্রকাশিত প্রবাসী পত্রিকার একটি সংখ্যায় অমূল্য গোপাল সেন লিখেছেন, “কুমিল্লা অঞ্চলের মুসলমান পটুয়ার আঁকা একখানা গুটানো পট কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে।” সম্ভবত পটটি গাজি বিষয়ক হওয়াতেই তিনি এটি মুসলমান পটুয়ার আঁকা বলেই ধরে নিয়েছেন। দেশভাগের পর লেখা এই প্রবন্ধের লেখকের পক্ষে নিশ্চয়ই দেশভাগের কারণে পূর্ববাংলায় এসে মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে লেখা সম্ভব হয়নি, এবং যেহেতু পশ্চিমবঙ্গের যেসব পটুয়ারা মুসলিম উপাধি ব্যবহার করেন তারাই সাধারণত গাজির পট আঁকেন, সেহেতু পূর্ব বাংলাতেও মুসলমানরাই এ ধরনের পটগুলো এঁকেছেন,- এ সিদ্ধান্ত নিতে পরিমল ঘোষ দ্বিধাবোধ করেননি। তবে আচার্যদের আঁকা গাজির পটের কিছু চৌখুপি লক্ষ্মীর পাঁচালী গাওয়ার উপযুক্ত করে আঁকা এবং এই চৌখুপিগুলো দেখিয়ে গানের সুরে যে কথাগুলো বলা হয় তা যুগ যুগ ধরে বিক্রমপুরের ঢোল সমুদ্র অঞ্চলের মুসলিম ভিখারীরা পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিক্ষা করবার সময় গাইতেন বলে পুরোনো অনেক লেখাতেই উল্লেখ রয়েছে। সম্ভবত ঐ ভিখারীদেরই ঘনিষ্ঠ কোনো অংশ পরবর্তীকালে পট প্রদর্শনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতে শুরু করেন এবং এরা সম্ভবত হিন্দু পৌরাণিক পট প্রদর্শন করতেন না।





Untitled Document
Total Visitor : 709037
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :