Untitled Document
শ্রাবণ সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
মন্ট্রিয়ল টু বাংলাদেশ: হেলালের চলচ্চিত্র যাত্রা
-আমিনুল ইসলাম

মিলনায়তনে ঢুকতেই হাতের ডানদিকে রিসেপশন কাউন্টারের উপর থরে থরে সাজানো ১৬ মি. মি. এর ফিল্ম এর প্রজেক্টর। মনে পড়ে গেল আশির দশকে বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সংসদ এবং বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন আমরা ১৬ মি.মি. এ নির্মিত মুক্তিযু্দ্ধের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং এই প্রজেক্টর নিয়ে গ্রামেগঞ্জে ঘুরে ঘুরে উন্মুক্ত প্রদর্শনী করেছি। আর ঠিক সামনেই সাদা ক্যানভাসে করা ‘সিনেমানিয়া’ চলচ্চিত্রের বিরাট ব্যানার, যা ঢাকার প্রেক্ষাগৃহের উপর টানানো বিশালকায় ব্যানারের কথা মনে করিয়ে দেয়। অটোয়ার ‘মেফেয়ার’ থিয়েটারে গত ২৩মে সাইফুল ওয়াদুদ হেলাল নির্মিত ‘অনিকায় হোম’ এবং ‘সুপ্রভাত বাংলাদেশ’ এর প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। প্রসঙ্গ যদিও ‘অনিকাস হোম’ এবং ‘সুপ্রভাত বাংলাদেশ’ আমি একটু পেছন থেকে শুরু করতে চাই।
হেলালের সাথে প্রথম কথা হয় (টেলিফোনে)  বছর দশেক বা তারো কিছু আগে। আমি ঢাকায় ৬ষ্ঠ আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র  উৎসবের আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত। নিউইয়র্কপ্রবাসী বন্ধু  বাবুল ফোনে আমাকে বলল সাইফুল ওয়াদুদ হেলাল ‘গুড মর্নিং  মন্ট্রিল’ নামে একটি ছবি আমাদের উৎসবে পাঠাতে চায়। আমি সানন্দে রাজী হলাম এবং দ্রুত ছবি পাঠাতে বললাম। তার সপ্তাহখানেক পরেই হেলাল তাঁর ছবির ভিডিও প্রিন্ট, পোস্টার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী (ডকুমেন্ট) পাঠালো। আমি তখনও জানতাম না ‘গুড মর্নিং মন্ট্রিল’ কাহিনীচিত্র এবং ভিডিও ফরমেটে নির্মিত। এখনে উল্লেখ করা প্রয়োজন তখন পর্যন্ত আমাদের উৎসবে শুধুমাত্র  ফিল্ম ফরম্যাটে (১৬ মি.মি. ও ৩৫ মি. মি.) নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্যের  কাহিনীচিত্রই প্রদর্শনের জন্য  নির্বাচন করা হতো। ভিডিও ফরম্যাটে শুধুমাত্র প্রামান্যচিত্র প্রদর্শন করা হতো। হেলালের ছবিটি ছিলো  ভিডিও ফরমেটে নির্মিত কাহিনীচিত্র, তাই সঙ্গতকারণেই  উক্ত উৎসবে ছবিটি প্রদর্শনের কোনো সুযোগ ছিল না। হেলাল যখন আমাকে ফোন করে তাঁর ছবি নির্বাচিত হয়েছে কি না জানতে চাইলো, আমি সরাসরি কোনো উত্তর দিতে পারিনি। আমার বিশ্বাস হেলাল বিষয়টা পরে বুঝতে পেরেছেন যে ফিল্ম স্ক্রিনিংয়ের criteria-র কারণেই সেটা সম্ভব হয়নি।
যাই হোক, তার ঠিক দুই বছর পর পরবর্তী উৎসবে হেলাল তাঁর পরবর্তী ছবি ‘কালার অব ফেইথ’ পাঠালেন। এটি একটি প্রামাণ্যচিত্র। চাঁদপুর জেলার বদরপুর নামক একটি স্থানে প্রতিবছর  একটি নির্দিষ্ট সময়ে মেলা হতো। সেখানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে  বাউল, ফকিররা জড়ো হতো এবং কয়েকদিনব্যাপী চলতো বাউল, শরিয়তী ও মারফতী গানের উৎসব। হেলাল তাঁর ক্যামেরায় সেই মেলার ঘটনা উপস্থাপন করেছেন সাবলীলভাবে।  ছবিটি তার নিজ গুণেই আমাদের সেবারকার উৎসবে জায়গা করে নেয়।
প্রায় বছর তিনেক হলো হেলাল বসবাস করছেন ঢাকায়। নিজের ক্যামেরা ও সম্পাদনা ব্যবস্থায় স্থাপন করেছেন নিজস্ব স্টুডিও। উদ্দেশ্য বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থাকা এবং  কাজ করা। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে  ঢাকায় চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্ররা নির্মাণ করছিলো অপরাজেয় বাংলার মতো আরেকটি ভাস্কর্য। উল্লেখ্য, সেই সময় বিমানবন্দরের সামনের সড়কে স্থাপিত বাউল ভাস্কর্যটি ভেঙ্গে ফেলে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী গোষ্ঠী। তারই প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা চালিয়ে যেতে থাকে বিভিন্ন কর্মসূচী।  আমি তখন ঢাকায় গিয়েছি, হেলালের সাথে ফোনে যোগাযোগ করলাম। বললো চলে আসেন চারুকলার সামনে ‘ছবির হাট’ প্রাঙ্গণে। আবার দেখা, আড্ডা চললো নানা প্রসঙ্গে। কাঁধে ব্যাগ, তার মধ্যে ক্যামেরা, জিজ্ঞেস করলাম কিছু করছেন। হেলাল বললো, হ্যাঁ ছাত্রদের  এই আন্দোলন, বিশেষ করে চারুকলায় ছাত্ররা যে ভাস্কর্য নির্মাণ করছে সেটা চিত্রায়ন করছেন। জানতে চাইলাম ছবির বিষয়বস্তু কি। বললো, এই ভাস্কর্য নির্মাণকে কেন্দ্র করে ‘অপরাজেয় বাংলা’র ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করবো।
বাসা/স্টুডিও দেখতে গেলাম একদিন, আলাপ প্রসঙ্গে বললো, টিভির জন্য কিছু কাজ করার ইচ্ছা আছে। পাশাপাশি প্রাণের তাগিদ মেটানোর কাজগুলো করা। ওর বাসা থেকে ফিরে আসতে আসতে ভাবছিলাম, কতটুকু প্রাণের এবং ছবি করার ইচ্ছা থাকলে স্ত্রী-সন্তানদের সুদূর অটোয়ায় রেখে জন্মভূমিতে ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে বিষয়ের পিছে ছুটে চলা সম্ভব। ধন্যবাদ হেলালের স্ত্রী (মীরা) এবং কন্যাদ্বয়কে (গল্প ও গ্রন্থ), হেলালকে এই সাহস ও শক্তি যুগিয়ে যাওয়ার জন্য।
ফিরে আসি ‘আনিকাস হোম’ এবং ‘সুপ্রভাত বাংলাদেশ’ প্রসঙ্গে।
অনিকা অটোয়ার কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রী। অনিকার মা-বাবার ইচ্ছা মেয়ে তার জীবনসঙ্গী  খুঁজে নিক নিজে এবং জন্মভূমি বাংলাদেশের কোনো তাদের মেয়ে বেছে নিক। আর তাই ১৫ বছর পর অনিকার বাংলাদেশে যাওয়া। ১০ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই  প্রামাণ্যচিত্রে অনিকা বিয়ে, রাজনীতি এবং সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর ভাবনা বলে। দৃশ্যের বিপরীতে অনিকার নিজ বর্ণনায় তাঁর কথা সে বলে যায়। প্রামাণ্যচিত্রের  একটি অংশে দেখা যায় অনিকার মা অনিকাকে বলছে, তাঁর বিয়ের বয়স হয়েছে, তাঁকে বাংলাদেশে যেতে হবে। ছোট এই প্রামাণ্যচিত্রটিতে অনিকার নিজের বর্ণনায় বিষয়টি যেভাবে এগিয়েছে তাতে মায়ের সাথে কথোপকথনের এই অংশটুকু একটু যেন খটকা লাগে। নর্থ আমেরিকায় বেড়ে ওঠা এবং পড়াশোনা করা একটি মেয়েকে বিয়ের বিষয়ে এইভাবে বলা (অনেকটা আদেশের সুরে) একটু যেন গতি হারায়।
‘সুপ্রভাত বাংলাদেশ’ ৬০ মিনিট দৈর্ঘ্যের কাহিনীচিত্র। ছবির প্রধান চরিত্র  পরমা স্থপতি বাবার সাথে প্রথমবারের মতো যায় বাবার জন্মভূমি বাংলাদেশে। অতি সাবধানী বাবা মেয়েকে স্মরণ করিয়ে দেয় এটা কানাডা নয়, বাংলাদেশ, সে যেন সাবধানে থাকে। বাবার সাবধানী উপদেশ মেয়ে ঠিক মানতে পারে না- বলে, নিজের জন্মভূমি নিয়ে বাবার এত ভয় কেন। পরমা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের কয়েকজন শিক্ষার্থীর  সঙ্গে বন্ধুত্ব করে। তাদের একজন ঋষির সাথে ঘুরে বেড়ায় ঢাকা শহর, পুরোনো ঢাকা, শহীদ মিনার, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। ঋষির সঙ্গে মিশে আবিষ্কার করে তাঁর বাবার জন্মভূমিকে, যেখানে ক্ষুধা-দারিদ্র আছে, তবে সবচেয়ে বড় যে জিনিসটা আছে, তা হচ্ছে  প্রাণ, আবেগ এবং ভালোবাসা।
ঋষির চরিত্রে রাহুল আনন্দ অসাধারণ অভিনয় করেছে। বলতে গেলে পুরো ছবিটার প্রাণ ছিলো  ঋষি, তাঁর সাবলীল চলাফেরা, সংলাপ বলা, দুষ্টুমি করা; রাহুলই পুরো ছবির গতিটা ধরে রেখেছে।  ঋষি/পরমার অন্য বন্ধুদের  নির্বাচনে যত্নবান হওয়া যেত। সেক্ষেত্রে ঢাকার গ্রুপ থিয়েটার কর্মীদের নির্বাচন করা গেলে বা করলে ভালো হতো।  আর পরমা প্রথম অভিনয় হিসেবে অবশ্যই প্রশংসনীয় অভিনয় করেছে।   এছাড়া সুপ্রভাত বাংলাদেশ এর কিছু বিষয় আমার মতে নির্মাতার অবশ্যই  যত্নবান হওয়ার প্রয়োজন ছিলো। যেমন পোশাক নির্বাচন, বিশেষ করে পরমার সোনারগাঁও-এ  যাওয়ার  দিনের পোশাক নির্বাচন। পরমার বাবা ও তাঁর  বন্ধুর টেলিফোন কথোপকথন। এখানে স্থপতি ফারুখের বন্ধুর সংলাপ প্রক্ষেপন সাবলীল ছিলো না। এই চরিত্রটি না থাকলেও কিছু যেতো-আসতো না; বরং টেলিফোনে ভয়েস ব্যবহার করলে ভালো লাগতো।
ছবি ভালো হলে মানুষ শুধু নির্মাতাকে কৃতিত্ব দেয় না- বলে সেট ডিজাইনার  ভালো করেছে, কস্টিউম ডিজাইনার ভালো, শিল্পী-কলাকুশলীরা দারুণ, আর খারাপ হলে কিন্তু সমস্ত দায় নির্মাতার। তাই এই বিষয়গুলো নিয়ে কখনোই কম্প্রোমাইজ করা ঠিক নয়।
তবে সার্বিক বিবেচনায় ‘সুপ্রভাত বাংলাদেশ’ একটি পরিচ্ছন্ন ছবি। সেদিন মেফেয়ার থিয়েটারে প্রদর্শনীশেষে উপস্থিত জনদের প্রশংসা যথার্থই। সৈয়দ ইকবাল যেমন বলেছেন, হেলাল এগিয়ে যাচ্ছে। আসলেই! গুড মর্নিং মন্ট্রিয়ল থেকে গুড মর্নিং বাংলাদেশ পর্যন্ত হেলাল ক্রমশ: এগিয়ে যাচ্ছেন।
লেখার শুরুতেই ১৬ মি.মি. প্রজেক্টর ‘সিনেমানিয়া’র  ক্যানভাসের কথা বলছিলাম। অপেক্ষায় থাকবো হেলালের ‘সিনেমানিয়া’ দেখার যেখানে বাংলাদেশের মূলধারার চলচ্চিত্রের, সিনেমাহলের হারিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন নির্মাতা।



Untitled Document
Total Visitor : 708639
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :