Untitled Document
শ্রাবণ সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
সুরের জন্ম-মৃত্যু
-কফিল আহমেদ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
নূপুর আমাদের গানের সঙ্গী। একদিন ও একটা প্রশ্ন রাখলো। ও বলেছিলো- আচ্ছা, এই যে বলা হয় এইটা হচ্ছে লালনের, অইটা রবীন্দ্রনাথের- গানকে এভাবে অমুকের-তমুকের বলা হয় কেনো? কথাটা শুনতে খুব সহজ মনে হলেও এর উত্তরটা আমাকে খুব ভেবেচিন্তেই খুঁজতে হলো। গানের নানান ধরন, মেজাজ, বিষয়-আশয় আর প্রকরণের জায়গা থেকে ওর প্রশ্নের উত্তরটা দেয়া যেতো। কিন্তু আমার কাছে আসলেই মনে হয়, মনে হলো, কোনো গান যে যখন গায়, তখন তা তারই। আর যারা শুনে গানটা তখন তারও। যে যখন যেমন যেটুকু যেভাবে গায় তার সবটুকু তখন তারই। এভাবে কোনো গান যেমন একজন লালনের, তেমনি অনেকের হয়ে ওঠতে পারে। আসলে গানের কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি মালিকানা নাই। গানকে পণ্যে, যশখ্যাতির অবলম্বন হিসাবে দেখতে চাইলে মালিকানার দাবীটা, নামদাবীটা আসে। বড়ো বিষয় হচ্ছে, উপলব্ধি। মর্ম। উপাসনাটা কোন্ সুরে, কোন্ কথায়, কেমন, কোথায়?
কখনো নিজেরাই নিজস্ব পরিসরে। তুলারাশি কন্যা মাগো বাতাসে মিলায়/ বাতাসে মিলিয়া কন্যা হাসিয়া  বেড়ায়- আমার মাকে নিয়ে নানী মেহেরুননেসা গাইতো এই গান। ঘরোয়া পরিসরে গল্পগীতের আন্তরিকতায় বাংলা গানের বহুদিনের এক জ্বলজ্যান্ত ধারা। গল্প করতে করতেই নানান ঘটনার সামনে উপস্থিত হতো এসকল গীত। যা কথার পরম্পরায় প্রাসঙ্গিক হয়েই এগুতো থাকতো গল্পগীতের এসকল ঘরোয়া জীবন। নিজেদের জীবন নিজেদের সামনে উপস্থিত করাটা বাংলা গানের অবশ্যই এক আন্তরিক জাগ্রত ধারা। এ ধারা যতো অকপট, জীবন ততোটা সোজাসাপ্টা। এ ধারা যতো গুমোট, জীবন ততোটা অন্ধ। বাংলা গানে জীবন প্রকাশিত হয়েছে যেমন অকপটে, তেমনি অনেক কিছুই বন্ধ থেকেছে আটকে আটকে।












আমাদের অস্ফুট অশ্র“ত অদেখার মেয়েরা হাঁটতে বসে যা এমনিতেই গাইতো, গাইতে পারতো- সেই সুরধারাটি ঘরের উঠানের মাঠের হয়ে অন্তরে বেজে বেজে একদিন রবীন্দ্রনাথের প্রাণে একটু-আধটু করে আরো খোলামেলা নাচতে চেয়েছিলো। বিষয়টি এমনই অনুভূতিজাত, এমনই স্বতঃসিদ্ধ যে, আমার মন কেমন করে- একথা সুরে একবারই গাওয়া যেতে পারে। সেকথা দ্বিতীয়বার কিংবা বারবার গাইবার জন্য আরো ‘অন্য একান্তলোক’ দরকার। যা আসলেই একটানে অকপটে অনুভূতিকে মর্মে পৌছে দিতে। আর মর্মটুকু অনুভবে না এলে তো তা আর ঘটেনা। যেকোনো সত্য গানের বেলাতেই এরকম মর্মে লাগা প্রাণের অস্তিত্ব বাস্তবিক অর্থেই জরুরী। তবে একথাই সত্য যে, প্রকৃত সত্যগান কোনোরকম মিডিয়া মঞ্চের বাইরে থেকেও মুখ থেকে মনে, মন থেকে মুখে- এভাবে মনেমুখের হয়েই দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে। আর আমরা যাকে ‘লোকগান’ বলি সে গানের প্রকৃত শক্তিটা তো ওখানেই। লোকগান, আসলে তা সময়ের উত্তীর্ণ গান। যুগের বিশেষ হয়েই, যুগকে ছাড়িয়ে অন্যযুগে অন্যলোকে এমনকি একদিন অন্যদেশেরও একান্ত গান হয়ে ওঠে।
তবে সবই কি অন্যযুগে অন্যলোকে ঠিকমতো পৌঁছেছে? যুগে যুগে অনেককিছুই গুম হয়েছে। বলা যায়, গুম করা হয়েঠে। খুব আঁচ করি, আমাদের বাংলা গানের একদম মূলে যে আনন্দ-বিলাপ, এর নিবিড় পরিচয়টা খুব ঘন হয়ে আছে কথার যে সুরধারায়- সে ধারা মূলত এদেশের মেয়েদেরই অন্তরের গুনগুন দাগ, এই দাগ নিরবেই জ্বলছে নিভছে। রবীন্দ্রনাথসহ আমাদের ফোক গানের সুরের প্রকাশের স্তরে স্তরে এর আভাসটুকু একটু ভালো করে কান পাতলেই টের পাওয়া যায়। আমাদের ভাওয়াইয়া ভাটিয়ালগুলিতো আসলে এসরেই সদা প্রকাশ্য নমুনা। কিন্তু কথা হচ্ছে, এদেশের নারীদের জীবনানুভূতি শেষতক চিহ্নিত হলো ভাটিয়ালের মাঝি-মাল্লার সুরে-স্বরে। নারীরা অনেক গেয়েছিলো। কিন্তু  সুশৃঙ্খল সংজ্ঞাবাদের সমাজবাদীরা বাঙ্গালী নারীর সুর করে কথা বলাটাকে এখনো গান বলে বিবেচনা করে না। বলে ‘মেয়েলী গীত’। কোনো সুশৃঙ্খল সংজ্ঞাবাদ যাকে সঙ্গীত বলে বিবেচনা করেনি তাই কিন্তু আমাদের গানের প্রকৃত বাংলা ধারা। কখনো কারো গায়ে হলুদে, লগ্ন বুঝে কখনো কৃষ্ণ নাম হরি নাম নিয়েই এবাড়ি সেবাড়ি যাবার সুযোগ মিলছে বৈকি। প্রতিটা গ্রামে পাড়ায় এক দুই করে এরা অসংখ্য। অনেক। কিন্তু অন্য পাড়ার আমরা কেউই এদের নাম জানি না। কোনো চন্দ্রাবতী-রজকীনি-খনার কথা তো আমরা জানতে পেরেছি অনেক কালের পর, তখন তো এদের জিহবা কাটা, মুখ মরা. চোখ নির্বাক। তাও এদের জীবন যখন কোনো বেদনার গাঁথা হয়ে শ্রোতামনে ‘রসের’, কোনে সরস ভাব পেতে চেয়েছে তখনই এদের কথা কিছুটা অন্য পাড়ায় আয়োজন করে কাঁদতে বসেছে। উকিল মুন্সী, মিরাজ আলী এমনকি রাধারমণের গানের সুরে-কথায় নারীরা যতোটা চিহ্নিত, বলা যায় সমাজের প্রতিকূলে জন্মাবার ফলে নারীদের কথাগুলি নিজেদের সুরে-কথায় সরাসরি ততোটা সামনে এলো না।
রাধা! আমাদের বাংলা গানের বহুযুগের এক ‘প্রেমিক মেয়ে’। আমাদের অধিকাংশ গানেরই মধ্যখানে সে আছে। সে বসে আছে। সে হাঁটছে। সে জল আনতে যাচ্ছে। সে কাঁদছে কিন্তু হাসছে খুবই সামান্য। কবেকার সেই জ্ঞানদাস, চন্ডীদাস, বিদ্যাপতি, উদ্ধবদাস কিংবা সেদিনের উকিল মুন্সী, মিরাজ আলী আমাদের বাংলা গানের এক বিশেষ অর্জন। রাধা রূপটি বাংলা গানের এক বিশেষ অর্জন। রাধা সঙ্গের হাজারো গানের মাঝ থেকে ‘এভাবে কানতে কানতে রাধায় মরে যদি সদায়/..... মরিলে শেষে তোমরা কারে দেখাইবে’- উকিলের গানের এই অনুভূতি আমাকে খুবই আপ্লুত করেছে। জীবনানুভূতির এক গভীর বাস্তবানুগ জরুরী চিন্তার চিন্তার জন্যই। আর এ গানের মুখটিতে ব্যথিতের সামনের আশারূপটি এসেছে এভাবে যে- এমন শুভদিন আমার কোন দিন হবে?/ প্রাণনাথ আসিয়া আমার দুঃখ দেখিয়া/নয়নের জল নি বন্ধু মুছিয়া দিবে। তবে সত্য এই যে, এ গানের মুখেও কিন্তু রাধা দুঃখি। কিন্তু মরিলে শেষে তোমরা কারে দেখাইবে- এই প্রশ্নের মুখোমুখি আমাদের জীবন-সংস্কৃতি-রাজনীতি। সকলের প্রতি, সকল সত্ত্বার জন্যই এই প্রশ্নটি রাখা যেতে পারে।
জীবনভর যে কান্নারত আবার বেশীরভাগ দৃশ্যেই সে রাধার প্রকাশিত ‘মনমোহিনী’, ‘ব্রজবালা’, ‘কৃষ্ণকায়া’, নাম নিয়ে। কথা হচ্ছে, এসকল নাম-অভিধার আড়ালে কান্নারা আরো বেশি করে ভারী হয়েছে। দেখা গেছে গানের বেলাতে কোনো বাউল গায়ক কিংবা সাধকের সাথী হিসাবে-, সাধনসাথী হিসাবে অনেক নারী নানান দুর্দশার মুখোমুখি হয়েই পুরোটা জীবন জড়িত করে লোকালয়ের বাইরে নানান আখড়ায় মন্দিরে মাজারের আবডালে হারিয়ে গিয়েছে। সেদিনো কিশোরগঞ্জের নিকলীতে চন্দ্রনাথের আখড়ায় কামিনীর কথা জানালাম। শুনলাম বালিকা বয়সেই কামিনী সিলেট থেকে এখানে এসে এই আখড়ায় চন্দ্রনাথের ভাবশিষ্য রাধারমণ গোঁসাইয়ের সান্নিধ্যে জীবন পাড়ি দিয়েছে। রাধারমণ এবং কামিনী একই সাথে মামুদজান নামে এক বাউলের সান্নিধ্যে জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছে। আর চন্দ্রনাথতো ছিলোই। কামিনী বিষয়ে আরো জানলাম, বালিকা বয়সে বিধবা হবারও কিছু কাল পর কিভাবে গর্ভবর্তী হবার পর সিলেট হতে আত্মীয়রা তাকে এ আখড়ায় রেখে যায়। কামিনী আর মা হলেন না। কিন্তু তাকে আখড়ার ব্যবস্থাপনায় বিয়ে দেয়া হলো রক্ষিত একটা পাথরের সাথে। কামিনী গাইতেন মামুদজান, চন্দ্রনাথ আর রাধারমণের হয়ে। কামিনী গাইতেন। কিন্তু কামিনীর গান কোথায়? মামুদজান, চন্দ্রনাথ আর রাধারমণের কথা অনেকেই নানাভাবে জানেন দেখেছি। কামিনীর বেলায় যা বড়ো করে জানলাম তা কেবল তার পাথরের সাথে বিয়ে হবার গল্পটি। ভাবি, কামিনী কি নিজের কথা নিজের সুরে বলবার গাইবার কোনো তাড়না বোধ করেন নি কখনোই? হতে পারে, চন্দ্রনাথ-মামুদজানের গানে সুরে কামিনী সঙ্গ পেয়েছেন, কিন্তু কামিনী যদি নিজেই গাইবার সাথে সুরে সুরে নিজের কথা বলে উঠতেন তাহলে জীবনের আরো আবডাল, সুরের আরো আড়াল পরিষ্কার হতো। এভাবে একে একে আরো মুক্ত এবং সঘন হয়ে উঠতে পারতো বাংলা গান। আরো মুক্ত আর ‘রূপবান’ হয়ে উঠতো পারতো বহুযুগের রাধানাম।
নজরুল তো গেয়েছিলো- বন্দিনী আজ ভেঙেছে পিঞ্জর/ বাহির হয়েছে পথে। বাহির হয়েও পথে পথে কামিনীরা কেবলই বঞ্চনা সয়েছে। গেয়েছে। কিন্তু কি কথা গেয়েছে? কার কথা গাইছে? ওদের নিজেদের কথা কোথায় লুকানো তা চেনা দরকার। আমরা তা কখনোই চিনবো না- যদি না ওরা নিজের কথাটা নিজেরা মনমতো না বলতে পারে। আর অনেক কাল থেকেই তো ওরা মুখবন্দী, মূক! সেই মধ্যযুগেরও আগে থেকে পাথরের শ্রী গোবিন্দের সামনে নেচেগেয়ে পূজা-অর্চনা করে জীবন কাটালো। দেবদাসী! সেবাদাসী! আর তাই নাকি আমাদের বাংলা-ভারতীয় নাচগানের আদিশাস্ত্র। আদ্ধা, ত্রিতাল, তেওড়ার আঁকাবঁকা ধ্র“পদ। সেসবইতো একদিন জমিদারের ঘরে পৌঁছালো। কোনো গহরজান! যৌবনে পূজা পেয়েছে। তারপর একদিন অনেকের মতোই নিরুদ্দেশে-নিরুদ্দেশে পঁচতে হলো। সেই ধ্র“পদই একদিন মঞ্চে, সিনেমায় জনতার চোখে। অন্দরমহলের বাঈ-বাঈজীরা জীবনভর অন্তরালে কেঁদেটেদে, একদিন নেচেগেয়ে সিনেমার পর্দায় হাসতে লাগলো। জীবন না হলেও পর্দার আলো ছায়ায় কাঁপতে কাঁপতে সে ‘হাসিটা’ই একদিন অনেক টাকার ড্যান্সার। সাথে নামডাক। গ্ল্যামার। এখনতো প্রতিযোগিতার পণ্যে নিজেকে টিকিয়ে রাখার পথটা শার্পলি আরো আউলাঝাউলা। প্রফেশনাল হবার এলাইট  প্রোপোজাল! কিন্তু জীবনের অসঙ্গতিটা ঘুঁচলো কি? শুভদিন এলো কি? সময়ে মেয়েরা এগিয়েছে। এগুচ্ছে। কথাটা ঠিক। কিন্তু যা বলছিলাম, আপন কথাটা, আপন সুরটা, আপন ছন্দটা আপনা আপনি প্রকাশিত হওয়া দরকার। এই প্রকাশটা কেবল গানে সুরে নয়, জীবনের সবক্ষেত্রেই, সব কাজেই, সকল বেলাতেই দরকার।
পৃথিবী মাটির বুকের পরতে পরতে অসংখ্যের প্রাণস্পন্দনের সব অসঙ্গতি আর বৈষম্যের বিরোধের সব হাহাকারকে ধরে মুক্তির সামগ্রিক পথটি খুঁজতে গিয়ে, ভেবেচিন্তে প্রাণ থেকেই গাইতে হয়েছে- বন্ধু ডাকো, ডাকো তোমার ডাক/ তুমি বসো, বসো তোমার ঢঙগে।
সাতটা শঙ্খের একসাথে বেজে ওঠবার জীবনে প্রতিটি সত্তারই নিজস্ব ডাকটুকু, নিজস্ব ভঙ্গিমার সাবলীল প্রকাশটুকু, প্রকাশের পরিবেশ দরকার। বিরুদ্ধ দশার বাস্তবিক মুখোমুখি হয়েই গাইতে ডাকতে বসতে নাচতে হয়। ভাবি, কাউকে কাউকে তো আগুন বন্যায়, ভূমিকম্পের মাটিতেই পা ফেলে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। হাঁটতে নাচতে গাইতে হয়। প্রকৃতি বা দেশের ঝাঞ্ঝায় লোকেরা সব বন্ধ করে লুকায়। সবাই সিকিউরিটি চায়। একটা গল্প শুনছিলাম, সন্ধ্যার আগে ঝড়ের শুরুতে সবাই যখন জানালা কপাট বন্ধ করছে তখন এক মুক্তমন তরুণ মেয়ে ঘরে যেয়ে সব জানালা কপাট আলো খুলে দিয়ে ঝড়ে দশার প্রতিকূলে উড়তে চাইলো। যেকোনো গুমোট দশার সামনাসামনি এটাই তো জীবনের প্রাণগান। এ ব্যাপারটা একদিন গানে এলো এভাবে- ঝড়ো রাত্রি, বাড়িটা কাঁপছে/ জানালাটা খুলে দাও/ দরোজাটা খুলে দাও/জানালাগুলি ও ঘর ছেড়ে পাখি হয়ে উড়ে যাও/ উড়ে যাও। সবাই যখন ঘরদোর চোখমুখ বন্ধ করে রাখে তখন কাউকে কাউকে অন্ধকারের সব অতল অন্তরাল একে একে উন্মোচিত করতে হয় শক্তি নিয়েই। দাঁড়াতে হয় ঝড়-ঝাঞ্ঝা, মৃত্যু কিংবা জন্ম যন্ত্রনার মুখোমুখি।
জীবন কিংবা সময়-সংস্কৃতির চলতি প্রকরণের মুখোমুখি হয়েই, এমনকি প্রকৃতিরও রন্ধ্রে-রন্ধ্রের সব গোপন হিংস্র লোভী অভিসন্ধির রকমসকমের সামনে দাঁড়িয়ে যাত্রাপথে সবকিছুর সামনে দাঁড়িয়ে ভাবতে হয়েছে- গানগুলি বুঝি জল্লাদের দুই পায়ের কাছে ক’ফোটা চোখের জল?
অষষ ভড়ৎসং ধৎব ঁমষু
খরশব ধ শরহম ড়ভ মড়ষফ
সোনার রাজার মতোই কুৎসিত, সব প্রকরণ কুৎসিত।
সব প্রকরণ ধরে কথা বলবার সাথে সাথে চিন্তার, কর্মের একটা দায় কিন্তু মনে জাগতে শুরু করে। কোনো কিছুর সমালোচনার মাঝ দিয়ে মুক্তির জাগরণের একেকটা সমূহ পথও কিন্তু জন্মাতে শুরু করে। গোটা চরাচর, সব অশেষ নক্ষত্ররাজি আর আমাদের আপন গ্রাম ঠিকানার বহুকালের জীবন যাপন আর চারপাশের সব বন্ধুসখা প্রাণীপ্রাণ পাখি গরু বাঘচাষীর সবার অন্তরের যন্ত্রণা, শূন্যতা আর হাহাকারের সামনে স্বপ্নটা রেখেই মহামিল রচনার পথ খুঁজে পাওয়ার একটা অনিবার্য আলেখ্য মনে জেগেছে বলেই একদিন গেয়েছি- সাতটা শঙ্খ একাবারে বাজাবো/ পুরোটা সপ্তক একসাথে বাজাবো। সবারই একসাথে বেজে ওঠবার, গেয়ে উঠবার অন্তরাটুকুতে বলেছি- শঙ্খ যাইও বন্ধুর বাড়ি/ শঙ্খ কইও তুমি তারই।
পুড়ছে গ্রাম, কারখানা, তালাবদ্ধ গার্মেন্ট শ্রমিক, তেলখনি। আকাশ হতে বজ্র নিক্ষেপ করছে বৈশাখ তার জমিনে। ওখান থেকেই ভূমিতে আগুন নিক্ষেপ করছে বোমারু বিমান। এ-ওর দিকে সামনাসামনি বুলেট পেট্রোল ছুঁড়ে মারছে বুকে মুখে। চোখ থেকে মুখে, মুখ থেকে আবার চোখে ছড়িয়ে পড়ছে দিকে দিকের ভয়ানক সব বিভৎসতা।
তা সরিয়ে একদিন সারাটা আকাশ দুনিয়া আর জলঅগ্নি ঝড়ঝাঞ্ঝা শিলাবৃষ্টি শেষে আরো ছায়াময় হবে নিশ্চয়ই! বৃষ্টিজলে ক্ষুধাটুকু নরম হলে খালে বিলের ছায়ায় পাড়ে পাড়ে জীবনের সাবলীল ঘোরাফেরা।
বাঁচি খুব প্রিয় প্রাণসৌন্দর্যের হয়ে। প্রজ্জ্বলন্ত কিন্তু আরো নরম, চৈতন্যের আরো পরম, মনোপ্রাণে অন্তরের আরো আলোক আগুন- তাও আমাদের আছে। এতোসবের মুখোমুখি প্রতিদিন, প্রতিটা রাত্রিদিন তাকে নিয়েই তো বাঁচি। আমি এবং আমার আগুন আমরা দু’জন যমজ বোন, যমজ ভাই। সে আমার একান্ত অনুভবের রূপ। রূপ নাম। এই অনুভবে বোন-ভাই, ভাই-বোন, একই সাথে একই অঙ্গে বিরাজ করে। সকল সত্তারই আলোকপ্রাণ আগুন। সবচাইতে আপন, সত্তারই প্রিয় রূপনাম। পৃথিবীর সব গেরিলার সুন্দর অন্তর। এই রূপনাম।
যমজবন্ধু! হাপড়টা টানতে টানতে লোহার লকলকে লালে হাতুড়ির ছন্দে ছন্দে প্রাণপন একই সাথে বাঁচি যেনো সেই চেনাজানা স্থির অবিচল কোনো চঞ্চল কামার। দিকে দিকে জীবন আরো আগুয়ান। সামনে আরো নতুনের গ্রাম।
গান বহু দিনের। বহু যুগের। অনেক জীবনের। ভিক্ষুক এবং ধার্মিক, সাধক এবং রাজন্যজন, বিরহী এবং বিদ্রোহীজন, নারী এবং কৃষকজন সব দেশে সবাই গেয়েছেন। আমাদের বাংলা গানের কবিদল চম্পাবতীর গ্রামে এসে একদিন বলেছিলো- বাজিতে বাজিতে বাদ্য বাজিয়া চলিল/সাজিতে সাজিতে কন্যা সাজিয়া চলিল। চরণ দুটির একটি বড়ো দিক কিন্তু কোনো বাদ্যকার নাই। বাদ্য নিজেরাই বাজিতে লাগিল। আমার কাছে বাদ্যের এই আপনাআপনি বেজে ওঠবার বিষয়টা অনেক বড়ো স্বপ্নের। তা কেবল নিতান্ত রস নয়। অনেক উত্তীর্ণ প্রকাশ। আর কন্যা নিজেই সাজছিলো। জীবনের এই খোলামেলা আনন্দঘন প্রকাশটা, বিষয়টা অনেক জরুরী। প্রাণে প্রাণ মেলাবারই ঘটনা। বাদ্য যখন নিজেই বাজতে থাকে আর সাথে কন্যা নিজে নিজেই সাজতে থাকবার এই জীবনলগ্নতা অবশ্যই একটা বিরাট স্বপ্নের। সময়-সমাজ সাথে প্রকৃতিতে প্রাণ আর জড়ের ব্যবধানও কিন্তু দূর হয়ে যাবার একটা বিপ্লবাত্মক সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখতে পাই এখানে। যে গানে পৃথিবীর ঝোঁপ-ঝাড়ে চক্ষু-কর্ণ-ওষ্ঠ নমুনার সেই বীজপত্র ফোঁটে। যদিও গানে বাদ্যে এখনো নিজে নিজে প্রাণবন্ত বেজে উঠছে না, কন্যা তখনো এমনকি এখনো ঠিকমতো নিজে নিজে সাজে না- কিন্তু যদি চরাচরের সব প্রাণবাদ্য আনন্দিত হয়ে নিজেরাই বেজে ওঠতো আর কন্যা নিজেই আপন সাজে মনোমতো সজ্জিত হতে থাকতো- তবে চম্পাবতির গ্রামে এসে আমাদের বাংলা গানের কবিদলের সেই বলাবলিটা এতোদিনে আরো যথাযথ হতো।
সুরের পটভূমির গহনে যে সৌন্দর্য, তা প্রকাশের প্রস্তুতির এই সত্যটা জীবনে-প্রকৃতিতে ঘুমিয়ে থাকে। সময়ে তা জাগে। প্রথমে তা অবশ্যই মানুষেরই প্রাণে। প্রাণমতো গাইতে পারলে আপনা আপনি তা প্রকৃতিরই অন্যসব খানে বেজে ওঠে। জেগে ওঠে। জেগে ওঠে বলেই প্রকৃত সত্য গানে কোনো নিদের্শনা লাগে না। আপনা আপনি তা সমস্তটা চরাচরব্যাপী, দেখা-অদেখার সব গ্রহসহ সকল সত্তারই উপলব্ধির জাগ্রত জীবনব্যাপী ঐকতানের নতুন কিন্তু তিলতিল অনিবার্য শুরু। প্রাণের সব বদ্ধ জড়তা দূর করবার জন্য, আর জীবনের মর্মে মর্মে সুর বাদ্য নৃত্যের একীভূত এক আনন্দঘন সদাহাস্য প্রিয় ভূমিকা। প্রাণে প্রাণ মেলাবোই। বলে রাখি।


(সমাপ্ত)



 



Untitled Document
Total Visitor : 708963
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :