Untitled Document
শ্রাবণ সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী

নেড়ুদা ও পাঁচু স্যার
- রজত শুভ্র বন্দোপাধ্যায়

আমরা যখন ক্লাস ফাইভে উঠলুম, তখন হাই-স্কুলে এসেই বড়দের মুখে শুনতে পেলুম একটা অদ্ভূত কবিতা –

পাঁচু পাঁচ ছাগলের মা,
পাঁচুর পাঁচ চড়ে সাত রা!

 এর কি মানে, তা বোদ্ধারাই বলবেন, তবে কেন জানি না, আমরা বেশ আমোদ পেতুম এই কবিতাটি শুনে, এবং বলে । গুজব ছিল যে আমাদের সেই বিখ্যাত নেড়ুদাই নাকি এই কবিতার কবি । নেড়ুদা তখন বোধহয় ক্লাস সিক্সে পড়ে । আর “পাঁচু” আমাদের ইস্কুলেরই এক শিক্ষকের আদরের নাম, আসল নাম বিজয় বাবু । তারপর আমরা যখন ক্লাস এইটে উঠলুম, তখন পাঁচু স্যার আমাদের SOCIAL STUDIES পড়াতে এলেন । নেড়ুদা ততদিনে আমাদের সহপাঠী ।

একদিন ক্লাস চলছে, পাঁচু স্যার আমাদের পড়াচ্ছেন এক অত্যন্ত বিরক্তিকর বিষয় – CONSTITUTION OF INDIA । আমরা উস-খুস উস-খুস করছি, আর উনি বলে যাচ্ছেন, “Just as Gandhiji is referred to as the Father of the Nation, Ambedkar is often referred to as the Father of the Constitution…” এমন সময় নেড়ুদা হঠাৎ হাত তুলল ।

 স্যার পড়ানো থামিয়ে খুবই সন্দেহের চোখে নেড়ুদার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কি নেড়ু, কিছু বলবে নাকি?” ওমনি নেড়ুদা দাঁড়িয়ে উঠে বলল, “হ্যাঁ স্যার, হঠাৎ ওনাকে Father of the constipation বলা হয় কেন? উনার ইশবগুলের কারখানা ছিল নাকি?”
 

স্যার বললেন, “আ-আ-আ-আ-হ! Constipation কেন হবে, Constitution! আহম্মক!, Constitution শোনও নি কখনও?” নেড়ুদা অম্লান বদনে বলল, “হ্যাঁ স্যার, কেন শুনব না? বাবাকে প্রায়ই বলতে শুনি, হর্লিক্স খেলে নাকি constitution ভালো হয়! তাহলে কি আম্বু দাদুর হর্লিক্সের কারখানা ছিল?”

 পাঁচু স্যার এবার বেজায় রেগে গিয়ে বললেন, “দূর ছাই! বিরক্ত কোরো না, পড়াতে দাও দেখিনি! চুপ করে বসে থাকো।”

 পড়ানো চলতে থাকলো – স্যার সবে আম্বেদকার সেরে আর্টিকলসে এসেছেন, এমন সময় নেড়ুদা আবার হাত তুলল! স্যার কটমট করে নেড়ুদার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কি হল? বাথরুম পেয়েছে?”

 নেড়ুদা গম্ভীর মুখে বলল, “না স্যার, এখনও পায় নি । বলছিলাম কি, আপনার নাম কি সত্যি পাঁচু, নাকি ওরা এমনিই বলে?”
স্যার দু চোখ বন্ধ করে বার দুয়েক বড় বড় শ্বাস নিয়ে কেটে কেটে বললেন, “আ-মা-র  না-ম  বি-জ-য় র-য়। আর জ্বালিয়ো না বাপু, বোসো।”
আরো কিছুক্ষণ পড়ানো চলল, তারপর আবার নেড়ুদা হাত তুলল! স্যার কি আর করবেন, ব্যাজার মুখ করে বললেন, “বল, কি বলবে, তাড়াতাড়ি বল!”

 নেড়ুদা অমনি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “স্যার, আপনি কি পাঁচু পয়ে আকার চন্দ্রবিন্দু চয়ে হস্যু লেখেন, নাকি স্রেফ বাংলার পাঁচ লিখে তলায় হস্যু বসিয়ে দেন?”
এবার স্যার আর কোনও কথা বললেন না, উঠে এসে নেড়ুদার কান ধরে টানতে টানতে দরজার কাছে নিয়ে গিয়ে আঙুল দিয়ে বাইরের দিকে দেখিয়ে দিলেন, নেড়ুদাও নির্বিকার ভাবে করিডরে বেরিয়ে গেল। স্যার এসে তাঁর চেয়ারে বসে পড়লেন, দুই কনুই টেবিলে, দু হাত কপালে! আমরা চুপ চাপ বসে রইলুম, কারোর মুখে কোনও কথা নেই। ‘পিন ড্রপ সাইলেন্স’ কথাটার সঠিক অর্থ যেন অবশেষে আমাদের কাছে পরিস্কার হয়ে গেল। তারপরেই আচমকা সেই ‘সাইলেন্স’ ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল, আমরা শুনতে পেলুম বাইরের করিডর থেকে একটা আওয়াজ – “টুং টুং টুং টুং টুং ..... ঠকাস্‌!” তারপর আবার কিছুক্ষণ চুপচাপ, আর তারপরেই শুরু হল ভয়ানক কোলাহল, এক সঙ্গে অনেকগুলো গলার শব্দ, সবই বড়দের গলা।

 পাঁচু স্যার ততক্ষণে উঠে বেরিয়ে গিয়েছেন আওয়াজের দিকে, আমরাও কজন ক্লাসের দরজা থেকে উঁকি মেরে দেখি, করিডরের শেষে কাঠের পার্টিশন, ওধারে স্টাফ্‌ রুম, সেখানে বেশ কিছু শিক্ষক শিক্ষিকার ভিড়, সকলেই একসঙ্গে কথা বলছেন, তার মধ্যে হিড়িম্বার তীক্ষ্ণ গলা শোনা গেল, “ভীষণ অসভ্য ছেলে, ভী-ঈ-ঈ-ঈ-ষণ অসভ্য!” তারপরেই নেড়ুদার দৃঢ় গলা, “ওটা আমার, ওটা দিন না আমাকে!” তারপর দেখি পাঁচু স্যার গিয়ে বললেন, “আমি করছি যা করবার”। বলে নেড়ুদাকে টানতে টানতে ক্লাসে ঢুকে পড়লেন। নেড়ুদা কিন্তু তখনও বলে চলেছে, “স্যার, আমার গুলিটা?”

 পাঁচু স্যার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “কি যে করি তোমাকে নিয়ে!” ওমনি নেড়ুদা বলল, “কিচ্ছু করতে হবে না স্যার, আমি তো ভালোই আছি, কিন্তু আমার গুলিটা ......”

 এবার পাঁচু স্যার হুঙ্কার দিয়ে বললেন, “আরে! নিকুচি করেছে তোমার গুলির! এটা স্কুল! তুমি কি ভেবেছো এটা তোমার পাড়ার রাস্তা?”

 নেড়ুদা সলজ্জে জীভ কেটে বলল, “ছি ছি! এটা রাস্তা হবে কেন? কি যে বলেন স্যার! আপনি এটাকে রাস্তা বলছেন? এখানে কি গাড়ি বাস চলে? বলুন?” পাঁচু স্যার চীৎকার করে বললেন, “চোপ্‌! আর একটা কথা নয়, নইলে, নইলে ... নইলে ...”

নইলে কি, তা আর আমাদের শোনা হল না, ঢং ঢং করে ঘন্টা পড়ে গেল, ক্লাস আপাতত শেষ। স্যার যেন ধড়ে প্রাণ পেলেন, নিমেষের মধ্যে বই খাতা গুছিয়ে নিয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমরাও সঙ্গে সঙ্গে নেড়ুদাকে ঘিরে ধরে জিজ্ঞেস করলুম, কি হয়েছিল?
নেড়ুদা বলল, “আরে! কি আর হবে, এমন কিছুই না। পরের পিরিয়ডটা এখন কার বলত?” দীপু উত্তেজনায় প্রায় হিড়িম্বার মত গলা করে বলল, “আহ্‌! বলই না কি হয়েছিল?”

 নেড়ুদা তখন যেন অনিচ্ছা সত্তেও বলল, “ বলছি, বলছি, আসলে একা একা করিডরে দাঁড়িয়ে বোর হয়ে যাচ্ছিলাম, তাই পকেট থেকে একটা গুলি বের করে ক্যাচ্‌ ক্যাচ্‌ খেলছিলাম একা একাই, তারপর - ওইটুকুনি জিনিস তো - হঠাৎ হাত ফস্কে পড়ে গিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে স্টাফ-রুমের কাঠের পার্টিশনে গিয়ে লাগলো, আর ঠকাস্‌ করে একটা বিকট শব্দ হল, শুনেছিস হয়ত। সেই শব্দ শুনে সবাই বেরিয়ে এলো, এমন ভাব করছিল যেন মহাভারত অসুদ্ধ হয়ে গেছে! আরে বাবা! ওইটুকুনি একটা কাঁচের গুলি, তাতে কি আর পার্টিশন ভাঙে? কিন্তু এদের কে বোঝাবে? সব হই হই হই হই করে উঠলো! আর ওই হিড়িম্বা! কি লোভী! আমার গুলিটা কিনা ঝেড়েই দিলো! নির্ঘাত বাড়ি গিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে গুলি খেলে!”

পরদিন শুনলুম, পাঁচু স্যার এক মাসের ছুটি নিয়ে শান্তিনিকেতন গিয়েছেন।




Untitled Document
Total Visitor : 709005
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :