Untitled Document
শ্রাবণ সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল
-মার্জিয়া লিপি

প্রণোদিত প্রজননের মাধ্যমে নতুন জীবের উদ্ভাবনঃ
জাতীয় উদ্যান, অভয়ারণ্য, চিড়িয়াখানা, গেম রিজার্ভ প্রভৃতি ভ্রমণ ও শিক্ষামূলক গ্রহণ।
বুনো জীনপুল থেকে কাঙ্খিত ও উন্নত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন সংকর জীব উদ্ভাবন


পরিবেশতান্ত্রিক গুরুত্ব :
কোন পরিবেশতন্ত্রে যদি কোন বড় ও দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন দেখা যায়, তবে সেই পরিবেশতন্ত্রের উদ্ভিদ ও প্রাণীকূলের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হয়। এর মাধ্যমে খাদ্যচক্রে শক্তি প্রবাহের ব্যাঘাত ঘটে এবং  পরিবেশ তন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হয়, উদ্ভিদ ও প্রাণীর অস্তিত্ব বিপন্ন হয় । ফলে শক্তি প্রবাহে বিঘœ ঘটে। এর সুদূরপ্রসারী ফলস্বরূপ মানবজাতির স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়; মানুষের অস্তিত্ব ও বিপন্ন হয়ে পড়ে। এই মারাত্মক পরিস্থিতি থেকে মানবজাতির অস্তিত্বকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে।



জীববৈচিত্র্যের অন্যান্য গুরুত্ব :
জীববৈচিত্র্যের অর্থনৈতিক ও পরিবেশতান্ত্রিক গুরুত্ব ছাড়াও নিম্নলিখিত নানাবিধ গুরুত্ব রয়েছে।

নৈতিক গুরুত্ব :
পৃথিবীতে শুধু মানুষই নয়, প্রতিবেশী হিসেবে অনেক প্রজাতির সহবাস। তাই জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা মানুষের নৈতিক দায়িত্ব।

সৌন্দর্য্য বিষয়ক গুরুত্ব :
প্রকৃতির বৈচিত্র্য ও প্রকৃতির নিসর্গ সৌন্দর্য্য অবলোকন মানুষের সৌন্দর্য্য পিপাসু মনে অপার রহস্যের জোগান দেয় তাই জীববৈচিত্র্যের সৌন্দর্য্য বিষয়ক গুরুত্ব অপরিসীম।

জীবের অস্তিত্ব রক্ষার্থে জীব জগতে কোন জীবই এককভাবে টিকে থাকতে পারে না। পরস্পর পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। এ জীবনধারায় একটি উদ্ভিদ বা প্রাণীর জীবন বিপন্ন হলে তা অন্য উদ্ভিদ বা প্রানীর অস্তিত্বকে প্রভাবিত করে। তাই জীবজগতের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজন একটি সমৃদ্ধশালী জীববৈচিত্র্য।

বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের বর্তমান অবস্থা :
বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের অবস্থা সংকটজনক। গত বিশ বছরে মাছের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। ৫৪টি প্রজাতি আগামী ১০ বছরে বিলীন হয়ে যাবে, যদি তাদের রক্ষা করার কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা না যায়। বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ বাংলাদেশে বিড়াল গোত্র পরিবারের আটটি বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী আছে। এদের প্রতিটির সংখ্যাই আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। বিগত শতাব্দীতে এ ধরনের প্রাণী যেমনÑ  রাইনো, বাইসন ও গাউর যা একসময় এদেশে প্রচুর পাওয়া যেত, তারা ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে। একই পরিণতি ঘটেছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির ক্ষেত্রেও। এদেশে ৩৮৮ প্রজাতির পাখি রয়েছে। এর মধ্যে ৫৪ প্রজাতি আগামী দশ বছরে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গোলাপী মাথার উড-ডাক পাখিটি শুধু বাংলাদেশ ও ভারতের আসাম প্রদেশে পাওয়া যেত। এখন আর এর অস্তিত্ব নেই। ময়ূর ও লালশির হাঁস এই দুই প্রজাতির পাখি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।  ১৯৭৪ সালে সর্বশেষ এক জোড়া ময়ুর দেখা গেছে মধূপুর শালবনে। বিভিন্ন প্রজাতির সরীসৃপ ও সাপের আবাসভূমি অধিকাংশই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। চিরতরে হারিয়ে গেছে বেঙ্গল ফোরিক্যান ময়ূর, সাম্বর হরিণ ও মায়া হরিণ।

যেসব প্রজাতির প্রাণী এখনও টিকে আছে তাদের অবস্থা করুণ। কিন্তু পাল্লা ঈগল এখনও টিকে আছে। কচ্ছপ, বিশেষ করে সামুদ্রিক রিডলে কচ্ছপ দ্রুত বিলুপ্তির পথে। কাঁকড়া রপ্তানীযোগ্য প্রাণী হওয়ায় এটিও বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে চলছে।। রপ্তানির অন্য শিকার হচ্ছে ব্যাঙ ও গুইসাপের চামড়া। রপ্তানির কারণে এগুলো এখন বিরল প্রজাতির তালিকাভুক্ত। রেসাস প্রজাতির বানরের অবস্থাও বড় করুণ। হাতি ক্রমাগত বিরূপতার শিকার হচ্ছে বন দখলকারীদের তরফ থেকে। বন দখলকারীরা বনকে ক্রমাগত সঙ্কুচিত করে ফেলেছে। এজন্য হাতিরা পিছু হটে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রান্তসীমায় গিয়ে ঠেকছে।

এদেশে উভচর প্রজাতি আছে ২২টি। এর মধ্যে ৩টি প্রজাতির অবস্থায় খুবই খারাপ, আর ৫টি  প্রজাতি অসহায় অবস্থার মধ্যে বাস করছে। সরীসৃপ প্রজাতির সংখ্যা ১০৯। এর মধ্যে ঘড়িয়াল প্রজাতি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং ৫৮টি প্রজাতি প্রায় বিলুপ্তির পথে। স্তন্যপায়ী গ্র“পের প্রজাতির মধ্যে ১০ টি প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এদের মধ্যে আছে রাইনো, বনগরু, বনমহিষ, নীলগাই। এছাড়াও ৪০টি প্রজাতি বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান এ দেশের জীববৈচিত্র্য যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা যদি ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে তবে আগামী ১০ বছরের মধ্যে অনেক প্রজাতি এদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বাংলাদেশের ১১০ প্রজাতির অভ্যন্তরীণ স্তন্যপায়ীর মধ্যে ৪০ টি নানা পর্যায়ের বিপদের সম্মুখীন, ১১ টি অত্যন্ত বিপন্ন, ১৩ টি বিপন্ন, ৬ টি বিপন্নপ্রায়। তথ্যাভাবে ৫৩ প্রজাতির অবস্থা মূল্যায়ন সম্ভব হয়নি । বর্তমানে ১৭ টি প্রজাতি বিপদমুক্ত। বঙ্গোপসাগরের স্তন্যপায়ীর মধ্যে ৩ প্রজাতির তিমি পৃথিবীর সর্বত্রই বিপন্ন।  নীল তিমি ও পাখনাওয়ালা তিমি বিপন্ন এবং কুঁজো তিমি বিপন্ন প্রায়। প্রায় ১১০ প্রজাতির অভ্যন্তরীণ স্তন্যপায়ীর মধ্যে বাদুড় বর্গই বৃহত্তম, তাতে আছে ৮ গোত্রের ২৯ প্রজাতি। দ্বিতীয় বৃহত্তম বর্গে আছে ৬ গোত্র ও ২৭ প্রজাতি।

গোত্রে অন্তর্ভূক্ত বাংলার বাঘ, চিতাবাঘ, বনবিড়াল ও মেছোবাঘ সহ সব বিড়াল প্রজাতি। চৎরসধঃবং বর্গের ১০টি প্রজাতির সবগুলিই বিপন্ন এর মধ্যে উল্লুক অতি বিপন্ন প্রজাতি। বিপন্ন হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে এখনও ৩ প্রজাতির ভল্লুক আছে। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বনে রয়েছে প্রায় ২০০টি হাতি। ডলফিন বর্গের ৭টি প্রজাতির মধ্যে স্বাদু পানির ডলফিন প্রধান নদীগুলিতে ছড়িয়ে আছে। অন্যদের বাস  সুন্দরবনের খাঁড়ি ও উপকূল এলাকায়।

উপকূলীয় জীব-বৈচিত্র্য :
ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ নিরক্ষীয় অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় আয়তনে ছোট হওয়া সত্বেও নানা জাতের রং বেরঙের পাখি, বৃক্ষরাজি, জীব-জন্তু ও তাদের মধ্যে বৈচিত্র্যতা লক্ষ্য করা যায়। এদেশের জলবায়ু ও ভূ-প্রকৃতি জীব-বৈচিত্র্যকে ধারণ করার মূল ভূমিকা পালন করে থাকে। জীব মন্ডলের বিশাল বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়েছে নানা দ্বন্ধ সংঘাতের মধ্যদিয়ে বিবর্তন প্রক্রিয়ায়। পরিবেশে বিরুপ পরিবর্তনের ফলে অনেক প্রজাতির সকল সদস্য বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যে সব এলাকার প্রকৃতি স্লিগ্ধ, উষ্ণ এবং আবহাওয়ায় জলীয়বাষ্পের পরিমান বেশী, সেখানেই বিপুল এবং বিশাল জীববৈচিত্র্য।

এদেশের জলবায়ু ও ভূ-প্রকৃতি জীববৈচিত্র্যকে ধারণ করার মূল ভূমিকা পালন করে থাকে। বিষুবরেখার দু’পাশে কর্কট ও মকরক্রান্তীয় উষ্ণ এলাকাগুলোই হল জীবমন্ডলের সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান। সেখানে তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে, সেখানে উদ্ভিদ ও প্রানী খুব সহজে তার বিপাক ক্রিয়া চালিয়ে যেতে পারে।

পৃথিবীতে বিরাজমান জীববৈচিত্র্যকে জীব, তাদের জীন, প্রজাতি বাস্তুতন্ত্র ও ল্যান্ড স্কেপ - এর আলোকে বর্ণনা করা যায় এবং জীববৈচিত্র্য মূলতঃ এসব উপাদানগুলোর বৈচিত্র্যের উপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশের যে সকল বনাঞ্চল ও উপকূলভাগে জীব-বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। তার মধ্যে -
১.    সুন্দরবন
২.     চকোরিয়া সুন্দরবন
৩.    সোনাদিয়া
৪.     সেন্টমার্টিন
৫.    কক্সবাজার, টেকনাফ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য

সুন্দরবন :
বিশ্বের বিষ্ময়কর ও বিশ্ব শ্রেষ্ঠ বন।  জীব বৈচিত্র্যের জীবন্ত পাঠশালা ও বন্য প্রাণীর স্বর্গরাজ্য এই সুন্দরবন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাক্ষেত্র এই সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ । মানুষখেকো রয়েল বেঙ্গল টাইগার, লোনা পানির হিংস্র কুমির, মায়াবী চিত্রল হরিণসহ এখানে ৩৩০ প্রজাতির ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ, ১২০  প্রজাতির মাছ, ৮ প্রজাতির উভচর, ৫০ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ২৭০ প্রজাতির পাখি, ৬০ প্রজাতির চিংড়ি ও কাঁকড়া উল্লেখ্যযোগ্য ।

চকোরিয়া সুন্দরবন :
সমুদ্রের কোল ঘেঁষে কক্সবাজার জেলার চকোরিয়া থানায় ২১০০০ হাজার এলাকা জুড়ে চকোরিয়া সুন্দরবনের অবস্থান থাকলেও আজ সেই বন সম্পূর্ণ ধ্বংসের পথে পরিবেশ বিপর্যের নজীববিহীন দৃষ্টান্ত এই চকোরিয়া সুন্দরবন। অপরিকল্পিত ও অদূরদর্শী বাগদা চিংড়ি চাষের ফলে মাত্র দু’দশকের ব্যবধানেই জোয়ার-ভাটায় ঢেউখেলানো প্রানবৈচিত্র্যের চকোরিয়ায় সুন্দরবন আজ বিলুপ্ত প্রায় কেওড়া, গেওয়া, বাইন, সুন্দরী প্রভৃতি ২০ প্রজাতির উদ্ভিদসহ বাঘ, হরিণ, বনবিড়াল, বন্যশুকর, শেয়াল, বানর সরীসৃপ সবই প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে ইতিমধ্যে।

সোনাদিয়া দ্বীপ :
উপকূলীয় অঞ্চলে কক্সবাজার জেলার মহেশখালি উপজেলার একটি সুন্দর দ্বীপ সোনাদিয়া। দ্বীপটির আয়তন ৭ বর্গ কি: মি:। দ্বীপটির কক্সবাজার জেলা সদর থেকে ১৫ কি: মি: উত্তর-পশ্চিমে এবং মহেশখালি দ্বীপের দক্ষিণে অবস্থিত। একটি খাল দ্বারা সোনাদিয়া দ্বীপ, মহেশখালি দ্বীপ থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। তিন দিকে সমুদ্র সৈকত, সাগর লতায় ঢাকা বালিয়াড়ি কেয়া, নিশিন্দার ঝোপ, ছোট-বড় খাল বিশিষ্ট প্যারাবন এবং বিচিত্র্য প্রজাতির  জলচর পাখি দ্বীপটি করেছে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত।

সোনাদিয়া দ্বীপ মানব বসতির ইতিহাস মাত্র ১০০-১২৫ বছরের। দ্বীপের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৬০০। মাছ ধরা এবং শুকানো দ্বীপের মানুষের মূল পেশা।

জীববৈচিত্র্য :
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব  উপকূলীয় প্যারাবনের অবশিষ্টাংশ দেখা যায় সোনাদিয়া দ্বীপে।   এর বিস্তীর্ন প্যারাবনে রয়েছে সাদা বাইন, কালো বাইন, কেওড়া, হারগোজা, নুনিয়া ইত্যাদি সহ প্রায় ২৭ প্রজাতির প্যারাবন সংশিষ্ট উদ্ভিদ। দ্বীপে ৭০ প্রজাতির জলজ ও উপকূলীয় অতিথি পাখির আগমন ঘটে। এখানে দেখা যায় পৃথিবীব্যাপী বিপন্ন তিন প্রজাতির পাখি স্পুনবিল ম্যান্ডপাইপার, এশিয়ান উইডচার এবং নরডম্যান’স গ্রীনশ্যান্ক। সোনাদিয়ার সৈকত এলাকা পৃথিবীব্যাপী বিপন্ন জলপাইরঙা কাছিমের ডিম পাড়ার আদর্শ স্থান। এক সময় এ দ্বীপে সবুজ কাছিম এবং লগারহেড কাছিমেরও আগমন ঘটত।

সোনাদিয়ার প্যারাবন, কাঁদাময় এলাকা, খাল ও মোহনা নানা প্রজাতির মাছ ও অমেরুদণ্ডী প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। দ্বীপের জলভাগে ৮০ প্রজাতির মাছ বিচরণ করে যার মধ্যে বাটা, কোরাল, তাইলা, দাতিনা, কাউন, পোয়া ইত্যাদি প্যারারন সংলগ্ন খালগুলোতে পাওয়া যায়। এছাড়াও সোনাদিয়ায় ১৯ প্রজাতির চিংড়ি এবং  ১৪ প্রকারের শামুক ঝিনুক পাওয়া যায়। দ্বীপের খাল ও তীরবর্তী সমুদ্র এলাকায় পৃথিবীব্যাপী হুমকির সম্মুখীন(এষড়নধষষু ঃযৎবধঃবহবফ) ইরাওয়াদি, ডনফিন, বটলনেসে ডলফিন এবং পরপইস দেখা যায়।

 

সেন্টমার্টিন দ্বীপঃ

বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত ভূমি সেন্টমার্টিন দ্বীপ। টেকনাফ উপজেলার বদরমোকাম হতে ১০ কি:মি দক্ষিণ-পশ্চিমে মাত্র  ৫৯০ হেক্টর আয়তনের ৭.৮ কি:মি: দীর্ঘ এ দ্বীপটি টেকনাফ শহর হতে জলপথের দূরত্ব ৩৪ কি:মি।  ভূতাত্ত্বিক বিবেচনায় সেন্টমার্টিন একটি পলল গঠিত মহাদেশীয় দ্বীপ। দ্বীপের পূর্ব-উত্তর অংশ ব্যতীত সমগ্র জোয়ার ভাটার অঞ্চল ও সমুদ্রাঞ্চলে অগণিত পলল গঠিত পাথর রয়েছে। মূলত এ শিলার উপরেই বালি ও সামুদ্রিক শামুক-ঝিনুকের চূর্ণ জমা হয়ে দ্বীপটি গঠিত হয়েছে। স্থানীয়ভাবে দ্বীপটি “নারিকেল জিনজিরা” বা জিনজিরা নামে পরিচিত। দ্বীপের প্রধান অংশ উত্তরপাড়া ও দক্ষিণ পাড়া। এ দু’ এর মাঝখানে সংকীর্ণ অংশের নাম গলাচিপা। সর্বদক্ষিণে “ছিড়াদ্বীপ” বা “ছিড়াদিয়া” নামে তিনটি ছোট ভূখন্ড রয়েছে। জোয়ারের সময় ছিড়াদ্বীপ মূল ভূখন্ড থেকে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দ্বীপের সর্বত্র বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে বিস্তৃত ভাবে  ভীত শীলার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এখানকার মাটি ও সৈকত শামুক- ঝিনুকের ভাঙ্গা চূর্ণে গঠিত। প্রচুর নারিকেল গাছের সারি, কেয়া-নিশিন্দার জঙ্গল, বালিয়াড়িতে সাগর লতার উপস্থিতি, আভ্যন্তরীণ জলাভূমি, বিস্তীর্ণ পাথর সমৃদ্ধ জোয়ার ভাটা অঞ্চল এবং স্বচ্ছ নীল জলরাশি দ্বীপেরর প্রধান বৈশিষ্ট্য।

দেশের মোহনাঞ্চলে অন্যান্য পললগঠিত চর বা দ্বীপের তুলনায় এখানকার পানি অধিক লবনাক্ত ও স্বচ্ছ হওয়ার কারণে বিচিত্র বর্ণের প্রবালের পাশাপাশি প্রবাল সংশ্লিষ্ট সামুদ্রিক শৈবাল, মাছ ও অন্যান্য অমেরুদণ্ডী প্রাণীর  আবাসস্থল এই  সেন্টমার্টিন দ্বীপটি । ১৫০ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল, ১৫৭ প্রজাতির স্থলজ গুপ্তবীজি উদ্ভিদ, ৬৬ প্রজাতির পাথুরে প্রবাল, ১৮৭ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, চার প্রজাতির সমুদ্র শশা ২১৮ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ ( ৮৬ প্রজাতির প্রবাল সংশ্লিষ্ট, চার প্রজাতির উভচর, ১২০ প্রজাতির পাখি ( ৮৭ প্রজাতির স্থানীয় এবং ৪৩ প্রজাতির যাযাবর, ২৯ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ১৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রানী অত্র দ্বীপ  থেকে রেকর্ড করা হয়েছে। সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র দ্বীপ । যার সামুদ্রিক এলাকায় প্রবাল এবং প্রবাল সংশ্লিষ্ট শৈবাল ও প্রাণী  প্রজাতি রেকর্ড করা হয়েছে। প্রবাল দ্বীপ সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বনাঞ্চল যেমন বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল, প্রবাল প্রাচীর ও তেমনি সামুদ্রিক মাছের আশ্রয় ও খারার যোগান দেয়। গণমাধ্যমে প্রচারের ফলে বিগত ৪-৫ বছরে সরকারী ও বেসরকারী  উদ্যোগে অপরিকল্পিতভাবে পর্যটন শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। স্থানীয় অনেক পরিবার সৈকত থেকে শামুক, ঝিনুক, প্রবাল সংগ্রহ ও তার থেকে তৈরী মালা, শো-পিচ প্রভৃতি পর্যটকদের নিকট বিক্রয় করে জীবিকা নির্বাহ করে। সঠিক পরিকল্পনার অভাবে হোটেল-অবকাঠামো নির্মাণ এবং পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত কার্যকলাপের দরুণ বর্তমানে সেন্টমার্টিন দ্বীপের প্রতিবেশ ব্যবস্থা মারাত্মক হুমকীর সম্মুখীন।  উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য তথা প্রাকৃতিক সম্পদকে রক্ষার জন্য ১৯৯৯ সাথে বাংলাদেশ সরকার গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে “প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ঊপড়ষড়মরপধষষু ঈৎরঃরপধষ অৎবধ, ঊঈঅ)’’ হিসাবে ঘোষণা করে।





Untitled Document
Total Visitor : 709963
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :