Untitled Document
শ্রাবণ সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
মৃৎ শিল্পের দৈন্যদশা: চিত্তদের বিত্তহীন হওয়ার গল্প
-জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল
আধুনিকতার নামে পাশ্চত্যের সংস্কৃতির আগ্রাসন আর কালের বিবর্তনে গোয়ালভরা গরু, গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ, গ্রাম বাংলার হাজার বছরের এমন সব হাজারো ঐতিহ্যবাহী শব্দ গুলো যেন আজ বেমানান আর রূপকথার গল্পে পরিণত হয়েছে। তেমনি জৌলুস হারিয়ে দৈন্যদশার শিকার হয়ে বিলুপ্ত হতে বসেছে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী আমাদের নিজস্ব শিল্প ও সংস্কৃতি।
পাশ্চাত্য সংস্কৃতির আগ্রাসনে নিজের জৌলুস হারানো ঐতিহ্যবাহী ও আদি শিল্পের অন্যতম মৃৎশিল্প। বাঙালির কৃষ্টি আর ঐতিহ্যে একাকার হয়ে থাকা এই শিল্পের সাথে নিবিঢ় ভাবে জড়িয়ে আছে প্রাচ্যের অগণিত মানুষের জীবন ও জীবিকা। বংশ পরম্পরায় জীবন ও জীবিকার তাগিদে এবং বংশীয় ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এ সমস্ত আদি শিল্পের ধারক বাহকরা এ শিল্পের দৈন্যদশার সাথে নিজেরাও যেন আজ দারিদ্রের যাঁতাকলে পড়ে ক্রমশ বিত্তহীন হয়ে পড়ছেন। এ শিল্পের উৎপাদন ও বিপননে সংশ্লি¬ষ্টদের অনেকেই যাপন করছেন অত্যন্ত মানবেতর জীবন। এমনই একজন মানবেতর জীবন যাপনকারী ব্যক্তির নাম চিত্ত দেবনাথ। ছেলেবেলা থেকেই যিনি নিজেকে নিয়োজিত করেছেন মৃৎশিল্পের সাথে। তবে উৎপাদন নয়, বিপননে। ৫৯ বছর বয়সী চিত্ত চার সন্তানের জনক। মুরাদনগর উপজেলার আন্দিকুট গ্রামের প্রায়ত হরিশ দেবনাথের ছেলে চিত্ত দেবনাথ। একই উপজেলার গাজীরহাট বাজারের আর দশজন ব্যবসায়ীদের মতো চিত্তও একজন। তবে অন্যদের চাইতে তার ব্যবসার ধরণ ভিন্ন এবং চাহিদাও কম। অর্থাৎ তিনি মাটির তৈরি তৈজসপত্র বিক্রেতা। জীবিকার তাগিদে যুবক চিত্ত একদিন কাঁধে তুললেন মাটির হাঁড়ি পাতিলের টুপরি (ভাড়)। ঘুরেবেড়ান গ্রাম থেকে গ্রামান্তর। চিৎকার করে বলতেনÑ “রাখবেননি গো পাইলাঃ তওয়াঃ হরাঃ!!” এভাবে দিনের পরদিন বছরের পর বছর গ্রামের পর গ্রাম আনাচে কানাচে ঘুরে ঘুরে গৃহিণীদের তৈজসপত্রের চাহিদার যোগান দিয়ে বেড়ানো চিত্ত একদিন ক্লান্ত হয়ে পড়েন। বেড়েছে বয়স কমেছে কর্মক্ষমতা থেমেছে পথচলা, বেড়েছে সংসারের পরিধি কিন্তু বাড়েনি রোজগার।

এদিকে নিজের অজান্তেই রক্ত মাংশের সাথেই যেন মিশে গেছে মৃৎশিল্প। তাই নিজে কর্মক্লান্ত হলেও ততোদিন জীবিকা আর পেশা যেন একই সুতোয় গাঁথা হয়ে গেছে।

মাটির ভাড় বয়ে ক্লান্ত চিত্ত ছাড়তে পারেননি মৃৎশিল্পের লোভ। মাটির গন্ধ যেন তাড়া করে বেড়ায় তাকে। তাই স্থির করলেন এভাবে গ্রামে গঞ্জে না ঘুরে বাজারে একটি মৃৎশিল্প সামগ্রীর দোকান খুলবেন। যেই কথা সেই কাজ। গাজরি হাটে সাজিয়ে বসলেন নিত্য ব্যবহার্য মাটির তৈজস পত্রের পসরা।

কিন্তু ততোদিন বাজার দখল করে নয়েছে বাহারী ধাতব সামগ্রী। রিতিমতো এসব ধাতব সামগ্রীর ব্যাপক প্রসারে বিরোপ প্রভাব ফেলেছে পরিবেশ বান্ধব এই আদি শিল্পটির ওপর! এখন সহজলভ্য সৌন্দর্য এবং সর্বোপরি টেকসইয়ের দিক বিবেচনায় মানুষ প্রতিনিয়তই পরিবেশ বান্ধব আর ঐতিহ্যের কথা ভুলে ঝুঁকে পড়ছে ঐ সমস্ত মনোলোভা বাহারী ধাতব সামগ্রীর প্রতি।

সমাজের উঁচু তলার বাসিন্দাদের বাড়ীর শোভা বর্ধনকারী মাটির তৈরী ফুলের টব, টেরাকোটা এ জাতীয় বিশেষ কিছু ক্ষেত্র ছাড়া এখন আর আগের মতো কেউ মাটির তৈরি সামগ্রীর উপর নির্ভর করেননা। মাটির সামগ্রী বিক্রেতা চিত্ত দেবনাথ বলেন, “জীবিকার তাগিদে দোকান নিয়ে তীর্থের কাকের মতো বসে আছি, কিন্তু বেচাকেনা নাই দাদা। দৈনিক এক দেড়’শ টাকা বিক্রি হয়, তা দিয়েকি সংসার চলে দাদা? দিনের বেশির ভাগ সময়ই অলস বসে থাকি, অথচ বছর শেষে ৫ হাজার টাকা দোকান ভাড়া গোনতে হয়। তাছাড়া আমরা বেচতে না পারলে কুমাররাইবা বানাইব কেমনে? হের লাইগা আমার দুই পুলারে সোনা রোপার কাম শিখাইতাছি।”

চিত্তের তথ্যানুযায়ী জানা যায়, মুরাদনগর এলাকায় এক সময় অনেক পরিবার এ শিল্পের উৎপাদনের সাথে (কুমার) জড়িত ছিলো। কিন্তু এখন শুধুমাত্র আন্দিকূট ও রামচন্দ্রপুর ছাড়া অন্যত্র এই শিল্পের সাথে কেউ সংশিষ্ট নেই।

তবে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ শিল্পের আধুনিকায়নের মাধ্যমে এ শিল্পটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব বলেও চিত্ত মনে করেন।






Untitled Document
Total Visitor : 709301
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :