Untitled Document
শ্রাবণ সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
আমার দেখা চলচ্চিত্র
চোখ: শোক-শুদ্ধ বিদ্রোহ

-মাহবুব আলম

ঊনিশশ’ একাশি সালের কথা। কলকাতার একটি প্রেক্ষাগৃহে উৎপলেন্দু চক্রবর্তীর ‘ময়না তদন্ত’ ছবিটি দেখে ভাল লাগা না লাগার ভাবনা-জড়িত পায়ে হল থেকে বেরুবার মুখেই ছোট্ট একটা জটলা দৃশ্যমান হোল- এবং মাঝখানে শ্মশ্র“মণ্ডিত স্বয়ং উৎপলেন্দু। আগ্রহী দর্শক উৎপলেন্দুকে ‘ময়না তদন্ত’ সম্পর্কে যত না জিজ্ঞেস করছিলো তার চাইতে বেশি জানতে চাইছিলো তাঁর পরবর্তী ছবি ‘চোখ’ বিষয়ে। ময়না তদন্তের ত্র“টিময় শব্দ গ্রহণ বিষয়ে আমি কিছু অভিযোগ তুলতেই তিনি এর সম্পূর্ণ দায়ভার প্রেক্ষাগৃহের ঘাড়ে চাপিয়ে আমার অন্যসব প্রশ্নকে অসহায় ফেলে রেখে বোধহয় হল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতেই দ্রুত প্রস্থান নিলেন।
চার বছর পর পঁচাশিতে সেই উৎপলেন্দুকে আবার ফিরে পেলাম ঢাকায়- ভারতীয় তথ্য কেন্দ্রের চলচ্চিত্র প্রদর্শন কক্ষে- তাঁর ‘চোখ’ আমার সব প্রশ্নকে অতিক্রম করে যায়। এবং দীর্ঘদিন পর যেন সত্যিকার অর্থে একটি ‘ভারতীয় ছবি’ দেখার অভিজ্ঞতা ঘটে- মৃণাল সেনের ভাষায় ‘তথাকথিত বাংলা ছবি’ নয়, ‘চোখ’ সর্বাংশে ভারতীয় ছবি- এবং এর জন্য দায়ী এর প্রতিটি চরিত্র, এদের ভাষা, এদের আচরণ এবং এদের সমগ্রতা। এক মাধবী এবং কুকুর-বিলাসী সেই সুপার-গিন্নী ছাড়া কাউকে মনে হয়নি যে ছবিতে অভিনয় করেছেন। চরিত্র নির্বাচনে টাইপেজ-ভাবনা এবং অভিনয়ের ক্ষেত্রে গতানুগতিকতাকে নির্মমভাবে বর্জন করার কারণে এটা সম্ভব হয়েছে।
ছবির ঘটনা মাত্র দু’দিনের। এবং এই ঘটনার সূত্রে অতীত এসেছে প্রয়োজনীয় ফ্ল্যাশব্যাকে। কখনো অতীত, কখনো বর্তমান। কিন্তু চিত্রনাট্য এবং সম্পাদনা ছবিটিকে এমন একটি সুসংবদ্ধতা দিয়েছে যাতে সেই অতীত এবং বর্তমানের দূরত্ব একটি টেনশনের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে থাকে। এই টেনশনকে আরও ঋজু করে তোলে এর সমৃদ্ধ ডিটেল এবং পরিমিত আবহ।
উৎপলেন্দুকে আমার প্রথম দিনের প্রশ্ন- সেই ‘শব্দ’ দিয়েই তো ছবির শুরু- প্রায়ান্ধাকার কারা-প্রকোষ্ঠে বসে চিঠি লিখছে যদুনাথ, ফাঁসির পর তাঁর চোখ দুটো আরেকজন শ্রমিক-ভাইকে উৎসর্গ করে- কারারক্ষীর ছায় এসে পড়ছে তার মুখে- সাউন্ডট্র্যাকে একটানা কর্কশ বুটের শব্দ। এবং যদুনাথের স্ত্রীর নেতৃত্বে পুলিশ ব্যারিকেডের দিকে শ্রমিক-শ্রেণীর নিঃশব্দ ক্রোধে এগিয়ে আসার পদযাত্রায় ছবির সমাপ্তি। এর পর কি ঘটে সেটা ছবিতে নেই, কিন্তু আমাদের মধ্যে একটা কিছু ঘটে যায়।
এ কেমন গল্পহীন এক ছবি।
কেবলই বাস্তবতা।
মনে হয়, বুঝিবা বেসরকারী ডকুমেন্টারী।
ক্যামেরা যখন ঘুরে ঘুরে যায় চক্ষু হাসপাতালের করিডোরে- হতশ্রী দেয়ালে মলিন বেঞ্চিতে বসে থাকা পুষ্টিহীন-দৃষ্টিহীন মানুষগুলোর মুখে-অপসৃয়মান সাইনবোর্ডের লেখায় ‘এইখানে শুধু গরীবদের চিকিৎসা করা হয়’ (শ্রেণী বিন্যাসের কি মহান স্বীকারোক্তি!)- তখন মনে হয় এ দেখা তো নিত্যদিনের সত্য। যে সত্যকে পরক্ষণেই ভ্রুকুটি করে রাইটার্স ভবনের মাথায় বৃটিশ-প্রোথিত ন্যায় বিচারের স্থাপত্য দৃশ্যকল্পটি।
এইখান থেকেই- এই ন্যায় বিচারকে প্রশ্ন করেই উৎপলেন্দুর ‘চোখ’ একটি গল্পকে অবলম্বন করে। গল্পটা সত্য- এবং গল্পটা জীবনের এবং সে কারণেই গল্প আর গল্প থাকে না- রিপোর্টাজের ভঙ্গীতে আসে।
বিনা দোষে কিছু শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে মিলের সমস্ত শ্রমিক কাজ বন্ধ করে দেয়। কিছুদিন মিল বন্ধ থাকার পর মিল মালিক বহিরাগত শ্রমিক দিয়ে মিল পুনরায় চালু করতে গেলে যদুনাথের নেতৃত্বে ধর্মঘটী শ্রমিকরা তাতে বাধা দেয়। সুবিধাবাদী ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা মালিক পক্ষের সঙ্গে আপোষ রফায় যেতে চাইলে যদুনাথ শ্রমিক শ্রেণীর বৃহত্তর স্বার্থে তাতে দ্বিমত পোষণ করে। অতঃপর মালিক পক্ষ এই ধর্মঘটকে বানচাল করার উদ্দেশ্যে ভাড়াটে গুণ্ডাদের দিয়ে অতর্কিত দু’টি ক্ষেত্রে হামলা চালায়। একটি মিলের সম্মুখে ধর্মঘটরত শ্রমিকদের উপর, অপরটি শ্রমিকদের বস্তি অঞ্চলে। এবং সেখান থেকে তিন-চারজন শ্রমিককে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্জন নদীর ধারে হত্যা করে তাদের গায়ে চারু মজুমদারের পোষ্টার লাগিয়ে দেয়া হয়।
এই ভায়োলেন্সকে চলচ্চিত্রকার পরিণত করে তুললেন পরদিন মিল মালিকের ভাই এবং তার সহযোগীর খুনের মধ্য দিয়ে। এবং এগুলো খবরের কাগজে সংবাদের মর্যাদা পেল। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য এই ভায়োলেন্সের দৃশ্যগুলো ছবিতে দু’বার ব্যবহৃত হয়েছে। মিল-শ্রমিকদের সঙ্গে ভাড়াটে গুণ্ডাদের সংঘর্ষ দ্বিতীয়বার যখন দেখান হয় তখন তা নিউজরীলের স্টীলের ভঙ্গিতে- যেখানে যদুনাথের প্রতিবাদের বিরাটকায় মুখাকৃতি ঘুরে ঘুরে আসে- যেন একটি ঐতিহাসিক মর্যাদা দিতেই। অপরদিকে মিল মালিক জেঠিয়ার দৃশ্য-কল্পনায় তার ছোট ভাইয়ের রক্তাক্ত মৃতদেহ পুনর্বার ছবিতে আসে সেই একই ভঙ্গিতে- কোনরকম তাৎপর্য ছাড়াই। এর কারণটিও স্পষ্ট। শ্রমিক বস্তিতে লোহার রড, রামদা, ছোরা, পিস্তল ইত্যাদি নিয়ে হামলা চালিয়ে সেখান থেকে নিরীহ নিরস্ত্র শ্রমিকদের ধরে নিয়ে গিয়ে যেভাবে হত্যা করা হয় তারপরই মিল-মালিকের ভাইয়ের খুন হওয়াটা যেন স্বাভাবিক ঘটনার মধ্যেই পড়ে। এবং এই ঘটনাগুলো সত্তর দশকের কলকাতার চলচ্চিত্রকার দু’একটি দৃশ্য সংলাপে এই সময়কে নির্দেশ করেছেন- যেন একটু সতর্কতার সঙ্গেই। মিল মালিকের ভাইয়ের খুনের সূত্রে যদুনাথের ফাঁসির আদেশ হয়, যদিও তাঁর এই ফাঁসির আদেশের কারণটি ছবিতে স্পষ্ট নয়, কারণ ‘সঠিক বিচারেও’ কখনও স্পষ্ট হবার নয় (চলচ্চিত্রকারের সেই ‘জাস্টিস’ স্থাপত্য প্রদর্শন এক্ষেত্রে স্মর্তব্য)।
যদুনাথ কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে বসে তাঁর জীবনের সত্যকে উপলব্ধি করে তা লিপিবদ্ধ করছে একটি উৎসর্গ-পত্রে- এখান থেকেই ছবিটি আমরা দেখতে শুরু করি- “শুনেছি ফাঁসির আসামীর ক্ষেত্রে একটি নিয়ম চালু আছে। নিয়মটি হচ্ছে তার মৃত্যুর পূর্বে তার শেষ কোন ইচ্ছা থাকলে তা পূরণের সুযোগ দেয়া হয়, জানি না সে নিয়মটি এখনও চালু আছে কিনা। যদি থাকে, তবে আমার মৃত্যুর পর আমার চোখ দুটো যেন আমারই আর অন্ধ শ্রমিক ভাই ছেদিলালকে দেয়া হয়। আমি তো এই জন্মে আমার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত হতে দেখে যেতে পারলাম না, তাই আমারই আর এক শ্রমিক ভাইয়ের মধ্য দিয়েই আমার এই চোখ সেই স্বপ্নকে সার্থক হতে দেখবে...”। এই চিঠিটা আমরা যদুনাথকে লিখতেই দেখি কেবল- এবং এর পাঠোদ্ধার হয় ডাঃ মুখার্জীর বৈঠকখানায়- যখন তিনি যদুনাথের সহকর্মী-স্বজনদের মুখে পুরো ঘটনার বৃত্তান্ত শুনছেন। বৃত্তান্ত শুনছেন, কারণ তিনি সেই হাসপাতালের সার্জন, যেখানে জমা পড়ার কথা যদুনাথের চোখ, ছেদীলালের জন্য। এবং ডাঃ মুখার্জী যেহেতু এক সময় প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন সেহেতু তাঁর মধ্যে এক ধরনের মধ্যবিত্ত-মানসিকতা কাজ করে- তিনি সত্যিকার অর্থেই চান এই হাসপাতাল ‘শুধু গরীবদের চিকিৎসার জন্যই’ হয়ে উঠুক। কিন্তু এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ক্ষমতা তো কেবল নিষ্ফল আক্রোশে সীমাবদ্ধ থেকে যায়- শ্রমিক শ্রেণীর সঙ্গে একসূত্রে গাঁথা হয় না। উৎপলেন্দু এই সত্যকেও অস্বীকার করেন নি।
যদুনাথের ফাঁসির আগের রাত। এই প্রথম মৃত্যু-চিন্তা যেন গ্রাস করে তাঁকে। অসুস্থতার ঘোরে দুর্বল শরীরটাকে  টেনে নিয়ে যায় দেয়ালের এক কোণে। কোঁথ দিয়েও যেন পেচ্ছাপ বেরুতে চায় না। শ্লথ পায়ে ফিরে এসে কম্পিত হাতে কুঁজোটা তুলে ধরে মুখের উপর। কোষ বেয়ে জল গড়ায়। বমি ওঠে। জং ধরা ময়লা বেড প্যানে ছিটকে পড়ে পানসে বমি। ছেঁড়া কম্বলে শরীর জড়িয়ে শুয়ে পড়ে যদুনাথ। কারাগারের পেটা ঘড়িতে ভয়ঙ্কর গম্ভীর শব্দে রাত তিনটে বাজে। ক্যামেরায় উঠে আসে যদুনাথের সেই প্রতিজ্ঞা চোখ। চোখের বিগ ক্লোজ-আপ থেকে কাট করে দেখান হয় যদুনাথের স্ত্রী বস্তিতে রান্না করছে। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন মুখ। প্রচন্ড চিৎকারে কাঁদছে ছেলে। সেই কান্নাকে ছাপিয়ে ভেসে আসছে দেহাতী সঙ্গীতের সুর। তারপরের সকালটি কারাগারের উঁচু দেয়াল ছুয়ে নেমে আসে নীচে, মাটিতে, যেখানে দেয়াল ঘেঁষে বসে আছে যদুনাথের স্ত্রী এবং বস্তির দু’একজন প্রতিবেশী। সকালের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে কারাগারের দরজা খুলে যায়- দ্রুত বেরিয়ে আসে চক্ষু হাসপাতালের এ্যাম্বুলেন্সটি- আর্ত-চীৎকারে ছুটে যায় যদুনাথের স্ত্রী এ্যাম্বুলেন্সের দিকে- এ্যাম্বুলেন্স ছুটে যায় গন্তব্যে- যদু নাথের স্ত্রীও ছোটে এ্যাম্বুলেন্সের পিছু পিছু- প্রতিবেশীরা তাকে ধরে রাখতে পারে না। শুধু যদুনাথ নয়, শুধু যদুনাথের চোখ নয়, যেন লুন্ঠিত হয়ে যাচ্ছে মনুষ্যত্বের সর্বশেষ অস্তিত্বটুকু। সেদিনকার কলকাতার সকাল এই আর্ত চিৎকারে একেবারে হতচকিত হয়ে আবার চলতে শুরু করে। ক্যামেরা ধাওয়া করে এ্যাম্বুলেন্সের পিছু পিছু। তারপর ট্রাম লাইনের তার ছুঁেয় উঠে যায় আকাশে।
এরপর জেঠিয়া এপিসোড।
জেঠিয়া মানেই স্বার্থ-সিদ্ধির সিদ্ধান্তে চলন্ত গাড়ীতে ঝুলন্ত পুতুল সদৃশ দোদুল্যমানতা। সেই জেঠিয়ার একমাত্র ছেলের অন্ধত্ব মোচনের জন্য কর্ণিয়া প্রয়োজন। জেঠিয়ার ছেলের অন্ধ হবার কারণও নাকি নকশালদের বোমাবাজি। দোর্দন্ড প্রতাপী জেঠিয়া তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে অবৈধভাবে সরকারী হাসপাতালের সমস্ত রীতিনীতি লংঘন করে যদুনাথের সেই চোখ দু’টো নিজের ছেলের জন্য হস্তগত করেন এবং বলাবাহুল্য তাঁকে এ বিষয়ে সহযোগিতা করেন হাসপাতালের সুপার স্বয়ং।
কিন্তু হাসপাতালের সার্জন সেই ডাঃ মুখার্জী এক শর্তে জেঠিয়ার ছেলেকে অপারেশন করতে রাজী হলেন যে তাঁকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখতে দিতে হবে। কারণ তাঁর জানা দরকার জেঠিয়ার ছেলের চোখে যে কর্ণিয়া সংযোজন করা হবে সেটি যদুনাথের সেই চোখের কি-না, যা সে উৎসর্গ করে গেছে একমাত্র ছেদীলালের জন্য। সুপার এই সব তথ্য জানাতে অস্বীকার করলে ডাঃ মুখার্জীও তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। এবং অন্য ডাক্তার দিয়ে জেঠিয়ার ছেলের চোখ অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
কিন্তু জেঠিয়া যখন জানতে পারে যে, এই কর্ণিয়া সেই যদুনাথের চোখের তখন সে তাঁর ছেলের অপারেশন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ ঐ ‘জানা’র মুহূর্তে তাঁর শ্রেনীদ্বন্দ্ব অত্যন্ত প্রকট হয়ে ওঠে- তার চাইতেও ভয় তাঁর যদুনাথকে। যদুনাথের সেই দৃঢ় ‘না’ উচ্চারণের শাণিত চোখ তাঁকে তাড়া করে ফেরে। জেঠিয়ার এই অন্তর্গত চিন্তার দৃশ্য নির্মাণে চলচ্চিত্রকার বুদ্ধিদীপ্ত ক’টি মন্তাজ ব্যবহার করেছেন। যেমন, হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন জেঠিয়ার ছেলে, শান্ত সৌম্য মুখ জেঠিয়া ছেলেকে দেখছে, কালো চশমা পরা জেঠিয়ার ছেলের মুখ। জেঠিয়া। ছেলের চোখে যদুনাথের চোখ। জেঠিয়া। ছেলের বেডে তীব্র দৃষ্টি নিয়ে শুয়ে আছে যদুনাথ। অস্থির অসহিষ্ণু জেঠিয়া।
ছেলের অপারেশন বন্ধের চাইতেও আরও চরম একটি সিদ্ধান্ত নেন জেঠিয়া। সুপারকে প্রায় বাধ্য করা হয় যদুনাথের চোখ দু’টো জেঠিয়ার লোকের হাতে তুলে দিতে। অতীতের অসংখ্য পাপকর্মকে চাপা রেখে নিজেকে নিষ্কলঙ্ক রাখার প্রয়োজনে সুপারের এই অপকর্মটি করা ছাড়া আর কোন গত্যন্তর ছিল না। সেদিন রাতেই সেক্রেটারীর মাধ্যমে আই ব্যাংকের নার্স যদুনাথের চোখ জেঠিয়ার নিত্যসহচর মস্তানদের হাতে তুলে দেয়। এবং তারা সেটি নিয়ে মাটির তলায় পুঁতে ফেলে। জেঠিয়ারা ভাবে যদুনাথের এই চোখ আর কখনও এই পৃথিবীতে কারও দৃষ্টিতে ক্রোধ হয়ে তাদের দিকে তাকাবে না- তাদের শোষণের বিরুদ্ধে অগ্নিদৃষ্টির বিষবাণ নিক্ষেপ করবে না।
কিন্তু যদুনাথের ‘চোখ’ যেন দুঃসাহসের বীজরূপে পোঁতা হয়ে গেল। তাই চোখ হননের অন্ধকার রাতের পরেই একটা দীর্ঘ স্বচ্ছ-সকাল। প্রায় এক মিনিট পর্দা সাদাই থেকে যায়। তারপর সেখান থেকে ধীরে ধীরে উঠে আসে দুঃসাহসী মানুষগুলো- সেই শ্রমিকরা- যারা ইতিমধ্যে জেনে গেছে সুপারের ষড়যন্ত্রে ছেদীলালের জন্য উৎসর্গ করা যদুনাথের চোখ শ্রমিক-শ্রেণীর পরম শত্র“ জেঠিয়ার ছেলের জন্য বরাদ্দ করা হয়ে গেছে। তাই তারা আগের রাতে সবাই আবার সংগঠিত হয়েছে- আরেকবার তারা একত্রে রুখে দাঁড়াবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। শহর কোলকাতার অদূরে ফাঁকা মাঠটা পেরিয়ে সুপারের বাড়ীতে তাঁকে ঘেরাও করে এর প্রতিকার চাইবে। কিন্তু সশস্ত্র পুলিশ খবর পেয়ে আগেই এসে সে জায়গা ঘিরে ফেলে। সারিবদ্ধ পুলিশ রাইফেল তাক করে দাঁড়ায়। কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে যায় আগুয়ান মিছিল। কিন্তু তাদের পায়ের তলার মাটিতে পোঁতা আছে যদুনাথের অগ্নিমন্ত্র চোখ। আবার এগোয় তারা। এবং এগোয় যদুনাথের স্ত্রীর নেতৃত্বে- যার বুক আগলে রয়েছে ছেদীলাল- শাশ্বত দুঃখিনী বাংলা মায়ের বুকে চিরবঞ্চিত আশাহত সন্তান।



চলচ্চিত্র জগতে নজরুল
-অনুপম হায়াৎ

(পূর্ব প্রকাশের পর)
৬.
চিত্রজগতে ফিল্ম পলিটিক্স বলে একটা কথা চালু আছে। নজরুল এই পলিটিক্সের শিকার হন রবীন্দ্র কাহিনী নিয়ে নির্মিত ‘গোরা’ ছবির সংগীত পরিচালনার সময়। এ ছবির মুক্তি পর্বে বিশ্বভারতী বোর্ড আপত্তি তোলে নজরুলের পরিচালনায় ছবিতে ব্যবহৃত রবীন্দ্র সংগীতের যথার্থতা নিয়ে। নজরুল তখন ছবির প্রিন্ট নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে গিয়ে সম্মতি আদায় করেন। পরে তিনি ছবিতে রবীন্দ্রনাথের তিনটি গান ছাড়াও নিজের লেখা একটি গান জুড়ে দেন।
‘গোরা’র পরিচালক ছিলেন নরেশ মিত্র আর প্রযোজনায় ছিল দেবদত্ত ফিল্মস। ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৩৮ সালের ৩০ জুলাই। একই দিনে রবীন্দ্রনাথের আরেকটি কাহিনী নিয়ে নির্মিত‘চোখের বালি’র চিত্ররূপ মুক্তি পেয়েছিল। সতু সেন পরিচালিত এ ছবির সংগীত পরিচালক ছিলেন অনাদি দস্তিদার। ‘গোরা’ ছবিতেই বাংলার দুই অনন্য সাধারণ কবি প্রতিভার সম্মিলন ঘটেছিল।
৭.
নজরুল বন্ধু সাহিত্যিক চলচ্চিত্রকার শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের কাহিনী, চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় ‘নন্দিনী’ মুক্তি পায় ১৯৪১ সালের ৮ নভেম্বর। এ ছবিতে হিমাংশু দত্ত সুর সাগরের সংগীত পরিচালনায় নজরুলের লেখা ও সুরে একটি গান ‘চোখ গেল’ ব্যবহৃত হয়। জানা যায়, শৈলজানন্দের অনুরোধে তিনি এই গানটি রচনা করেন। এই গানে কন্ঠ দেন শচীন দেব বর্মন। গানটি অবশ্য পরে কলকাতার ‘বারবধূ’ ছবিতেও ব্যবহৃত হয়েছে নতুন একটি শিল্পীর কন্ঠে।
শৈলজানন্দের আরেকটি ছবি ‘অভিনয় নয়’তেও নজরুলের একটি গান (ও শাপলা ফুল) ব্যবহৃত হয়েছে। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৪৫ সালের ২ মার্চ। নজরুল শিষ্য গিরিন চক্রবর্তী ছিলেন ছবির সংগীত পরিচালক।
শৈলজানন্দের ‘শহর থেকে দূরে’ ছবিতেও গান লেখার জন্য নজরুল চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন বলে গবেষক আসাদুল হক জানিয়েছেন। ছবির জন গানটি ছিল ‘আধো রাতে যদি ঘুম ভেঙ্গে যায়’। কিন্তু পরে ছবির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নানা বাহানার কারণে নজরুল সে চুক্তি বাতিল করেন।
৮.
ফজলী ব্রাদার্স প্রযোজিত নবেন্দু সুন্দর পরিচালিত ‘চৌরঙ্গী’ (বাংলা) ছবিতে নজরুল সংগীত পরিচালনা, গান রচনা ও ব্যবস্থাপনার সংগে জড়িত ছিলেন। বাংলা ‘চৌরঙ্গী’ মুক্তি পায় ১৯৪২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। ছবির আটটি গান রচনা ও সুরারোপ করেন নজরুল।
চৌরঙ্গীর হিন্দী ভার্সন মুক্তি পেয়েছিল আগে ১৯৪২ সালের ৪ জুলাই। এর পাঁচদিন পরই কবি অসুস্থ হয়ে পড়েন। হিন্দী ভার্সনের পরিচালক ছিলেন এস ফজলী আর সহ-পরিচালক ছিলেন নবেন্দু সুন্দর ও আশুতোষ চক্রবর্তী। হিন্দী ‘চৌরঙ্গী’তে গান ছিল ১৩ টি। এতে নজরুল সংগীত পরিচালনা ছাড়াও গানের বাণী রচনা করেছিলেন।
৯.
ম্যাডান থিয়েটারস থেকে ফজলী ব্রাদার্স পর্যন্ত যেসব চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠানে নজরুল জড়িত ছিলেন, সেগুলোর মালিক ছিলেন অবাঙালী মুসলমান বা বাঙালী হিন্দু। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময় তাঁর হয়েছিল তিক্ত অভিজ্ঞতা। কোন কোন প্রতিষ্ঠান তাঁর সংগে করেছিল প্রতারণাও। এই উপলব্ধি থেকেই নজরুল ১৯৪০-৪১ সালের দিকে শেরে বাংলাকে প্রধান পৃষ্ঠপোষক করে ‘বেঙ্গল টাইগারস পিকচার্স’ গঠন করেন। তাঁর সংগে ছিলেন ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু, সাঈদ সিদ্দিকী, আব্বাস উদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ মোদাব্বের, আজিজুল ইসলাম, সারওয়ার হোসেন, হুমায়ুন কবীর, ওয়াজেদ আলী, আজিজুল হক প্রমুখ।
সারওয়ার হোসেনের সূত্রে জানা যায়, বি.টি. পিকচার্স থেকে নজরুল ‘মদিনা’ নামে একটি ছবি তৈরির ঘোষণা দিয়েছিলেন। ছবিটির কাহিনী, গান, সুর ও সংগীত পরিচালনাও তাঁরই। সেই ‘মদিনা’র খসড়া কপি আব্দুল আজীজ আল আমান উদ্ধার করেছেন। এটি ছাপা হয়েছে নজরুল ইন্সটিটিউট পত্রিকায় ১৩৯২ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায়। পরীক্ষায় দেখা যায়, ৪৩ নং সিকোয়েন্সে নজরুল লিখেছেন : ‘আমার মদিনা নাটক সিনেমায়, থিয়েটারে দিব, রেডিওতে ও গ্রামোফোন কোম্পানীতেও দিব’। ছবিতে কোন গানটি ব্যবহৃত হবে, কে গাইবে, কে নাচবে- তাও নজরুল তাঁর খসড়ায় উল্লেখ করেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, অসুস্থতার কারণে নজরুলের সেই স্বপ্নের চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান বি.টি পিকচার্সের কার্যক্রম যেমন বন্ধ হয়ে যায়, তেমনি বন্ধ হয়ে যায় মদিনা ছবি নির্মাণের কাজও।
১০.
অসুস্থ হওয়ার পর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত কয়েকটি প্রামাণ্য চলচ্চিত্রে নজরুলকে দেখা যায় প্রত্যক্ষভাবে। তবে এসব ছবিতে অন্যেরা তাঁকে ব্যবহার করেছেন। উৎসাহীদের কাছে এসব ছবি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, এতে জীবন্ত নজরুলকে দেখা যায়- দেখা যায় ঘুমন্ত বিদ্রোহী সিংহকে।
নজরুল সংশ্লিষ্ট তেমনি কয়েকটি প্রামাণ্য চিত্র হচ্ছে ঃ পশ্চিম বঙ্গ সরকার প্রযোজিত ‘বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম’ (১৯৫৬-৫৭), পাকিস্তান চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর প্রযোজিত ‘বিদ্রোহী কবি’ (১৯৭০), ভারত সরকার প্রযোজিত ‘কাজী নজরুল ইসলাম’ (১৯৭২) এবং বাংলাদেশ আমলে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর প্রযোজিত ‘কবি নজরুল’ (১৯৮০-৮১) ও বিবিসি টিভি চ্যানেল ফোর (লন্ডন) প্রযোজিত ‘কাজী নজরুল ইসলাম।’
১১.
বৃটিশ আমলে, পাকিস্তান আমলে, বাংলাদেশ আমলে উপমহাদেশের বিভিন্ন ছবিতে প্রযোজক-পরিচালকরা নজরুলের গান, সুর, সংগীত, কাহিনীকে নানাভাবে ব্যবহার করেছেন। কখনো স্বীকৃতি দিয়ে কখনো বিনা স্বীকৃতিতে। এসব ছবির মধ্যে উল্লেখ করা যায় চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, মৃত্যুক্ষুধা (অসমাপ্ত), তিন কন্যা, নবাব সিরাজদ্দৌলা, হাসুলী বাঁকের উপকথা, দাদা ঠাকুর, বিষ্ণুপ্রিয়া, শ্রী শ্রী তারকেশ্বর, সুবর্ণ গোলক, দেবদাস, বারবধূ, নীলকন্ঠ, আগমন, জীবন থেকে নেয়া, কোথায় যেন দেখেছি, বধূ বিদায়, লায়লী মজনু, রঙিন নবাব সিরাজদ্দৌলা, শান্তির প্রহরী ইত্যাদি।
১২.
নজরুল শুধু চলচ্চিত্র মাধ্যমের সংগে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন না- তাঁর প্রেরণারও উৎস ছিল চলচ্চিত্র। নিতাই ঘটকের স্মৃতি থেকে জানা যায়, ১৯৩০-এর দশকে নজরুল সেকালের বিখ্যাত ইংরেজী ছবি ‘পেগ্যান লাভ সঙ’- এ নায়ক র‌্যামন নোভারোর কন্ঠে ‘কাম টু মি হোয়ার দি মুনস বীমস’ গান শুনে এতই মুগ্ধ হন যে বাড়ী ফেরার পথেই মুখে মুখে তিনি রচনা করেন ‘দূর দ্বীপবাসিনী চিনি তোমারে চিনি’ গানের প্রথম পর্ব। অনেকেই নজরুলের সেই বিখ্যাত কবিতা ‘ট্রেড শো’র কথাও জানেন। সেই কবিতায় নজরুল সেকালের নতুন প্রেক্ষাগৃহ রূপবানী-গান্ধী-রবীন্দ্রনাথ-সুভাস-জহরলালের সংগে তুলনা করে অনুরাধা-নিউ থিয়েটারস-ভাগ্যচক্র-পাহাড়ী-দুর্গাদাস-সায়গল-পংকজ-অমর-দেবকী কুমার-অশোক কুমার-অচ্ছ্যুৎ কন্যার প্রসংগ টেনে লিখেছেন :
‘হায়রে বিংশ শতাব্দী, হায় বাংলার যৌবন
নিকট, কপট ছায়াপট প্রেমে পড়িয়াছে জনগণ।
বাণীচিত্রে যা ফুটে ওঠে তা কি এই জীবনের ছায়া?
এই বিকৃতি কাগজের ফুল এই মরীচিকা মায়া?
সম্ভবতঃ ‘নজরুল’ এই কবিতাটি লিখেছিলেন প্রমথেশ বড়–য়া পরিচালিত ‘বাংলা ১৯৮৩’ ছবির প্রথম প্রদর্শনী উপলক্ষে। প্রদর্শনী হয়েছিল ১৯৩২ সালের ২৬ ডিসেম্বর কলকাতার রূপবাণী প্রেক্ষাগৃহে। এর আগের সপ্তাহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই প্রেক্ষাগৃহের উদ্বোধন করেছিলেন।
নজরুল সম্পাদিত পত্র-পত্রিকায়ও চলচ্চিত্র অন্যতম বিষয় হিসেবে ঠাই পেতো। ১৯৪১ খৃস্টাব্দে নজরুলের প্রধান সম্পাদকত্বে ‘দৈনিক নবযুগ’ পত্রিকার অন্যান্য বিষয়ের সংগে সাপ্তাহিক একটি বিভাগের নাম ছিল ‘রূপ ও ছন্দ’। এটি পরিচালনা করতেন রূপকার।
১৩.
জাতীয় কবি, প্রথম বাঙালী মুসলমান চিত্র পরিচালক, সুর ভাণ্ডারী, সংগীত পরিচালক, গীতিকার, সুরকার, গায়ক, অভিনেতা, কাহিনীকার, সংগঠক কাজী নজরুল ইসলাম প্রত্যক্ষভাবে, শারীরিকভাবে এবং প্রামাণ্যভাবে যেসব চলচ্চিত্রে জড়িত ছিলেন, সেসব সংক্রান্ত যাবতীয় নিদর্শন (প্রিন্ট, ক্যাসেট, সার্টিফিকেট, চিত্রনাট্য, শুটিং স্ক্রিপ্ট, স্থিরচিত্র, বিজ্ঞাপন, আলোচনা, সমালোচনা, রেকর্ড, পোস্টার, ব্যানার) অনতিবিলম্বে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হোক। দেশে তথ্য মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, নজরুল ইন্সটিটিউট, ফিল্ম আর্কাইভ, জাতীয় যাদুঘর, শিল্পকলা একাডেমী, ডিএফপি, টেলিভিশন, এফডিসি, গণমাধ্যম ইন্সটিউট রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান নজরুল চলচ্চিত্র নিদর্শন সংগ্রহ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে এই প্রজন্মকে উদ্দীপ্ত করবে- এটাই কাম্য।
অত্যন্ত দুঃখের সংগে জানাতে হচ্ছে, দেশে ফিল্ম আর্কাইভ হয়েছ ১৯৭৮ খৃস্টাব্দে। দীর্ঘ এই সময়ের মধ্যে নজরুল পরিচালিত ধ্র“ব’ ছবির ১৮টি রীলের মধ্যে মাত্র একটি রীল সংগ্রহ করা হয়েছে। নজরুল ইন্সটিটিউট অদ্যাবধি তাঁর ছবির কোন নিদর্শন সংগ্রহের উদ্যোগই নেয়নি। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বিবিধ কাজ-কর্ম নিয়ে অতি ব্যস্ত থাকলেও জাতীয় কবির প্রতি দেখাচ্ছে চরম অবহেলা। আমরা চাই, বর্তমান বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী গণমাধ্যম চলচ্চিত্রের ফিতেয় বন্দী নজরুলের জীবন ও কর্মের নিদর্শন প্রেক্ষাগৃহে, টিভিতে, অডিটরিয়ামে, মেলায়, অনুষ্ঠানে হোক বারংবার প্রদর্শিত। চলচ্চিত্রের শতবর্ষের পথ পরিক্রমায় আমাদের চেতনার পর্দায় প্রতিফলিত হোক নজরুল চিত্র, সাউন্ডট্র্যাকে উচ্চারিত হোক তাঁর গান ও সুর।

http://www.youtube.com/watch?v=FYFhYtfTM5w
Kazi Nazrul Islam -in his Film''Dhrubo''released 1st January,1934


 


Untitled Document
Total Visitor : 709331
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :