Untitled Document
ভাদ্র সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
বাংলাদেশের পটচিত্র
-নিসার হোসেন
(পূর্ব প্রকাশের পর)

বর্তমানে বাংলাদেশের একমাত্র পটচিত্রশিল্পী শম্ভু আচার্য তাঁর শৈশবের স্মৃতি স্মরণ করে জানিয়েছেন যে, অত্যন্ত গরিব ঐ সব বেদে-গায়েনেরা তাদের ব্যবহৃত গামছাগুলো শম্ভুর পিতা সুধীর আচার্যকে দিতেন। এই সব গামছার দু’দিক থেকে খড়িমাটি ও ইটের গুঁড়া তেঁতুল বীচির আঠার সাথে মিশিয়ে পুরু আস্তর দিয়ে ছবি আঁকার উপযুক্ত পরিসর তৈরি করা হতো। গামছার সীমিত মাপের মধ্যে পুরো কাহিনীটা আঁকতে হতো বলেই গাজিকে মাঝখানে বড় করে এবং বাকি চরিত্রগুলোকে ওপরে-নিচে ছোট ছোট চৌখুপিতে বিন্যস্ত করে আঁকা হতো। তাছাড়া গায়েনরা পটটিকে আশাদণ্ডের সাথে ঝুলিয়ে রাখতেন এবং সুর করে কাহিনী পরিবেশনের সময় দণ্ডটিকে পটসমেত মাটিতে গেঁথে তার সামনে নাচতেন। (সম্ভবত এই কারণে কোনো কোনো অঞ্চলের লোকেরা পটপ্রদর্শনকে পট নাচানোও বলতেন।) ফলে পুরো পটটিকে একসাথে প্রদর্শন করার প্রয়োজন থেকেই হয়তোবা পটের আকৃতি ও আয়োজনে এই বৈশিষ্ট্য এসেছে। এ ধরনের পটপ্রদর্শনের একটি দৃশ্য আমাদের জাতীয় জাদুঘরের দুজন ক্যামেরাম্যান নরসিংদী অঞ্চল থেকে ধারণ করেছেন।
এই নরসিংদীর মোহনগঞ্জ নামক এলাকা থেকেই গত শতকের ৮০ এর দশকে ড. তোফায়েল আহমেদ গাজির পটের সন্ধান পেয়েছিলেন। তিনি কারুশিল্পের ওপর একটি সার্ভে প্রকল্পে কাজ করবার সময় মোহনগঞ্জে পটপ্রদর্শক কোনাই মিয়ার সন্ধান পান এবং তাঁর দেয়া তথ্য অনুযায়ী বিক্রমপুরের কাঠপট্টি বাজার নিকটবর্তী কালিন্দি গ্রামে গিয়ে পটচিত্র নির্মাতা সুধীর আচার্যকে খুঁজে বের করেন। এই পরিবারের দেয়া তথ্য থেকে জানা যায় যে, এদের আদি নিবাস ময়মনসিংহ এবং জীবিকার সন্ধানে এরা নানা অঞ্চল ঘুরে বিক্রমপুরে এসে বসতি গড়েছেন। রজতানন্দ দাস গুপ্তের যে লেখাটি ১৯৮৩ সালে বাংলা একাডেমী কর্তৃক পুস্তকে প্রকাশিত হয়েছে তাতেও লেখক পূর্ব বাংলার ময়মনসিংহ অঞ্চলকে এককালে পটচিত্রের জন্য প্রসিদ্ধ অঞ্চল বলে উল্লেখ করেছেন এবং এখানকার আচার্য পরিবারের মহিলা চিত্রকর গৌরি আচার্যের কাজের খ্যাতির কথাও উল্লেখ করেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে পটের ছবি আঁকা ছাড়াও আচার্যরা নরসিংদী ও ডেমরা অঞ্চলের তাঁতিদের জন্য শাড়ির নকশা এবং সোনারগাঁয়ে কাঠের পুতুল রঙ করার কাজও করেছেন। সম্ভবত এই সব কাজের অভিজ্ঞতার প্রতিফলনেই পূর্বপুরুষদের পটচিত্রের তুলনায় এদের পট অনেক বেশি নকশাধর্মী ও অবয়বগুলো কাঠের পুতুলের মতোই সরলীকৃত ও অপ্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। তবে এদের আঁকা হিন্দু পৌরানিক কাহিনীভিত্তিক পটগুলোতে প্রাচীন পটের বৈশিষ্ট্য কিছুটা বজায় আছে। তাহলে কি অনুমান করা চলে যে, মুসলমানদের জন্য হিন্দু পট থেকে ভিন্ন চেহারার একটি পট তৈরি করার প্রয়োজন পড়েছিল? অথবা মুসলমান সমাজে (ধর্ম?) মানুষের প্রতিরূপ নির্মাণ গ্রহণযোগ্য নয় বলেই চরিত্রগুলোকে পুতুলরূপী করে তোলা হয়েছে?
আচার্যদের আঁকা গাজির পটের চৌখুপিগুলোর বিন্যাস পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য পটের বিন্যাস থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র; কিন্তু এ ধরনের বিন্যাস রাজস্থানের চিতেরা সম্প্রদায়ের আঁকা পটগুলোতে লক্ষ্য করা যায় (অর্থাৎ পটের মূল চরিত্রকে মাঝখানে বড় করে এঁকে বাকি চরিত্র ও ঘটনাগুলোকে মূল চরিত্রের ওপরে ও নিচে ছোট ছোট চৌখুপিতে বিন্যস্ত করা হয়)। মজার ব্যাপার হল রাজস্থানের এইসব পটনির্মাতারাও ‘জ্যোতিষী’ হিসেবে পরিচিত এবং তারাও পটচিত্র আঁকার পাশাপাশি ঠিকুজি নির্মাণ করেন। আচার্যরা যে ঠিকুজিগুলো তৈরি করেন কিংবা রাশিচক্র আঁকেন, তাতে লেখা ও আঁকার যে আয়োজন, সেটাও অনেকটা এ ধরনেরই। বিশেষ করে ঠিকুজিতে সংহারীচক্র (মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ যে ফ্রেমে উল্লেখ থাকে) নামে যে ছকটি থাকে, গাজির পটে কৃপনের পরিণতি দৃশ্যের ফ্রেমটিও (চৌখুপি) ঠিক একই নামে, অর্থাৎ সংহারীচক্র নামেই পরিচিত। রজতানন্দের লেখা থেকে জানা যায় যে আচার্যরা কোনো কোনো পটের প্রতিটি দৃশ্যের নীচে কাহিনীও লিখে দিতেন যা আমরা ঠিকুজিতেও দেখতে পাই)। তবে আচার্যদের আঁকা গাজির পটের দৃশ্যগুলোর নীচে কোনো ধরনের লেখা দেখতে পাওয়া যায় না। হয়তোবা এ কারণেই গুরুসদয় দত্ত আচার্যদের আঁকা গাজির পটগুলোকে অশিক্ষিত মুসলমানদের জন্য আঁকা হয় বলে তার লেখায় নিশ্চিত মন্তব্য করেছেন।




Untitled Document
Total Visitor : 708979
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :