Untitled Document
ভাদ্র সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
দাদুর যত অলঙ্কার
-প্রিসিলা রাজ

পয়লা ফাগুনের রঙ লেগেছে চারুকলা ইনস্টিটিউটের সর্বাঙ্গে। বাসন্তী, গেরুয়া, মেটে, আধপাকা লেবু, পুরো পাকা লেবু, পাকা কলা, মিষ্টি কুমড়া - হলুদ কত বিচিত্র হতে পারে আর কত রঙের সাথে কত ঢঙেই না তার মিল হতে পারে চেয়ে চেয়ে তাই দেখছিলাম। চারুকলার দেয়াল ঘেঁষে রোজকার মত দাদু বসেছিলেন তাঁর গয়নার স্ট্যান্ডটা নিয়ে। আশেপাশে বসেছে চুড়িওয়ালী, বাঁশি-বাজিয়ে, ফুল বানিয়ে, ক্ষুদে ঘর বানিয়ে, আরও কতরকমের শৌখিন পশরা বিক্রেতা। এসবই অবশ্য আজকের জন্য, বেশীর ভাগই তারা অন্য দিন বসে না। দাদুর পাশেই একটি হলুদ বালিকা গয়না বাছছিল। ছবি তুলছি দেখে দাদু মৃদু হেসে ইশারা করলেন মেয়েটির সাথে একই ফ্রেমে তাঁকে ধরতে। কীভাবে যেন মেয়েটি টের পেল। ঘুরে বসে দাদুর মুখে হাত বুলিয়ে দিল পরম মমতায়। সাতানব্বুই বছরের (দাদুর নিজের হিসাব) অলঙ্কার শিল্পীকে মায়ার ডোরে বেঁধে রেখেছে এরাই।




“অষ্টাশির সময় হবে মনে হয়। শরীরে আর আগের মত তাকৎ পাই না। মডেল দিতে পারি না আগের মতন। এই সময় (শিল্পী) জামাল আহমেদ একদিন বললেন, ‘দাদু, এদ্দিন আর্ট কলেজে থাকলেন আর কিছুই শিখতে পারেন নাই?’ আমি কইলাম, ‘শিখছি। আমার ভিত্রে আছে।’ ‘তো করেন না ক্যান্?’ আমি কইলাম যে পয়সার লাইগা পারতেছি না। উনি তখন আমারে জিগাইলেন কত টেকা হইলে আমি কাজ শুরু করতে পারব। আমি কইলাম হাজার টেকা হইলে হবে। জামাল আহমেদ সাবে তখন ঘরে উইঠা গিয়া দুইটা পাঁচশ টেকার নোট আনলেন। আমারে দিয়া কইলেন, ‘এই টেকা আর আমার লাগবে না। যান দেখি সাত দিনের মইদ্যে আপনে কী কইরা আনবার পারেন।’ আমি চাইর দিনের মধ্যে গয়না বানায়া নিয়া গেলাম। ঘরে ইউরোপিয়ান আছিল দুইটা। হেরা এইগুলি দেইখা চাইরশ টেকার কিনা নিল। জামাল আহমেদ নিজে নিলেন একশ টেকার।”

ব্যস্। সেই শুরু। মডেল দাদু হয়ে গেলেন অলঙ্কার শিল্পী। চারুকলা ইনস্টিটিউটে দাদুকে যাঁরা ছোট বেলায় দেখেছেন তাঁদের অনেকেরই যৌবন পার হয়েছে প্রায়। আসল নামটা তাঁর কজন জানে? মমিন আলী মৃধা, বাড়ী শরিয়তপুরের সিংহলমুরি গ্রামে। ছেলেবেলাতেই বাবাকে হারিয়ে দুই ভাই-বোন মানুষ হয়েছিলেন মামাবাড়ীতে। তারপর জীবিকার খোঁজে, প্রাণের টানে বেরিয়ে পড়েন পৃথিবীর পাঠশালায়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে পূর্ব ভারতে ওয়ার ফিল্ডের লেবারার ছিলেন। “রানী এলিজাবেথের সার্টিফিকেট আছিল।” একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের আগের বন্যায় নষ্ট হয়েছে সেসব।

দাদু গয়না বানান সিমেন্ট দিয়ে। “ভূগোল বইতে দেখছি মোগল আমলে তখন পাথরের মালা পরত। তারপর হিন্দি ফিলমেও দেখি। তখন ভাবলাম আমি নিজে চেষ্টা কইরা দেখি।” পাথুরে গয়নার মূল উপাদান সিমেন্টের সাথে যোগ হয় মার্বেল গুঁড়ো আর রঙ। কাঁচামাল জোগাড় হয় বাজার থেকে। “অনেক সময় বস্তা কিনি, অনেক সময় খুচরা। বস্তা কিনলে সিমেন্টটা খুব ভাল পাওয়া যায় কিন্তু যত্ন কইরা রাখতে হয় খুব।”

“এই গয়না নষ্ট হয় না। আপনার মাইয়া নাতি-নাতনী পরতে পারব,” বলছিলেন দাদু এক ক্রেতাকে। গয়নার দামটা যেন বেশী বলে মনে হয়েছিল তার। দাদুর কাছে সাধারণত কানের দুল, হাতের ব্রেসলেট আর মালা পাওয়া যায়। গয়নাগুলোর উপাদান সিমেন্ট বলেই মনে হয় রঙটা হয় মেটে মেটে। কিন্তু রঙ মেলানোর গুণেই বোধহয়, খুব উজ্জ্বল দেখায়। পয়লা ফাগুনের দিন দুল দেখা গেল হরেক কম্বিনেশনে: মেটে গোলাপী আর গাঢ় নীলের দুল; হলুদ, গোলাপী আর নীল; হলুদ, সবুজ আর নীল আর আরও কত রকম। সিমেন্ট-পুঁতি দিয়ে বানানো মালাতেও ছিল হরেক রঙ - সাদা, নীল, হলুদ, গোলাপি, সবুজ। একেক জোড়া দুল বিক্রি হয় কুড়ি থেকে চল্লিশ/পঞ্চাশ টাকায়, ব্রেসলেট কুড়ি টাকায় আর পুঁতির সংখ্যা ও কম্বিনেশনের মাহাত্ম্য বুঝে মালার দাম ৩০ থেকে ১৫০ পর্যন্ত উঠতে পারে।

এবারের পয়লা ফাল্গুনে গয়না বিক্রি হয়েছে দু’হাজার টাকার মত। অন্যবার এসব মেলা-উৎসবের দিনে তা পাঁচ হাজারে ওঠে। দাদু এবার অস্স্থুতার কারণে আর পারিবারিক কিছু সমস্যায় ঠিক সময়ে মাল আনতে পারেননি। “মাইয়ারা সব হলুদ শাড়ী পইরা আসে আমার কাছে পছন্দমত দুল-মালা কিনতে। এইবার এগো ঠিকমত দিতে পারি নাই,” দুঃখিত স্বরে বলেন। যেন দুঃখটা বিক্রি যে যথেষ্ট হয়নি সেজন্য না, উৎসবে মেতে ওঠা তরুণ-তরুণীদের মনমত গয়না যোগাতে পারেননি সে কারণেই।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ফেরত মমিন মৃধা মালির চাকরি করতেন ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের বাড়ীতে, ইস্কাটনে। সেখানে যাতায়াত ছিল শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের। “সুন্দর বাগান দেইখা জয়নুল আবেদীন সাব স্কেচ করতেন।” শিল্পাচার্যই তাঁকে মডেলিংয়ে আসতে বলেন। সেটা পাকিস্তান আমল। চাকরি ছিল তাই আর্ট কলেজে নিয়মিত সিটিং দিতে পারতেন না, মাঝে মাঝে দিতেন। স্বাধীনতার পর ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব মারা গেলে মডেলিংয়ের কাজটিকেই পেশা হিসাবে নিয়ে নিলেন। তিন দশকেরও বেশী এই চারুকলার চত্বরে কাটিয়ে তিনি এখন সকলেরই দাদু।

দাদুর গয়না দেশের বাইরেও যায়। ইডেন কলেজের ছাত্রী লোপাকে দেখেছিলাম একদিন হরেক ডিজাইনের মালা কিনতে। বলেছিলেন কোরিয়ায় ভাইয়ের কাছে পাঠাচ্ছেন। ভাই তাঁর বিভিন্ন দেশের বন্ধুদের দেবেন। এভাবে ছাড়াও কুটিরশিল্প ব্যবসায়ীরাও অর্ডার দেন। সেগুলো তাঁরা বিদেশে রপ্তানী করেন। জানান দাদু।

কাঁঠালবাগানের ষাট বছরের বাসিন্দা দাদু। তিন ছেলে এক মেয়ের সবারই জন্ম এখানেই। এখনও তাঁরা সকলে এই এলাকাতেই বাস করছেন। বিয়ে হয়েছে সকলের। সাতটি নাতি-নাতনি দাদুর। তবে তাঁর বড় আক্ষেপ ঢাকা শহরে এতগুলো বছর পার করেও একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই করতে পারেননি। ফলে এক বাসা থেকে আরেক বাসায় ক্রমাগত ছুটে বেড়াতে হচ্ছে এই বয়সেও।

সিমেন্টের গয়না বানানোর কাজটা খুব ধৈর্য্যরে। “মাটির দশটা পুঁতি বানাতে যে সময় লাগে সিমেন্টের একটা পুঁতি বানাতে লাগে সেই সময়। মাটিটা হাতের মধ্যে নিয়ে পাকালেই সাইজ হয়ে যায়। আর সিমেন্ট হাতের মধ্যে নিয়া পাকানের চেষ্টা করলে ‘ফাকি’ হয়ে যায়,” বললেন নুরুদ্দীন হাবিব, দাদুর ছোট ছেলে যিনি নিজেও আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়া আঁকিয়ে এবং বাবাকে এই কাজে সাহায্য করেন।

“মাঝে হাত-পা অবশ হয়া গেছিল। কাজের এনার্জি একদম কইমা গেছে। দুর্বল হইয়া গেছি,” দুই হাত মেলে ধরে বলেন বৃদ্ধ। বলি এত কষ্টের চেয়ে সহজ মাটিতে গয়না বানালেই তো হত। শীর্ণ মাথা দু’দিকে দৃঢ় নড়ে ওঠে। “ঐটা করলে তো আমি অন্যদের সমান হইয়া গেলাম।”

গয়নার নকশা মূলত দাদু নিজেই করেন। বলেন, “আমি চারুকলার মডেল - আমার কি ডিজাইনের অভাব আছে নাকি? স্যাররা, ছাত্ররা আইসা বলে, ‘দাদু, এইটা বানান।’ ” নিজের মাথা দেখিয়ে বলেছিলেন, “বয়স হয়ে গেছে। বোঝেন তো মাথার খুব কাজ - যেটুকু আছে সেইটা খুব সাবধানে খাটাই, নাইলে এইটাও নষ্ট হইয়া যাইব।”

এখন কাজ শেখাচ্ছেন ছোট পুত্রবধূকে। অর্ডার আসে যথেষ্ট কিন্তু লোকবলের অভাবে সাপ্লাই দিতে পারেন না। জিজ্ঞেস করি বাইরে থেকে কাউকে কাজে নিচ্ছেন না কেন। নুরুদ্দীন জানালেন বাবা পরিবারের বাইরে কাজটিকে যেতে দিতে চান না। আর দাদু বললেন, “কাজ শিখাব, তারপর আমারে ছাইড়া চইলা যাবে, সেইটা চাই না।” তাই দেশ থেকে কোনো ‘চিনজান’ আত্মীয়কে নিয়ে এসে কাজ শেখানোর পরিকল্পনা করেছেন।

বাবা মাইজভান্ডারের শিষ্যত্ব নিয়েছেন বহুদিন। শশ্ম্রু ও জটায় তারই ইঙ্গিত। জীবনের প্রান্তসীমায় এসে জটিল মুহূর্তগুলোতে গুরুর অদৃশ্য পা ছুঁয়ে কৃতজ্ঞতা জানান। সমস্যার কথা উঠলে শান্ত স্বরে বৃদ্ধ বলেন, “সমস্যা যেইটা সেইটা আর সমাধান করা যায় না।”

শিল্পী রনবীর কাছে কাজ শেখা ছোট ছেলে চারুকলায় পড়বে - বড় আশা ছিল দাদুর। সে আশা পূরণ হয়নি। তবে নুরুদ্দীন জানালেন বাবার পরে তিনিই সিমেন্টের গয়নার ‘প্রোডাক্টটা’ ধরে রাখবেন।

ছবি ও লেখা: প্রিসিলা রাজ
১ লা ফাগুন ১৪১০



Untitled Document
Total Visitor : 708335
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :