Untitled Document
ভাদ্র সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
ধ্বনি ও চিত্র
- সাইম রানা
স্থির কোনও দৃশ্যের মধ্যেও গতির এক মহা নেশা কাজ করে। গতিশীল কোনও দৃশ্য যা আমরা দেখি, তা-ও একর্থে স্থিরচিত্র। তাই দর্শকের দৃষ্টির উপলব্ধিই গতিশীলতার অনুভব মাত্র। যেমন চলচ্চিত্র- যা স্থিরচিত্রের সমন্বয়ে এক চলমান প্রক্রিয়া। একটি স্থিরচিত্রের অন্তর্গত গভীরতা (perspective) এবং দুরত্ব (Distance) অর্থাৎ কাছের দৃশ্য ও দূরের দৃশ্যের ফারাকটা অনুভব করা যায়। দূরত্বের মধ্যে উত্তল কিংবা অবতলের গাণিতিক রেখার যে পরিমাপ, তা অল্পদূরকে কখনো বেশিদূরে দেখায়, আবার কখনো বেশিদূরকে অল্পদূর মনে হয়। অনুভবের এই গতিময়তা একটি সমান কাগজের মধ্যেই দেখানো যেতে পারে। একটি শাদা কাগজে জলরঙ করার আগে কিছুই কল্পনা করা যায় না। চিত্রকর তাতে নানা রঙ-এর ব্যবহার করে দর্শককে নতুন নতুন কল্পনা দান করতে পারে। মানুষের মনের ভিতরের বোধ ঐ দৃশ্যের দুই/চার ইঞ্চি রেখাকে দু/দশ মাইলে প্রলম্বিত করে। ছবি দেখার এই কৌশল সম্পর্কে কেউ জানুক বা না জানুক, তরঙ্গ সবার মধ্যেই কম বেশি কাজ করে।





তাই কোনও নদী দেখাটাই যেন শুধু নদী দেখা নয়। তার ভিতরে প্রবাহিত স্রোত, পাল তোলা নৌকোকে নিয়ে বাতাস আর স্রোতের ঠেলাঠেলি। তীর। তীরের বুকে আছড়ে পড়া ঢেউ। জল। কলকল। কলকলের ভিতর ভাটিয়ালি গান। পাড়ের ভাঙন। ভাঙনের গর্জন। নদীকূল। কূলের জীবন। হারানো জীবন ও সংসারের রোদন। শোকের কান্না। কান্নার ধ্বনি। গীত ও মাতম। এভাবেই চিত্রকল্পের অবাধ ছুটাছুটি, শব্দ ও গুঞ্জনের সমারোহ ঘটে। শিল্পকলায় তাই যে টুকুই দৃশ্যায়িত হোক; গল্প-কবিতায় যতটুকুই বয়ান করা হোক; তার ভিতরটা খুঁড়ে খুঁড়ে তৈরি হয় একটি গোলার্ধ। প্রণত পৃথিবী। শিল্পীর পৃথিবীটা দর্শক-পাঠকের পৃথিবীতে গিয়ে আছড়ে পড়ে। এই মহা-মাতমের খেলায় মেতে ওঠেন শিল্পী, যেমন তার সৃষ্টিতে, ভোক্তা সেই বোধের তাড়নায়। এই খেলা শিল্পীর যতটা জীবন ও অভিজ্ঞতা নিংড়ানো বিপুল আবেগের হানাহানি, ততটা পরিণত মননে এবং সু-কৌশলে স্থিরতা প্রদান। একটি স্থিরচিত্র তাই কোনও স্থির চিত্রই নয়, ভাষা কোনও নিরেট বাক্যবন্ধনীই নয়। অক্ষর কোনও সংকেত বা প্রতীকই নয়। যা চলমান প্রক্রিয়ার মহাজাগতিক ক্ষমতাকে রোধ করে শিল্পী তার কল্পনার নিজস্ব আদলে মুড়িয়ে রাখে। আবার ঠেলে দিয়ে গতিবিদ্ধ করে। আবার রোধ করে। এই যে প্রতিনিয়ত ভাঙা ও গড়া। শিল্পীর এই যে নৃশংস যাত্রা। নিজের সপক্ষে ও বিপক্ষে ভাঙচুর, প্রলয়-বজ্রের নিনাদ, পাখির ডানা ঝাপটানো, আগুনের গনগনে হলকা, ঘোড়ার হ্রেষা অথবা বীরত্বের দৃঢ়তা, কিংবা শান্ত-রোমান্টিক-প্রণয়, ঋতু-নিসর্গের গতিকে নাড়িয়ে দিয়ে, দুলিয়ে দিয়ে একটু হেসে ওঠা। শিল্পীর কাজই এমন। তাই শিল্পী অন্তত আত্মজগতের-আত্মজ্ঞানের প্রবল ঈশ্বর।

চৈনিক বৌদ্ধ সংগীতে পাওয়া যায় স্তোত্র পাঠের মধ্যে মাটি খুঁড়ে পৃথিবীর অতলে ঢুকে যাওয়ার সুর, পিংপং বলের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে পাহাড়ের পর পাহাড় টপকিয়ে অন্য কোনও দেশে পৌঁছে যাওয়া সুরচিত্র, মহাজগতের কোথাও কোনও নক্ষত্রের ভিতর ঢুকে যাওয়া। সাঁই করে শূন্যে বিলীন হয়ে যাওয়া, ভূস করে ভেসে ওঠা, গলগলে লাভার বুদবুদের মতো, ফোঁসফোসে নাগরাজের মতো হয়ে যাওয়ার এই যে সুর, তা ঐসব ধর্মগুরুদের আত্মশক্তির ফল। শুধু সুর বা ধ্বনির মাধ্যমে যে আশ্চর্য চিত্রকল্পে (Imagination) ঢুকে যাওয়া, এ শুধু মানসিক ধ্যান-ধারনার মধ্যেই সীমবদ্ধ নয়। বরং বৌদ্ধ সাধকসিদ্ধগণ স্বশরীরেই একর্ম সাধন করতে পারতেন বলে ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়। আত্মার ভিতর যখন মহাত্মার শক্তি দাঁড়িয়ে যায়, লৌকিক জীবনের অসম্ভব কোন ঘটনাও তখন সম্ভবপর হয়ে ওঠে, মৌলিক শিল্পীরা অন্তত তার শিল্পমাধ্যমে এমন আশ্চর্যের যোগ ঘটাতে পারেন নিশংসয়ে। ফলে আমরা দেখি ইউরোপিয় চিত্রকলায় এক্সপ্রেশনিস্টদের মধ্যে একই চিত্রের ভিতর আরো অনেক চিত্র। একটি ঘটনার ভিতর অজস্র ঘটনার ইঙ্গিত। কিন্তু বারোখ পিরিয়ডের চিত্রশিল্পীরা ঐতিহাসিক ও মিথিক্যাল চরিত্রের বাস্তবায়ন করেছেন শুধু। সেখানে মনে হয় শিল্পী যেন অংকিত চরিত্র ও তার ভঙ্গিকে সশরীরে দেখেছেন। মিথিক্যাল এই সব চরিত্রকে যদি শিল্পী স্বচক্ষেই অবলোকন না করবেন তাহলে আঁকবেন কীভাবে? অথবা একটি শান্ত প্রকৃতির মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রের তাণ্ডব শেষের ফেলে যাওয়া সেই মুহূর্তকে ধারণ করবেন কীভাবে? তাই বলা যায় শিল্পীর সেই আত্মজ্ঞানের পরিচর্যা যেমন জীবনকে প্ররোচিত করে- আদিষ্ট করে, আর সেই আদিষ্টকে শিল্পী কৌশলে তুলে আনেন তাঁর শিল্পমাধ্যমে।
এই শিল্প বা সাহিত্যের ঘটনাগুলোর রচনা শৈলীর দিকে আমি আলোকপাত করছি না। তবে মৌলিক লেখক মাত্রই নিজস্ব রচনাশৈলী থাকে এবং রচনাকর্মে তাঁর জীবন ও আবিষ্কারের অভিজ্ঞতায় আরো স্বকীয় করে তোলেন। এই স্বকীয় বিনির্মাণের জন্য যে বিশেষ বিশেষ উপাদান ব্যবহার করেন তা বিষয়ের, বোধের, স্থান-কাল-সুরের, অবরোহন-আরোহনের, সেই আলাদা উপাদানই স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও শৈলীতে দাঁড় করাতে সাহায্য করে। এই কৌশলকে আবিষ্কারের মধ্য দিয়েই রচনাকর্ম ও শিল্পীর জীবনকে অন্বেষন করা সম্ভব হয়। এজন্য অপেক্ষা শুধু, অপেক্ষা। হঠাৎ এসে ধরা দেয় ‘সা’, কিংবা একটি রেখা অথবা কোনও এক বোধ। যা পৃথিবীর সবকিছুর প্রয়োজনের অতীত। সেই বোধ জীবনানন্দের কবিতার মতো-

আলো- অন্ধকারে যাই- মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়,- কোন্ এক বোধ কাজ করে!
স্বপ্ন নয়- শান্তি নয়- ভালোবাসা নয়,
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়!
আমি তারে পারি না এড়াতে,
সে আমার হাত রাখে হাতে;
সব কাজ তুচ্ছ হয়,- পণ্ড মনে হয়,
সব চিন্তা- প্রার্থনার সকল সময়
শূন্য মনে হয়,
শূন্য মনে হয়!


    





Untitled Document
Total Visitor : 708983
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :