Untitled Document
ভাদ্র সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা
-শুভ কিবরিয়া
১৯৭৯ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে দখলদারিত্ব কায়েম করে। কম্যুনিস্টরা মুসলমানদের দেশ দখল করছে বলে তখন বন্ধু সাজে আমেরিকা। মুসলিম মুজাহিদিন বা সশস্ত্র প্রতিরোধকারীদের হাতে অস্ত্র, টাকা এবং প্রশিক্ষণ তুলে দেয় আমেরিকা। আমেরিকার এই কাজে হাত লাগায় তার মুসলিম মিত্র পাকিস্তান এবং সৌদি আরব। পাকিস্তান তখন আমেরিকার বড় বন্ধু। পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা এই যুদ্ধে পাকিস্তানকে আমেরিকার আরো কাছে নিয়ে যায়। ওসামা বিন লাদেন তখন বড় বন্ধু আমেরিকার। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্ষমতাশালী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই তখন দু’হাতে প্রশিক্ষণ এবং সামরিক সহায়তার দুয়ার খুলে দেয় আফগান মুজাহিদদের।
এরপর ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত রাশিয়া বাধ্য হয় আফগানিস্তান ছাড়তে। ১৯৯৬ সালে তালেবান রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয় আফগানিস্তানে। ২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে ৯/১১-এর হামলার পর ওসামা বিন লাদেন আর তালেবান দুই আমেরিকার বড় শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হয়। আমেরিকা ন্যাটো বাহিনী নিয়ে হাজির হয় তালেবান নামের মুসলমান শত্রু নিধনে। সেই থেকে বছরের পর বছর যুদ্ধ চলছে আফগানিস্তানে। কিন্তু সেখানে আর জয়ের মুখ দেখে না আমেরিকা। বরং পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। ইরাক ও আফগানিস্তানে সামরিক আগ্রাসনের কারণে দুনিয়াজুড়ে মুসলমানদের বড় অংশের শত্রু হয়ে ওঠে আমেরিকা। প্রতিফলে জঙ্গিবাদ আর সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুুদ্ধের নামে আমেরিকা নিজেই কায়েম করে এক ‘যুদ্ধরাজ’।
তার প্রকৃতি কেমন?













আমেরিকার প্রভাবশালী নিউজ ম্যাগাজিন ‘নিউজ উইক’-এর আগস্ট, ২০১০ সংখ্যায় টেক্সাস থেকে এক পাঠকের চিঠি ছাপা হয়েছে। চিঠির ভাষ্য এ রকম-
ÔWith all the financial problems in the United States there is no way to justify pouring $ 100 billion a year into fighting a war in a corrupt, stone Age country. How many more flag-draped caskets do we have to see before we come to our senses? The day will come, just as in Vietnam, when our leaders accept that this war we’re not going to win.
John M. Massey, KATY, TEXAS
[প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত মধ্যযুগীয় দেশে যুদ্ধ চালানোর আর কোনোই যৌক্তিকতা নেই। সম্বিত ফিরে পাবার আগে আর কত জাতীয় অপমান সইতে হবে সেখানে। দিন আসছে, খুব শিগগিরই আমাদের নেতারা স্বীকার করে নেবেন, ভিয়েতনামের মতোই এই যুদ্ধেও আমরা জিততে পারছি না।’
জন এম ম্যাসি, ক্যাটি, টেক্সাস]

২.
আমেরিকার সংবাদপত্র ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ হালে গোমর ফাঁস করেছে । ৯/১১ এর পর দুনিয়াজোড়া শত্রু উৎপাদন করে আমেরিকার লাভ হয়েছে কি তার বিষয়ে বিস্তর তথ্য ফাঁস করেছে তারা।
তারা বলছে, শত্রু খুঁজতে খোদ আমেরিকাতেই হাজার হাজার সংস্থা তৈরি হয়েছে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায়। Top Secret America শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ জানাচ্ছে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় কাজ করছে ১,২৭১টি সরকারি সংস্থা এবং ১৯৩১টি বেসরকারি সংস্থা। খোদ আমেরিকাতেই ১০ হাজার জায়গায় চলছে এদের কাজকারবার।
প্রায় নয় লাখ লোক জড়িত এই তৎপরতায়। পেন্টাগনের তুলনায় তিনগুণ, ১৭ মিলিয়ন স্কয়ার ফুট জায়গা জুড়ে চলছে এসব গোয়েন্দা তৎপরতার দপ্তরগুলো। এদের সংখ্যা এত বেশি এবং কাজ এতই সমন্বয়হীন যে হয়ত এক সংস্থা যে কাজ করছে ঐ কাজটিই নতুন করে করছে অন্যজন। প্রতিবছর প্রায় ৫০ হাজার গোয়েন্দা রিপোর্ট তৈরি হচ্ছে। পত্রিকাটি সংশয় প্রকাশ করে বলেছে এই সমন্বয়হীন, বিপুল খরচের গোয়েন্দাযজ্ঞ শেষতক কি ফল আনছে, আমেরিকা কতটা নিরাপদ হচ্ছে বলা মুশকিল।

৩.
এসব খবরের মধ্যে হালে নতুন তথ্য হলো আফগানিস্তানে আমেরিকার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে। ইতোমধ্যে পাকিস্তান ও আমেরিকার এই দুই দেশের সরকারের মধ্যে অবিশ্বাস চরমে উঠেছে। পাকিস্তান দ্বিমুখী আচরণ করছে বলে প্রকাশ্যেই বৃটেন ও আমেরিকা অভিযোগ তুলছে। পাকিস্তান অভিযোগ তুলছে আমেরিকান নেতৃত্বাধীন ন্যাটো সেনাবাহিনী কর্তৃক বেসামরিক জনগণ হত্যার ফলে পাকিস্তানে এবং আফগানিস্তানে মার্কিন জনপ্রিয়তা কমছে। সাম্প্রতিক এক জরিপ বলছে আমেরিকার ভারতপ্রীতিসহ সামরিক আগ্রাসনের ফলে পাকিস্তানের মাত্র ১৭ শতাংশ মানুষ আমেরিকার ভূমিকায় সন্তুষ্ট। বাকি বিপুল জনমত আমেরিকার বিপক্ষে।
এর মধ্যে আমেরিকার পেন্টাগন প্রকাশ করেছে, আফগানিস্তান সম্পর্কে নতুন তথ্য। তারা জানাচ্ছে, আফগানিস্তান জুড়ে আছে লোহা, তামা, কোবাল্ট, সোনা এবং লিথিয়ামের মতো দামি খনিজ সম্পদ। প্রায় এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের খনিজ সম্পদের খবর দিচ্ছে আমেরিকা।
এখন, নতুন প্রশ্ন জাগছে, তাহলে আফগানিস্তানে আমেরিকান আগ্রাসনের মূল মতলব কি ছিল এই?
আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদ লুটতেই কি আমেরিকার এই সর্বগ্রাসী যুদ্ধ?
২০১১ সালের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও আমেরিকানরা কি ছাড়বে আফানিস্তানের মাটি?
নাকি সাহায্য, প্রশিক্ষণ, খনিজ সম্পদ উত্তোলন ও বিনিয়োগের নামে গেড়ে বসবে চিরকালের জন্য নতুন আস্তানা?

৪.
আমেরিকা- ইসরাইল এই অঞ্চলে ভারতকে নতুন মিত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে। আমেরিকা-ইসরাইল-ব্রিটেনসহ পশ্চিমা পৃথিবীর ধারণা বাণিজ্যে বাঁচতে হলে ভারতের বাজার ধরতে হবে। তাই এসব দেশ ভারত- তোয়াজে নেমেছে। অন্যদিকে, আফগানিস্তানে ভারত ক্রমশ বড় ভূমিকা রাখছে। সেখানে ঠিকাদারীসহ নানামুখী ব্যবসায় ক্রমশ জড়িয়ে পড়ছে ভারত। সবাই মিলে যখন তোয়াজ করছে ভারতকে, তখন বিগড়ে গেছে পাকিস্তান। এমনিতেই নিজ রাষ্ট্রকে প্রায় অকার্যকর করে ফেলেছে তারা। আফগানিস্তান ইস্যু তাদের আরো অসহিষ্ণু করেছে। যার ফলে তালেবানরা উপকৃত হচ্ছে। আবার পাকিস্তানের ক্ষমতাধর গোয়েন্দা সংস্থা বড় আকারে ভূমিকা রাখছে রাজনীতি ও রাষ্ট্র বিষয়ে। তাদের নানা কায়দা প্রয়োগে ভারতকেও ব্যতিব্যস্ত রাখছে তারা কৌশল হিসেবে। সাম্প্রতিক ভারতীয় অংশের কাশ্মীরে ‘ইনতিফাদা’ বা জনবিদ্রোহ’ তার বড় প্রমাণ।
বাণিজ্যের ভালোবাসায় জড়িয়ে ভারত যেমন লাভ গুনছে। বিপদের কারণও তার কম নেই। মাওবাদীরা সশস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। মুসলিম জঙ্গির ভয় তো আছেই। আবার মাতব্বরি ফলাতে গিয়ে আফগানিস্তানের তালেবান যোদ্ধারাও ক্ষুব্ধ তাদের ওপর।
একদিকে ভারত ও আমেরিকার নববন্ধুত্ব। অন্যদিকে আফগানিস্তান, পাকিস্তানের মার্কিন বিদ্বেষ। পুরো দক্ষিণ- এশিয়া জুড়ে এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মহাজোট সরকার মিত্র মানছে ভারত- আমেরিকাকে। সহজ সোজা হিসেবে, তাদের ভাবনা হচ্ছে, উন্নয়ন ও সরকারে থাকতে চাই, আমেরিকা- ভারত ছাড়া গতি নাই।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কি? এ নিয়ে কথা বলার জন্য আরেক প্রস্ত জায়গা দরকার। শুধু ক্লু দিয়ে রাখি। আমেরিকা যার বন্ধু হবে তার শত্রুর দরকার নেই।
১৯৭১ সালে পাকিস্তান টের পেয়েছিল।
২০১০ সালেও পাকিস্তান টের পাচ্ছে।
১৯৮৯ সালে আফগানিস্তান টের পেয়েছিল।
২০১০ সালেও আফগানিস্তান টের পাচ্ছে।
- অনেকে বলেন, রাজনীতির বড় দোষ হচ্ছে, রাজনীতি অতীত থেকে স্মৃতিচারণ করে কেবল, শিক্ষা নেয় না।



Untitled Document
Total Visitor : 709326
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :