Untitled Document
ভাদ্র সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
কক্সবাজার টেকনাফ উপকূলীয় অঞ্চল
- মার্জিয়া লিপি
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে উপকূলীয় অঞ্চলে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমূদ্র সৈকত অবস্থিত। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেষে কক্সবাজারের ঝিলংজা হতে টেকনাফের বদরমোকাম পর্যন্ত প্রায় ১০০ কি:মি: দীর্ঘ এই সৈকত। পাহাড়ী বনাঞ্চল ঘেষা সুদীর্ঘ সৈকতের প্রধান আকর্ষণ সারিসারি ঝাউবন, প্যারাবন (Mangrove Forest) এবং বালিয়াড়ি। সৈকতের কিছু কিছু স্থান জুড়ে রয়েছে পাথরময় জোয়ার-ভাটা অঞ্চল।
জীববৈচিত্র্যঃ কক্সবাজার টেকনাফ সমুদ্র সৈকাত রয়েছে বেশ কিছু দেশীয় এবং পৃথিবীব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ-প্রানী। এখানে প্রায় ২০০ প্রজাতির স্থানীয় পাখি এবং ৮১টিরও বেশি প্রজাতির পরিযারী পাখির বিচরণের তথ্য পাওয়া গিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পৃথিবীব্যাপী হুমকিগ্রস্ত চার প্রজাতির পাখি - স্পুনবিল স্যান্ডপাইপার, এশিয়ান ডাউইচার নরডম্যান’স গ্রীন শ্যানক এবং লেজার এ্যাডজুটেন্ট। স্পুনবিল স্যান্ডপাইপার পৃথিবীর বিরলতম পাখির মধ্যে একটি। এই সৈকতে পাওয়া যায় বিচিত্র প্রজাতির শামুক, ঝিনুক ও কাঁকড়া কক্সবাজার - টেকনাফ সমুদ্র সৈকত পৃথিবীব্যাপী বিপন্ন সবুজ কাচ্ছিম ও জলপাই রঙের কাচ্ছিমের ডিম পাড়ার আদর্শ স্থান।

সৈকত সংলগ্ন পাহাড় ও বনাঞ্চলে ৯০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রানী বসবাস করে। এর মধ্যে হাতি, ভালুক, হরিণ, মেছো , বাঘ, লামচিতা, বন্যকুকুর, শিয়াল, সোনালী বিড়াল ইত্যাদি উলে¬খযোগ্য। উপকুলবর্তী এলাকায় জলসীমায় রয়েছে সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রানী ডলফিন ও পরপইস।

উপকুলীয় ও মেহেনা এলাকায় বাস করে নানা প্রাজাতির হাঙ্গর, কোরাল, লইট্যা, চান্দা বাটা, দাতিনা, লাক্ষা পোয়া, ছুরি, ফাইস্যা, ইলিশ, গলদা চিংড়ি ইত্যাদি। সৈকতে যে সব উদ্ভিদ সচরাচর পাওয়া যায় তার মধ্যে বাইন, ঝাউ, সাগর লতা, কাঠবাদাম, শেওড়া, ক্যাকটাস, নারিকেল, কেয়া, বেত ইত্যাদি। সৈকতের পাথরময় জোয়ার- ভাটা অঞ্চলে দেখা যায় নানা ধরনের সামুদ্রিক শৈবাল।

উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশগত সংকটঃ
পৃথিবীর সবচেয়ে জন-অধ্যুষিত দেশের একটি হচ্ছে বাংলাদেশ। সুদুর অতীত কাল হতে বাংলাদেশ নামের এই ভূ-খন্ডটি একটি চিরহরিৎ অরণ্যের ঘণ আচ্ছাদনে ভরে ছিলো। মেঘনার অববাহিকায় তথা সমগ্র উপকুলীয় অঞ্চল হতে সুদুর হুগলী পর্যন্ত ঘন ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল আবৃত ছিল। পৃথিবী জুড়ে বৃক্ষ উজার প্রবাহমানতার সাথে সাথে এদেশেও ব্যাপক বন উজাড় হতে থাকে, গড়ে উঠতে থাকে জীবন সংগ্রাম বসতি এবং নির্বিচারে উজাড় হতে থাকে দেশের বনজ সম্পদ, ক্ষতিগ্রস্থ হয় জীববৈচিত্র) ফলে মারাত্মক পরিবেশ ও প্রতিবেশ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। ফলশ্র“তিতে আবর্তক প্রাকৃতিক দুর্যোগ অপরিমেয় ক্ষতিগ্রস্থ করছে দেশের পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থাকে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল কক্সবাজার -টেকনাফ, সুন্দরবন, সোনাদিয়া দ্বীপ, সেন্টমার্টিনসহ বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ সংকটের কারণ নিম্নরুপঃ

 চিংড়ি ও লবন চাষের জন্য ব্যাপক হারে প্যারাবন কেটে ফেলা।
 দ্বীপবাসীর জ্বালানীর প্রয়োজন মেটাতে প্যারাবন কাটা।
 গরু মহিষের চারণভূমি হিসেবে প্যারাবনের যথেষ্ট ব্যবহার।
 বণ্যপ্রাণী শিকার ও তাদের আবাসস্থল নষ্ট করা।
 সামুদ্রিক কাছিমের ডিম সংগ্রহ করা।
 অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ ও প্রজনন মৌসুমে ডিমওয়ালা মাছ ধরা
 চিংড়ি পোনা আহরনকালে অন্যান্য জলজ প্রাণীর ক্ষতিসাধন করা।
 মাছ ধরার জন্য অবৈধ জালের ব্যবহার করা
 নির্বিচারে শামুক ও ঝিনুক আহরণ করা
 মানুষ ও গবাদি পশুর চলাচল দ্বারা বালিয়াড়ি ক্ষতিগ্রস্থ করা।
 কৃষি জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার দ্বারা মাটি ও পানির গুনাগুন নষ্ট করা।
 সৈকত এলাকা জুড়ে হ্যাচারী ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ।
 ভূমির অপরিকল্পিত ব্যবহার।
 সৈকত সংলগ্ন পাহাড় কাটা।
 মোটরযান চলাচলের ফলে সৈকতের বালি বসে যাওয়া এবং নৌকা রাখার ফলে উপকূলের ভূমি ধ্বংসে যাওয়া

কৃষিকাজে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক, নৌকার বর্জ্য তেল এবং হ্যাচারীর বর্জ্য দ্বারা সমুদ্র দূষণ হওয়া।
উপকূলীয় অগভীর সমুদ্রে ব্যাপকভাবে ট্রলিং করে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করা।
চিংড়িঘের ও লবনের মাঠ তৈরীর জন্য প্যারাবন উজাড় করে মাছ ও পাখির আশ্রয়স্থল ধ্বংস করা।
সামুদ্রিক কাছিমের ডিম পাড়ার স্থান এবং পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর বিচরণস্থলে অনিয়ন্ত্রিত চলাচল ও কার্যকলাপ।
সৈকত সংলগ্ন এলাকায় কেয়া বন ও ঝোপঝাড় ধ্বংস করে বহুতল বিশিষ্ট হোটেল ভবন নির্মান।
অপরিকল্পিত ভাবে সামুদ্রিক শৈবাল, শামুক, ঝিনুক ও প্রবাল উত্তোলন ও সংগ্রহ করে পর্যটকদের নিকট সৌখিন সামগ্রী হিসেবে বিক্রয়।
জোয়ার ভাটা অঞ্চল থেকে পাথর উত্তোলন এবং কেয়াবন, ঝোপঝাড় কর্তনের ফলে সৈকত বালু সমুদ্রে ক্ষয় প্রাপ্ত হওয়া।
জোয়ার ভাটা অঞ্চলে প্রবাল পাথরের উপর যত্রতন্ত্র হাটাহাটির ফলে জীবন্ত শামুক- ঝিনুক ও প্রবাল ধ্বংস প্রাপ্ত হওয়া।
অনিয়ন্ত্রিতভাবে পর্যটক আগমনের ফলে যেখানে সেখানে পর্যটকদের ফেলা পলিথিন ও অন্যান্য কঠিন বর্জ্য পদার্থ দ্বারা ব্যাপক দূষণ।
অনিয়ন্ত্রিত সংখ্যায় পর্যটকদের অবস্থানের ফলে ভূ-গর্ভস্থ পানি স্তরের হ্রাস এবং পয়ঃনিষ্কাশন দ্বারা ভূ-গর্ভস্থ পানি স্তরের হ্রাস এবং পয়ঃনিষ্কাশন দ্বারা ভূ-গর্ভস্থ পানির দূষণ।

অতীতে সৈকত ছিলো বর্তমানের অবস্থান থেকে আরোও অনেক ভিতরে এবং সাগর তীরে বাঁধ ছিলনা। মাইলের পর মাইল হেঁটে গিয়ে সৈকতে পৌছাতে হতো। কিন্তু এখন সাগরের তীর ভাঙছে। সাগরের ভাঙন কখনো ভয়াবহ রূপ নেয়। তীর ভাঙতে ভাঙতে উপকূলীয় অঞ্চল অনেক নিকটে এসে গেছে বঙ্গোপসাগরের জলরাশি। উপকূলীয় মাটিতে লবনাক্ততা, বালুকাময় প্রান্তর, উষ্ণ বায়ুতে বনায়ন উদ্যোগ ব্যাহত হচ্ছে, হ্রাস পাচ্ছে বৃক্ষাচ্ছাদিত বনাঞ্চলের পরিমান। ফলশ্রতি বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রাকৃতিক দূর্যোগ। বিগত এক দশকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দূর্যোগ বহুগুনে বৃদ্ধি পেয়েছে। খরা, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি প্লাবন, ঝড়, জলোচ্ছ্বস, বন্যা ও ভূমিকম্পের তীব্রতা বেড়েছে আশংকাজনকভাবে।

উপকূলীয় অঞ্চলে বৃক্ষরাজির শিকড় আটকে মাটির ক্ষয় রোধ করে এবং উপকূলভাগকে আগলে রাখে। দক্ষিণে সুন্দরবন থাকায় জলীয় বাষ্পপূর্ণ বাতাস বনভূমির শীতল স্পর্শে ঘনীভূত হয়ে মেঘ হয়, বর্ষা ঝরায়। সাম্প্রতিককালে পৃথিবী জুড়ে উচ্চারিত পরিবেশিক সমস্যার ফলে সৃষ্ট জলবায়ুর পরিবর্তন উপকূল সীমারেখা অস্তিত্বকে বিলীন করে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও জীববৈচিত্র্যের ধ্বংসকে তরান্বিত করবে।





Untitled Document
Total Visitor : 709003
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :