Untitled Document
ভাদ্র সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
চন্দ্রাভিযান
- সুমেরু মুখোপাধ্যায়
১। ফলি ছিল, ডলি ছিল, ফলি ছাড়া ডলি ফলিডল খেল।

কথায় বলে না, নেই কাজ তো খই ভাজ! তখন মানুষের সত্যি কাজ ছিল অল্প। বাংলাদেশের মানুষ তবু মাঝে মাঝে মিটিং করত। বেশ কয়েকটা মিটিং এর পরে যেমন তারা ঠিক করে ফেলল চারপাশের সৌন্দর্যবর্ধন করা হবে। কিছুই যখন করার নেই, এটাই বেশ। সবাই বলল বেশ, বেশ। করা তো হবে বোঝা গেল, কিন্তু কী করা হবে? কীভাবে হবে তা কেউ বলল না। সুতরাং ঠিক হল সেটা ঠিক হবে পরবর্তী মিটিং এ। একবারে সব করতে চাইলে কিছুই করা হয়ে ওঠে না। ধিরে ধিরে করাই ভাল। ঠিক হল প্রথমে একটা দিয়ে শুরু করে হাজারে পৌঁছাতে হবে, উপমা দিতে গেলে ছুঁচ আর ফালের মত। একটা কিছু একটা কিছু ভাবতে ভাবতে ছোট-বড় সব জিনিস ছেড়ে সবার নজর গিয়ে পড়ল চাঁদে। সেদিন ছিল পূর্ণিমা, আর মিটিং হচ্ছিল খোলা আকাশের নীচে, সেখানে মাথার উপর টানটান ফুল ভ্যলুমের একপিস মাল, তাই চাঁদ আর রক্ষা পেল না। কারুকলার ছেলে মেয়েরা সানন্দে এই দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিল, তারাই রঙ ফং করে বাজারে ছাড়বে। দায়িত্ব নেওয়া তো হল। কিন্তু কাজ হবে কী করে। এমনতো নয় চাঁদ বাংলাদেশের বাপের সম্পত্তি, স্মার্টলি গিয়ে আঁকি-বুকি টেনে আসবে! ঠিক হল মিটিং- টিটিং করে অন্যদেশের সঙ্গে আলোচনার পর ব্যপারটা ঠিক করা হবে। তৈরি হল কোর কমিটি। এই কমটির কাজই হবে শুধু মিটিং করা। তার নেতৃত্বে রইলেন বর্ষিয়ান শিল্পী ফলিউদ্দিন আহমেদ সংক্ষেপে, ফলিভাই। চাঁদের আইডিয়াটা যেহেতু তারই তাই সবাই এক বাক্যে তাকে গুরু বলে মেনে নিল।




 
ফলিভায়ের জীবন ছিল খুব করুণ। প্রথম জীবণে তিনি ছিলেন এক দুরন্ত ম্যাজিশিয়ান। কিন্তু তিনি একই ম্যাজিক রোজরোজ দেখাতে ভাল বাসতেন না। একঘেয়ে কবুতর থেকে ডিম আর ডিম থেকে কবুতর বানাতে বানাতে তিনি আকস্মিক চিত্রশিল্পের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন। একদিন তিনি রাস্তার ধারে বসে বিভিন্ন রঙের ডিমের ছবি আঁকছিলেন তখন কারুকলার এক অধ্যাপকের নজরে পড়ে যান। তাঁরই অনুপ্রেরণায় ফলিভাই গুগুল সার্চ করে জানতে পারেন, বিদেশের লেটেস্ট ট্রেন্ড এখন action painting তারপরই ফলি ভাই নিয়মিত শরীরচর্চা শুরু করেন। ডিম, দুধ আর বুট ছোলা ভিজে। দৌড়া-দৌড়ি দুইবেলা। তিনবেলা ওয়েটলিফটিং। মীরপুরে একদিন দৌড়াতে দৌড়াতে নজরে পড়ে যান জাতীর ক্রিকেটার আশরাফুলের এবং হয়ে যান উদিয়মান ক্রিকেটার। তখনো T20 এর যুগ আসেনি। ফলে ফলি ভাই বেশি দিন ধৈর্য রাখতে পারলেন না, গুগুলে আবার সার্চ দিয়ে ঠিক করলেন ইন্সটলেশন আর্টিস্ট হবেন। কিন্তু ডিম আর কত রকমভাবেই বা সাজান যায়! শুরু হল ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে জটিল পড়াশুনো। দিন রাত সার্চ দিচ্ছেন ইন্সটলেশন আর ডিম দিয়ে। ফলিভাই মাসাধিক কাল ঘর বন্ধ করে জটিল পড়াশুনো করলেন ইন্সটলেশন নিয়ে। সময়ের হিসেবে একমাস সময়টা খুব কম নয়। এই একমাসেই ফলিভাই এর সম্পর্ক ভেঙে যায়।
বান্ধবী ডলের সঙ্গে ঝামেলা মেলা দিন ধরেই চলছিল তার ডিম খাওয়া নিয়ে এবার একেবারেই ভেঙে গেল ডিমের খোলার মত। চলে যাওয়ার আগে ডল দেখা করতে যায় ফলিভাইএর সঙ্গে। চলে যাওয়ার আগে ভাইয়া বলে ডেকে সম্পর্কটা ইজি করে নিতে হবে। যাতে সব স্মুথ হয়ে যায় ফিঊচার। কিন্তু বিধি বাম। ফলিভাই তখন জটিল গবেষণায় মগ্ন। শত ডাকাডাকিতেও ঘরের দরজা যখন খুললনা তখন ডল খুব ঘাবড়ে গেল। ডল আন্দাজ করল হয় সে ভিতরে অন্য নারী নিয়ে স্ফূর্তি করছে নয় অলরেডি আত্মহত্যা করেছে। হয় তাকে ফলিভাই কোনদিনই ভালবাসে নি নয়ত তাকে সে চরম ভাল বাসে। ফুল ঘাপলা কেস। আর এইটাও সে জানে না। ছিঃ। তার থুতু ফেলে ডুবে মরা উচিত। লজ্জা-অপমান আর হতাশায় ডল বন্ধ দরজার সামনে ফলিডল খেয়ে আত্মিহত্যা করল, তার চিরজাগরুক ভালবাসার নিদর্শন সরূপ। পুলিশ এসে দরজা ভেঙ্গে ফলিভাইকে উদ্ধার করে। ডলের চরম পরিস্থিতি দেখে ফলিভাই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। কবরে মাটি দিয়েই ঠিক করেন জীবনে আর কোনদিন প্রেমের ফাঁদে পা দেবেন না।
জীবন থেকে প্রেম মুছে যাওয়ার পরে ফলিভাই আর কোনদিন যেমন কবিতা পড়েননি তেমন চাঁদের দিকেও তাকাননি, ও সব হল প্রেমিকদের ব্যপার, সফটি সফটি, রোম্যান্টিক। কোর কমিটির প্রধান হওয়ার পর ফলিভাই ঠিক করলেন, একমাস ধরে শুধু চাঁদই দেখবেন। লোকে ফলিভাইএর এধরণের একাগ্রতার কথা আগে শুনেছিল, খোঁজ পেয়ে চমৎকৃত হল। আগামী একমাস আর কোন মিটিং নেই, সবাই আবার পূর্বকার অলস জীবনে ফিরে গেল, কেবল ফলিভাই ছাড়া। ঠিক করেলেন সারা রাত জেগে চাঁদ দেখবেন আর দিনে ঘুমাবেন। পূর্ব অভ্যাস মত নিজের ঘরে ঢুকে সমস্ত জানালা-দরজা ও মোবাইল বন্ধ করে জটিল গবেষণার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করলেন। কিন্তু ঘরের সমস্ত জানালা-দরজা বন্ধ থাকায় সারা রাত জেগে থেকেও ফলিভাই চাঁদ দেখতে পেলেন না। শুধু একদিন নয়, দিনের পর দিন রাতের পর রাত তার এভাবেই কাটল কিন্তু তিনি জিদ করে একমাস ঘরের মধ্যে বসে রইলেন ও গুগুলে সার্চ দিয়ে চাঁদসওদাগর, মরণচাঁদ ও ফটিকচাঁদ নিয়ে অনেক পড়াশুনো করলেন। ঠিক একমাস বাদে তিনি দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন যেন একজন নতুন মানুষ। ফলিভাই যাকে সামনে পেলেন তাকেই জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন, আচ্ছা! চাঁদ কয় প্রকার ও কি কি? বলাবাহুল্য কেউই তার এই প্রশ্নের কোন উত্তর দিল না। কেউ হাসল, কেউ ভ্যাবাচ্যাকা খেল বা কেউ মুখ ভ্যাচকাল। ফলিভাই রাগ করলেন না এতটুকু। অবিচিলত রাখতে হবে নিজেকে, তিনি নেতা। ফলিভাই বারবার নামাজ পড়তে লাগলেন। শান্ত, শান্ত, শান্ত- মন তুই আগে শান্ত হ।
নতুন লব্ধজ্ঞান অবলম্বন করে কোর কমিটিকে নিয়ে অনেকগুলি গুরুত্ত্বপূর্ণ মিটিং করলেন ফলিভাই। প্রতিটি মিটিং এ আলোচনার বিষয় এক, পরবর্তী মিটিং এর বিষয়বস্তু। পঞ্চাশতম মিটিং এ পৌঁছে ফলিভাই দুম করে বলে বসলেন, আমরা ঠিক আর একটা মিটিং করব তারপর শুরু হবে আমাদের চন্দ্রাভিযান। সবাই থ। এতদিন সবাইএর তবু মিটিং ছিল, একবার চাঁদে পৌঁছে গেলে সবাই আবার নিষ্কর্মা হয়ে পড়বে, তখন কাজ করবে শুধু কারুকলার ছেলেমেয়েরা! শত অনুরোধেও ফলিভাই তার সিদ্ধান্ত বদলালেন না। বরং দ্রুত গতিতে এগিয়ে যেতে লাগলেন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে। ফলিভাই বললেন, আমাদের কোরের একজনকে হতে হবে নীল আর্মস্ট্রং, সেই প্রথম পা দেবে চাঁদে। কোরগ্রুপে নিলয় বলে একটি ছেলে ছিল, ফলিভাইএর পরামর্শে সবাই তাকে নীল বলে ডাকতে শুরু করল। আর নীলকে শুরু করতে হল পুশ-আপ আর ওয়েটলিফটিং। অলমোস্ট সারাদিন। এই ভাবে দুই মাসেই নিলয়ের আর্মগুলো বেশ স্ট্রং হয়ে উঠল। ৫১ নম্বর মিটিং এ ফলিফাই দেখতে চাইলেন নীলের আর্ম কতটা স্ট্রং হয়েছে! তার নির্দেশে কোর গ্রুপের সবাই মিলে লোহার রড দিয়ে তার হাতে খুব পেটাল এবং তার দুইখানা হাতই ভেঙ্গে ফেলল। ডলি মারা যাওয়ার পর থেকেই ফলিভাই খুব কঠিন হয়ে গিয়েছিলেন, সহজে ভেঙে পড়তেন না। নীল আর্মস্ট্রং প্রোজেক্ট ক্যানসেল হলেও তিনি ভেঙ্গে পড়লেন না। বললেন, আমরা ঠিক আর বিশটা মিটিং করব। তাতে নিশ্চিত বিশে বিষক্ষয় হয়ে যাবে। চাঁদের কলঙ্ক থাকতে আমাদের যাওয়াটা ঠিকও নয়, বলা তো যায়না ছেলেমেয়েদের কোন অজানা রোগ হতে পারে। আর সেটা যদি ছোঁয়াচে হয় তাহলে তো আমরাও বাঁচব না। সো ফার্স্ট রিমুভ অল দ্য কলঙ্কস।

২। সপ্তডিঙা মধুকর, চাঁদ বেচে চাঁদসওদাগর।

চাঁদ সওদাগরের ছিল চাঁদের ব্যবসা। তিনি জাহাজ ভরতি করে বিভিন্ন সাইজ ও শেপের চাঁদ নিয়ে বিভিন্ন দেশে ঘুরে ঘুরে বেচতেন। ঠেকবি তো ঠেক নৌকা মংলা দিয়ে ঢুকে ঘুরতে ঘুরতে এসে ভিড়ল বুড়িগঙ্গায়। চাঁদসওদাগর সওদাগর মানুষ, সওদার সন্ধানে নানান জায়গায় ঘোরেন। যে দেশে যা নেই সেখানে সেটাই বেচেন। সদরঘাটে নৌকা ভিড়িয়ে সারা রাত আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন, না তার রাস্তা কিলিয়ার। আকাশে কোন চাঁদই উঠল না। পরদিন সন্ধ্যেবেলা বেরিয়ে নানা যায়গা ঘুরলেন, আলুবাজার, চাঙ্খারপুল, শাহবাগ। এদিক ওদিক তাকান কিন্তু চাঁদ কোথায়? তখন রমজান মাস। রাস্তাঘাট খালি। দোকানে দোকানে সাজানো ইফতারের হাজার পসরা, শর্মা, পেঁয়াজু থেকে চন্দ্রপুলি, চন্দ্রহাঁস কী নেই সেখানে! কিন্তু নো চাঁদ। সওদাগর পাকা জহুরী বুঝলেন এখানে তার হবে রমরমা ব্যবসা। এখন ভীড় দেখে ভিড়ে পড়তে হবে। ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে পড়লেন কবির হাটে। সে এক মস্ত ব্যপার। বিভিন্ন খবরের কাগজের মালিকেরা সেখানে আসেন কবি কিনতে। খুন, শ্লীলতাহানী, ধর্ষণের খবর ছন্দ করে লোকে পড়তে পছন্দ করে। কখনো সে খবর দীর্ঘজীবিও হয় কবিতার গুণে। তাই সেখানে কবিদের এমন ডিমান্ড। গোটা হাটে গিজগিজ করছে কবি আর পুঁজিপতি। চাঁদের বিদেশী বণিকের চেহারা সব কবির নজরেই পড়ল। ফরেন এমপ্লয়ার দেখে সবাই যাহারপরনাই খুশি হয়ে মন দিয়ে কবিতা পড়তে শুরু করে দিল। কেউ কেউ লিখতে লাগল নতুন কবিতা, অদৃশ্য কলমে, গাছের পাতায়, বাতাসের গায়ে। চাঁদ সওদাগর কবিদের কাজ-কারবার দেখে তাজ্জব বনে গেলেন। সবাই যে কোথায় কবিতা লিখছে, অথচ তিনি তো একটা অক্ষরও চোখে দেখছেন না। একবার আটলান্টিক মহাসাগরের এক দ্বীপে এক উকিল তাকে ধরেছিল চাঁদের পেটেন্ট নেওয়ার জন্য। অনেক বোঝালেও ব্যপারটা তার মাথায় ঢোকেনি, শেষে একটা আস্ত চাঁদ গচ্চা দিয়ে সে যাত্রা ছাড়া পান। তাই তার ইচ্ছা থাকলেও সাহস হল না কোন কবির কাছে গিয়ে ব্যপারটা বুঝতে! এক জায়গায় দেখলেন কবিদের নিলাম হচ্ছে ঠিক আইপিএলের মতন। ইস তার চাঁদেরও যদি এমন নিলাম হত!

চন্দ্রা বলে এক মহিলা কবির সঙ্গে ভীষণ দোস্তি হয়ে গেল চাঁদ সওদাগরের। বেশ মেয়েটা। এখন অফ সিজিন চলছে তার, চাঁদ না দেখলে তার ভাবই আসে না। বলল আবার সে কবিতা লিখবে ঈদের পর, ততদিন কবিতাও নেই, চাগ্রিও নেই, কী মজা কী মজা। আর কবিতা লেখা মানেই তোমাকে সমাজ সচেতন হতে হবে। খবরের কাগজে বা টিভিতে তোমায় রোজ কবিতা সাপ্লাই দিতে হবে সেইদিনের মার্ডার আর রেপের নাম্বারের উপর নির্ভর করে সাইজ। বেশি হলে বড় কবিতা, ছোট হলে ছোট্ট করে ভেতরের পাতায় এক কলমে শেষ। চাঁদ সওদাগর যে খুব ভাল বুঝলেন ব্যপারটা তা না, আসলে তিনি ব্যবসাদার মানুষ, চাগ্রি ব্যপারটাই তার মাথায় ঢুকছিল না। আচ্ছা, যারা ফুল-পাখি নিয়ে কবিতা লেখে তারা? চন্দ্রা বলে, তারা হয় সরকারী ভবনের গার্ডেনার না হলে খবরের কাগজের কৃষির পাতায় কাব্যি করে, এই সব কবির ডিমান্ড নেই বুঝলে, নিলামেও ওঠে না। চাঁদ সওদাগর তার নিজের ব্যবসার কথা বলতেই চন্দ্রা খুব ভয় পেয়ে গেল। সওদাগরের পকেটে ছিল একটা ছোট স্যাম্পেল চাঁদ। সেটা চন্দ্রাকে দেখাতেই সে তখনই একটা সনেট লিখে ফেলল। তার পর বলল, চাঁদটা এখুনি পকেটে ঢোকাও নয়ত আমি কবিতা লিখতে লিখতে এখানেই মারা যাব। অনেক কবিতা মানে অনেক খুন, অনেক দুর্নীতি, অনেক রেপ; দেখ দেখ আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।

দুজনে মিলে ঠিক করল বাংলাদেশে চাঁদের ব্যবসা খুলবে তারা। সমস্ত শপিং মলে থাকবে তাদের আউট লেট, সেখানে থাকবে বিভিন্ন সাইজ আর শেপের চাঁদ। বাংলাদেশের মানুষ হুদাই জিনিস কেনে, একেকজন কিনবে কুড়ি-পঁচিশ পিস করে চাঁদ। ওফ খুব শিগগির বড়লোক হয়ে যাবে তারা, ইনশাল্লাহ। চন্দ্রা ঠিক করে আর সে জীবনে কোন দিনও কবিতা লিখবে না, সে হবে কোম্পানীর সিইও। চোখে কালো কাপড় বেঁধে রাখতে হবে টাইট করে, গান্ধারীর মত। খবরদার কখনও ভুলেও যেন চোখ না পড়ে কোন চাঁদে। ভুলে যেতে  হবে সব আগের কথা, মন দিয়ে এখন শুধু ব্যবসা। চাঁদের কাজ হবে সাগরপাড়ি দিয়ে নানা দেশ থেকে বিভিন্ন রঙ আর শেপের চাঁদ সংগ্রহ করে নিয়ে আসা। এখন থেকে সে শুধু বাংলাদেশের সঙ্গেই ব্যবসা করবে ঠিক করে। চন্দ্রা আপাতত তার ব্যবসার পার্টনার, ব্যবসা ভাল চললে লাইফের ও পার্টনার করে নেওয়া যাবে। ব্যবসায়ীরা সাধারণত চায় না লাভের টাকা বাইরের কারো সঙ্গে শেয়ার করতে, জানা কথা। মার্কেটিং রিসার্চ, রিটেল মানেজমেন্ট এইসব চোখা চোখা টার্ম চাঁদ সওদাগর বাপের জন্মে শোনেনি, চন্দ্রা রোজ উঠতে বসেতে শোনে, ফলে ঠিক হল বিজনেস পলিসি দাম-টাম সব চন্দ্রাই ঠিক করবে। চন্দ্রা বিজনেস পলিসি তৈরি করে দিল সব চাঁদ ছোট ছোট টুকরো করে ফেলা হবে। দামও থাকবে কম, যে রিক্সা চালায় সে যাতে দিনের শেষে আট-দশটা করে কিনতে পারে। সওদাগর এটুকু বুঝল বেশি বিক্রি মানে বেশি টাকা। সে চন্দ্রাকে ভালবেসে ফেলল।

তারা টিভি-কাগজে বিজ্ঞাপন না দিয়ে রাতের অন্ধকারে একটা বড় সাইজের চাঁদের গায়ে মোবাইল নম্বর লিখে কবির হাটের পাশে সারাদিনসর্দি উদ্যানে একটা লম্বা গাছে সেটা টানিয়ে রাখল। সারাদিনসর্দি উদ্যানটা ছিল সারাদিনই স্যাতস্যাতে আর অন্ধকার নেশাড়ুদের একটা ঠেক, চাঁদের ডিসপ্লের পক্ষে আদর্শ। চাঁদের আলো শুধু কবির হাটে নয় গোটা বাংলাদেশেই ছড়িয়ে পড়ল। আলো দ্রুতগামী, কিন্তু এইসব খবর বোধহয় আরো দ্রুতগামী। মৌলভীরা পড়লেন ধন্ধে। রমজানের সবে বাইশটা রোজা পার হয়েছে, এর মধ্যে একটা ফুল সাইজের চাঁদ। ভাবলেও গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। দেশের লোক ছোটাছুটি করতে লাগল নতুন কোন বিপদের আশঙ্কায়। রাতারাতি শহর খালি। মোবাইল নেটওয়ার্ক সমস্ত জ্যাম। চাঁদ সওদাগর নিজের জাহাজ মধুকরে ঘুমিয়ে রইলেন জানতেও পারলেন না তার চাঁদ রাতারাতি গোটা শহরই বদলে দিয়েছে। চন্দ্রা কিছুতেই সওদাগরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারল না। গোটা শহর জুড়ে তখন মহামারীর আশঙ্কা আর দেশে ফেরার ধুম। ঈদে নিশ্চয় দেশে ফিরবে সবাই, কিন্তু এতটা এগিয়ে আশায় সবাই দে দৌড়। চাঁদ দেখা কমিটি পড়ল বিপদে। গণণা করে কুল পেল না তারা। সামনে একটা জলজ্যান্ত চকচকে চাঁদ, অস্বীকার করাটাও তো মূর্খামি। আবার এতগুলো রোজা কম মানে ইস সোয়াব প্রচুর কমে যাচ্ছে! সমস্ত ব্যবসাদারের মাথায় হাত, সবে ঈদের বিক্রি শুরু হব হব করছিল। এ পুরো বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত। দেখতে দেখতে শহর খালি হয়ে গেল। চন্দ্রাও পরিবারের সকলের সঙ্গে চলে গেল দেশের বাড়ি নড়াইলে। প্রলয়ের আশঙ্কা বা আগাম ঈদের ব্যবস্থা করতে সবাই ট্রেন ও বাসের মাথায় চেপে ও ঝুলতে ঝুলতে যে যার দেশের বাড়ি চলে গেল।

সওদাগর বেচারা এইসবের কিছুই জানে না তার না আছে টেলিভিশন না আছে মোবাইল ফোন। দিনের বেলা মধুকরের জানালা বন্ধ করে সে সমস্ত চাঁদ ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করেছে প্ল্যান মাফিক। সন্ধ্যেবেলা কবিরহাটে চন্দ্রার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা, তাকে গীফট করার জন্য একটা গোল দেখে চাঁদ বেছে পকেটে রেখেছে সে। আর কবির হাটে আসার পথে কিনেছে একটা ঘন কালো-কাঁচের চশমা, চোখের অপারেশনের পর যেগুলো মানুষে ব্যবহার করে, এমনকি নিজে টেস্ট করে দেখেছে তাতে এক ফোঁটা আলো দেখা যায় না। সে এগোয় কবিরহাটের দিকে। রাস্তাঘাট অদ্ভূত খালি। তাদের মানুষ চাই, অনেক মানুষ মানে অনেক কঞ্জিউমার, কালকেই বুঝিয়েছে চন্দ্রা, কালকেই প্ল্যান হল মসজিদের হুজুর দিয়ে দিয়ে বিজ্ঞাপন দিতে হবে। আরো আরো বাচ্চা চাই দেশে, বাডিং কাস্টমার, বুঝাইতে হবে- সন্তান আল্লার দান, আটকাইতে নাই। কবিরহাটও প্রায় জনশূন্য। কেবল দুই এক পিস মাতাল, বিধর্মী আর পুলিশ। চাঁদ সওদাগর সারারাত চাঁদের তলায় বসে কাটিয়ে দিলেন। কেউ এল না চাঁদের খোঁজে, চন্দ্রাও এল না। একদিন গেল দুই দিন গেল সওদাগর চন্দ্রার জন্য পাগল হয়ে গেলেন, দিন যায় কিন্তু চন্দ্রা আর আসে না। উড়ো খবর আসে চন্দ্রাও নাকি পাগল হয়ে ঘোরে নড়াইলের নানা কবিগানের আসরে। সারাক্ষণ চাঁদ দেখে আর কবিতা আউড়ায়। এই ক-বছরে সে ঘুমাইনি এতটুকু। আর এদিকে সওদাগর কবিরহাটে নাওয়া খাওয়া ছেড়ে চাঁদের তলায় পড়ে থাকেন দিনরাত। ছিনতাইবাজেরা সুযোগবুঝে চুরি করে নিল চাঁদ ভর্তি মধুকর ডিঙা। চাঁদ সওদাগরের কি আর সে হুঁশ আছে। চেহারা হয়েছে একখানা! চুলে জটা, মুখে ইয়া ইয়া গোঁফ-দাড়ি, চোখে সেই কালো চশমা যাতে আলো ঢোকেনা এক ফোঁটাও। তবু সে শুধু পথের দিকে চেয়ে থাকে, আজ এত বছর পরও অপেক্ষা করে চন্দ্রার ফিরে আসার। মোবাইল নম্বর লেখা সেই চাঁদটা কেউ আর নামায় নি। সারাদিনসর্দি উদ্যানে গাছপালা কেটে ফেলায় এখন বেশ আলো, দিনের বেলা আর সহসা টের পাওয়া যায়না চাঁদটা। ভার্সিটির পোলাপানেরা দুই বেলা চাঁদের ওপর পা ঝুলিয়ে বসে বিড়ি ফোঁকে আর তাদের সই সাবুদ রেখে যায় চাঁদের বুকে। চাঁদের গায়ে জেগে থাকে বাঘবন্দীর খোপ, তারেক+হাসিনা টাইপের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, নতুন শেখা গালাগালি ও দু এক কলি কবিতা, এইসব কালির দাগে চাঁদ আরো হয়ে পড়েছে নিষ্প্রভ, দাগগুলো সব ফুটে থাকে কলঙ্কের মত।








Untitled Document
Total Visitor : 708978
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :