Untitled Document
ভাদ্র সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
বর্ণ বিচিত্রা
-শ্রী প্রভাত রঞ্জন সরকার
খেজুর

তালীবর্গের অন্যতম গাছ হচ্ছে খেজুর। সংস্কৃত ‘খর্জুর’ শব্দ থেকে বাংলায় তদ্ভব শব্দ খাজুর বা খেজুর এসেছে। খেজুর গাছের সঙ্গে ভারত ও মধ্য এশিয়ার লোকেরা দীর্ঘকাল থেকেই পরিচিত। তাই বৈদিক ও লৌকিক সংস্কৃত দুইয়েতেই ‘খর্জুর’ রয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নানান প্রজাতির খেজুর আছে। ভারতীয় বা ইন্ডিকা প্রজাতির খেজুরেরও মোটামুটি চারটি শাখা আছে- ১) গাঙ্গেয় (গ্যাঞ্জালাইটিস্), ২) রাজস্থানী, ৩) গুজরাতী, ৪) দক্ষিণী (ডেকানাইটিস)। এদের মধ্যে স্বাদে-গুণে গুজরাতী খেজুর সর্বোৎকৃষ্ট। রাজস্থানী খেজুরও উন্নত মানের। দক্ষিণী খেজুর সাধারণ মানের আর গাঙ্গেয় খেজুরের আঁটির (সংস্কৃত ‘অস্থি’ শব্দ থেকে প্রাকৃতে ‘অ্টঠি’ শব্দ এসেছে। তার থেকে বাংলায় ‘আঁটি’ ও ‘আঠি’ দুই চলতে পারে।) গায়ের খোলা (আগেই বলেছি- কলকাতার বাংলায় আমরা ‘খোসা’ শব্দ ব্যবহার করি না। তবে বাঙলায় স্বীকৃত রীতি হচ্ছে- আবরণটা কঠোর হলে তাকে বলা হয় খোলা আর নরম হলে বলা হয় খোসা। যেমন নারকোলের খোলা কিন্তু আঁবের খোসা। কলকাতার বাংলায় দুটোকেই খোলা বলা হয়) লেপ্টে থাকে। অর্থাৎ শাঁস বলতে বিশেষ কিছু নেই। কিন্তু এই গ্যাঞ্জোলাইটিস প্রজাতির খেজুরের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গাছগুলো একেবারে রসে টইটম্বুর। এই গাছগুলি থেকে প্রচুর পরিমাণে তাড়ি ও রস উৎপন্ন হয়ে থাকে। এখানেও সেই তালগুড়ের মত ব্যাপার। সাধারণতঃ বৈষ্ণব ও মুসলমানেরা তাড়ি খান না। তাই তারা খেজুরের রস থেকে গুড় তৈরি করতে উৎসাহী। খেজুর গুড়ের মিষ্টতা ইক্ষু গুড়ের (বাংলায় ইক্ষু থেকে ‘আখ’ ও কুশেরিকা থেকে ‘কুশিয়ার’ শব্দ এসেছে। দুটোই সংস্কৃতজাত তদ্ভব) চেয়ে তো কমই, তাল গুড়ের চেয়েও কম। কিন্তু স্বাদে গন্ধে মনোরম। গুণের দিক দিয়ে তালগুড়ের চেয়ে কম হলেও কেবলমাত্র শীতকালীন পণ্য বলে গণ্য হলেও এর আকর্ষণ অপ্রতিরোধ্য। এছাড়া খেজুর গাছের একটা মহা সুবিধা হচ্চে এই যে তাল বা নারকোলের মত এর কান্দি থেকে রস বের করতে হয় না। গা চেছে রস বের করতে হয়। তাই তাল ও নারকোলের কেবল পুরুষ ও স্ত্রী গাছেই কান্দি হয় আর তা থেকেই রস পাওয়া যায়। আর বন্ধ্যা গাছে কান্দি না থাকায় রস পাওয়া যায় না। কিন্তু খেজুরের গা চেছে রস পাওয়া যায় বলে বন্ধ্যা গাছ থেকেও রস পাওয়া যায়।
খেজুরের রস ও গুড় গরম হাওয়া সহ্য করতে পারে না বলে এর রস টানা ও গুড় তৈরী করা শীতকালেই সম্ভব। কিন্তু গা চেছে রস পাওয়ার একটা কুফল এই যে মানুষ অতি লোভে গাছের স্বাস্থ্যের কথা না ভেবে যত পারে রস নিতে থাকে। তার ফলে গাছের অকালমুত্যু তো হয়ই, যারা বেচে থাকে তারাও ফল দিতে পারে না। দিলেও তা নিকৃষ্টমানের দিয়ে থাকে। খেজুর গাছগুলোকে এই সর্বনাশা লোভের হাত থেকে বাচাবার জন্যে এই সম্পর্কে আইনগত বা সমাজগত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
খেজুরের তাজা রস কৃমি ব্যাধির, লিভারের ব্যাধির, শোথ রোগের ও মূত্রস্তম্ভের ঔষধ। এই রস গেজে গেলে তাড়ি হয়। শুদ্ধ বৈয়াকরণিক বিচারে এই গেজানো রসকে ‘তাড়ি’ না বলে ‘খর্জুরী’ বলা সঙ্গত কারণ তাড়ি তো হবে তাল থেকে।
ভারত বিভাগের আগে বাঙলার অবিভক্ত নদীয় জেলাতেই (বর্ত্তমানে পশ্চিম বাঙলার নদীয়া জেলা, বাংলা দেশের কুষ্ঠিয়া জেলা ও অবিভক্ত চুয়াডাঙ্গা মহকুমার জীবননগর থানায়) খেজুর গাছের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশী। কিন্তু খেজুরের উৎপাদন হত বেশী যশোর জেলায়। আর খেজুর গুড়ের সবচেয়ে বড় মোকাম ছিল যশোরের কোর্টচাদপুর। বর্ত্তমান ভারতে খেজুর গুড় সবচেয়ে বেশী উৎপন্ন হয় ২৪ পরগণা, তার পরেই বাকুড়া জেলায়।



Untitled Document
Total Visitor : 708942
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :