Untitled Document
ভাদ্র সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
আমার দেখা চলচ্চিত্র
চলচ্চিত্রে এমিল এবং এমিলের চলচ্চিত্র


‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য একটি খবর। খবর, কারণ এটিই সরকারী অনুদানের প্রথম ছবি যা ঢাকায় মুক্তি পেল। ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ সেই ঊনআশির শেষে নাটোরে মুক্তি পেয়ে, দুটো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়ে আশিতে ঢাকায় মুক্তি পেয়েছে। এই দুটো ছবিই চলচ্চিত্র সংসদ কর্মীদের তোলা। এবং বলাবাহুল্য ভালো ছবি নির্মাণের ক্ষমতা যে তারা রাখেন সেটাও প্রমাণিত হল এই দুটো ছবিতে। যদিও আলমগীর কবির এই সত্যটাকে আরও আগেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
এদেশে প্রথমবারের মতো যখন সুস্থ চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার প্রেক্ষিতে অনুদানপ্রথা চালু হল, তখন যে কজন চিত্রনাট্যের যোগ্যতা বিচারে এই অনুদানের আনুকূল্য পেলেন তাদের মধ্যে ছিলেন বেবী ইসলাম, কবীর আনোয়ার, বাদল রহমান এবং যৌথভাবে মসিহউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলী। এবং পরবর্তী বছরের আর্থিক অনুদানের ক্ষেত্রে সুভাষ দত্তকে প্রথম অগ্রাধিকার দেয়া হবে এই আশ্বাসের সূত্রে তিনি নির্মাণ শুরু করলেন ‘ডুমুরের ফুল’। অতঃপর সরকারী অনুদানপ্রাপ্ত ছবিগুলো নির্মাণের পূর্বেই সুভাষ দত্ত সরকারী অনুদান লাভে ব্যর্থ হন। কারণ ইতিমধ্যে সরকারের অনুদাননীতিই বদলে গেছে।
‘ডুমুরের ফুল’-কে অনেকাংশে শিশু ও কিশোর চলচ্চিত্র বলে আখ্যায়িত করা চলে। প্রাণবন্ত শিশু-কিশোরদের অভিনয়সমৃদ্ধ এ ছবিটিতে সুন্দর একটা বক্তব্য ছিল। কিন্তু ছিল না সম্পূর্ণ চলচ্চিত্রগুণ।
সেক্ষেত্রে বাদল রহমানের ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’ সম্পূর্ণ অর্থেই একটি শিশু ও কিশোর চলচ্চিত্র। এতে কোনো বক্তব্য থাকলেও তা অত্যন্ত অষ্পষ্ট। তবে ছবিটি সম্পূর্ণ অর্থেই একটি ‘চলচ্চিত্র’।
সেই তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে একবার শিশুদের জন্য একটি ছবি তোলা হয়েছিল – ‘প্রেসিডেন্ট’। তারপর এই স্বাধীন বাংলাদেশে শিশু-কিশোরদের প্রতি ভালবাসার দুঃসাহসী কাজটি করলেন বাদল রহমান ‘এমিল’-কে দিয়ে, যে এমিল উচ্চারণ করে “আমার বাবাকে রাজাকাররা মুক্তিযুদ্ধের সময় মেরে ফেলেছে।” এবং ছবির একটি দৃশ্যে দেখা যায় রাজাকাররা এমিলের বাবাকে গুলি করে মারছে। গুলিবিদ্ধ এমিলের বাবা হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মুখ থুবড়ে পড়ে যান। ক্যামেরা ধরে রাখে তার ছিটকে পড়া চশমা। আমাদের চিন্তায় মুহূর্তেই দৃশ্যমান হয় ‘ব্যাটলশিপ পটেমকিনে’র সেই অবিস্মরণীয় ওডেসা-সিঁড়ি দৃশ্যমালা। চলচ্চিত্রকারের এই অবচেতন অনুকৃতি প্রকারান্তরে আমাদের সর্বদেশে সর্বকালের স্বৈরাচারী শাসকদের সমান্তরাল অত্যাচারের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
এরিখ কাস্টনারের মূল জার্মান গল্প-কাহিনী অবলম্বনে রচিত হয়েছে ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’র চিত্রনাট্য। খেলাঘরের ‘মুক্ত পাখীকে বন্দী করো না’ শীর্ষক রচনা প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে খুলনার ছেলে এমিল ঢাকায় পুরস্কার নিতে আসতে গিয়ে পথে কিছু টাকা হারিয়ে ফেলে এবং সেই সন্দেহে একটি লোকের পিছু নিয়ে ঢাকায় এসে আরও একগুচ্ছ ছেলেমেয়েকে সঙ্গে নিয়ে রীতিমত একটি গোয়েন্দা বাহিনী গড়ে তোলে। এই ক্ষুদে গোয়েন্দা বাহিনীর কাণ্ডকারখানা নিয়েই ছবি।
এরিখ কাস্টনারের এই গল্প (যে গল্প নিয়ে কলকাতায়ও ‘দেড়শ খোকার কাণ্ড’ নামে একটি ছবি হয়ে গেছে) বাদল রহমানকে কি কারণে আকৃষ্ট করলো বোঝা মুশকিল। আমাদের এদেশের শিশু-সাহিত্য যথেষ্ট সমৃদ্ধ না হলেও এর চাইতে মজার এবং বক্তব্যপূর্ণ ছবি করার মত কাহিনী হয়তো অবশিষ্ট ছিল। অবশ্য এই গল্প নির্বাচনের ব্যাপারটি একান্তই চলচ্চিত্রকারের ইচ্ছাগত ব্যাপার যদিও, তথাপি যেহেতু শিশু-চলচ্চিত্র সেহেতু ছবির পরিণতিতে এর ‘উদ্দেশ্য’ নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায়। তাছাড়া এদেশের শিশু-সাহিত্যের সঙ্গে চলচ্চিত্রের যোগাযোগ ঘটানোর প্রয়োজনীয় কাজটাও তিনি করতে পারতেন।
পুনা ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে বাদল রহমান মূলত চলচ্চিত্রে সম্পাদনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছেন। কিন্তু ছবিটিতে এই সম্পাদনার অভাবটাই প্রকটভাবে অনুভূত হল। মনে হয়েছে চলচ্চিত্রকারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাদল রহমান সম্পাদকের দায়িত্বটাই ভুলে বসেছিলেন। অথচ ছবিটি সুসম্পাদিত হলে চিত্রনাট্যের সমস্ত ত্রুটি সত্ত্বেও এত ধীরগতির হতো না এবং আরও কিছুটা উপভোগ্য হতে পারতো। তাই কিছু কিছু অসঙ্গতির সঙ্গে যখন শব্দগ্রহণের ত্রুটিও এসে যুক্ত হয় তখন বিরক্তির অবশেষ থাকে না।
তবে ছবিটা যেভাবে শুরু হয়েছিল- সেই সুচিন্তিত টাইটেল থেকে শুরু করে বিশাল ক্যানভ্যাসে প্রাচীন ভাস্কর্যের পটভূমিতে এমিলের প্রাতঃভ্রমণ, চিন্তার মধ্যে খুনির বিভৎস মুখাবয়ব, স্বপ্নের মধ্যে পুলিশের তাড়া করা এবং সর্বক্ষণের ইচ্ছার মুক্তির আকুলতা – এইসব ছবিটির পরিপূর্ণ পরিণতির প্রতি আমাদের আশাকে ধাবিত করেছিল। কিন্তু তার পুরোটা সম্পূর্ণ হল না এই যা দুঃখ।
কিন্তু যা পেলাম তা-ইবা কম কি!
‘এমিল’-কে দিয়ে সুস্থ চলচ্চিত্র নির্মাণ আন্দোলনে বাদল রহমানের যে কৃতিত্ব তার দায়ভাগ চলচ্চিত্র গ্রাহক আনোয়ার হোসেনেরও। এই প্রথম বাংলাদেশের একটি ছবিতে রঙিন চিত্রগ্রহণের কাজ এত পরিচ্ছন্ন এবং দৃষ্টি সুখকর। ছবির সর্বত্র কোথায় যেন একটা স্নিগ্ধতার আমেজ ছিল। তদুপরি চলচ্চিত্রকারের চিন্তাকে ক্যামেরা কখনই অস্বীকার করেনি, বরঞ্চ সে চিন্তাকে আরও শিল্পশ্রী করে তুলেছে। ছবিটিকে বক্তব্য কিংবা অভিনয় সমৃদ্ধ না বলে চলচ্চিত্রভাষাসমৃদ্ধ বলা হয়েছে এ কারণে।
সর্বোপরি যে কথাটি অবশ্যই বলবার তা হচ্ছে সরকারী অনুদানপ্রাপ্ত বাংলাদেশের এই শিশু চলচ্চিত্রটি বহু আবেদন-নিবেদন সত্ত্বেও কি কারণে করমুক্ত হল না সেটাও আর বিস্ময়! ভবিষ্যতের এমিলেরা নিশ্চয়ই এর কৈফিয়ত চাইবে।
গণসাহিত্য
ফেব্রুয়ারি ১৯৮১
 




Untitled Document
Total Visitor : 708542
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :