Untitled Document
ভাদ্র সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
   বিদেশী রূপকথা : পাখি
  কমিকস্ : টিনটিন

ছড়াঃ চারু প্রজাপতি
জোড়া সাপ
- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

সেবার আমি বেড়াতে গিয়েছিলাম কাশীতে, আমার ছোট মাসীর বাড়িতে। আমার ছোট মেসোর বদলির চাকরি, সেই জন্য আমার খুব মজা হয়েছিল। ছোটো মেসো এক একটা নতুন জায়গায় বদলি হয়ে যান, আর আমি অমনি সেখানে বেড়াতে যাই। এইভাবে আমার মুসৌরী, দেরাদুন, পুনা, তেজপুর, বিশাখাপত্তন- এই সব ভালো ভালো জায়গা দেখা হয়ে গিয়েছিল।
আমার ছোট মেসোকে আসলে বলা উচিত বিরাট মেসো। কারণ তাঁর চেহারাটা ঠিক ভীমের মতন। তেমনি বাজখাঁই তাঁর গলার আওয়াজ, আর সাহসও সাঙ্ঘাতিক। কেউ ভয়ে তাঁর সঙ্গে দ্বিতীয়বার শেকহ্যান্ড করে না। তিনি এমন বজ্রমুষ্টিতে হাত চেপে ধরেন যে তারপর তিন দিন ব্যাথা থাকে। আমার ছোট মাসী আবার তেমনি ভীতু। টিকটিকি, আরশোলা কিংবা মাকড়সা দেখলেই ছোট মাসী প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়েন। অবশ্য আমার সেই বিরাট মেসোও যে পৃথিবীতে একটা জিনিসকে খুব ভয় পান, তার প্রমাণ পেয়েছিলাম সেবার কাশীতে।
ছোট মাসীরা বাড়ি নিয়েছিলেন বেনারস স্টেশনের উল্টো দিকে একটা নতুন পাড়ায়। পাড়াটা সবে তৈরি হচ্ছে। মাঠের মধ্যে মধ্যে উঠছে নতুন বাড়ি। মাঠগুলো ঝোপ-ঝাড়ে ভরা, খুব বড় বড় ইঁদুর আছে সেইসব মাঠে। এক একটা ইঁদুরের অন্তত দু’কিলো তিন কিলো ওজন হবে।
কাশীতে বড্ড ফেরিওয়ালার উৎপাত। সারা দিনে কতরকম ফেরিওয়ালা যে আসে, তার ঠিক নেই। কাঁচের চুড়ি, ছাগলের দুধ, লুধিয়ানার কম্বল, পুরোনো ঘি, কাঠের পুতুল, আচার এসব নানারকম জিনিস বিক্রি করতে ফেরিওয়ালা আসে। এ ছাড়া বাঁদরের নাচ, ভালুকের নাচ দেখাবার লোক আছে।
একদিন এল একটি মেয়ে সাপুড়ে। এর আগে আমি কখনো মেয়ে সাপুড়ে দেখিনি। বেশ গাঁট্টগোঁট্টা চেহারার মাঝ বয়সী একজন মেয়ে, সঙ্গে গেরুয়া রঙের কাপড়ে মোড়া তিনটে সাপ ভর্তি ঝোলা, আর সেই মাঝখানটা বেলুনের মতন ফোলানো বাঁশী। সেই বাঁশী সে অনেকক্ষণ ধরে বাজালো আমাদের বাড়ির সামনে। তারপর বললো, ‘সাপ খেলা দেখবে গো! এ বাঙালী মাইজী!’
আমরা যে বাঙালী, সে কথা কী করে বুঝলো কে জানে! বোধ হয় চিংড়ি মাছ রান্নার গন্ধ পেয়েছিল!
ছোট মাসী বারান্দায় বেরিয়ে এসে মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন, ‘না দেখবো না! পরশুই ত একজন সাপুড়ে এসে খেলা দেখিয়ে গেল! আমরা কি রোজ বাঁদরের নাচ, ভাল্লুকের নাচ আর সাপের নাচ দেখবো নাকি!’
মেয়ে সাপুড়েটি অনেক কাকুতি মিনতি করলো, কিন্তু মন গললো না ছোট মাসীর!
তখন সাপুড়েনী বললো, ‘বড় তিয়াস লেগেছে, এক বর্তন পানি দেবে মাইজী?’
কেউ জল চাইলে না বলা যায় না! ছোট মাসী জল আনতে গেলেন আর সাপুড়েনীটি তার ঝাঁপিগুলো নামিয়ে আমাদের বারান্দায় এসে বসলো!
ছোট মাসী এক জগ জল এনে দিলেন। সাপুড়েনী জগটা মুখের কাছে উঁচু করে ধরে ঢক ঢক করে প্রায় আদ্ধেকটা জল খেয়ে নিল। তারপর ঝাঁপিগুলোর মুখ খুলে সাপগুলোর গায়ে ছিটিয়ে দিল খানিকটা। অমনি একটা হলদে কালো ডোরাকাটা সরু সাপ সুরুৎ করে বেরিয়ে এসে মেঝের ওপর কিলবিল করতে লাগলো! ছোট মাসী ভয় পেয়ে দরজার আড়ালে লুকিয়ে পড়ে চ্যাঁচাতে লাগলেন, ‘শিগগির ওটাকে তুলে নিতে বল। শিগগির ওকে বিদায় কর।’
সত্যি কথা বলতে কি, অত কাছে একটা সাপ দেখে আমারও একটু একটু ভয় করছিল, একমাত্র ভয় পেলো না ছোট মাসীর দেড় বছরের ছেলে বাবলু। সে খলখল করে হেসে বলতে লাগলো, ‘সাপ ধরবো! সাপ ধরবো!’
বাজারের মাছওয়ালারা যেমনভাবে সিঙ্গিমাছ ধরে, সাপুড়েনী সেই রকম অবহেলার সঙ্গে সাপটার মাথা চেপে ধরে সেটাকে আবার ঝাঁপিতে পুরে দিল। তারপর উটেরা যেমন ভাবে গন্ধ শোঁকে সেই রকমভাবে ঠোঁট আর নাক কুঁচকে রেখে বললো, ‘মাইজী তুমহার কোঠীর পাশে মাঠে সাঁপ আছে, পাঁচটা রুপিয়া দো, সাঁপ ধরে দেবো।’
ছোট মাসী খিল খিল করে হেসে উঠলেন। আমিও হাসলাম। এ বাড়ির চাকর শুকদেও-ও হাসলো। কারণ, ঠিক দু’দিন আগেই আমাদের উল্টোদিকের বাড়িতে সাপ খেলা দেখাতে এসে একজন সাপুড়ে ঠিক এই কথা বলেছিল। আর মাত্র দু’টাকা চেয়ে সে বাড়ির সিঁড়ির তলা থেকে দুটো সাপ ধরে দিয়েছিল। ঐ সব সাপুড়েরা মুনমেন্টের মাথা থেকেও যখন তখন সাপ ধরে দিতে পারে। উল্টোদিকের বারান্দা থেকে আমরা স্পষ্ট দেখেছিলাম, সাপুড়েটার আলখাল্লার নীচে কোমরে জড়ানো ছিল দুটো সাপ; সেই দুটোই খুব কায়দা বার করলো, ম্যাজিশিয়ানরা যেভাবে টুপীর ভেতর থেকে খরগোশ বার করে।
আমাদের সকলের এক সঙ্গে হাসি শুনে সাপুড়েনীটি একটু ঘাবড়ে গেল বোধহয়। আর বেশী উচ্চবাচ্চ্য করলো না। ঝাঁপিগুলো তুলে নিয়ে চলে গেলে। ছোট মাসী বারান্দাটা ফিনাইল দিয়ে ভালো করে ধুয়ে ফেললেন।
খানিকটা দূরে বেশ কিছুক্ষণ পেট-ফোলানো বাঁশীটার আওয়াজ শোনা গেল; বোধহয় সাপুড়েনী আর কোনো বাড়িতে খেলা দেখাবার সুযোগ পেয়েছে।
পরের রবিবারে ছোট মেসো আমাদের সারনাথ ঘুরিয়ে নিয়ে এলেন। ফিরতে ফিরতে সন্ধে হয়ে গেল। তারপর ছোট মাসীর শোবার ঘরে বসে আমরা চা খাচ্ছি, রেকর্ড প্লেয়ারে ওস্তাদ গুলাম আলী খাঁর গান বাজছে এমন সময় হঠাৎ আলো নিভে গেল আর গুলাম আলীর গলাটা বিশ্রী মোটা হয়ে থেমে গেল।
আমরা কলকাতার ছেলেরা যখন তখন আলো নিভে গেলে আর অবাক হই না। ছোট মাসী বললেন, ‘দূর ছাই’! ছোট মেসো বললেন, ‘এই শুরু হল জ্বালাতন!’
কারুরই অবশ্য মোমবাতি খোঁজবার উৎসাহ হল না! সেদিন পাতলা পাতলা জোৎস্না ছিল। জানালা দিয়ে তার একটু আলো এসে পড়েছে। আমরা সেই আবছা অন্ধকারেই বসে বসে চা খেতে লাগলাম। অন্ধকারে আর যাই অসুবিধা হোক, খাবার খেতে কোন অসুবিধা হয় না। হাতের বিস্কুটটা ঠিক মুখেই চলে আসে, সেটা আমরা ভুল করে কানে গুঁজে দিই না।
তিনজনে মিলে নানা রকম গল্প করছিলাম। এক সময় আমার চোখে পড়লো মেঝেতে কী যেন চকচক করছে। মনে হল খানিকটা জল পড়ে আছে, তার ওপর এসে পড়েছে চাঁদের আলো। এখানে জল এল কি করে? তারপর মনে হল, জলটা যেন নড়ছে। তারপর আর কিছুই মনে হল না, আমি লাফিয়ে উঠে বললাম, ‘সাপ!’
আমি ছোট মাসীকে ভয় দেখাবার জন্য অনেক সময় মিছিমিছি বলি, ‘ছোট মাসীর, তোমার পায়ের কাছে একটা আরশোলা!’ ছোট মাসী সেইরকমই কিছু একটা ভেবে চেয়ারেই বসে রইলেন। ছোট মেসো স্প্রিংয়ের মতন উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘সাপ? কোথায়?’
‘ঐ যে সামনেই।’
একথা বলেই আমি ছোট মাসীর হাত ধরে ঝটকা টান মেরে ছুটলাম। আমি আর ছোট মাসী চলে এলাম বসবার ঘরে। আর শোবার ঘরের পেছনে একটা ছোট ঘরে গিয়ে ঢুকলেন ছোট মেসো। দড়াম করে বন্ধ করে দিলেন দরজা। ততক্ষণে আমরা সাপটার দু’বার ফোঁস ফোঁস আওয়াজ শুনতে পেয়েছি।
দারুণ ভয় পেয়ে ছোট মাসী ধপাস করে সোফার ওপর বসে পড়তে যাচ্ছিলেন, বোধহয় অজ্ঞান হয়েই যেতেন, কিন্তু তক্ষুণি আবার উঠে চিৎকার করে বললেন, ‘বাবলু! বাবলু রয়েছে যে ঘরের মধ্যে।’
সত্যিই ত! সারনাথ থেকে ফেরবার পথেই বাবলু ঘুমিয়ে পড়েছিল। তাকে কোলে করে এনে শুইয়ে দেওয়া হয়েছিল খাটে। বাবলু ত সেখানেই ঘুমিয়ে রয়েছে!
এরপর দেখলাম, ছোট মাসী আর ছোট মেসোর একদম উল্টো ব্যবহার। দারুণ সাহসী ছোট মেসো ঘরের দরজা আর খুললেনই না, সেখান থেকে চেঁচিয়ে বললেন, ‘কী হল? সাপটা গেছে? কত বড় সাপ?’
আর যে ছোট মাসী আরশোলা দেখলেই মূর্ছা যান, তিনি তক্ষুনি ছুটে আবার সেই সাপের ধরে ঢুকতে যাচ্ছিলেন। আমি ছোট মাসীর হাত চেপে ধরলাম। বিছানার ওপর ঘুমিয়ে থাকা বাবলুকে হয়ত সাপটা না কামড়াতেও পারে, কিন্তু ছোট মাসী ঘরের মধ্যে ঢুকলে নির্ঘাৎ কামড়াবে।
আমাদের চ্যাঁচ্যামেচি শুনে শুকদেও ছুটে এল আর সে চট করে একটা টর্চ জোগাড় করে ফেলল। টর্চের আলোটা যাতে সে সাপটার মুখের ওপর না ফেলে তাই আমি টর্চটা হাত থেকে নিয়ে নিলাম। যতদূর জানি সাপ কানে শুনতে পায় না- তাই আমাদের চিৎকার সে গ্রাহ্য করতে নাও পারে, কিন্তু চোখে আলো ফেললে নিশ্চয়ই রেগে যাবে। আলোটা একটু তেরছা ভাবে ফেলে দেখলাম, সাপটা একটা বিরাট ফণা তুলে লেজের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছে আর এদিক ওদিক মুখ ঘোরাচ্ছে। সাপটা অন্তত চার হাত লম্বা, মাঝে মাঝে জিভ বার করছে চিরিক চিরিক করে। দেখলেই বুকের রক্ত হিম হয়ে আসে।
ছোট মাসী চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘সুনীল, শিগগির সাপটাকে মার।’
কিন্তু বললেই কি আর অতবড় সাপটাকে মারা যায়? কাছে এগোলেই যদি লাফিয়ে এসে কামড়ায়? সত্যি কথা বলতে কি, ভয়ে আমার বুক কাঁপছিল। আমি বাঘ, ভাল্লুক, ভূতের চেয়ে সাপকে বেশী ভয় পাই। তবু ঘরের মধ্যে বাবলু রয়েছে, একটা কিছু করতেই হবে।
আমি বললাম, ‘শুকদেও, লাঠি কোথায়, লাঠি?’
শুকদেও দৌড়ে গিয়ে একটা ডান্ডা নিয়ে এল।
সাপটা কী করে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে জানি না। কিন্তু এখন সে বেশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে মনে হয়। সাপেরা সিমেন্টের মেঝে পছন্দ করে না। ফণা তোলা অবস্থায় একটু খানি চলতে গিয়েই চটাং চটাং করে পড়ে যাচ্ছে। তাতে রেগে উঠে আরও বড় ফণা তুলছে।
সাপটাকে তক্ষুনি মারবার বদলে, ওটা যদি কোনো রকমে ঘর থেকে বেরিয়ে যেত, তাহলে আমরা বাঁচতুম। কিন্তু সাপটা একটা উল্টো কাজ করলো। সেটা আমাদের দিকেই খানিকটা এসে একটা দরজার পাশে লুকিয়ে পড়লো। চৌকাঠের সঙ্গে লেগে থাকা খানিকটা লেজ আমরা তখনো দেখতে পাচ্ছি। সর্বনাশ, এবার ত আমরা ঘরেও ঢুকতে পারবো না। বাবলু যদি ঘুম ভেঙে হঠাৎ খাট থেকে নেমে আসে!
ওপাশের বন্ধ ঘর থেকে ছোট মেসো আবার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী হল, সাপটা গেছে?’
ছোট মাসী বললেন, ‘না! তুমি বেরিয়ো না একদম।’
ছোট মাসী তারপর আরও সব অসীম সাহসিক কাজ করতে লাগলেন। রান্নাঘর থেকে কেরোসিনের টিনটা এনে প্রায় দরজার চৌকাঠ পর্যন্ত এগিয়ে অনেকখানি কেরোসিন ছিটিয়ে দিলেন ঘরের মধ্যে। তারপর একগাদা খবরের কাগজ পাকিয়ে তাতে কেরোসিন ঢেলে রান্নাঘরের উনুনে ছুঁইয়ে আগুন জ্বেলে আনলেন। তারপর সেই খবরের কাগজের মশালটা ছুঁড়ে দিলেন সাপটার গায়ে। গায়ে আগুন লাগতেই সাপটা দরজার পাশ থেকে বেরিয়ে আবার ফণা তুললো আর সেই আগুনে ঘরের মধ্যে কেরোসিনও জ্বলে উঠলো দাউ দাউ করে।
ছোট মাসীর উপস্থিত বুদ্ধি সাঙ্ঘাতিক বলতে হবে। ঘরের মধ্যে আগুন জ্বলছে বলে সাপটা আর ঘরের মধ্যে গেল না, চৌকাঠের সামনে কিলবিল করতে লাগলো।
এই সময় এই হট্টগোলে বাবলু জেগে উঠলো। ডেকে উঠলো, ‘মা-’
ছোট মাসী প্রায় পাগলের মতন হয়ে গিয়ে কেঁদে চিৎকার করে বললেন, ‘বাবলু, বাবলু খাট থেকে নামিস না-’
সেই সময় শুকদেও সাপটার গায়ে একটা ডান্ডা কষালো।
কিন্তু লাঠি দিয়ে সাপ মারা খুব সোজা কথা নয়। মারটা খেয়ে সাপটার বিশেষ কিছু হল না, সে চৌকাঠ ছাড়িয়ে এগিয়ে এল আমাদের দিকে। সাপ দারুণ জোরে ছুটতে পারে এক এক সময়, কিংবা লাফাতেও পারে। সেই মুহূর্তে সাপটা আমাদের একজনকে ছোবল মারতে পারতো। কিন্তু শুকদেও তক্ষুনি তার ডান্ডা দিয়ে সাপটাকে মেঝের সঙ্গে চেপে ধরলো।
তখন দেখলাম শুকদেও’র কী দারুণ সাহস আর গায়ের জোর। সিমেন্টের মেঝেতে একটা সাপকে চেপে ধরে থাকা কি সোজা কথা? সাপের গাটাই ত তেলেতেলে!
আমি এক লাফে তিন পা পিছিয়ে গিয়েছিলাম। আবার এগিয়ে এলাম। সাপটা নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার জন্য ভীষণভাবে ছটফট করছে। শুকদেও চেপে ধরে আছে ঘাড়ের কাছটা। আর সাপটার লেজটা একটা চাবুকের মতন ছটাস ছটাস করে পড়ছে মেঝেতে। এক একবার চেষ্টা করছে লাঠিটাকে পাকিয়ে ধরবার জন্য।
শুকদেও চেঁচিয়ে উঠলো, ‘দাদাবাবু আভি উসকো মারিয়ে!’
দেখলাম শুকদেও’র মুখে ঘাম জমে গেছে, দাঁতে দাঁত চেপে আছে। সাপটার নিশ্চয়ই খুব গায়ের জোর। শুকদেও বেশীক্ষণ ধরে রাখতে পারবে না। ছোট মাসী সবটা কেরোসিন ছড়িয়ে দিলেন মেঝেতে, আবার কাগজ জ্বেলে ছুঁড়ে দিলেন সেখানে। এখন সাপটার সব দিকেই আগুন তবু কিন্তু পুড়ছে না সহজে, ছটফট করে যাচ্ছে সমানে!
আমি কি দিয়ে সাপটাকে মারবো? হাতের কাছে কোনো জিনিস নেই। একটা চেয়ার ছুঁড়ে মারলে কি কোন লাভ হবে? কিছুই ঠিক করতে পারছি না। যদি শুকদেও’র হাত পিছলে যায়, যদি সাপটা আগুন পেরিয়ে আসে...
ছোট মাসী বললেন, ‘সুনীল, রান্নাঘর থকে শিল-নোড়াটা নিয়ে আয়-’
কিন্তু তার আগেই সাপটা শুকদেও’র লাঠির তলা থেকে পিছলে বেরিয়ে এল। তারপর আগুনে শিখা ছাড়িয়ে ফণাটা তুলে আমাদের দিকে তাকালো। শুকদেও সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের গতিতে ডান্ডাটা দিয়ে প্রাণপণ শক্তিতে মারলো সেই ফণাটার ওপর। তাতেই ফণাটা ছাতু হয়ে গেল, সাপটা নেতিয়ে পড়লো আগুনের ওপর। শুকদেও তখনও দমাদম করে পেটাতে লাগলো এক জায়গায়। সাপটা আর নড়লো না।
ছোট মাসী আগুন ডিঙ্গিয়ে বাবলুকে কোলে তুলে নিলেন।
আমি আর শুকদেও ক্লান্ত হয়ে বসে পড়লাম মাটিতে। সারা ঘরে সাপ পোড়ার বিশ্রী গন্ধ। বমি এসে যাচ্ছে প্রায়। শুকদেও আবার আগুন থেকে লাঠি দিয়ে বার করে আনলো সাপটাকে। জায়গায় জায়গায় আগুনে ঝলসে সাপটা যেন হঠাৎ মোটা হয়ে গেছে।
এতক্ষণ পরে বেরুলেন ছোট মেসো। তিনি সাপটাকে দেখে বললেন, ‘বাবা, এত বড় সাপ? সাপকে বিশ্বাস নেই, ওরা অনেক সময় মটকা মেরে থাকে!’
তিনি শুকদেও’র হাত থেকে লাঠিটা নিয়ে সেই মরা সাপকে মারলেন কয়েক ঘা।
ছোট মাসী বললেন, ‘হয়েছে, হয়েছে! এবার ওটাকে রাস্তায় ফেলে দিয়ে এসো।’
ছোট মেসো বললেন, ‘রাস্তায় ফেলবে কি? বৃষ্টির জল লাগলে সাপ আবার বেঁচে যায়।’
সে আর কি করা যাবে! শুকদেও আর আমি গিয়ে অনেকটা দূরে সাপটাকে ফেলে দিলাম মাঠের মধ্যে। নিশ্চিহ্ন হবার জন্য দু’টো থান ইট দিয়ে আরও কয়েকবার ঠুকে দিলাম ওর মাথা। নাঃ, সাপটা মরে গেছে নিশ্চিত। সাপেরা ত আর অমর হতে পারে না।
সেদিন আর সারারাত প্রায় ঘুমই হল না বলতে গেলে। ছোট মাসীর ধারণা হল সাপটার বিষ নিশ্চয়ই ঘরের মধ্যে পড়েছে। দুটো ঘরে একবার ফিনাইল একবার ডেটল ছড়িয়ে খুব করে ধোওয়ামোছা হল। তারপর বহুক্ষণ জেগে আমরা অনবরত ঐ ঘটনা নিয়ে আলোচনা করতে লাগলাম। সত্যি খুব জোর একটা ফাঁড়া গেছে। ছোট মাসী বারবার ছোট মেসোকে ঠাট্টা করে বলতে লাগলেন, ‘তুমি কি দরের বীরপুরুষ বোঝা গেছে! আমরা তিনজন প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সাপটা মারলাম। আর তুমি দরজা বন্ধ করে বসে রইলে?’
ছোট মেসো বললেন, ‘আহা, তোমরাই ত আমাকে বেরুতে বারণ করলে।’
ছোট মাসী বললেন, ‘থাক্ থাক্! সব বোঝা গেছে। তোমার তখন গলা কাঁপছিল। এ বাড়িতে আর থাকবো না। তুমি অন্য বাড়ি খোঁজ।’
সাপটা মারার ব্যাপারে আমি যদিও বিশেষ কিছুই করিনি, তবু ছোট মাসী যে আমাকে কৃতিত্বের খানিকটা ভাগ দিলেন তাতে আমি খুশিই হলাম।
পরদিন সকালে উঠে দেখে এলাম যে মাঠের মধ্যে মরা সাপটা একই জায়গায় পড়ে আছে। বেঁচে উঠে পালায়নি।
ব্যাপারটা কিন্তু এখানেই শেষ হল না। আমাদের সাপ মারার কাহিনীটা পাড়া প্রতিবেশীদের মধ্যে ছড়িয়ে গেল। অনেকে এ পাড়ায় সাপের কথা শুনে দারুণ অবাক হল। অনেকে আমাদের সাহসের প্রশংসা করলো, আর অনেকে আমাদের ভয়ও দেখালো খুব। প্রত্যেক সাপেরই একটা করে জুটি থাকে। একটাকে মারলে অন্যটা এসে প্রতিশোধ নেয়।
এরকম একটা কথা আমরা শুনে আসছি বটে, কিন্তু ঠিক বিশ্বাস হয় না। আমরা ত মরা সাপটা ফেলে এসেছি বেশ খানিকটা দূরে, মাঠের মধ্যে। ঐ সাপটার যদি একটা জুটি থাকেও তবু সে এই বাড়ি খুঁজে খুঁজে আসতে পারবে? সাপের কি এত বুদ্ধি থাকে? সাপের বুদ্ধির ত তেমন গল্প শুনিনি। বরং সাপ সম্পর্কে এমন অনেক কিছু শোনা যায়, যেগুলি আসলে বাজে কথা। যেমন লোকে বলে, দুধ-কলা দিয়ে সাপ পোষা! কিন্তু সাপ আসলে দুধও খায় না, কলাও খায় না।
তবু উল্টো দিকের বাড়ির দারোয়ান বললো, ‘খুব সাবধান বাবুজী! আমাদের গাঁওতে এই জন্য কেউ সাপ মারে না। একটা সাপকে মারলেই অন্য সাপ এসে বদলা নিয়ে যায়। আমার এক চাচাতো ভাইকে সাপে কেটেছিল...’
আমরা তার কথা অবিশ্বাস করে উড়িয়ে দিলাম। তবু ভেতরে ভেতরে একটু ভয় রয়ে গেল। ভয় জিনিসটা একবার মনের মধ্যে ঢুকলে আর সহজে যায় না। আমরা কথা বলতে বলতে প্রায় খাটের তলা কিংবা ঘরের কোণগুলো খুঁজে দেখি ভালো করে। সন্ধের পর সব জানালা বন্ধ থাকে।
এদিকে ছোট মাসী পরদিন সবজীমন্ডী থেকে ঘুরে এসে চোখ বড় বড় করে বললেন, ‘ত্রিবেদীজীর বউ কী বললেন জানিস? আমার মুখে সাপ মারার কথা শুনে বললেন, মরা সাপের লেজ দিয়ে নাকি একরকম তীব্র গন্ধ বেরয়। অন্য সাপটা সেই গন্ধ শুঁকে বোঝে কোন জায়গায় ঐ সাপটাকে মারা হয়েছিল, সেই গন্ধ শুঁকে শুঁকে আসে।’
আমি বললাম, ‘কোনো বইতে ত এরকম কথা লেখা নেই।’
ছোট মাসী ঝংকার দিয়ে বললেন, ‘যারা বই লেখে, তারা বুঝি সব জানে? মানুষের থেকে জন্তু জানোয়াররা অনেক কিছু বেশী বোঝে। তুই বলতে পারিস, কোথাও ভূমিকম্প হবার দু’দিন আগেই সেখানকার মুর্গীগুলো বেশী ছটফট করে কেন?’
আমি বললাম, ‘তা বলে বেনারস শহরে কি সাপ কিলবিল করছে নাকি?’
ছোট মাসী বললেন, ‘সেদিন দেখলি ত অতবড় সাপটা! একটা থাকলে দুটো থাকতে পারে না? যাই হোক বাবা, এ বাড়িতে আর আমি থাকছি না। যদি পারি, কাল-পরশুর মধ্যেই উঠে যাবো।’
ছোট মাসী খুব তাড়া দিতে লাগলেন ছোট মেসোকে বাড়ি খোঁজার জন্য। একতলা বাড়ি নয়, তিনি অন্তত তিনতলার ফ্ল্যাট চান।
ঠিক চারদিনের দিন সত্যিই এল দ্বিতীয় সাপটা। একদম দিনের বেলা!
দুপুরবেলা খাওয়াদাওয়ার পর ছোট মাসী আর আমি বসে গল্প করছি। খাটের ওপর খেলা করতে করতে একটু আগে ঘুমিয়ে পড়েছে বাবলু। একটু বাদেই ছোট মাসীর চোখে ঘুম চলে আসবে, তখন আমি আমার ঘরে চলে যাবো বই পড়তে, তার আগেই দেখতে পেলাম সাপটাকে। ঘরের বাইরের দেয়ালের পাশে যে হাসনাহেনা গাছটা রয়েছে, সেটা থেকে একটা সাপ জানালা দিয়ে ঘরের মধ্যে মুখ বাড়ালো। একদম আমাদের চোখের সামনে!
ছোট মাসী আর আমি এত অবাক হয়ে গেছি যে প্রথমে একটাও কথা বলতে পারলাম না। সাপটা জানালার শিকে লেজ পাকিয়ে দু’এক মুহূর্ত ঘরের মধ্যে চেয়ে রইলো, তারপর দেয়াল বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করতে গিয়ে পারলো না, ছপাৎ করে পড়ে গেল ঘরের মধ্যে।
‘ওরে বাবা,’ বলেই ছোট মাসী আর আমি এক দৌড়ে পালালাম। তারপরই আবার দু’জনে ফিরে এলাম দরজার কাছে। ঠিক আগের দিনের মতন অবস্থা। ঘরের মধ্যে সাপ, খাটের ওপর ঘুমিয়ে আছে বাবলু! সাপটাও ঠিক একরকম, হাত চারেক লম্বা, মাথার ওপরে একটা পায়ের ছাপের মতন।
আজ ছোট মেসো বাড়িতে নেই, শুকদেও একটু আগে বেরিয়ে গেছে। খাওয়াদাওয়া পর সে একটু ঘুরে আসতে যায় রোজ।
একই রকম বিপদ থেকে কি পর পর দু’বার বাঁচা যায়! ছোট মাসী সেদিনকার মতন আর সাহস দেখাতে পারলেন না, একেবারে যে ভেঙে পড়লেন। ‘ওরে বাবা গো! ওরে বাবা গো!’ হাঁপাতে হাঁপাতে আর কাঁদতে কাঁদতে এই কথাই বলতে লাগলেন বারবার! আমি ছোট মাসীকে শক্ত করে ধরে আছি- হঠাৎ ছুটে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লেই সাঙ্ঘাতিক কান্ড হবে।
সাপটা খাটের একটা পায়ার সঙ্গে লেজ জড়িয়ে মাথাটা ঘোরাচ্ছে এদিক ওদিক। মাঝে মাঝে ফণাটা সামান্য উঁচু করে আমাদের দেখছে। ওকে দেখেই আমার গা যে কাঁপছে। শুনেছিলাম মানুষ যেমন সাপকে ভয় পায়, তেমনি সাপও ভয় পায় মানুষকে। সহজে মানুষের কাছে আসে না। কিন্তু এই সাপটার একটুও ভয় পাবার লক্ষণ নেই! ঠিক যেন খেলা করছে।
মেল ট্রেনের চেয়েও তাড়াতাড়ি চিন্তা করে যাচ্ছি, কি করে সাপটাকে মারবো। সেদিনকার মতন কেরোসিন ছড়িয়ে পুড়িয়ে মারার উপায় নেই। সাপটা ইচ্ছে করলেই খাটের নীচে লুকোতে পারে। শুকদেও’র মতন ডান্ডা হাতে নিয়ে ওর কাছে যেতেও সাহস পাচ্ছি না। যদি একবার ফসকায়? তারই মধ্যে একবার ভেবে নিলাম, সাপটা যখন প্রতিশোধ নিতে এসেছে তখন কাকে কামড়াবে? ছোট মাসীকে না শুকদেও-কে? আমাকে কামড়ানো উচিত নয়। কারণ আমি ত আগের সাপটাকে ঠিক মারিনি। পরের মুহূতেই ভাবলুম, ‘ছিঃ, আমি কি স্বার্থপর!’
ছোট মাসীর চিৎকারে বাবলু জেগে গিয়ে খাটের ওপর উঠে বসলো। আমরা দু’জনেই এক সঙ্গে বললাম, ‘বাবলু, নামিসনি। সাপ! নামিসনি!’
বাবলু বললো, ‘কোথায় সাপ?’
‘-খাটের নীচে! নড়িস না, একটুও নড়িস না।’
বাবলু খাটের পাশে এসে ঝুঁকে সাপটাকে দেখলো। সাপটাও দেখলো বাবলুকে। সাপটা এত বড় যে অনায়াসেই অতটা ফণা উঁচু করে ছোবল মারতে পারতো বাবলুকে। আমরা শিউরে উঠে বললাম, ‘সরে যা বাবলু, সরে যা!’
বাবলু ঐটুকুন ছোট ছেলে, সে চ্যাঁচানিতে ঘাবড়ে গেল। প্রথমে সে কেঁদে উঠলো ‘অ্যাঁ-অ্যাঁ’ করে! তারপর হঠাৎ পা ঝুলিয়ে খাট থেকে নেমে পড়তে গেল।
চরম বিপদের সময় মানুষের মাথায় ঠিক একটা বুদ্ধি এসে যায়; আমি এতক্ষণ যা ভাবিনি তাই করে ফেললাম। ছোট মাসীকে পেছন দিকে ঠেলে ফেলে দিয়ে আমি ঘরের মধ্যে ঢুকে এলাম, একটানে আমার গা থেকে জামাটা খুলে ফেলে ছুঁড়ে দিলাম সাপটার দিকে। সাপটা রাগ করে জামাটার ওপরে ছোবল মারতে গিয়ে তার মধ্যে তালগোল পাকিয়ে গেল। তার রাগী ফোঁস ফোঁস শব্দ শোনা যেতে লাগলো শুধু। আমি একহাতে বাবলুকে ধরে ফেলে চেঁচিয়ে বললাম, ‘ছোট মাসী লাঠি আনো! শিগগির, লাঠিটা-’
কিন্তু লাঠি আনতে হল না। তক্ষুনি রাস্তায় শুনতে পেলাম প্যাঁ প্যাঁ বাঁশীর আওয়াজ- সাপ খেলানো বাঁশী। আমি এবার আনন্দে চিৎকার করে উঠলাম, ‘ছোট মাসী’- তার আগেই ছোট মাসী ছুটে গেলেন রাস্তার দিকে।
সেই মেয়ে সাপুড়েটি আসছিল। ছোট মাসী গিয়ে তার হাত ধরে ব্যাকুল ভাবে বলতে লাগলেন, ‘শিগগির আও, আমার কামরামে একঠো সাপ...তুম পাকড়ো, তুমকো দশ টাকা...বিশ টাকা দেগা..’
কাঁধের ঝাঁপি নামিয়ে ছুটে এল সাপুড়েনী। জামাটার কাছে গিয়ে বাজাতে লাগলো তার বাঁশীটা। একটু বাদেই জামার ভেতর থেকে ফস করে সাপটা ফণা উঁচু করলো, অমনি সাপুড়েনীটি দারুণ রেগে গিয়ে বললো, ‘আরে কালুয়া!’
সাপুড়েনীটি বাঁশীটা ডান দিকে বাঁ দিকে নাড়তে লাগলো আর সাপটাও মাথা দোলাতে লাগলো সেই সঙ্গে। তারপর সে এক ফাঁকে কপ করে ধরে ফেললো সাপের মাথা। বকুনি দিয়ে বললো, ‘আরে কালুয়া। বদমাসকা বাচ্চা!’
আমরা অবাক।
সাপুড়েনীটি সাপটাকে ধরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, ‘কালসে হামি ঢুঁড়ছি এই সাপটাকে। বদমাসটা যে কখন ভেগে গেল!’
ছোট মাসী বললেন, ‘অ্যাঁ?’
বাবলুও কান্না থামিয়ে চোখ গোল করে তাকালো।
সাপুড়েনী একগাল হেসে বললো, ‘হ্যাঁ মাইজী, কাল এই রাস্তার উধায়ে এক কোঠিতে খেলা দেখালাম, তার মধ্যে কখন এই বদমাসটা ভেগে গেল!’
সাপুড়েনীটি এই মাত্র যে উপকার করলো সেটা ভুলে গিয়ে দারুণ রেগে গেলেন ছোট মাসী, চোখ পাকিয়ে বললেন, ‘অ্যাঁ? তুই সাপ ছেড়ে দিয়েছিস এ পাড়ায়? আর একটু হলে আমার ছেলেকে কামড়াতো! তোকে আমি পুলিশে দেবো!’
সাপুড়েনীটি বললো, ‘ইসকো তো বিষ নেই আছে! এই দেখিয়ে না?’
সে একটা হাত মুঠো পাকিয়ে সাপটার মুখের মারতে লাগলো বারবার। সাপটা কামড়ালো না, মুখটা ফিরিয়ে নিতে লাগলো। শুধুই তাই নয়, বাইরে এসে সাপুড়েনী সাপটাকে মাটিতে ছেড়ে দিতেই সে সরসরিয়ে ঢুকে গেল একটা ঝাঁপির মধ্যে, তখন আর সন্দেহ রইলো না যে সেটা সত্যি সত্যিই পোষা সাপ।
ছোট মাসী তবু বললেন, ‘তোকে এক পয়সাও বকশিশ দেবো না! তোর সাপ কেন আমার ঘরে ঢুকবে? আর একটু হলে আমি হার্ট ফেল করেছিলাম। উঃ এখনো বুক ধড়াস ধড়াস করছে।’
কিন্তু আমার একটা খটকা লাগলো। একই রকম সাপ কয়েক দিনের মধ্যে ঐ একই ঘরে ঢুকে পড়লো? দ্বিতীয়টটা তাহলে প্রতিশোধ নিতে আসে নি? আমি সাপুড়েনীকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তোমার ক’টা সাপ পালিয়ে গিয়েছিল?’
সে অবাক হয়ে বললো, কাঁহে বাবু? এই একঠো!’
আমি বললাম, ‘তোমার দুটো সাপ হারায়নি? ঠিক বলছো! তাহলে কয়েকদিন আগে আমাদের বাড়িতে আর একটা সাপ এসেছিল কি করে? ঠিক এক রকম সাপ।’
সাপুড়েনী চোখ কপালে তুলে বললো যে সে কথা ত সে জানে না! সে কসম খেয়ে বলছে, তার এই একটা মাত্র সাপই হারিয়েছিল। তাও কাল সন্ধাবেলা। চারদিন আগে ত সে বেনারসেই ছিল না, সে চলে গিয়েছিল রামনগর। তা ছাড়া এরকম আর একটা সাপ আসবে কি করে- এ ত পাহাড়ী জাতের সাপ, এ ত এখানে পাওয়া যাবে না। তাকে যতই বলি যে ঠিক ঐ রকম একটা সাপ আমরা সত্যিই মেরেছি, সে অবিশ্বাসের সঙ্গে মাথা দোলায়। রাগ ধরে গেল। এর মধ্যে শুকদেও এসে পড়েছে। আমি বললাম, ‘শুকদেও, মাঠের মধ্যে ওকে সেই মরা সাপটা দেখিয়ে দাও ত!’
শুকদেও সাপুড়েনীকে নিয়ে গেল মাঠের মধ্যে! সাপটা সেখানে নেই। না থাকতেই পারে, চারদিন কেটে গেছে, এর মধ্যে কাক চিল শকুনি খেয়ে ফেলেছে নিশ্চয়ই। সাপুড়েনীটি হেসে হেসে মাথা দোলাতে লাগলো। আমরা তাকে মাত্র পাঁচ টাকা বকশিশ দিয়ে বিদায় করে দিলাম।
ব্যাপারটা একটু রহস্যময় রয়ে গেল।
সন্ধেবেলা ছোট মেসো বাড়ি ফেরার পর সবিস্তারে সব বলা হল তাঁকে। তিনি প্রথমে বিশ্বাস করতে চান না। পর পর দুটো সাপ একই ঘরে? যাক, তিনি নতুন বাড়ি দেখে এসেছেন, সামনের রবিবারই সেখানে চলে যাওয়া হবে।
ছোট মাসী বললেন, ‘দুপুরে তখন আর কেউ ছিল না। তবু ভাগ্যিস সুনীলটা ছিল, ওই ত সাহস করে জামাটা ছুঁড়ে দিয়েছিল, নইলে কী যে হত? আমার ত মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল একেবারে।’
ছোট মেসো হেসে বললেন, ‘হুঁ, একে ত পোষা সাপ, তার ওপর বিষ নেই- তার সামনে যাওয়া আর এমন কি? আমি থাকলে ওটাকে খপ করে ধরে ফেলতাম।’
ছোট মাসী বললেন, ‘আহা! তখন কি আমরা জানতাম যে ওটার বিষ নেই কিংবা পোষা।’
ছোট মেসো বললেন, ‘ও দেখলেই বোঝা যায়। তোমরা ত সাপ চেনো না, আমি চিনি। জীবনে কত সাপ দেখেছি।’
কিছু না বুঝে বাবলুও হাসতে লাগলো!
১৩৮৪
Untitled Document
Total Visitor : 709187
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :