Untitled Document
ভাদ্র সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
জলেস্বর : স্বকৃত নোমান
নদী ও মানুষের ইতিকথা
- আবদুল্লাহ আল-হারুন

সাগরের পানি বাষ্প হয়ে আকাশের দিকে ধায়। মেঘের কাছে গিয়ে তার আশ্রয় নেয়। তারপর পাহাড় আর উপত্যকার উপর দিয়ে সে মেঘের আনাগোনা। বায়ুর সাথে দেখা হলেই সে আবার কান্নায় ভেংগে পরে নীচের ক্ষেতে বৃষ্টি হয়ে গড়িয়ে পড়ে। তারপর হয় নদীর সাথে তার পুনর্মিলন, সে আবার তাকে সাগরে বয়ে নিয়ে আসে। যেখান থেকে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল। মেঘের জীবনও তাই বিচ্ছেদ আর সাক্ষাতকার, একটি অশ্রু, একটি হাসি -  খলিল জিবরান: একটি অশ্র“ এবং একটি কান্না।
কবিগুরু যাকে বলেছেন, শুধু যাওয়া আসা, শুধু স্রোতে ভাসা। নদীর সঙ্গে যার বিন্দুমাত্র পরিচয় আছে এই দুই কবির বর্ণিত মহাসত্যটি বুঝতে পারবেন। নদীর মধ্যেই জীবনের প্রতিফলন, নদীকে দিয়েই আমরা জীবনের উৎস আর শেষ যাত্রাটি ভালো করে উপলব্ধি করতে পারি। এ সত্যটি নদী মাতৃক আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে সর্বত্র বিরাজমান। তাই তো বাংলা কবিতা, গল্পে আর উপন্যাসে, নদীর প্রেক্ষাপট ঘুরে ফিরেই আসে। বাংলা সাহিত্যের আনাচে কানাচে নদী মহানায়কের ভুমিকা নিয়ে পাত্র পাত্রীদের বিকশিত করে পাঠক-পাঠিকাদের কাছে। যারা এ কথা স্বীকার করতে দ্বিধাগ্রস্থ, তাদের বলি সোজন বাদিয়ার ঘাট, পদ্মা নদীর মাঝি, নৌকাডুবি আবার পড়তে বা জীবনানন্দ দাসের ধানসিঁড়ি নদীর পাশে কবির সাথে বসতে। স্কুলে থাকতে পরীক্ষা পাশের জন্য নদীর আত্মকাহিনী রচনা শিখতে হয়েছে কিন্ত ধীরে বহে ডন উপন্যাস পড়ার পর বা তিতাস একটি নদীর নাম ছবিটি (এ জে কাদারের সোয়ে নদীয়া, জাগে পানিও মনে করতে হবে) দেখে, প্রথমবার বুঝেছি, সত্যিই পানির আরেক নাম জীবন এবং নদীই এ পানির আঁধার। বৈজ্ঞানিকরাও বলেন কোটি কোটি বছর আগে জড় পৃথিবীতে প্রথম এক কোষ প্রানীর জন্মও পনির মধ্যে, যা বর্তমান সমস্ত প্রানী আর উদ্ভিদের প্রারম্ভ।
তাই স্বকৃত নোমানের জলেস্বর পড়ে উপন্যাসটির পটভুমি নির্বাচনে তার বুদ্ধিমত্তার সাধুবাদ দিতেই হয়।
নয়ন তোমারে দেখিতে পায়না, রয়েছ নয়নে নয়নে এর মতই আমাদের দেশের সহস্র নদী নালা খাল বিলে সান্দার আর বেদেদের বহর আমরা নিত্যই দেখি কিন্ত সত্যিই কি দেখি? সান্দার আর বেদের মধ্যে কি পার্থক্য, নোমান তার বইতে মাঝে মাঝে আলোকপাত করার চেষ্টা করেছে, কিন্ত ব্যাপরটি পরিস্কার হয় নি। জসিমুদ্দিনের সোজন বাদিয়া আর নোমানের ইনুসের মধ্যে আমি কোন পার্থক্য পাই নি। হয়ত আমার বোধশক্তিরও কমতি হতে পারে। একটা ব্যাপার বুঝেছি, নৌকায় যারা বসসবাস করে, তারা আদি বেদে বা সান্দারদের সত্যিকার প্রতিভু এবং যারা স্থলে স্থায়ী বসতি স্থাপন করে, তারা মুল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্ত এটাতো সারা দুনিয়ার ইতিহাস। আরব বেদুইনরাও এখন দালান কোঠায় বাস করে। আমাদের আদি পিতামাতা (বিবর্তনের মতে) একদা সেই আফ্রিকার জঙ্গল আর বেলাভুমির (সাভান্না- তৃণময় সমতলভুমি) মধ্যে একদিন দু পায়ে দাঁড়িয়ে মেরুদন্ড সোজা করে হাটতে যেই শিখল, শুরু হল তার জগত পরিক্রমা! সাগর মহাসাগর, মরুভুমি পহাড় পর্বত আর কত না চড়াই উৎড়াই পাড়ি দিয়ে, সারা দুনিয়ার বসতি স্থাপন করে এখন সে পরিবেশ নষ্ট করে আদি মাতা পুথিবীরই বারোটা বাজাচ্ছে! বোকা (মহাকবি হবার পুর্বে) কালিদাসের মত! যে ডালে বসে আছে, সে ডালেই কুপিয়ে যাচ্ছে। একটু  নড়ে চড়ে অন্যত্র যাবার মত সময় বা ইচ্ছা কারো নেই। এটাই নাকি সমৃদ্ধি আর সভ্যতার চরম বিকাশ! 
বিবর্তনের ইতিহাস, বিভেদ, বৈষম্য আর পার্থক্যের ইতিহাস। অষ্টাদশ শতক অবধি ধর্মীয় বিভেদ ছিল প্রধান। খৃষ্টান আর মুসলমানদের জেরুজালেমকে নিয়ে লড়াই সেই বারো শতাব্দি থেকে। একদলের কাছে ক্রুসেড, আরেকদল বলেন জিহাদ, দুটিই ধর্মের নামে করা হয়েছিল। ইউরোপে অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি, জেমস ওয়াটের (ইংল্যান্ড) বাষ্পীয় শক্তি আবিস্কারের পর পরই শিল্প বিপ্লবের সুত্রপাত। ধীরে ধীরে ধর্মের প্রভাব কমতে থাকে, যুক্তি আর  মুক্ত চিন্তার আবির্ভাবে। ধর্মের শক্তি ষোল দশকে রেঁনেসার আগমনের পরেই দুর্বল হতে থাকে। শিল্প বিপ্লব প্রথম পুথিবীর মধ্যে প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের ব্যবধানের সঞ্চার করে। এর সাথে যোগ দেয় ব্রিটিশ তথা বিভিন্ন ইউরোপীয় রাষ্ট্রের এশিয়া আফ্রিকায় উপনিবেশ স্থাপন।
সামাজিক, ধর্মীয়, ভৌগলিক, সাংস্কৃতিক আর গায়ের রঙের পার্থক্য ছাপিয়ে উঠেছে আজকের তথাকথিত বিশ্বায়নের যুগে, অর্থনৈতিক পার্থক্য। সমগ্র বিশ্বই, এখন জাতী ধর্ম নির্বিশেষে, একটি মাত্র মাপকাঠিতে
বিভক্ত হয়ে গেছে- ধনী আর গরীবে।
ইসলাম ধর্মের প্রতি যারা অন্ধ ভক্ত তারা বলেন, এ ধর্ম মানবজাতীর মধ্যে কোন ভেদাভেদ মানে না। কাগজে কলমে কথাটি ঠিক। হিন্দুদের শ্রেণীবিভক্তি, ছুৎ আর অচ্ছুৎ এর সমস্যা ইসলাম ধর্মে নেই। বছরে দুদিন ইদের মাঠে জনসমক্ষে প্রভু-ভৃত্যের কোলাকুলিও হয়। ঘরে অবশ্য দৃশ্যটি সম্পুর্ন অন্যরকম। একাদশ শতকে, পাক ভারত উপমহাদেশে ইসলাম প্রসার লাভ করে মুলত: নিচু শ্রেনী, তথাকথিত সিডিওল কাষ্ট হিন্দুদের মধ্যেই। এর কারন সবারই জানা, ব্যাখ্যার কোন প্রয়োজন নেই। কিন্তু আজ পর্যন্ত কতজন ব্রাম্মন বা উচ্চবর্ণের হিন্দু ধর্মান্তর করেছেন তা আলোচনা সাপেক্ষ। পাঁচশ বছর মোগলদের রাজত্বের সময় জাত হিন্দুরা, রাজপুতরা বাদশাহদের অধীনতাস্বীকার করে আজীবন তাদের সেবা করেছেন কিন্ত রাজধর্ম গ্রহন করেন নি। মোগলদের মধ্যে মহাপুরুষ হিসেবে পরিচিত, আকবর, তার প্রিয় স্ত্রী যোথাবাই (জাহাঙ্গীর ওরফে সেলিমের মা) কে আমুত্যু হিন্দু হিসেবেই তার হারেমে রেখেছেন। মোগল-পাঠান রাজা-বাদশাহদের হারেমে অমুসলমান রমণীরাই ছিল সংখ্যায় বেশী। খৃষ্টান মিশনারীদেরও একই অভিজ্ঞতা! ধর্ম বদলে যীশুর আশ্রয় নিয়েছে শুধুই অচ্ছুৎ হিন্দু আর আদিবাসীরা। আজও তাই ঘটছে।
এতসব কথা বলার পেছনে একটাই কারন, পৃথিবীর সব দেশেই, গনতান্ত্রিক, অগনন্ত্রান্তিক, ধর্মীয় বা রাজার শাসনের অধীন, সর্বত্রই শ্রেণীবিচ্ছেদ আজও আছে। তা না হলে পৃথিবীর সবচাইতে বৃহৎ ও শক্ত গনতন্ত্রের পিঠভুমি ভারতবর্ষে শাসনতন্ত্রে জাতীভেদ প্রথা তুলে দেবার পরেও, বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে বিবাহ এখনও সামাজিক স্বীকৃতি লাভ করে নি। কোনদিন করবে বলে মনেও হয় না। অচ্ছুৎ হিন্দুরা, তধাকথিত চামার-মেথররা গ্রামের এক কোনায় নির্বাসিত জীবন যাপন করেন কেন? মহাত্মা গান্ধির পর আর কোন সর্বভারতীয় নেতাই হরিজনদের উদ্ধারের জন্য নি:স্বার্থভাবে কাজ করে জীবন দান করেন নি। একমাত্র ভোটের আগেই হরিজনরা নেতাদের সাক্ষাত পায়।
এ চিত্রটি আমাদের দেশেও আছে। আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি নেই। প্রায় প্রতিটি শহরেই মেথর পট্টি আছে। যেখানে রাতের আঁধারে অনেক বিদগ্ধজনই তাড়ি খেতে যান কিন্ত দিনের বেলায় নাকে রুমাল দেন ওদের কাছে দেখলে।
ঠিক আছে আদিবাসীরা বা অচ্ছুৎরা মুসমান নয় কিন্ত বাংলাদেশের তাঁতী, বেদে, সান্দার যারা জন্মসুত্রে মুসলমান, নামে ও কাজে দুটোতেই, তাদের জন্য এই ২০১০ সালে কেন নোমানকে লিখতে হয়:
যুগ-যুগান্তরের নিপীড়িত-নিগৃহিত, বঞ্চিত, লাঞ্ছিত সান্দারদের কান্নায় যেন রাতের তারারা স্তব্ধ, বাতাস অবিচল (পৃ: ৭২)? বা কিন্ত আমার জানা মতে বাইদা-বাইদেনীরা নামাজ-কলমা-পর্দা-পুশিদার ধার ধারে না। এই গোরস্থানে বাইদানী  দাফন করার হুকুম কেমন কইরে দেই? কাটারাজের চরে মুক্তারার জানাজা শেষ করার পরই, বিপত্তির সুত্রপাত। বর্ণহিন্দুরা তাদের শ্মশানের পাশে তাকে কবর দিতে দেবে না। অনেকের জানা নেই,  হিন্দুধর্মে অচ্ছুৎদের মৃতদেহও পোড়ানোর নিয়ম নেই। যদিও তারা সারাজীবন হিন্দু ধর্মের নানা দেব দেবী মেনে চলেন। শুধু মুসলমান-ইহুদিদের মধ্যেই মৌলবাদি আছে তা নয়, বর্ণহিন্দুরা কিছু কিছু ব্যাপারে এক কাঠি সরেস! আয়ার্ল্যান্ডে ক্যাথলিক-প্রটেষ্টানদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষও  মনে রাখতে হবে।
ইমাম সাহেবের ফর্মুলা অনুযায়ী, ঢাকা শহরে প্রতিদিন মৃত মুসলমানদের  মধ্যে তাহলে কজনের দাফনের ধর্মীয় কোয়ালিফিকেশান আছে? তাদের মধ্যে কজন নামাজ-কলমা-পর্দা-পুশিদার মধ্যে ছিলেন? কিন্ত শহুরে অধিবাসীরা, তথাকথিত সুশীল সমাজভুক্তরা তো উচ্চ বর্ণের, তাদের জন্য নিয়ম আলাদা। বস্তুত দেশের শাসনব্যবস্থা, সামাজিক বিধিবিধানের তো তারাই রচয়িতা। বিপদ শুধু মুক্তারাদের, বেচারী জলে বাস করে, সান্দার! ভাগ্যিস আমাদের উপমহাদেশে গৌতমের জন্ম হয়েছিল এবং এখনও কিছু বৌদ্ধ আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছেন। নয়তো মুক্তারার মরনের শেষে সাড়ে তিনহাত জমিও মিলত না!
মুখ্য চরিত্র: বইটির তৃতীয় মলাটে লেখা হয়েছে- বেদে সম্প্রদায়ভুক্ত এক সান্দার তরুনের লড়াকু যাযাবর জীবনের একটি গল্প নিয়ে রচিত এ উপন্যাস। নোমানও স্বস্তি বচনে বলেছে- কেবল এক সান্দার লড়াকু যাযাবর-জীবনের একটি গল্প নিয়েই উপন্যাসটি রচিত। লড়াকু শব্দটি লড়াই থেকে এসেছে। কিন্ত আমি বইটি দুবার পড়ার পর একটু খটকায় পড়ে গেছি! ইনুস কি লড়াকু? বাংলাদেশের সশস্ত্র স্বাধীনতা আন্দোলনের পর থেকে মুক্তিযোদ্ধা বলে যে শব্দটি এখন আমাদের  হ্রদয়ে গেঁথে আছে, তারপর ইনুসের বয়েসী একটি যুবককে লড়াকু বলার পেছনে সমুচিত যুিক্ত আছে কি? মাকে অন্যায়ভাবে মারা হল, মাথা পিঠ ফেটে গেল তার, কিন্ত আজীবন মার জন্য কাতর (বইয়ের শেষ পর্যন্ত বারে বারে মা ফিরে এসেছে তার চিন্তায়) ইনুস তো দৃর্বৃত্তের কারো গায়ে (স্থলে বসতকারী বুদা সর্দারের অনুগামী বেদে) ভালোমত একটা আঘাত হানার চেষ্টাও করল না।
বৃঝলাম তাকে ধরে রাখা হয়েছিল। কিন্ত মার প্রতি যার এতটা টান (আমি সব মাতৃবৎসল সন্তানদের কথাই বলছি), আসলেই সে যদি লড়াকু হত, ওসব বাঁধা ছাড়াতে কতক্ষন? এ ছাড়াও আরো কিছু জায়গায় তার মাত্রাতিরিক্ত নম্রতা এবং আপোষ তাকে এক ধরনের শান্তিবাদি চরিত্রই করে তুলেছে এবং তা নোমানের অজান্তেই। আমার কাছে আগাগোড়াই ইনুসকে একটা রোমান্টিক এবং ভাবালু যুবক মনে হয়েছে। যে বন্য চড়–ই পাখী পোষে। চতুর্দশীর গায়ে অজান্তে বাচ্চা কাছিম ছুঁড়ে তার আকুলি বিকুলি এবং তারপর বেশ কয়েকবার এজন্য সেই অজানা ও মাত্র একবারের দেখা মেয়েটির কাছে (বাস্তবে ও স্বপ্নে) ক্ষমা চাওয়ার প্র্যাকটিশ, সবই পথের পাঁচালির অপুর মত ভাবাবেগ। শ্রীকান্তের নির্ভয় ও সাহসী ইন্দ্রনাথ নয়। খালি নৌকায়  সে কয়েকবারই মেছো ভুত আর অদৃশ্য প্রেতাত্মার ভয়ে ভীত। শ্রীকান্ত যারা পড়েছেন, তারা জানেন ইন্দ্রনাথের গভীর রাতে নদীতে (শ্রীকান্ত সহ) জেলেদের পাতা জাল থেকে পানিতে ডুব দিয়ে মাছ চুরি করার কথা। শ্রীকান্তের প্রশ্নের উত্তরে সে নির্বিকার ভাবে বলে, ধরা পড়লে, জেলেরা এক কোপে মাথা কেটে দেবে বা ভেসে যাওয়া মরাকে সে এমন তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বর্ননা দেয় যেন একটা কাঠের টুকরো ভেসে যাচ্ছে। এদিকে আমরা পাঠকরা পড়েই ভয় পেয়ে যাচ্ছি!
নোমান হয়ত জানে না, আমার মত পাঠকরা, বইটি পড়ার সময়, ইনুসকে বরাবর যুবক-মঙ্গলফকির (ওরফে মঙ্গলচান)
হিসেবে দেখবে। ইনুসের সারা জীবনটাই দাদার আদলে তৈরী। বলা যায় মঙ্গল ফকিরের দর্পণে ইনুসের মুখ। তার উৎস সান্দারদের আবহ নয়, মঙ্গলফকির। বিক্রম ফকিরের ঘরজামাইয়ের সুখী ও নিশ্চিত আরামের জীবন বিসর্জন দিয়ে সে যে আবার হোসনদিঘাট তথা চরমাল্লায় (পরে কালিদহ) ফিরে এল সেটা স্বজনপ্রীতি নয়। নিজের গোত্রে ফিরতে নয়। সে এসেছিল ঐ একটি আশাতেই, দাদা মঙ্গলফকির হয়ত এখনও বেঁচে আছে। কুষ্ঠরোগী আশরফ হোসেনের কাছে সে ডুবতে ডুবতে উপরে উঠার জন্য শেষ খড়টির সন্ধান পায়। আশরফ হোসেন জানায়, হ্যাঁ, কয়েকটা বেদে নৌকা এক বছর আগেও ছিল সেখানে। বছর খানেক আগে তারা কালিদহের ওদিকে চলে গেছে। ভয়াল ভড়ের রাতে বহরের অনেকেই ডুবে মরেছে, দুটো নৌকা খুঁজে পাওয়া যায় নি। ভেতরে ভেতরে তার দাদার জন্য যে সুপ্ত আগ্নেয়গিরিটি এতদিন ধিঁকি ধিঁকি করে জ্বলছিল, আশরফ হোসেন এক ফুঁয়ে তা আবার জ্বালিয়ে দিলেন! বিকল্প যে জীবনটি দাদার অনুপস্থিতিতে (এই চিন্তায় যে দাদা মারা গেছে সেই ঝড়ের রাতেই), দিনুর সাথে কয়েকবছরে সে গড়ে তুলেছিল, এক মুহুর্তে তা তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পড়ল! তবে কিছু পাঠক-পঠিকা অবশ্যই জানতে চাইবেন, কেন? একবিংশ শতাব্দিতে দাদার জন্য প্রেম বিসর্জন! এ সত্যটি  হজম করা নতুন প্রজন্মের জন্য একটু কঠিনই। বিক্রম মাষ্টরের বাড়ীতে ইনুসের কয়েকবছর বসবাস, বালতি ও কলসে একে অপরের গায়ে জল ঢালাঢালি (অপুর্র্ব সিকোয়েন্স ও বর্ণনা), নির্দোষ প্রেমের  (কামহীন প্রেম, নিকষিত হেম) কথাবার্তা সবই এখন অর্থহীন! পিতৃহীন নাতী (এবং পরে মাতৃহীন) ইনুসের জীবনের প্রধান চালিকা শক্তিই মঙ্গলফকির। আলী বরদারের শিষ্য মঙ্গলফকির এখন অদৃশ্য। কিন্ত ইনুসের আত্মায় সে বহু আগেই চাবি মেরে দিয়েছে যা হয়ত কিছুদিন ঝিম ধরে থাকে, দিনুর প্রভাবে। কিন্ত সময় এলেই চাবি আবার সচল হয়ে যায় আশরফ আলীর কথায় এবং সাধনকুঠি মিলিয়ে যায়, চরমাল্লা জেগে উঠে। এই টানাপোড়নে দিনু হারিয়ে গেল! বেচারী!
ইনুসও ভুলতে বসেছে শিমুলকান্দি, টানকালিগঞ্জ, তালজঙ্গা আর হোসেনদির নানা স্মৃতি-বিস্মৃতি। দাদা মঙ্গল ফকিরের চেহারাও ক্রমে ধূসর হয়ে আসে। ভুলে গেছে দোতারার সুর। চটে মোড়া দোতারা ও পাঞ্জাটা জীর্ণপ্রায় নৌকার কোথায় পড়ে আছে কে জানে! কতদিন খোলা হয় না নৌকার দাপার, ছাপ্পরটা রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে ভগ্নপ্রায়। এবং এ পর্যায়েই ইনুস তার প্রাক্তন জীবন থেকে সবচেয়ে বেশী দুরত্বে থাকে। কিন্ত যোগসুত্র ছিন্ন হয় না। মঙ্গলফকিরের চাবি হ্্রদয়ের খাঁচার মধ্যে ঘুমিয়ে থাকে, এক সময়ে জেগে থাকার অপেক্ষায়। এবং জাগার পরই উপন্যাস শেষ। আর তো কিছু বলার নেই। ইনুস সৃষ্টির নিয়মেই আবার তার উৎসে ফিরে আসে। ঠিক উৎসে নয়, কাছাকাছি।
কিন্ত পাঠকের অতৃপ্তি থেকে যায়। আমার সাজানো বাগান শুকিয়ে গেল! বা রবীঠাকুরের শেষ হয়েও হইল না শেষ। সেই প্রশ্ন, কেন এমন হল? উত্তর, যে বইটি লিখেছে, তারও জানা নেই। সব প্রশ্নের জবাব নেই বলেই জীবন সচল। সব প্রহেলিকা যেদিন শেষ হবে, সুষ্টিরও সেদিন অন্ত হয়ে যাবে।
কিছু বৈশিষ্ট: উপন্যাসটির সময়কাল নি:সন্দেহে এ শতাব্দি। সমসাময়িক। কিন্ত বর্তমান বাংলাদেশের সবচাইতে বড় চলমান ঘটনা এখানে একেবারেই অনুপস্থিত। রাজনীতি ও দুর্নীতি। নোমানকে বিশেষ ধন্যবাদ, সমাজের এই স্থায়ী ক্ষতটি তিনি ইনুস আর মঙ্গল ফকিরের কাহিনী বলতে গিয়ে সযত্নে পরিহার করেছেন। সন্ত্রাস, হত্যা (একটিই মাত্র, মুক্তারার, কিন্ত নিতান্তই অরাজনৈতিক), চাঁদাবাজী, ক্যাডারদের হামলা এসব নেই। কেউ হয়ত বলবেন, বাস্তব সময়কে এভাবে এড়িয়ে গেলে, কাহিনী এবং পাঠক দুজনের প্রতিই অবিচার করা হয়। আমি এটা স্বীকার করি না। উনিশ শতকে ব্রিটিশ আমলে স্বাধীনতার জন্য সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র বা অন্যদের নিরস্ত্র সংগ্রামের সময় শতাধিক প্রথম শ্রেনীর উপন্যাস লেখা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে বিমল মিত্র সবাই উপন্যাস, গল্প লিখেছেন। কিছু বইতে রাজনীতি আছে কিন্ত অধিকাংশতেই নেই। কারন একটাই, রাজনীতি বাস্তব এবং আগামীকালই এটা ইতিহাস। এটা লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব মুলত: ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিকদের। সাধারনত এটি নিয়ে আলোচনা যারা করেন, তারা সাহিত্যিক নন। এ দায়িত্বও সাহিত্যিকদের নয়। রাজনীতিকে সরাসরি এড়িয়ে, নোমান কথাশিল্পি হিসেবে সততার পরিচয় দিয়েছেন।
সারা বইতে শুধুমাত্র একবারই পুলিশ এসেছে, পরানিপুর ঘাটে। পাঁচ পৃষ্ঠাতেই সেই পর্ব শেষ। তবে এখানে স্পষ্ট করেই বোঝা যায়, সমাজে নিচু জাতি হিসেবে সান্দারদের সরকারী নিরাপত্তার ন্যুনতম গ্যারান্টিও নেই। আইনের শাসনের আওতায় তারা পড়ে না। তারা হয়তো মানবেতর প্রাণী!
কিছু মনে রাখার মত কথা ও সংলাপ: মৃত্যুর আগে নাকি মানুষের মেজাজ বিগড়ে যায়, হয়ে উঠে হিংস্র প্রকৃতির, কথায় কথায় চটে যায়, ভালো কথাও তার কাছে খারাপ লাগে। নদীর চরিত্রও বুঝি মানুষের মতো? চির বিদায়ের আগে উন্মাদ আগালেখা শিমূলকান্দি গ্রামটার ওপর নিজের সমস্ত ক্ষমতা প্রকাশ করে দিয়েছে বুঝি!  পৃ: ২৯
মনে হয়, মা তো আর মা নাই! এ নিছক একটা লাশ ছাড়া আর কিছু নয়। মৃতের সঙ্গে জীবিতের কোনো সম্পর্ক হয় না। (আমার মত ভিন্ন) মা আমার সাত আসমান সাত জমিন পেরিয়ে এখন বেহেশতমুখী নদীর ইস্টিমারে বসে হাসছেন...   পৃ: ৫০
----- নদী কি মানুষ, যে শিকল দিয়ে বাইন্দে রাখবে? শাসন করবার গিলি নদী হয় দুকুল তছনছ করে শোধ নেয়, নয় আত্মহত্যা করে প্রতিবাদ জানায়। নদীর আত্মহত্যা?  পৃ: ৫৩
মঙ্গল ফকিরের নদীকে ভাবনা-  তার বিশ্বাস, নদীরও প্রাণ আছে, আনন্দ উচ্ছ্বাস আছে, নদীও পায়েল পায়ে রিনঝিন শব্দ তুলে নদের প্রাণ আকুল করে। নদীও হাসে, কাঁদে, গীত গায়, নদীরও মিলন-বিরহ আছে। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে নদ-নদী সব যে একাকার হয়ে অগ্রহায়ন-পৌষ মাসে ফের বিল-খাল শুকিয়ে চর জাগিয়ে দেয়, তা তো নদীর মিলন-রিবহেরই খেলা। নদীর সঙ্গে কথা বলত মঙ্গল ফকির। শামসু মিয়া কতদিন দেখেছে, আড়াখোলার চরে দাঁড়িয়ে ফকির একা একা কার সঙ্গে যেন কথা বলছে। প্রথমে ভেবেছিল, ফকিরকে জিন-ভুতে আসর করল বুঝি। কিন্ত মঙ্গল ফকির নিজে থেকেই একদিন শামসু মিয়াকে বলেছিল-- জিন-ভুত কিছু নারে শামসু, আমি নদীর সাতে কথা কই। পৃ: ৫৩।  এ কয়েকটি বাক্যই উপন্যাসটির পরমাত্মা। এখানেই নদীর আসল রূপটি ভাববাদ আর প্রকৃতির সাথে এক হয়ে গেছে। নোমানের শব্দ চয়নের প্রশংসা করতেই হয়।
জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি একই স্থানে একটি জীবন কাটিয়ে দেবার সার্থকতা নেই। বড় একঘেয়ে এ জীবন। তাই পালিয়ে যাচ্ছে ইনুস। আর কিছু না থাক- বৈচিত্র আছে যাযাবর জীবনের। আছে ভয়-শঙ্কা-উত্তেজনা। স্থায়ী জীবনের একতরফা সুখ কিংবা একতরফা দু:খ বড় বেশী ক্লিশে (মানে?)। পৃ: ১৫০। এসবই বিবাহ থেকে পালিয়ে যাবার জন্য  ইনুসের যুক্তি। পাঠক-পাঠিকারা গ্রহন করবেন কি?
আরো কিছু যুক্তি: তাকে পেতে হলে যে অসংখ্য নিকটজন হারাতে হয় ইনুসকে (কিন্ত আমরা তো জানি, ইনুসের আসল নিকটের জন একজনই, মঙ্গল ফকির)। তারচেয়ে বরং একজনই চলে যাক (হায় দিনু!) জীবন থেকে। খুব বেশীদিন থাকে না মানুষের শোক। চৈত্রমাসের খাল-বিলের মতো শোকও এক সময় শুকিয়ে যায়। একদিন সকল দু:খ-শোক মুছে ফেলে অন্য বরে সমর্পিত হয়ে দিনুরাই বিস্মৃত হবে সকল অতীত। পৃ: ১৫০
এমনি হয়ে আসছে সহস্র বছর থেকে। এটা কোন লড়াকু প্রেমিকের কথা নয়। বরং পলায়নপর এক দাদা-অন্ত-প্রাণ নাতীর। এ সময়েও যে সে সত্যিকার সাহসী বা সাবালক হয় নি তা বোঝা যায়।
আসুন আমরা শেষবারের মত মঙ্গল ফকিরের দোতারা বাজানো শুনি। আজ কেন যেন দোতারার সুর সবার মনে ভিন্ন দ্যোতনার সৃষ্টি করল। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর সবাই বেড়ী বাঁধের উপর গোল হয়ে বসে নিবিষ্ট চিত্তে ফকিরের দোতারার সুরে মগ্ন হয়ে পড়েছে। বয়সী দু-একজন সান্দারনীর চোখের কোন বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা অশ্র“ গড়িয়ে পড়ছে। শিমুলকান্দি বাজার, বাজারের মাঝখানে সেই কৃঞ্চচূড়া গাছ, যৌবনোচ্ছুসিত আড়ালেখা, জেলে পাড়া, তারপর টানকা ঘাট হয়ে তালজঙ্গা-  একে একে সব দৃশ্য যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে সবার চোখে। এখন আবার অচেনা এক ঘাটে এসে নোঙর করেছে সবাই। এ কোন নিয়তি তাদের? পৃ: ৭১
জলেস্বর মঙ্গল ফকিরের কাহিনী, ইনুসের শৈশব, বয়োসন্ধি আর প্রেমের কাহিনী, এক বহর সান্দার-সান্দারনীর কাহিনী। এ কাহিনীর শুরু বিবর্তনের পথ বেয়ে এবং শেষ হবে যেদিন কোটি কোটি বছর পরে আমাদের এই প্রিয় পৃথিবী মৃত হয়ে বিশ্ব ব্রম্মান্ডে মিশে যাবে, সাথে সৌর জগতের অন্যরাও এবং সব শেষে প্রপিতামহ সুর্য!
এমনি করে একদিন এ মহাশুন্যেরও অবসান ঘটবে, আরেক ব্রম্মান্ডের আগমন হবে, নতুন প্রাণের বার্তা নিয়ে। আমি এ বইটির বহুল প্রচার কামনা করি।
আমাদের আত্বাটিও একই পথের পথিক। অবিনশ্বর থেকে বিচ্যুত হয়ে সে পদার্থে এসে মেশে। সেখানে সে মেঘের মতই শোকের পাহাড় আর আনন্দের উপত্যকার উপর দিয়ে ভেসে বেড়ায়। যে পর্যন্ত তার গায়ে মৃত্যুর একটিও পরশ না লাগে। তারপর সে ফিরে যায়, যেখান থেকে সে এসেছিল। ভালাবাসা আর সৌন্দর্যের সমুদ্রে, বিধাতার কাছে------                            

খলিল জিবরান: একটি অশ্রু এবং একটি কান্না।
আবদুল্লাহ আল-হারুন
alharun@gmx.de






Untitled Document
Total Visitor : 708734
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :