Untitled Document
আশ্বিন সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল
- মার্জিয়া লিপি
 
 
(পূর্ব প্রকাশের পর)

উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতাঃ
জীবমন্ডলে প্রত্যেক প্রজাতির নিজস্ব ভূমিকা ও গুরুত্ব রয়েছে। জীবমন্ডল হচ্ছে বিভিন্ন উদ্ভিদ এবং প্রাণীর সমাহার যা মানুষের টিকে থাকার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। পরিবেশের সব কিছুই পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থেই এই জটিল সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিপুল সংখ্যক জীবের তৎপরতার মধ্য দিয়ে পরিবেশে এই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

জীববৈচিত্র্যের প্রাকৃতিক, পরিবেশিক ও অন্তর্নিহিত মূল্য অপরিসীম । কেবলমাত্র অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কারণেই জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রয়োজনীয় তা নয়, সৌন্দর্য্যবোধ, উপযোগিতা, চিত্তবিনোদন, নানা প্রকার দূষণ নিয়ন্ত্রণে তার ভূমিকা রয়েছে। জ্বালানী কাঠের চাহিদা মেটাতে গিয়ে নষ্ট হচ্ছে স্রোতজ  পানির বন। ফলে ধ্বংস হচ্ছে উপকূলীয় এলাকার পানি। বিভিন্ন ঝিনুক, ম্যাডক্র্যাবস, পানি পরিশোধন ও মাটিতে অক্সিজেন সংমিশ্রন আগের মতো ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলে বায়ুমন্ডলে কার্বনের আধিক্যে জীবের পরিবেশ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানব সভ্যতা চিরকাল প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতিকূলের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের উপর নির্ভরশীল, মানব গোষ্ঠীর উন্নতি, স্বাস্থ্যরক্ষা তথ্য জীবনমান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উপকূলীয় পরিবেশ ধ্বংস শুধুমাত্র প্রাকৃতিক দূর্যোগের ঝুঁকিই বাড়ায়না উপরন্তু পরিবেশে বিদ্যমান প্রজাতিগুলোও নিঃশেষ হয়ে যায় চিরতরে।

একবার একটি প্রজাতি বিলুপ্ত হলে তার সাথে আংশিক বা সর্বাঙ্গীনভাবে জড়িত অন্যান্য প্রজাতি, উপপ্রজাতিগুলোও বিকলাঙ্গ বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। মানব সভ্যতা বিস্তারের সাথে সাথে প্রাকৃতিক পরিবেশ বেষ্টিত জায়গা ক্রমেই কমে  আসছে।

মূলত প্রাকৃতিক পরিবেশের আবর্তন, বিভিন্ন খাদ্যচক্রকে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে বন্যপ্রাণীই নিয়ন্ত্রণ করছে এবং এ চক্রেরই একটি প্রান্তে মানব জাতির অবস্থান। প্রাণী ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের বিলুপ্তির পরিণতিতে ভবিষ্যতে অনেক মূল্যবান খাদ্য, শিল্প ও স্বাস্থ্যের জন্য বিকল্প সম্পদ থেকে বঞ্চিত হবে মানব সমাজ। প্রাণী, উদ্ভিদ ও মানুষের মাঝে ঘটে মিথষ্ক্রিয়া। তারা পরস্পর নির্ভরশীল হয়ে পরিবেশের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একে অপরকে সাহায্য করে।

উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে করণীয়ঃ
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে দেশের সরকারী প্রশাসনে নীতি নির্ধারকদের সচেষ্ট হতে হবে। পরিবেশের টেকসই উন্নয়নে সময়োপযোগী নীতিমালা বা আইন তৈরী করতে হবে। কোথায় কোন প্রজাতির বিপন্ন উদ্ভিদ বা প্রাণী আছে এবং কিভাবে তাদের রক্ষা করা যায় এ বিষয়ে মত বিনিময়ের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও জীববৈচিত্র্যে সংরক্ষণে নিয়োজিত সংস্থা ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয় করে কার্যক্রম বাস্তবায়িত করতে হবে।

প্রজাতি সংরক্ষণ কর্মসূচী গ্রহণ করে সমাজে সর্বস্তরের বিশেষ করে সম্পদ আহরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জনগণের  সচেতন দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতে হবে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পক্ষে জনমত সৃষ্টি ও জনসাধারণকে এ বিষয়ে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করণের লক্ষ্যে গণশিক্ষা, প্রচার ও অংশগ্রহণ ভিত্তিক কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে।

                                         
চতুর্থ  অধ্যায়

উপকূলীয় পরিবেশে মৎস্য

বাংলাদেশর আর্থ-সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে মৎস্য সেক্টরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে তথা জিডিপিতে মৎস্য সেক্টরের অবদান প্রায় ৫.৩%, যা কৃষি খাতে উৎপাদিত মোট মূল্যের প্রায় ১৮% (সাম্প্রতিক ডাটায়)। আমাদের দৈনন্দিন প্রাণীজ আমিষের শতকরা ৬০ ভাগ যোগান দিচ্ছে মাছ। এ সেক্টরের সাথে সার্বক্ষণিকভাবে ১২ লক্ষ এবং খন্ডকালীনভাবে ১ কোটি ২০ লক্ষ জনগোষ্ঠী সম্পৃক্ত থেকে তাদের জীবিকা নির্বাহ করার পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর প্রাণিজ  আমিষের চাহিদা পূরণ, দেশের জন্য মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, আত্ম কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, পরিবেশের উৎকর্ষতা বৃদ্ধিসহ দারিদ্র বিমোচন  কর্মকান্ড সম্পাদিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে মৎস্য উৎপাদন ও আহরনের উৎস হচ্ছে অভ্যন্তরীণ জলাশয় এবং সামুদ্রিক এলাকা। অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের পরিমান প্রায় ৪৩.৩৭ লক্ষ হেক্টর। এর মধ্যে প্লাবন-ভূমি সহ মুক্ত জলাশয় ৪০.৪৭ লক্ষ হেক্টর এবং উপকূলীয় চিংড়ি খামার সহ বদ্ধ জলাশয় ২.৯০ লক্ষ হেক্টর।

দেশের ৭১০ কিলোমিটার তটরেখার কাছাকাছি বেইস-লাইন থেকে সাগরে  ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা আমাদের আওতাধীন জলসীমা। এর ফলে প্রায় ১,৬৪,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা দেশের সামুদ্রিক জলসীমা হিসাবে অন্তর্ভূক্ত- যা দেশের মূল ভূ-খন্ডের আয়তনের চাইতেও বড়। এই জলসীমায় আহরণযোগ্য প্রচুর চিংড়ি ও মৎস্য প্রজাতির ছাড়াও রয়েছে অনাহরিত বিপুল মৎস্য সম্পদ।

উপকূলীয় অঞ্চলে মৎস্য সম্পদঃ

বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চল অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং সমুদ্র তটরেখার বিস্তৃতি প্রায় ৭১০ কিলোমিটার। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে মাছ চাষের তেমন বিস্তৃতি না থাকলেও অপরিকল্পিতভাবে চিংড়ি চাষের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। উপকূলীয় অঞ্চলে ৬৪,২৪৬  হেক্টর চিংড়ি খামারের স্থলে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে তা বর্তমানে ১,৪১,৩৫৩ হেক্টরে উন্নীত হয়েছে। এদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বর্তমানে হেক্টর প্রতি চিংড়ি উৎপাদনের হার ৩০০-৩৫০ কেজি। পৃথিবীর চিংড়ি উৎপাদনকারী দেশ সমূহের তুলনায় এ উৎপাদন অনেক কম। তবে, এ সকল চিংড়ি খামারের উপর প্রত্যক্ষ ভাবে প্রায় ৪ লক্ষ জনগোষ্ঠী সহজে তাদের  জীবিকা  নির্বাহ করছে।

উপকূলীয় অঞ্চলে চিংড়ির উৎপাদন বৃদ্ধি ও বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ, বৃদ্ধির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। মোহনা অঞ্চল, সুন্দরবনে সংরক্ষিত জলাভূমি, বেসলাইন জলভূমি ও আন্তর্দেশীয় অঞ্চলের জলাশয় বিদ্যমান।

প্রাকৃতিক উৎসে ব্র“ড থেকে পোনা উৎপাদিত হয়। এরা উৎপাদন চক্রের বিভিন্ন অবস্থায় বিভিন্ন অবস্থানে থাকে। আঁতুড় অবস্থায় পোনা উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বা প্যারাবনে আসে একটু বড় হবার পর এরা আবার গভীর সমুদ্রে ফিরে যায়। ধীরে ধীরে বাণিজ্যিকভাবে আহরণ উপযোগী এবং পরবর্তীতে ব্র“ডে রুপান্তরিত হয়।
বাংলাদেশের মৎস্য উৎপাদনের ২২-২৫ ভাগই আহরিত হয় সমুদ্র থেকে।

সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদঃ
আমাদের সামুদ্রিক মৎস্য ও মৎস্যজাতীয় সম্পদের মধ্যে  রয়েছে ৪৭৫ প্রজাতির মাছ, ২৫ প্রজাতির চিংড়ি, ৫ প্রজাতির লবষ্টার, ১৫ প্রজাতির কাঁকড়া, ১২ প্রজাতির শিরোপদী, ৬ প্রজাতির  কস্তুরা, ৩০১ প্রজাতির ঝিনুক/ শামুক, ৩৩ প্রজাতির সাগর  কুসুম, ১১ প্রজাতির তিমি/ডলফিন, ২ প্রজাতির তারা মাছ, ৩ প্রজাতির স্পঞ্জ,  ৪ প্রজাতির কচ্ছপ, ৫৬ প্রজাতির শৈবাল, ১৩ প্রজাতির প্রবাল এবং সাগর শসা, সজারু, কুমির ইত্যাদি।

সামুদ্রিক তলদেশীয় মাছঃ
দেশের সামুদ্রিক জলসীমায় আহরিত মৎস্য প্রজাতির মধ্যে অধিকাংশই তলদেশীয় মাছ। প্রধান আহরিত তলদেশীয় মৎস্য প্রজাতি হচ্ছে, ফলি চান্দা, রুপচান্দা, সাদা দাতিনা, রাঙ্গা চইক্ক্যা, লাউখ্যা, ছুরি, লাল পোয়া, কামিলা এবং কোরাল ইত্যাদি।

সামুদ্রিক উপরিস্তরের মাছঃ
দেশের সামুদ্রিক জলসীমায় উপরিস্তরের সামুদ্রিক মৎস্যের উপর এখনও কোনো ব্যাপক জরীপ পরিচালিত হয়নি। তবে বিভিন্ন সময়ে তলদেশীয় মাছ ও চিংড়ি সম্পদ জরিপকালে এবং বাণিজ্যিক ট্রলারের জালে বাই-ক্যাচ হিসাবে যেসব উপরিস্তরের সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যায়, সেগুলি হচ্ছে চ্যাপা কড়ি, মাইট্র্যো ও চম্পা, টুনা মাছ, সারডিন, ক্লপিডস, হাঙ্গর ও ক্যারাঞ্জিড।

অপ্রচলিত সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদঃ
অনেক প্রজাতির মৎস্য রয়েছে যা অপ্রচলিত, যেমন- লবষ্টার, শিরোপদী, কাঁকড়া, কস্তুরা, ঝিনুক, সামুদ্রিক শসা, শৈবাল ইত্যাদি।

 

চিংড়িঃ
প্রাপ্তবয়স্ক সামুদ্রিক চিংড়ি সাগরে  ট্রলার জাল দ্বারা এবং পোনা ও অপ্রাপ্ত চিংড়ি উপকূলীয় ও মোহনা অঞ্চলে বিভিন্ন সনাতনী জাল দ্বারা আহরিত হয়ে থাকে। উল্লেখযোগ্য চিংড়ি প্রজাতি হচ্ছে- বাগদা, বাধাতারা, ডোরাকাটা, চাগা, বাঘ চামা, হরিণা, ললিয়া এবং রুড়া। উল্লেখিত চিংড়ি প্রজাতির মধ্যে বাগদা চিংড়ির মূল্য স্থানীয় ও  আন্তর্জাতিক বাজারে  বেশী থাকায়, এর বাণিজ্যিক আহরণ বেশী। তবে মোট চিংড়ি উৎপাদনের সর্বাধিক অবদান রাখে হরিণা চিংড়ি।

উপকূলীয় অঞ্চলে চিংড়ি চাষের ইতিহাসঃ
১৯৫০ সালের  সর্বপ্রথম সাতক্ষীরা জেলায় চিংড়ি চাষ শুরু হয়। ষাটের দশক হতে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জোয়ারের পানি বাঁধ দিয়ে আটকিয়ে রেখে পানির সাথে আগত চিংড়ি ও মাছের পোনাকে ৩-৪ মাস লালন-পালন করে তা আহরণ করা হয়। পরবর্তীকালে বিশ্ব বাজারে চিংড়ির চাহিদা বৃদ্ধির  সাথে সাথে দেশে চিংড়ি চাষের বিস্তৃতি ঘটতে থাকে।

চিংড়ি চাষের এলাকাঃ
বর্তমানে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাংশে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট ও কক্সবাজার জেলার      ১ লাখ ১৯ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে  চিংড়ি চাষ হচ্ছে। যার মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ জমি বৃহত্তর খুলনা জেলায় অবস্থিত। এছাড়াও  দেশের ১৬টি জেলায় প্রায় ১২ হাজার হেক্টর জমি গলদা চাষের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। বিভিন্ন বাঁধ কোট, নদী-খালের লবণ পানি ঢুকিয়ে জমিতে ছোট বড় বেড়ী বাঁধ দিয়ে অপরিকল্পিত ভাবে চিংড়ি চাষ করা হচ্ছে। স্থানীয় ভাবে একে চিংড়ি ঘের বলা হয়। ধানের চেয়ে চিংড়ি উৎপাদনের প্রায় ১০ গুণ বেশী আয় হয় ফলে দিন দিন একদিকে যেমন ধান চাষের জমির পরিমান কমছে অন্যদিকে চিংড়ি চাষের আওতায় আনা জমির পরিমাণ বাড়ছে। যে  সকল জমিতে ধান ও চিংড়ি দু’টো ফসল সেখানে ধানের উৎপাদন ও মান ক্রমান্বয়ে কমছে।

চিংড়ি চাষ ও পরিবেশঃ
চিংড়ি চাষ ও পরিবেশ তৈরী হয়। চিংড়ি চাষের কারণে পরিবেশ দূষণ, ইকোলজিক্যাল ভারসাম্যহীনতা, পরিকল্পনাহীনতা ও অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষের ফলে পরিবেশ ও প্রতিবেশের নানা বিপর্যয় বিশেষত উপকূলীয় বাস্তু-সংস্থান ধ্বংস হচ্ছে।

বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৬,৮৭,০০০ হেক্টর ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল বা প্যারাবন রয়েছে। প্যারাবন উপকূলীয় অঞ্চলের মাটি ও পানির পুষ্টি চক্র (ঘঁঃৎরবহঃ ঈুপষব)  সমাধান করে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করে। উপকূলীয় জোয়ার-ভাটার, স্বাদু ও লবণ  পানির মিশ্রন স্থলে প্যারাবন বিশেষ বাস্তুসংস্থানগত ভারসাম্যতায় সামুদ্রিক জীবদের আঁতুড় অবস্থায় খাদ্য আহরণ ও বেঁচে থাকার পরিবেশ সৃষ্টি করে। প্যারাবন নির্মুলের ফলে উপকূলীয় ভূমিক্ষয় বৃদ্ধি পায়, সামুদ্রিক তলানি (ঙপবধহরপ ঝবফরসবহঃধঃরড়হ ) পদ্ধতিতে পরিবর্তন সাধিত হয়, তটরেখার দীর্ঘস্থায়ীত্ব হুমকির সম্মুখীন হয় এবং সর্বোপরি উপকূল ভাগ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় সম্পূর্ণ অরক্ষিত থাকে। একসময় আমাদের দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে অনেক প্যারাবন ছিলো। কক্সবাজার অঞ্চলের অধিকাংশ প্যারাবন চিংড়ি চাষের আগে-পরে অবলুপ্ত হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত কারণে প্রাথমিকভাবে উপকূলীয় প্যারাবন পরিষ্কার করে চাষাবাদ শুরু হয় এবং পরবর্তীতে এর অংশ বিশেষ চিংড়ি খামারে পরিনত হয়। ধারণা করা হয়, ম্যানগ্রোভ অঞ্চল ধ্বংসের কারণে কক্সবাজার অঞ্চলের এ অংশে উপকূলীয় প্রাকৃতিক দূর্যোগের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

উপকূলীয় চিংড়ি চাষ, যা মূলত বৈদেশিক বাণিজ্যমুখী এবং এর বিকাশ ঘটেছে অত্যন্ত দ্রুত ; কিন্তু অপরিকল্পিত, অনিয়ন্ত্রিত এবং সমন্বয় ছাড়া। উপকূলীয় চিংড়ি চাষের প্রসারের সাথে সাথে পরিবেশগত, বাস্তুসংস্থানগত এবং জীব-বৈচিত্র্যের উপর  এর কি কি প্রভাব পড়ে এ সম্পর্কে আনুপুঙ্খিক সমীক্ষা হয়নি। বিচ্ছিন্নভাবে যেসব কাজ হয়েছে তার ফলাফল এবং সম্ভাব্য প্রভাবের সাথে প্রত্যক্ষ যোগসূত্র নির্নয় করা সম্ভব নয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় প্রাকৃতিক উৎস থেকে বাগদা চিংড়ি পোনা আহরণ কালে ১০০-১০৫ টি প্রজাতির মাছ ও অন্য প্রজাতির চিংড়ি পোনা মারা যায় এবং বহু অদেখা ক্ষুদ্র জলজ প্রাণীর রেনু ও পোনা নষ্ট হয়ে বঙ্গোপসাগর মৎস্য শূন্য হয়ে পড়ছে। সংরক্ষিত সুন্দরবনের নদী-খাল থেকে চিংড়ির পোনা ধরতে গিয়ে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা চরের বিপর্যয় হওয়া ছাড়াও বন্যপ্রাণীর জীবনচক্র বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে, চিংড়ির পোনা সংগ্রহকালে নির্বিচারে নিধন হচ্ছে অসংখ্য ছোট ছোট গাছপালা। এভাবে চিংড়ি চাষের ফলে উপকূলীয় এলাকায় পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

দূষণের শিকার উপকূলীয় মৎস্য সম্পদঃ
উপকূলীয় অঞ্চল মাছের জন্য বিখ্যাত। কিন্ত প্রতিবছরই  নদ-নদীতে লবণাক্ততার পরিমান ও স্থায়ীত্ব বেড়ে যাচ্ছে। পূর্বে সামান্য বৃষ্টি ও হিমালয়ের বরফ গলা পানির স্পর্শ পেলেই লবণ দূরীভূত হয়ে যেতো। কিন্তু বর্তমানে প্রবল বর্ষণেও লবণ দূরীভূত হয় না। লবণ পানির প্রভাবে মাটি ও ভূ-গর্ভে লবণাক্ততার পরিমান বাড়ছে।

বঙ্গোপসাগরে ব্যাপক দূষণের ফলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে মাছের মজুদ দ্রুত কমে যাচ্ছে। দূষণ যদি এই মাত্রায় চলতে থাকে তবে এই মজুদ আরও কমে যাবে। এর ফলে ডানাওয়ালা ও খোলশমুক্ত মাছের প্রজাতিগুলো একেবারেই হারিয়ে যেতে পারে। যেসব কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের জলীয় পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে সেগুলো হলো-  শিল্পের বিষাক্ত আবর্জনা, নৌযান থেকে চুইয়ে পড়া  তেল, অপ্রয়োজনীয় মাছ সমুদ্্ের ফেলে দেয়া, বেআইনী ও বেশী পরিমানে মাছ শিকার, পলি জমা হওয়া এবং দীর্ঘসময় বন্যার পানি জমে থাকা, উজান থেকে বেশি পরিমানে আবর্জনা বয়ে আসা, কৃত্রিম হ্যাচারি, বঙ্গোপসাগরে মাছের মজুদ সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং মৎস্য খাতের নানা অব্যবস্থাপনা। মাছ থেকে শুটকি তৈরীর সময় এতে যে কীটনাশক ও রাসায়নিক উপাদান মেশানো হয় সেগুলো চুইয়ে পানিতে মেশে। এই বিষ উপকূলীয় অঞ্চলের উদ্ভিদ ও প্রাণীর সহাবস্থানে থাকা প্রতিবেশ ধ্বংস করে দিতে পারে। ফলে মাছের খাদ্য জুপ্লাংকটন এবং ফাইটোপ্লাংকটনের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের ক্ষতি হতে পারে ও হুমকির সম্মুখীন হতে পারে উপকূলীয় জীব বৈচিত্র্যতা। শিল্পের বর্জ্যের সাথে সাথে চিংড়ি ঘের, ভবিষ্যতে মাছের বংশ বিস্তারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।

কৃষিতে যেসব রাসয়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহৃত হয় সেগুলোও উপকূলীয় মাটি ও পানি দূষণের জন্য দায়ী। এসব কারণে বঙ্গোপসাগরের দূষণ চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে এ অঞ্চল, মাছের বসবাসের অনুপোযোগী হয়ে পড়বে, বিনষ্ট হবে অর্থনৈতিক অবস্থা, জীবনযাত্রা এবং জীববৈচিত্র্য।

প্রতিক্রিয়াঃ
      উপকূলীয় এলাকার মাটি, খাল,পুকুরে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া।
      চারণভূমির পরিমান কমে যাওয়ায় গো-খাদ্যের অভাব, গৃহপালিত পশু-পাখির সংখ্যা কমে যাওয়া।
      ফসলের নিবিড়তা ও ফসল চক্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া
      চিংড়ি ঘেরে  লবণ পানি আটকে রাখার ফলে মাটিতে ও ভূ-গর্ভস্থ স্তরে ক্রমাগত লবন পুঞ্জিভূত হচ্ছে।
      সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় অসংখ্য ঘের গড়ে তোলায় লবণ পানির প্রবাহ ক্রমশঃ উত্তরমুখী  হয়ে দ্রুত ধাবিত হচ্ছে।
      লবণাক্ততার বৃদ্ধির কারণে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে।

 

সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা ও উন্নয়ন কৌশলঃ
উপকূলীয় জলাশয়গুলোতে বাগদা পোনা আহরণকালে পোনার সাথে বিভিন্ন প্রজাতির চিংড়ি, জুপ্ল্যাংকটন ও সাদা মাছের লার্ভা প্রচুর পরিমানে ধরা পড়ে, যেগুলো একে অন্যের খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়। খাদ্য পিরামিডের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় পিরামিডে বড় প্রাণীদের তুলনায় ছোট প্রাণীরা সবচেয়ে বড় স্থান দখল করে আছে। বড় প্রাণীগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ছোট প্রাণীদের উপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন বিভিন্ন প্রজাতির অসংখ্য লার্ভা বিনষ্ট হওয়ায় প্রাণীকূল থেকে এক বিরাট অংশ হারিয়ে যাচ্ছে। ব্যহত হচ্ছে তাদের প্রজনন ও ডিম দেওয়ার ক্ষমতা। উন্নয়নমূলক কাজের জন্য অন্যদিকে  বিনষ্ট হচ্ছে জলজ প্রাণীদের বিচরণ ভূমি।

জীবের বৈচিত্র্য ও উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য অতিদ্রুত নিম্নের পদক্ষেপ নেয়া আবশ্যকঃ

উপকূলীয় ভূমি ব্যবহার নীতিমালা প্রনয়ণ ও ভূমির শ্রেণী বিন্যাস করে স্থানীয় সুযোগ সুবিধা ও পরিবেশ সহনীয় লাগসই প্রযুক্তি ভিত্তিক চিংড়ি চাষ জোন নির্ধারণ ও চিংড়িচাষের আলাদা নীতিমালা প্রনয়ণ।
পরিবেশ অনুকূল সম্ভাব্য স্থানে ক্রমান্বয়ে আধা নিবিঢ় ও নিবিঢ় চাষ সম্প্রসারণ।
চিংড়ির পর মাছ বা চিংড়ির পর কৃষি ফসলের উৎপাদন আবর্তন বজায় রেখে রোগ প্রতিরোধ এবং পরিবেশ অনুকূল চিংড়ি চাষ প্রবর্তন।
চিংড়ি খামারের পানি সরববাহ ও নিষ্কাশন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও অন্যান্য আনুষাঙ্গিক অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ বা সহজ শর্তে ঋণ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধান।
চিংড়ির প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র ও নার্সারী এলাকা সংরক্ষণ এবং এর প্রজনন মৌসুমে ট্রলিং এর মাধ্যমে চিংড়ি আহরণ নিষিদ্ধ করণ।
ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ধ্বংস বন্ধ এবং খামার/ঘের ও নদী তীরের মাঝে যে ভূমি রয়েছে তাতে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সৃষ্টি।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব সম্পন্ন মাছ চাষ সম্প্রসারণ।
চিংড়ি/ মাছ চাষ সহায়ক সকল সরঞ্জামদি ও উপকরণাদি সহজলভ্য করা ও প্রয়োজনে আমদানি করা।

(চলবে)
     
Untitled Document
Total Visitor : 708638
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :