Untitled Document
আশ্বিন সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
আমি একজন মানুষঃ রণজিৎ বাওয়ালীর জীবনী
- লিঠু মণ্ডল
 
জন্মঃ
প্রচণ্ড বন্যায় সমস্ত এলাকা পানির নীচে তলানো। চারদিকে পানি শুধু পানি। তিনবোন সহ বাবা-মার অভাবের সংসার । ঘরের ভেতর পানি তাই মাচা বানিয়ে কোনোরকমে টিকে আছে পরিবারটি। এ অবস্থাতেই জন্ম হলো এক শিশুর। জন্মেই দারিদ্র্য আর প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখি হওয়া এই শিশুটিই একদিন কঠোর সংগ্রাম করতে করতে হয়ে গেলেন রণজিৎ বাওয়ালী। বিরূপ প্রকৃতি আর সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তার সংগ্রাম আজন্ম এবং আমৃত্যু। কখনো গণমানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে মাঝের মানুষটি তিনি, আবার কখনোবা গানই তার প্রতিবাদ-প্রতিরোধের হাতিয়ার।

রণজিৎ বাওয়ালীর বাবা আশুতোষ বাওয়ালী, মা রঙ্গবালা বাওয়ালী। বাংলা ১৩৪৮ সালে যশোরের অভয়নগর থানার ডুমুরিয়া গ্রামে তার জন্ম।

ঠাকুরদাদারা ছিলেন দুই ভাই। নিজ ঠাকুরদাদার নাম কেতু বাওয়ালী, আরেক ভায়ের নাম মধু বাওয়ালী। ঠাকুরদাদার পাঁচ ছেলেমেয়ে। এক ছেলে, চার মেয়ে। একমাত্র পুত্র আশুতোষ বাওয়ালীর সন্তান সংখ্যা দশ। দশ ভাইবোনের মধ্যে রণজিৎ চতুর্থ। ভাই-বোনদের মধ্যে তিনি ছাড়া আর তার ধলে ভাই সমর, হরিলুঠ এবং অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানে একটু-আধটু গান গেয়ে থাকেন। একভাই শচীন ভারতে ঠাকুরনগরে চলে গেছেন তাছাড়া আর সবাই বাংলাদেশে থাকেন।  ছোটভাই বিজন কবিরাজী করেন। বাদবাঁকী সবাই ক্ষেতে-কামারে কাজ করেন। আমি তার কাছে কথা প্রসঙ্গে, জাত-ধর্মের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন-“ আমি একজন মানুষ। মানবতাই আমার ধর্ম। আমার কোনো জাত-পাত নাই।”

শৈশবঃ
জন্মের পর থেকেই করালগ্রাসী পোড়ামুখী অভাবকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকতে দেখেছেন। বাবা কৃষিকাজ করতেন। খেজুর গাছ কাটা, জন দেয়া, জমি চাষ করা প্রভৃতি কাজ করেতেন। এ করেই চালাতে হতো তার সংসার। ছেলেবেলা আবার তার লেখাপড়ার প্রতি বিশেষ ঝোঁক ছিল। অভাবের মধ্যেই তিনি তার সাত বছর বয়সে ভর্তি হলেন পাঠশালায়।  পাঠশালাটি চলতো গ্রামের লোকজনের টাকায়। পাঠশালায় শিক্ষক ছিলেন মাত্র একজন। শিশুবর টিকাদার। সম্পর্কে তার ভগ্নিপতি। রণজিৎ বাওয়ালী ছোটবেলা থেকেই ছিলেন ডানপিটে, তবে পড়াশুনার প্রতি ছিল তার প্রচণ্ড আগ্রহ। আর এ কারণেই পাঠশালার শিক্ষক তাকে প্রচণ্ড ভালবাসতেন। তবে দুষ্টুমির কারণে শাস্তি দিতেও কমতি করতেন না। প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উঠেছিলেন। দ্বিতীয় শ্রেণীতে কিছুদিন পড়ার পর পাঠশালায় গিয়ে পড়া আর কোনোদিন হয়ে ওঠেনি। তিনি পাঠশালা থেকে শিখেছিলেন-

স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, বানান, কাঠা, সের, পণ, শতকিয়া, গণ্ডা, কুড়ি, কড়া প্রভৃতি বিষয়গুলো।

পড়াশোনার পাশাপাশি গানের প্রতি তার ঝোঁক শিশুবেলা থেকেই ছিল। তার ইচ্ছা ছিল বড় হয়ে ভাল একজন গায়ক হবেন। খুব ইচ্ছা জাগতো অষ্টকের দলের সাথে ঘুরে ঘুরে গান করা। বন্ধুরা সব যেত- কিন্তু বাবা তাকে যেতে দিত না। 

 
কৈশোরঃ
দ্বিতীয় শ্রেণীতে ওঠার পর অভাবের কারণে তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। স্কুলে গেলে পাছে বাবা মারধোর করেন এ ভয়ে তিনি আর স্কুলে যাননি। কিন্তু পড়াশোনা তিনি থামাননি। সহপাঠীদের কাছ থেকে বই ধার করে নিয়ে এস সারাদিন বাবার সাথে জন বিক্রি করার পর সন্ধ্যায় বইগুলো পড়তেন। এভাবে মেট্রিক অবধি তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে যুক্ত থাকেন। পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি অন্যান্য বইও তিনি পড়তেন।

৭/৮ বছর বয়সেই পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে বাবার সাথে কৃষিকাজে নেমে পড়েন। একটু বড় হলে কৃষিকাজের পাশাপাশি বাধা জন দেবার কাজ শুরু করেন। জীবনধারণের জন্য দিনের পর দিন তাকে এ কাজগুলোই করে যেতে হয়। এখন অবধি তিনি এ কাজের মাধ্যমেই জীবন চালান। বাদা জনবিক্রি করতে গিয়ে তিনি গাছমারা, মাটিকাটা, পাতামারা, জমি লাগানো, ভুঁইরোয়া ইত্যাদি- যখন যে কাজ পেয়েছেন তাই করতেন। বিরে ভুঁই নিড়াতে নিড়াতে কেউ গান ধরলে ছেলেবেলা থেকেই তিনি ধুয়ো টানতেন। আবার কখনো সখনো গাওযারও চেষ্টা করতেন। বাড়ি ফিরে খুব সন্তর্পনে গানটি আবার গাওয়ার চেষ্টা করতেন। বাবা শুনে ফেললে পিটুনির ভয়তো ছিলই!  ছেলেবেলা থেকে গানের প্রতি প্রবল  এই আগ্রহ তাকে আজকের রণজিৎ বাওয়ালীতে পরিনত করেছে। 

(চলবে)  
     
Untitled Document
Total Visitor : 708643
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :