Untitled Document
আশ্বিন সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
শ্লোগান
-মাহবুব আলম

ব্যবসায়িক স্বার্থে কেউ যদি সাধারণের মনোরঞ্জনের জন্য একটি ছবি করেই বসে তাহলে কারো কিছু বলার থাকে না। কিন্তু তাতে যদি শিল্প-চিন্তার প্রশ্ন জড়িত থাকে তবে অবশ্যই ভাববার কথা। আর ছবিটি যখন বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক-ঔপন্যাসিক শহীদুল্লাহ কায়সার এবং লেখক-চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানকে উৎসর্গ করে।
‘শ্লোগানের’ সাংবাদিক সম্মেলনে এবং মহরৎ অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বকনিষ্ঠ এই তরুন পরিচালক কবীর আনোয়ারের বিপ্লবী কণ্ঠস্বর ক্রমশ ক্ষীণ হতে থাকে। ‘কম্প্রোমাইজ’ তার প্রতিবাদের বিরুদ্ধ শব্দ হয়ে দাঁড়ায়। এবং ছবিটি রিলিজের পূর্বে তাকে নির্দ্ধিধায় স্বীকার করতে হয়- “শ্লোগান সম্পূর্ণরূপে একটি বাণিজ্যিক ছবি।’’এর চাইতে প্রবঞ্চনার আর কী হতে পারে। আসলে কি, কমার্শিয়াল ছবি মানেইতো কম্প্রোমাইজ। অর্থের সঙ্গে রুচির। ইচ্ছার সঙ্গে অনিচ্ছার। প্রযোজকের সঙ্গে পরিচালকের। যেখানে সত্যিকার অর্থে একজন চিত্রস্রষ্টা অনুপস্থিত। আর আর্ট ফিল্মে ‘কম্প্রোমাইজ’ বলে আদৌ কোন কথা নেই। কবীর আনোয়ার পূর্বেই তাই নিজেকে চিহ্নিত করে নিয়েছেন। কিন্তু এজন্যে তো ‘পারাপারে’র (প্রগতিশীল নাট্য সংগঠন) কবীর আনোয়ারের কোন প্রয়োজন ছিল না- সতী নারী, বাঘা বাঙালী, কে তুমি, রংবাজ, কিংবা অবুজ মনের শ্রদ্ধেয়রাই (!) যথেষ্ট ছিলেন। কই, ঋত্বিক ঘটক, রাজেন তরফদার, আইজেনষ্টাইন কিংবা টনি রিচার্ডসনের বেলায় তো এমন হয় নি। তারাওতো নাট্য আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সৎ চলচ্চিত্র সৃষ্টিতে নিজেদের নিবেদিত করেছেন।
ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় সৃষ্ট একটি জারজ সন্তানকে কেন্দ্র করে শ্লোগানের কাহিনী। এবং কাহিনী বিস্তারে সহায়ক উপাদানগুলো হচ্ছে সমসাময়িক কিছু বিষয়-বিশেষ। যেমন শ্রমিক আন্দোলন, সংবাদপত্রের সীমিত (কিংবা নিয়ন্ত্রিত) স্বাধীনতা, অভিজাত শ্রেণীর উচ্ছৃংখলতার স্বরূপ ইত্যাদি। অবশ্যই এর উদ্দেশ্যমূলে নায়ক-নায়িকার একটি সাজানো প্রেমের গল্প রয়েছে। মরচে ধরা মান-অভিমান, রাগ-অনুরাগ, আবেগ-উত্তেজনা, ইচ্ছাকৃত ভুল বোঝাবুঝি, প্রত্যাখান-বিরহ এবং অবশেষে মিলন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে শ্লোগানের কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপ, গীতরচনা এবং পরিচালনা এ পাঁচটি দায়িত্বই কবীর আনোয়ার নিজের অনুগত রেখেছেন। স্বাভাবিকভাবেই তাই চিত্রনাট্য প্রায় মঞ্চ-ঘেঁষা। ভিন্ন-ভিন্ন চিত্রকল্পে অনেকক্ষেত্রে মঞ্চের আঙ্গিক ব্যবহৃত। শিল্পশৈলিতে আশানুরূপ দুঃসাহসিকতা নেই। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে কবীর আনোয়ার বুঝিবা তেন চলচ্চিত্র-অভিজ্ঞ নন। নতুবা তার সৃষ্টি কিছু দুর্দ্ধর্ষ মুহূর্ত ব্যর্থ বলে আখ্যায়িত হয় কেন?
তাছাড়া ছবির বিষয়বস্তু যখন আধুনিক- অর্থাৎ যুদ্ধোত্তর সমস্যা নয় অথচ সাম্প্রতিক। পরোক্ষে রাজনৈতিক সামাজিক অর্থনৈতিক শ্রেণী চিন্তা। কিন্তু তবু এবং এমন অবস্থায়ও ‘শ্লোগান’ হয়ে পড়ল যথাপ্রচলিত ফর্মুলাভিত্তিক। সংলাপ-সর্বস্ব কাহিনী কেন্দ্রিক। ‘এক থেকে দুই হয়, দুই থেকে তিন’। এভাবে ছুটে চলা-আদি-মধ্য-অন্ত নীতিকে অনুসরণ করে।
তাই অভিজাত শ্রেণীর প্রতি কবীর আনোয়ারের আক্রোশের কারণটাও ঠিক বোঝা গেল না। সুজনের (রাজ্জাক) উঁচুদরের কিছু কথা-বার্তা (যা প্রায়শঃ রাজনৈতিক দলগুলোর মূল্য বিহীন পুস্তিকায় পুনঃ পুনঃ মুদ্রিত হয়ে ঘন ঘন বিতরিত হয়ে থাকে) যেমন নিরর্থক তেমনি প্রশ্নবোধক সাংবাদিক চরিত্রটি অপূর্ণতা। রীতিমত দুবোর্ধ্য এবং অবিশ্বাস্য। এর একমাত্র কারণ বাস্তববোধে অসংগতি। পরিস্থিতি এবং চরিত্রের সমান্তরাল না হলে এটা হবেই। প্রচারধর্মী শিল্প সমাজতান্ত্রিক জীবন ব্যবস্থার কথা সহস্র শ্লোগানে উচ্চারিত হলেও তা জনগণের মনে কোন আবেদনই সৃষ্টি করতে পারবে না, যদি না তাতে বাস্তবের সঙ্গে বিন্দুমাত্র সম্পর্ক না থাকে। ইমোশনাল এফেক্ট-এ নাটক হয়- চলচ্চিত্র সৃষ্টি হয় না।
কেননা চলচ্চিত্রে শব্দের ব্যবহার, সঙ্গীত এবং সর্বোপরি এর কারিগরিগত দিক রয়ে গেছে। সামগ্রিকভাবে ‘শ্লোগান’- এ এর সবগুলোই সম্পূর্ণতা পেতে গিয়েও যেন পায় নি। শেষ পর্যন্ত কিন্তু সম্পাদক (সরাফত হোসেন) দীর্ঘ কিছু বিরক্তিকর সময়ের যতি টানতে পারতেন, অনায়াসে। টানেননি।
ছবিটি নির্মাণকালে ফিল্ম ইন্ডাষ্ট্রির পরিচালকের সঙ্গে নীরবে অসহযোগিতার মনোভাব পোষণ করেছেন এবং সেই সব দু’একজন ঈর্ষাকাতর ভীতু এবং কুচক্রীদের একটি বিশেষ ইচ্ছার মৃত্যু ঘটিয়েছেন পরিচালক কবীর আনোয়ার। এবং সেই সঙ্গে আমাদের অনেকের। অনেক ইচ্ছার, আশার, বিশ্বাসের।
তবু ‘শ্লোগান’- এ কবীর আনোয়ারকে আলাদা করে ভাবা গেছে, যখন দেখি ছবিটিতে হালকা রস পরিবেশনের নামে নিছক ভাঁড়ামির আশ্রয় নেয়া হয়নি। এবং মারপিট নেই ছবিটিতে। আভাস আছে যদিও। যেমন আভাস আছে কবীর প্রতিভার।
পূর্বদেশ
নভেম্বর ১৯৭৩
Untitled Document
Total Visitor : 709971
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :