Untitled Document
কার্তিক সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী

ধ্রুপদী থেকে
(মুহম্মদ খসরু সম্পাদিত পত্রিকা)
ফিল্ম সোসাইটির ভূমিকা
- রণেশ দাশ গুপ্ত
সের্গেই আইজেনস্টাইন বলতেন, “চলচ্চিত্র ও পারমানবিক পদার্থবিদ্যা আমাদের চলতি শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের শ্রেষ্ঠ দুই পদক্ষেপ।” দুটোই যদিও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, চলচ্চিত্র গোড়া থেকেই মানবিক থেকেছে, পক্ষান্তরে পরমাণুবিদ্যা কমবেশি উগ্রই থেকে গেছে। এমনকি বিশ্বমানবের অস্তিত্বের উপর চোখ গরম করে আছে। এ বিদ্যার দানে মানবকল্যাণের চেষ্টা যদিও চলছে তবু শিল্প হয়ে ওঠার এর কাল কেটে গেল। চলচ্চিত্র ওদিকে ইলেকট্রনিক্সের সব সফল কুড়িয়ে, ফটো প্রোজেকশানে অজস্র ভঙ্গিমা খুঁজে পেয়ে নিজে শিল্পীত হয়েছে এবং ওগুলোকেও আপন আত্মায় ঠাঁই দিয়েছে। চলচ্চিত্রের অবদান ও সম্ভাবনা এভাবে আমাদের নানা বর্ণে নানা বন্ধনে জড়িয়ে ফেলেছে।


এমন একটা প্রভাতে শিল্পের সকল শাখার সৃজনশীল কর্মীবৃন্দ ফিল্মের জগৎটাকে নিজেদের বলে দাবি করার অধিকার স্বাভাবিকভাবেই অর্জন করে। এবং চলচ্চিত্র যজ্ঞে তাদেরও একটা কিছু বলার আছে। চলচ্চিত্র যেহেতু কোনো না কোনোভাবে জনমনের আশা আকাক্সক্ষা সৌন্দর্যতৃষ্ণার খোরাক যোগায় তাই সামনের সকল বাঁধ ভেঙ্গে এক আলা দেখানো প্রথম বিবেচ্য কাজ। আবার চলচ্চিত্রের বিশ্বজনীনতা সব মানুষকেই দিয়েছে এর নির্মাতার সমালোচনায় মুখর হবার অধিকার।

আইজেনস্টাইন যখন তার কমরেডদের (চলচ্চিত্র কর্মীদের) ভীষণ একটা কিছু করে ফেলার জন্য তাড়া দিতেন তখন তিনি দর্শক ও নির্মাতা সম্পর্কের ব্যাপারে গভীর মনোযোগ রেখেই তা করতেন। যুগের  অন্তরে দানবীয় টেলিভিশন মাধ্যমের আলোড়ন দেখেও চলচ্চিত্রের অপার সম্ভাবনায় মগ্ন আইজেনস্টাইন  বলেন “চলচ্চিত্রের জটিল সম্ভাবনার জগৎটি মানুষের হাতে পড়ে সহজ ও সুন্দর হবার অপেক্ষায় আছে। যেমন পদার্থবিদ্যার দান এই নতুন পারমানবিক যুগের অসংখ্য উপাদান স্পর্শহীন হয়ে পড়ে আছে এবং যার প্রতিটিই মানুষের আয়ত্বে আসা দরকার। এবং সে উৎকর্ষ সাধনে এখনি সকলের কাজে হাত লাগানো কর্তব্য। সমগ্র মানবজাতির প্রতি যে দায়িত্বের ইঙ্গিত আইজেনস্টাইন করছেন তা নিছক কোনো মনের খেয়াল নয়। চলচ্চিত্র কর্মীদের জন্য এর মধ্যে রয়েছে চলচ্চিত্র নির্মাণে জড়িত সকল কুশলীর শ্রম সমন্বয়ের নির্দেশনা। ছবির নায়ক নায়িকা থেকে শুরু করে শব্দের কারিগরÑ সকলের সম্মিলিত শ্রম  সাধনার প্রস্তাবনা। দর্শকের জন্যেও সচেতন সুসংগঠিত অনুপ্রেরণা ও প্রশংসা জানাবার  দাবি প্রচ্ছন্ন রয়েছে এই কথার মধ্যে। ফিল্ম সোসাইটিকে আমরা সহজেই শেষোক্ত পর্যায়ভুক্ত করতে পারি। এসকল সোসাইটি চলচ্চিত্রের পরিচালক, দর্শক শিল্পী কুশলী কর্মী বোদ্ধা সকলকে সদস্যভুক্ত করবে। সোসাইটিগুলো পরিচ্ছন্ন বোধ নির্মাণের ক্ষেত্রে একেকটি দায়িত্বশীর গোষ্ঠী হয়ে উঠতে পারে। শিল্পের কোনো একটি শাখার কর্মী গায়ক কি সুতোর মিস্ত্রী, কি প্রাজ্ঞ শ্রমিক কেউ যদি এ সোসাইটি থেকে বাদ যায় তাদেরকে যদি আলোচনা ও মন্তব্যের প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা হয় তবে সে সোসাইটিকে ঘুণে ধরা সোসাইটি আখ্যা দিতে হবে। এসব সোসাইটি পথেই উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে। কথাটি আরেকটু পরিষ্কার করা যাক।

ফিল্ম সোসাইটি হবে সকলের জন্য উন্মুক্ত। যখনি সে ড্রইংরুমে উঠে যায় তখনি সামগ্রিক চলচ্চিত্র-বিজ্ঞানের সঙ্গে অবধারিতভাবে সে সম্পর্ক হারায়। এই সত্যের পটভূমিতে সমস্যা খতিয়ে দেখতে গেলে দেখা যাবে আমাদের দেশে আমরা কী করছি। চারিদিকে কী দেখছি। ফিল্ম সোসাইটিগুলো সূচনালগ্ন থেকেই এরকম সম্পর্কহীনতার মুখে পড়ছে। আমাদের ফিল্ম সোসাইটির প্রবণতা আভিজাত্য ও আত্মসম্ভ্রমের দিকে। আমাদের সবচেয়ে শুদ্ধতম প্রবণতা বড়জোর একটি বিলাসী তরুর জন্ম দিতে চায়। এটা অনেক দেশেই ঘটেছে এবং সেখানে এ সব প্রবণতার একটি রাজনৈতিক অর্থনৈতিক কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে।

নিঃসন্দেহে একটি শিল্প মাধ্যম হিসাবেই চলচ্চিত্রের জন্ম। এবং তাদেরই জন্য আমরা যাদেরকে ইতর জনগোষ্ঠী বরে ডাকি। সেলিস ফ্রান্সে কী করেছেন, কী করেছেন এডউইন পোর্টার আমেরিকায়। সাধারণের অনুভূতিকে শিল্পের ভাষায় প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মনে সব সময সে সব দর্শক বাস করেছে যারা মেলা ও মিউজিক হলের সামনে ভিড় জমায়। ১৯১৪ সালে চ্যাপলিনের আবির্ভাব এ পটভূমিতে। এরই আদর্শ গুরু হিসাবে। যদিও তাঁর ঐ যুগের ক্ষুদ্র ছবিগুলো আপাতদৃষ্টিতে স্থূল ও রুচিহীন ছিল তথাপি তাতে হৃদয়ের যে প্রতিধ্বনি ছিল তা হীরের মতো খাঁটি। প্রকৃত রুচিহীনতার শুরুতো এই সেদিন থেকে, লাখপতি কোটিপতিরা যেদিন চলচ্চিত্রে টাকার গন্ধ পেয়েছে। যেদিন ছবিতে তারা হাত লাগিয়েছে, উপড়ে ফেলেছে তার হৃদয়। কমার্শিয়াল কথাটি তখন থেকে রাজদণ্ড পেয়েছে। একাধিপত্যকামী সে সব সেনাপতিরা মানুষের হাতে আফিম তুলে দিয়েছে। অপটন সিনক্লেয়ার বিশের দশকে ওয়েল নমে একটি নভেল লিখেছিলেন যাতে ঐ সব অসুরের বাস্তব বর্ণনা পাওয়া যায়। সকল ক্যাপিটালিস্ট দেশের অর্থগৃধু ফেঁদে দিয়েছে লোভের গোঁজ। এখানে অবশ্য দ্রষ্টব্য যে, আমেরিকার মতো একচেটিয়া পুঁজির দেশেও সব শিল্পী কুশলী নির্মাতা  শৃগালের কাছে আত্মসমর্পণ করেনি। মূল স্রোতেই তাঁরা কূল খোঁজার চেষ্টা করেছেন। তাঁরা আমেরিকান নয় বলে তাদেরকে সন্দেহ করা হয়েছে, স্টুডিও থেকে বের করে দেয়া হয়েছে, তবু তারা সুসংগঠিত প্রতিরোধ গড়েছেন। এর ফলে তারা চাকরিচ্যূত হয়েছেন, সাজা পেয়েছেন। চরম দুর্দশায়ও পড়েছেন।  জন হাওয়ার্ড লসন, আলবার্ট মাৎস এবং আরো অনেকের চলচ্চিত্র নির্মাতা ঐ সব কর্মীদের মুক্তির জন্য লড়েছেন। সম্প্রতি লক্ষ্যণীয় যে তারা কিছুটা হলেও তাদের জন্য জায়গা করে নিয়েছেন।

আমাদের দেশের প্রসঙ্গে আসলে দেখা যাবে দীর্ঘ যুগ ধরে আমাদের বোধশক্তির উপর চলছে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির একচেটিয়া কসাইবৃত্তি। আফ্রো এশিয়া লাতিন আমেরিকার অনুন্নত দেশগুলোতে চলচ্চিত্র নামের আফিম ব্যবসার বাজার বলে গণ্য করা হচ্ছে। আমাদের দেশেও এ মর্মন্তুদ ঘটনা স্বাধীনতা অর্জনের পরেও দৌরাত্মের সঙ্গে ঘটে চলেছে। পাক ভারত উপমহাদেশের ধনকুবেরেরা স্বাধীনতার পর মুক্ত ভারত পাকিস্তানে সাম্রাজ্যবাদীদের কণিষ্ঠভ্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তাদের এ ধরণের ভূমিকায় আমাদের অবস্থা আরোও দূরারোগ্য হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের ফিল্ম সোসাইটিগুলো ওদের সাথে সংঘর্ষে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত এবং পরে ক্লান্ত হয়ে নুয়ে পড়েছে। কিন্তু সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে এখনও তাঁরা মুনাফাখোরদের সাথে দ্বন্দ্বে বেসামাল।

এতটুকু উজ্জ্বলতার কারণ গোড়াতেই বলা হয়েছে। ফিল্মকে এগুতে হয় মানব সম্পর্কের উপর নির্ভর করে। এ সম্পর্ক গভীর ও বিস্তৃত করার মধ্য দিয়ে বহিরাগত শিল্পী কর্মীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ হয়। শিল্পীরাই পারেন হৃদয়ের প্রতিমূর্তি স্থাপন করতে যা খাঁটি হীরে।

জাপানী কবিতা ও কাবুকীভক্ত আইজেনস্টাইন একবার মন্তব্য করেছিলেন জাপানী সংস্কৃতির সিনেমাটোগ্রাফিক বৈশিষ্ট্য জাপানী সিনেমায় থাকে না। আইজেনস্টাইনের এমন মন্তব্য করার কারণ তিনি জাপানী ছবিতে অজস্র করাপশন, প্রচুর মুনাফা ব্যবসা, অঢেল তারকাখ্যাতি ও বিশেষ নাটুকেপনা লক্ষ্য করেছেন। তবুও জাপানী সিনেমাটোগ্রাফী থেকে বিস্তর অনুপ্রেরণা সংগ্রহ আইজেনস্টাইনের পক্ষে খুব অস্বাভাবিক ছিল না। ইঙ্গিতটি পরিষ্কার।

আমাদের ফিল্ম সোসাইটিগুলোতে সমস্যা থাকলেও নৈরাশ্যের কোনো কারণ নাই। আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতিতে রয়েছে সিনেমাটোগ্রাফিক উপাদান। আমাদের রয়েছে প্রাণবন্ত জনসমষ্টি। শুধু প্রয়োজন রয়েছে সঙ্কীর্ণতার বিরুদ্ধে প্রাকার গড়ে তোলার।

অনুবাদ: মাসুদ আলী খান     
 

প্রাপ্তিসূত্রঃ মুহম্মদ খসরু সম্পাদিত বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ এর পত্রিকা ধ্র“পদী থেকে সংগৃহীত।
     
Untitled Document
Total Visitor : 708590
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :