Untitled Document
কার্তিক সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
তোমাকে দেব না ভুলেও লাল জবা ফুল
- কফিল আহমেদ
 

(পূর্ব প্রকাশের পর)

শহরের উপর আকাশের চিল ঘুরছে। একা। ভিখিরির কয়েক টুকরো জোগাড় করার বন্দোবস্ত রীতি আছেই। তবে তাকেও ঘুরতে হয়। ল্যাংচাতে ল্যাংচাাত ঘুরতে হয়।  না পারলে পথের মোড়ে কোথাও শুয়ে বসে আছে।  এক-দুই টুকরা তার মুখেও জুটতে পারে। কাকচিলেরা তো আরো অনেক দূরের । তবে ওরাও উড়ছে ঘুরছে। বহুদূর থেকে ওরা নীরব ইন্দুরমরা, না হয় আরো নিথর পচাগরলা খুঁজছে।

বিলেগাঙ্গে হাজারকিদের হল্লা শুনেছি। এ অঞ্চলে বহুকাল হতে মানুষেরা একজোট হয়ে বিলেগাঙ্গে মাছ ধরতে যেতো। কিন্তু জেলে হাজারকিরা, কৈবর্তরা বেশিরভাগই নিরীহ হিন্দুজন। গাঙবিলে একজোট হয়ে ওরা মাছ ধরে বাঁচে।

হাজারাকিদের বহুদিনের পেশা আর ঘরবাড়িকে তছনছ করে সেখানেও একদিন নিলামঅলার শাসন প্রতিষ্ঠিত। বিপরীতে হাজারকিদের মরণপণ হাঁকডাক, লড়াই- তা-ও শুনেছি। সরকার তার বন্দোবস্ত আইনে বিলগাঙ ইজারা নিলামে ভাড়া দিয়েছে স্থানীয় ঠিকাদার জোতদারদের কাছে।

তখন জেলে কৈবর্তরা যেন গাঙবিলের বুকে বহু উদ্বাস্তু কাকচিল। কিন্তু তাদেরতো আর পাখা নাই যে শুধু শূন্যভরে উড়বে ঘুরবে। তাদের আছে হাত। আছে মুখ। তাই জেলে যে জলা তার দাবি নিয়েই তরুণ দাবির প্রতিজ্ঞাঘন আন্দোলনের শুরু। সে দাবির মুখে নিলামঅলাদের মাথা কাটা যেতে পারে, এমন পরিস্থিতিতে সরকারের খোদ প্রশাসন পর্যন্ত বিচলিত। আর এদিকে মামলা মোকদ্দমা জেল জালিয়াতির মুখে মরণপণ যুদ্ধ করতে করতে, সে যুদ্ধ অসমাপ্ত রেখেই আন্দোলনকরীরা একদিন যার যার জীবনযাপন নিয়ে এদিকে সেদিকে।

দুহাতে থাপ্পা দিয়ে কাকচিল সরানো সহজ। কিন্তু নিলামঅলাদের উচ্ছেদ করা তো মোটেও সহজ কিছু নয়। এদের শক্তি গ্রাম রাষ্ট্র হয়েই নাকি সারা দুনিয়াব্যাপী। তবু ‘জেলে যে জলা তার এই দাবি নিয়ে প্রায় একযুগেরও আগে বেঙলার জেলে আন্দোলন... বাঙলার এই হাজারকি আন্দোলন নিলামঅলাদের উৎখাত করবার জন্য গাঙ্গের বুকে জেলে হাজারকিদের পতাকা উড়াবার সঠিক খবরটা দিয়েছিল।

কেউ বলবেন এদেশে নিলামঅলাদের ভিত্তি আরো সাঙ্ঘাতিক। দিনে দিনে  যেন আরো পোক্ত হয়েছে। বিল-গাঙ্গ-হাট-বাজার-বন্দর-মাঠ সবকিছুইতো দিনে দিনে আরো নিলামে উঠছে।

হাটে মুরগী গরু বেচা লোক, তাকেও হাসিল দিতে হয় গাঁয়ের ইজারাঅলাকে। ঘাটে ঘাটে গাঙ পারাপারে বাড়তি ভাড়া দিতে হয় পথচারীকে। নদীর তলানি থেকে পাথরের মাথা পর্যন্ত যা যা আছে, যা যা দেখা যায়, যা কিছু দেখা যাচ্ছে না- মাটির তলার সম্ভাবনা তেল-কয়লা, সকল সম্ভাবনা, অনুমান কিংবা অনুধাবন তাও ইজারা নিলামে বন্ধকী দেয়া হচ্ছে। এক থেকে শুরু করে একশো বছরের জন্য বন্দোবস্ত চুক্তির নানান স্বাক্ষর নিয়ে খুব তৎপর আর বেপরোয়া হয়ে উঠছে নানান কোম্পানিগোষ্ঠীর লোক।

 জেলে যে জলা তার- এই দাবি নিযে বেঙলার তরুণ হাজারকি আন্দোলন অগ্রসর হলে এদেশে নিশ্চয় এতোসব জীবন বিরোধী বন্দোবস্তের বিরুদ্ধে একটা সুন্দর দৃষ্টান্ত, পথ আরো বাস্তবিক সম্ভাবনার হয়ে উঠতোই। একথা স্বীকার করতেই হবে।

 ‘জেলে যে জলা তার- কথাটা এদেশের মানুষের জীবনে এখনো কার্যকর না হলেও, সে দাবী কার্যকর করবার জন্য লোকালয়ের তরুণ মন ঠিকই আন্দেলিত হয়েছিল। শ্রমিক যে কারখানা তার একথাটা এখনো স্পষ্ট বলা যাচ্ছে না, কারণ নাকি কারখানার একটা মালিকানা ব্যবস্থা রীতি আছেই। ওখানে ব্যক্তি কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং পুঁজির ইনভেস্টমেন্ট আছে। কারখানা শ্রমিকের - এ কথাটা বলতে গেলে নাকি চলতি বিধানরীতির বিরুদ্ধে জীবনের ডাকটা খুব সরাসরি হয়ে যেতে পারে।

জলাভূমি ... যদিও তা সকলের জন্য কখনোই সমান খোলামেলা ছিলনা, তবু সে জলাভূমি ঘিরে বহুকাল আগে থেকেই সে পাড়ের অসংখ্যের জীবনযাপন।  তা নিয়েইতো মানুষের আরোপ কতো রকমের কাজ, আরো কতো স্বপ্নসাধ। সে অসংখ্যের নামই হাজারকি। দেশ চালাতে টাকা লাগে। সে কথা জেলে কৈবর্তরাও জানে। আর সে জন্য তো সরকারের তহবিলে নিয়ম করে তা দেবার মন ইচ্ছা আর প্রতিশ্র“তি প্রকৃত জেলেদের ছিলোই। তারা তো চেয়েছিলো- তারাও বাঁচুক আর দেশের সরকারও ভাল থাকুক। কিন্তু সেদিকে সরকারের প্রশাসনের কোনো খেয়াল নেই। তাই জলাভূমির উপর ব্যক্তিগোষ্ঠীরা একটু পুঁজির ইনভেস্ট করেই অসংখ্যকে উদ্বাস্তু বানিয়ে নিলামে একটা বন্দোবস্তে ডেকে আনে। সে ডাকেও অনেক সরকারি ফাঁকি। ঘুষ। প্রশাসনের নানান স্থানীয় সরকারি জোচ্চুরি।

চাষা যে মাঠ তার সে কথা বলবার মুখেও ভূঁইয়া ভূস্বামীরা বক্তার মুখ বেঁধে, তাকে জেলখানায় দিতে চাই। উপায়ান্তরে হত্যাকান্ডও ঘটাতে পারে। এদেশে খাসজমি চেয়ে ভূমিহীনেরা, দিনমুজুরেরা নানাভাবে লড়াই সংগ্রামও করেছে। সেসব লড়াই সংগ্রামকোনো সুন্দর পরিণতি পায়নি। ভুমিছাড়াদের নানান আন্দোলন আর রক্তদান তা-ও জীবনের অধিকার  প্রতিষ্ঠার পথ ধরে বেশিদূর এগুতে পারেনি। তা সত্য।

তবুও জেলে যে জলা তার এই স্লোগান দাবির সাথে শ্রমিক যে কৃষি তার, কারখানা তার- হয়ে উঠবার পথে জীবনধারাকে আরো সাবলিল ও সামগ্রিক করবার জন্য, তাকে আরো সত্য করে বলতেই হয়- জলাধারের উৎসমুখ আর তার প্রবাহ যেনো কাছের দূরের সব স্থল ও পাহাড়দেশ পর্যন্ত... তা আরো জীবনে যুক্ত হয়। সম্পর্কিত হয়। এই সম্পর্কে, যা আছে, যা যা আছে- সেখানে অবশ্যই জলটুকু আছে। জল ছাড়া তো জলার অস্তিত্বের কথা ভাবা যায় না। আর জলধারার উৎসমুখে তো পাহাড়দেশ জড়িত হয়েই আছে। তা আর ছিন্ন হওয়া যায় না। সে পথে বাঁধ দিয়ে, নানান বন্ধকির বাঁধা দিয়ে তো পথে পথে নানান মৃত্যুবীজ বপন করাই হচ্ছে।

জলার গভীরে যারা থাকে, যারা আসে... তারা মাছ, ঝিনুকশামুক। জলদেশে যারা বাস করে তারা ফুলকলমি, পদ্মশালুক। জল জুড়ে যারা উড়ে তারা পানকৌড়ি, বকচিল। বিলে এবার হাঁস এসেছে... এমন খবর পেয়ে জালুয়ারা যেন অন্ধকারে আকাশ জুড়ে ওদেরকে আর ঘেরাও না দেয়। সে ধারার ঘেরাও নীতি মানুষের মনে গোপনে ঘাপটি মেরে খুব হাসাহাসি করে।

শত আইন করেও নাকি সে হাসি থামানো যাচ্ছে না। মানুষ জাল বুনতে চায় গোপনে হাসি ধরবার জন্য্ ব্যক্তি কোম্পানি বানাতে চাই আর কোম্পানিও রাষ্ট্রনীতি বানাতে চায় তার জাল দিয়ে মানুষগুলোকে ধরবার জন্য। ভিতরে ভিতরে লালসা আরো ঘন, সংকট আরো জমাট হয়েই আছে।

(চলবে)

(উলুখড় এর প্রকাশনা ছোটকাগজ আন্দোলনের ২৫ বছরঃ স্বপ্নের সারসেরা থেকে প্রকশিত কফিল আহমেদের লেখা হতে সংগৃহীত।)



   

                

     
Untitled Document
Total Visitor : 708936
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :